ডা. ছাবিকুন নাহার

ডা. ছাবিকুন নাহার

অবসটেট্রিশিয়ান অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্ট 
ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল।


২০ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০৪:১৯ পিএম

স্বেচ্ছায় এবরশন: হাসতে হাসতে খুন করার শামিল

স্বেচ্ছায় এবরশন: হাসতে হাসতে খুন করার শামিল
মনে মনে ভাবছি, কী আজব সাইকোলজি মানুষের! এক বাচ্চার শুশ্রূষার জন্য অন্য বাচ্চা মেরে ফেলতে চাচ্ছে! এটা তো বাচ্চা নষ্ট করার জন্য কোনো অযুহাত হতে পারে না। প্রতীকী ছবি

গত শুক্রবার। যতটা নয়, তারচেয়ে বেশি উৎকণ্ঠা নিয়ে এক দম্পতি ঢুকলেন। মধ্য তিরিশের। বেশ লম্বাটে দুজনই। পোশাক যদি স্বচ্ছলতার মাপকাঠি হয় তবে এরা স্বচ্ছল। তবে খুব অস্থিরতা চোখে মুখে লেগে ছিল।

: কি সমস্যা?

: ম্যাডাম বাচ্চা নষ্ট করতে এসেছি।

উত্তরে কিছু বললাম না, শুধু চোখ তুলে তাকালাম। সে তাকানোতে কী ছিল জানি না, রোগী গড়গড় করে বলতে শুরু করল।

: আসলে আমার আগের দুইটা বাচ্চা আছে। একটা ছেলে একটা মেয়ে। ছোট বাবুটার বয়স মাত্র তিন বছর। বাচ্চা পেটে আসলে আমি এক মুহূর্ত সুস্থ থাকি না, সারাক্ষণ বমি করি। এই আপদ থেকে আমাকে বাঁচান ম্যাডাম। এই বাচ্চা আমি রাখতে পারবো না। তাহলে আমার বড় বাচ্চা দুইটা মরে যাবে একদম।

: কত মাস?

: ঠিক বলতে পারবো না। তবে দুই মাসের বেশি হবে না। ম্যাডাম ওষুধ দেন। আমরা এই বাচ্চা কোনো মতেই রাখতে পারবো না। একই কথার পুনরাবৃত্তি করছেন একটু পর পর।

: নিলেন কেনো তাহলে?

: নিতে চাইনি, ভুলে রয়ে গেছে।

মনে মনে বললাম, কী আজব! তো ভুল করবে এক পক্ষ, আর জীবন দিয়ে প্রায়শ্চিত্ত করবে আরেকজন। এ কেমন বিচার! মনের কথা মন রেখে অতিরিক্ত শান্ত কণ্ঠে বললাম, আগে কনফার্ম হোন কত সপ্তাহের বাচ্চা। তারপর দেখি কী করা যায়।

আল্ট্রাসনোতে দেখা গেলো বাচ্চার বয়স প্রায় দুই মাস। এত্তটুকুন একটা মানব ভ্রুণ। অথচ কী জীবনী শক্তি! প্রবলভাবে নিজের হৃৎপিন্ডকে পাম্প করে যাচ্ছে। যেনো ভ্রুকুটি করছে তার অবিবেচক বাবা-মায়ের আচরণকে। যেনো বলছে, মানব জাতী তো পাগল কিসিমের! এরা নিজের রক্তকে ভুল বলে ফেলে দিতে চায়। আবার কেউ কেউ নাকি সেই ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্টে জীবনের আলো জ্বেলে দিতে সর্বোত্তম চেষ্টা করে। দেখি আমার ক্ষেত্রে কী হয়?

: ম্যাডাম বলছিলাম না দুই মাস। দেখলেন তো! শুনছি শুধু ওষুধ খাইলেই এই সময়ে কিলিয়ার হইয়া যায়। ওহ্হ! আল্লাহ বাঁচাইছে। ওষুধ দ্যান। খুব তাড়াহুড়া। যেনো একটা ওষুধের প্রেসক্রিপশনেই লেগে আছে মুক্তির বার্তা, অতঃপর পালতোলা নৌকায় ভেসে বেড়ানো চিন্তাহীন।

: আচ্ছা তাহলে ফাইনাল, বাচ্চা রাখবেন না?

: জ্বী ম্যাডাম। আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি এই সময়ে। কিচ্ছু খাইতে পারি না। সারাক্ষণ বমি করি। বিছানায় পড়ে যাই। বাচ্চাকাচ্চার একদম যত্ন নিতে পারি না।

মনে মনে ভাবছি, কী আজব সাইকোলজি মানুষের! এক বাচ্চার শুশ্রূষার জন্য অন্য বাচ্চা মেরে ফেলতে চাচ্ছে! এটা তো বাচ্চা নষ্ট করার জন্য কোনো অযুহাত হতে পারে না। জীবন-মরণ সমস্যা হলে এক কথা ছিল।

: শুধুমাত্র এই অযুহাতে আপনি আপনার সন্তানকে হত্যা করবেন?

: না মানে এখনো তো হয়নি। তাছাড়া...

: তাহলে পেটের ভিতরেরটা থাক। বরং বড় দুই বাচ্চার যে কোন একটাকে মেরে ফেলেন।

: কী বলেন ম্যাডাম?

: আঁৎকে ওঠলেন কেনো? একই তো। মারবেন যখন যে কোনো একটা হলেই তো হয়।

এবার একটু চুপ করে বসলেন যেনো। হয়তো বা ভেবেও থাকবেন, ম্যাডাম এভাবে কথা বলল!

: দেখুন আপনাদের বাচ্চা আপনারা নষ্ট করতেই পারেন। আমি শুধু বলছি, আপনারা একটু ভেবে দেখেন বাচ্চাটা রাখতে পারেন কিনা। এরপর আর নিবেন না প্রয়োজনে। চাইলেই নিলাম, চাইলেই নষ্ট করলাম, এটা ঠিক না।

কৈফিয়তের সুরে আরো বললাম, দেখুন আমি বাচ্চা নষ্ট করি না। এ ব্যাপারে কোনো রকম পরামর্শও দিই না। তবে যদি এমন হতো যে, আপনার বাচ্চা নষ্ট হয়ে গেছে তাহলে আমি আপনাকে যথাযোগ্য চিকিৎসা দিতাম। আপনি অন্য কাউকে দেখাতে পারেন। স্যরি।

নিজের স্থির এবং দৃঢ় কণ্ঠে নিজেই অবাক হলাম। এবং কথা কটা বলে এক ধরনের স্বস্তি পেলাম যেনো। মনে মনে বলি, আমি তো এমন করে কথা বলি না। তাছাড়া এবরশনতো এখন লিগ্যাল। এর ওষুধ তো মুড়ি-মুড়কির মতো বিক্রি হয় বলে শুনছি। ইনফ্যাক্ট ফার্মেসিম্যানই নাকি প্রেসক্রিপশন ছাড়াই বিক্রি করে।

এক মন বলছে, এতটা রিজিড না হলেও পারতে। আরেক মন বলছে, কী করব বাচ্চাটার হার্টবিট এত রিদমিক ছিলো যে, মনে হচ্ছিলো আমাকে বলছে, প্লিজ সেভ মি ডক্টর। প্লিজ! তাছাড়া আমার সেই সময়ের কথা মনে পড়ে গেলো।

: কোন সময়ের?

: কেনো ভুলে গেলে?

: আশ্চর্য! মনে নেই একটা বাচ্চার জন্য আমাদের সে কী আকুলতা? বাচ্চার হার্টবিট নেই জেনে আকাশ-পাতাল ভাসিয়ে আমার নীরব কান্না? তুমিই বলো একটা জীবন্ত বাচ্চাকে মেরে ফেলার সহযোগী আমি কেমন করে হই?

: তাদের বাচ্চা তারা এবর্ট করতেই পারেন। এটা আইনত বৈধ।

: যতই বৈধ হোক, এটা আমি করতে দিতে পারি না। আমি কখনোই করি না, করবো না। যখন আমার জান বাচ্চারা আমার কোলে আসার আগেই ইশ্বরের কাছে পাড়ি জমিয়েছিল, তখনই এটা আমি প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আমি আমার প্রতিজ্ঞার প্রতি দায়বদ্ধ।

: কিন্তু রোগী কি তোমার কথা শুনলো?

: না শুনুক আমি আমার কাজ করেছি, অন্তত চেষ্টা তো করেছি।

'ম্যাডাম আপনার কথায় আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত চেঞ্জ করলাম।'

রোগীর হাজবেন্ডের কথায় সম্বিৎ ফিরল। খুশিতে চোখে পানি আসার মতো ব্যাপার। চোখের কোনায় পানি নিয়ে ঝাপসাচোখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছি। মনে হলো ভ্রুণটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আর তার চোখে অপার কৃতজ্ঞতা! 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে