ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ৮ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৬ ঘন্টা আগে
১৩ অগাস্ট, ২০১৬ ১৮:২২

ব্লাড ডোনেশন -রক্তদানের গুরুত্ব ও কিছু তথ্য

ব্লাড ডোনেশন -রক্তদানের গুরুত্ব ও কিছু তথ্য

রক্তের প্রয়োজন যাদের:
১) দুর্ঘটনাজনিত রক্তক্ষরণ- দূর্ঘটনায় আহত রোগীর জন্য দুর্ঘটনার ধরণ অনুযায়ী রক্তের প্রয়োজন।
২) দগ্ধতা-আগুনে পুড়ে যাওয়া বা এসিডে ঝলসানো রোগীর জন্য প্লাজমা রক্তরস প্রয়োজন। এজন্য ৩-৪ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন।
৩) অ্যানিমিয়া- রক্তে R.B.C এর পরিমাণ কমে গেলে রক্তে পর্যাপ্ত পরিমাণ হিমোগ্লোবিনের অভাবে অ্যানিমিয়া রোগ হয়। হিমোলাইটিক অ্যানিমিয়াতে R.B.C. এর ভাঙ্গন ঘটে, ফলে রক্তের প্রয়োজন হয়।
৪) থ্যালাসেমিয়া- এক ধরনের হিমোগ্লোবিনের অভাবজনিত বংশগত রোগ। রোগীকে প্রতিমাসে ১-২ ব্যাগ রক্ত দিতে হয়।
৫) হৃদরোগ- ভয়াবহ Heart Surgery Ges Bypass Surgery এর জন্য ৬-১০ ব্যাগ রক্তের     প্রয়োজন হয়। 
৬) হিমোফিলিয়া-বংশগত রোগ। এতে রক্তক্ষরণ সহজে বন্ধ হয় না, তাই রক্ত জমাট বাঁধার উপাদান সমৃদ্ধ Platelet দেয়া হয়।
৭) প্রসবকালীন রক্তক্ষরণ-সাধারণত প্রয়োজন হয় না, তবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ অনুসারে রক্ত দেয়া হয়।
৮) ব্লাড ক্যান্সার-রক্তের উপাদানসমূহের অভাবে ক্যান্সার হয়। প্রয়োজন অনুসারে রক্ত দেয়া হয়।
৯) কিডনী ডায়ালাইসিস-প্রতিবার ডায়ালাইসিসে এক ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন।
১০) রক্ত বমি- এ রোগে ১-২ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন।
১১) ডেঙ্গু জ্বর- এ রোগে ৪ ব্যাগ রক্ত হতে ১ ব্যাগ Platelet  পৃথক করে রোগীর শরীরে দেয়া হয়।
১২) অস্ত্রোপচার-অস্ত্রোপচারের ধরণ বুঝে রক্তের চাহিদা বিভিন্ন।

রক্তদানের যোগ্যতা:
ক্স     বয়স: ১৮-৫৭ বছর।
ক্স     ওজন: ১০০ পাউন্ড বা ৪৫ কেজির উর্ধ্বে। তবে বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে (অনুচক্রিকা, রক্তরস) ওজন ৫৫ কেজি বা তার উর্ধ্বে।
ক্স     রক্তচাপ স্বাভাবিক থাকলে।
ক্স     রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ৭৫% বা তার উর্ধ্বে থাকলে।
ক্স    সম্প্রতি (৬ মাস) কোন দুর্ঘটনা বা বড় ধরনের অপারেশন না হলে।
ক্স     রক্তবাহিত জটিল রোগ, যেমন: ম্যালেরিয়া, সিফিলিস, গনোরিয়া, হেপাটাইটস, এইডস, চর্মরোগ,
       হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, টাইফয়েড এবং বাতজ্বর না থাকলে।
ক্স     কোন বিশেষ ধরনের ঔষধ ব্যবহার না করলে।
ক্স     চার মাসের মধ্যে যিনি কোথাও রক্ত দেননি।
ক্স     মহিলাদের মধ্যে যারা গর্ভবতী নন এবং যাদের মাসিক চলছে না।
রক্তদান এবং রক্তদানের পর:
রক্তদানের আগে প্রত্যেক রক্তদাতাকে তার স্বাস্থ্য সম্পর্কিত কিছু ব্যক্তিগত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জিজ্ঞাসা করা হয়। সেগুলোর সঠিক উত্তর দিতে হবে। রক্তদাতার শারীরিক তাপমাত্রা, রক্তচাপ, নাড়ীর গতি পরীক্ষা করা হয় এবং রক্তদাতার রক্ত জীবানুমুক্ত কি না তা জানার জন্য সামান্য রক্ত নেয়া হয় (ক্রসম্যাচিং)। রক্ত পরীক্ষার পর কারও রক্তে এইডস, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটস-সি, সিফিলিস বা অন্য কোন জীবানুর উপস্থিতি ধরা পড়লে তাকে (রক্তদাতা) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের পরামর্শ দেয়া হয়। সূঁচের অণুভূতি পাওয়ার মাধ্যমে রক্তদান প্রক্রিয়া শুরু হয়। এতে সময় লাগে সর্বোচ্চ ১০ মিনিট।
রক্তদানের পূর্বে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে:- 
ক্স    যথেষ্ট বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা। 
ক্স    রক্তদাতা প্রয়োজন মনে করলে বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারে। 
ক্স    রক্তদানের সময় মাথা ও শরীর সমান্তরাল থাকতে হবে। 
ক্স    দূর হতে রক্ত দিতে এলে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে হবে। 
ক্স    রক্ত দান করার পর অবশ্যই ন্যূনতম ৫ মিনিট শুয়ে থাকতে হবে। 
ক্স    রক্তের প্রবাহ সমগ্র শরীরে স্বাভাবিক হওয়ার জন্য এটি অতীব জরুরী। 
ক্স    শুধু লোহিত রক্ত কণিকা পূরণ হতে ১২০ দিন বা ৪ মাস সময় নেয়। 
ক্স    রক্তদানের পর অবশ্যই তারিখ মনে রাখেতে হবে। প্রায় সব প্রতিষ্ঠানই ডোনার কার্ড সরবরাহ করে।

বেশিরভাগ রক্তদাতাই রক্তদানের পর কোন সমস্যা অনুভব করেন না। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে রক্তদাতা তলপেটে ব্যাথা, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, সূঁচ প্রবেশের স্থানে ক্ষত, লালচে দাগ এবং ব্যাথা অনুভব করতে পারেন। সামান্য কিছু ক্ষেত্রে রক্তদাতা জ্ঞান হারাতে পারেন বা মাংশপেশীতে খিঁচুনী ধরতে পারে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এসব সমস্যা ৪৮ ঘন্টার মধ্যে ঠিক হয়ে যায়, কোন ঔষধের প্রয়োজন হয় না।
রক্তদানের সুবিধা:
ক্স    প্রতি ৪ মাস পরপর রক্ত দিলে দেহে নতুন ইষড়ড়ফ ঈবষষ সৃষ্টির প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেকগুনে বেড়ে যায়।
ক্স    নিয়মিত রক্তদানে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে বলে হৃদরোগ বিশেজ্ঞরা মনে করেন। ফ্লোরিডা ব্লাড সার্ভিসের এক জরিপে দেখা গেছে, যারা নিয়মিত রক্ত দেন, তাদের হার্ট অ্যাটাক এবং স্ট্রোক  অন্যদের চেয়ে ৩৩ ভাগ কম হয়।
ক্স    স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে আপনি জানতে পারবেন আপনার শরীরে রক্তবাহিত মারাত্মক রোগ যেমন: হেপাটাইটিস-বি, এইডস্, সিফিলিস ইত্যাদির জীবানু বহন করছে কিনা।
ক্স    স্বেচ্ছায় রক্তদানে মানসিক প্রশান্তি আসে। কারণ প্রতি ২ সেকেন্ডে বিশ্বে ১ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। আপনার দেয়া রক্তই একজন মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে পারে।
ক্স    রক্তদানের ফলে শরীরের অতিরিক্ত কোলেস্টরলের মাত্রা কমে যায়।
ক্স    রক্তের বিকল্প কেবলই রক্ত। তাই রক্ত দিন, জীবন বাঁচান।
ক্স    রক্তদানের মাধ্যমে একটি জীবন বাঁচানো পৃথিবীর সর্বোচ্চ সেবার অর্ন্তভুক্ত। আল্লাহ বলেন “একজন মানুষের জীবন রক্ষা করা সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করার মতো মহান কাজ” (সূরা মায়েদা-৩২)। 

রক্তদান সম্পর্কিত কিছু প্রশ্ন ও উত্তরঃ ১.    আমার শরীরে রক্তের পরিমাণ অনেক কম, আমি কীভাবে রক্ত দেব?     মানুষের শরীরে রক্তের পরিমাণ: ক) পুরুষ: ৭৬.৬ মিলি/ কেজি ওজন, খ) মহিলা: ৬৬.৬ মিলি/ কেজি ওজন। শুধুমাত্র ৫২.২ মিলি/ কেজি ওজন রক্ত শরীরের স্বাভাবিক কার্যকলাপ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য যথেষ্ট। রক্তদানের সময় কেবল ৮ মিলি/ কেজি ওজন রক্ত আপনার শরীর থেকে নেওয়া হয়। অর্থাৎ রক্তদানের পরেও আপনার শরীরে অতিরিক্ত প্রায় ১০ মিলি/ কেজি ওজন রক্ত মজুদ থাকে। এই চিন্তার কোন কারণ নেই ২.কতদিন পর পর রক্ত দিতে পারবো?    মানুষের রক্তের লোহিত কণিকা প্রতি ৪ মাস (১২০ দিন) পর পর ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। প্রতিবার রক্তদানের পর কয়েক ঘন্টার মধ্যে রক্তের জলীয় অংশের ঘাটতি পূরণ হয়ে যায় এবং ৩ূ৪ সপ্তাহের মধ্যে লোহিত কণিকার ঘাটতিও পূরণ হয়ে যায়। সুতরাং আপনি ইচ্ছে করলেই প্রতি ৪ মাস পর পর নিয়মিত রক্তদান করতে পারেন ।
৩. মহিলারা কি রক্ত দিতে পারবেন? আমার ওজন কম, আমি কি রক্ত দিতে পারবো? ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়স্ক পুরুষ কিংবা মহিলা যাদের ওজন নূন্যতম ৪৫ কেজি, তারাই রক্ত দিতে পারবেন।
৪. রক্ত দানের কতক্ষণ পর আমি স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারবো? রক্তদানের পর প্রচুর পরিমাণে পানি, শরবত প্রভৃতি পান করা উচিত এবং কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর সুস্থবোধ করলে আপনি স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে পারবেন। রক্তদানের পর ২৪ ঘন্টা পর্যন্ত কোন ধরণের ভারী কাজ না করাই শ্রেয়।
৫. আমি ধূমপান করি, আমি কি রক্ত দিতে পারবো?    ধূমপান সর্বদাই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। রক্তদানের কমপক্ষে ১ দিন পূর্বে ধূমপান পরিহার করতে হবে।
৬. আমি উচ্চরক্তচাপে ভুগছি, আমি কি রক্ত দিতে পারবো?    হ্যাঁ! উপযুক্ত ঔষধ সেবনের মাধ্যমে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকলে (১৮০/১০০ মিমি পারদ চাপ এর নীচে) আপনি অনায়াসে রক্ত দিতে পারেন।
৭. ডায়াবেটিস রোগীরা কি রক্ত দিতে পারবেন? টাইপ-২ ডায়াবেটিস অর্থাৎ যারা ইনসুলিন গ্রহণ করছেন না বরং শুধুমাত্র ঔষধ সেবন করছেন, ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে থাকলে তারা রক্ত দিতে পারবেন। যারা ইনসুলিন গ্রহণ করে থাকেন, তারা রক্তদানের ২ সপ্তাহ পূর্বে নির্দিষ্ট মাত্রায় ইনসুলিন গ্রহণের মাধ্যমে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রেখে রক্ত দিতে পারবেন।
৮. আমার ওজন অনেক বেশি, আমি কি রক্ত দিতে পারবো?    মানুষের শরীরের ওজনের সাধারণত ৭% রক্ত থাকে। ওজন যাই হোক না কেন শরীরে রক্তের পরিমাণ নির্দিষ্ট থাকে। শরীরের ওজন বেশি, তাই রক্তের পরিমাণ বেশি- এই ধারণা ভুল। সুতরাং, আপনি অবশ্যই রক্ত দিতে পারবেন। 

কয়েকটি ব্লাড ব্যাংকের ঠিকানা:
১। কোয়ান্টাম ব্লাড ব্যাংক
    ঠিকানা: ৩১/বি, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন সড়ক,
    শান্তিনগর (দ্বিতীয় তলা), ঢাকা-১২১৮
    ফোন: ৯৩৪০৪৪১, ৮৩১৯৩৭৭
    মোবাইল: ০১৭১৪৯৭৪৩৩৩
২।    বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট ব্লাড ব্যাংক
    ঠিকানা: ৭/৫, আওরঙ্গজেব রোড, মোহাম্মদপুর,    ঢাকা-১২০৭
    ফোন: ৯১১৬৫৬৩
৩।    সন্ধানী ব্লাড ব্যাংক : সকল মেডিকেল কলেজে এর শাখা রয়েছে
৪।    রিদম ব্লাড ব্যাংক
    ঠিকানা: ১৬৮, আটলান্টিক ওয়াজউদ্দিন টাওয়ার,
    এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা-১২০৫
    ফোন: ০১৮৫৪৮০৮৭৬৫
 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত