ঢাকা      সোমবার ১৭, জুন ২০১৯ - ৩, আষাঢ়, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. জোবায়ের আহমেদ

নির্বাহী পরিচালক ডা. জোবায়ের মেডিকেয়ার এন্ড প্যাথলজি সেন্টার। 


'এইবার মিয়াসাব তাবিজের পাশাপাশি ওষুধ খাইতে বলছেন'

আফিয়া বেগম উদ্ভ্রান্তের মত ৩২ বছর এর ছেলেকে নিয়ে আমার চেম্বারে আসলেন।

অনেক দিনের পরিচয় আফিয়া বেগম এর ফ্যামিলির সাথে আমার।

সম্পর্কটা ভিজিট নেওয়া ও প্রেসক্রিপশান দেওয়ার মাঝে সীমাবদ্ধ নয়, সন্তানের মত স্নেহ পেয়েছি এই ৬০ বছরের বৃদ্ধার কাছ থেকে। অনেক মায়া বিলিয়েছেন আমাকে, গরুর মাংস ও চাউলের রুটি আমার কাছে অমৃত। একবার ওনি আমার জন্য গরুর মাংস ভুনা করে নিয়ে আসলেন, সাথে রুটি। আমি আমার এক স্টাফকে বললাম, টিফিনটা রেখে দাও, ওনাকে ধন্যবাদ দিয়ে রোগী দেখায় ব্যস্ত হলাম।

দেড় ঘন্টা পরে চেম্বার থেকে বের হয়ে দেখি উনি বাইরে বসে আছেন, নিজ চোখে আমার গরুর মাংস ও চাউলের রুটি খাবার দৃশ্য দেখে তারপর বাড়ি যাবেন।

সেদিন এই মায়া দেখে আমি অশ্রুসিক্ত হয়েছিলাম।

অনেক কাল মায়া পাইনি আমি, তাই এই জিনিস এর প্রতি বড়ই দূর্বল আমি।

আফিয়া বেগম এর দুই ছেলে। দুই মেয়ে।

মেয়েরা শ্বশুর বাড়িতে। সুখেই আছে। তাদের নিয়ে অন্য মা’দের মত আফিয়া বেগম এর চিন্তা কম। মেয়েরা শ্বশুর বাড়িকে আপন ঠিকানা ভেবে নিয়েছে, সেখানে শাশুড়ির কাছে সন্তান স্নেহেই আছে। উনি নিজেও ছেলের বউদের নিজ মেয়ের মত আদর করেন, তাই ওনার মেয়েরা সেটা শ্বশুর বাড়িতে পাচ্ছে।

ভালোবাসা ও মায়া ফিরে ফিরে আসে।

আপনি কাউকে মায়া করলে সেই মায়া আপনার কাছে ফিরে আসবে এটাই প্রকৃতির নিয়ম।

ছেলেরা দুজন লন্ডনে থাকেন। বড় ছেলে সেজানকে নিয়ে আমার কাছে আসা। নয় দিন হলো দেশে আসছে সেজান।

লন্ডনে ফার্মেসী শপে কাজ করা সেজান বিয়ে করেছেন এক বছর হলো। সব কিছু প্রসেস করে বউকে লন্ডনে নেবার জন্য নয় দিন হল দেশে আসলেন।

ছেলেটা খুব আনন্দে ছিল এই কয়দিন।

গত রাতে হঠাৎ সেজান এর রুম থেকে চিল্লাপাল্লা শুনা গেলে আফিয়া বেগম ছেলের দরজায় কড়া নাড়লেন।

ভেতরে ভাংচুর এর শব্দ শুনা গেল। কিছুক্ষণ পর কান্নার আওয়াজ।

আফিয়া বেগম অস্থির হয়ে উঠলেন।

ওনার ছেলে কাঁদছে কেন?

উনি দরজায় খুব ধাক্কাধাক্কি করলেন।

কিন্ত দরজা বন্ধ থাকলো দুই ঘন্টা।

ঘটনার আকস্মিকতায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে অস্থির চিত্তে সোফায় বসে আছেন আফিয়া বেগম।

মায়াজাল এর সংসার আফিয়া বেগম এর।

স্কুল শিক্ষক স্বামীর টানাপোড়েনের সংসার ছিল।

অভাব ছিল। কিন্ত আফিয়া বেগম এর অভিযোগ ছিল না। স্বামীকে সম্মান করতেন, ওনার অবস্থা বুঝতেন।

বাবার বাড়ি স্বচ্ছল ছিল। সেখান থেকে সহযোগিতা পেতেন। সংসারটা চালিয়ে নিতেন নিজের মত করে।

অভাবের সংসারে ভালোবাসা ছিল টইটুম্বুর।

লোকটা আফিয়া বেগমকে একা ফেলে না ফেরার দেশে পাড়ি দিয়েছেন ৫ বছর হলো।

মাঝে মাঝে নিজের মানুষটির কথা ভেবে বিনিদ্র রজনী কাটে আফিয়া বেগমের।

একটা অশান্তিতে ভোগেন। আজ এত সুখ, অভাব নেই, প্রাচুর্য আছে কিন্ত যে মানুষ এই মায়াজালের সংসার গড়েছেন তিনি হারিয়ে গেছেন দূরে বহুদূরে।

একা একা এত সুখ ভোগ আফিয়া বেগমের মাঝে অপরাধবোধ এর জন্ম দেয় মাঝে মাঝে।

দুই ঘন্টা পর ছেলের রুমের দরজা খুলে গেলো।

সেজান এসে মাকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কাঁদলো কিচ্ছুক্ষণ।

বউ রুমে একা চুপচাপ কাঁদছে।

আফিয়া বেগম কিছুই বুঝতেছেন না। কী হলো!

ভাবলেন, কোন বিষয় নিয়ে অভিমান, তাই ছেলের মাথায় হাত বুলালেন কিচ্ছুক্ষণ। তারপর বউ এর খবর নিতে যেই ছেলের রুমের দিকে যেতে চাইলেন, তখনই ছেলে চিৎকার করে উঠল, তুমি এর চেহারা দেখবে না।

কেন, কী হইছে, আমার এমন স্বাদের বড় ছেলের বউ এর মুখ দেখতে পারবো না?

তুই কি পাগল হয়ে গেছিস বাপ?

আফিয়া বেগম এর জিজ্ঞাসু মনের প্রশ্ন?

ছেলের রুমে ঢুকে দেখেন দুইটা মোবাইল ভাঙ্গা। ড্রেসিং টেবিলটা ভাঙ্গা, ছেলে বউ খাটে চুপচাপ বসে নখ খাচ্ছে, অশ্রু গড়িয়ে পড়ার দাগ মেয়েটির দুই গালে।

কী হইছে, সোমা? সেজানের বউয়ের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন কিন্ত সোমা চুপচাপ।

একটা গুরুগম্ভীর পরিবেশ।

এখনো ড্রয়িং রুম থেকে ছেলের ফোঁপানির আওয়াজ পাচ্ছেন।

ঘটনার কিছুই বুঝলেন না। ছেলে ও ছেলে বউ দুজনই নিশ্চুপ।

ঘটনার কোন ক্লু পেলো না আফিয়া বেগম।

সারাদিনের ক্লান্তিতে আফিয়া বেগম কখন সোফায় ঘুমিয়ে গেলেন বুঝতে পারেননি।

হঠাৎ চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভাঙলো আফিয়া বেগমের।

দৌড়ে ছেলের রুমে গিয়ে দেখেন ছেলে হাত কেটে ফেলছে কাঁচ দিয়ে, রক্ত ঝরছিলো।

সোমাকে গালাগালি করছিলো।

হঠাৎ সেজান চিৎকার দিয়ে বললো, এই কীট কেন খেয়েছো?

কেন? কেন? কেন?

আফিয়া বেগম কিছুই বুঝছেন না।

কী কীট খেয়েছে?

ছেলে মায়ের দিকে একটা মেডিসিনের প্যাকেটে এগিয়ে দিলো, তাতে লিখা MM kit.

ছেলেকে নিয়ে দ্রুত আমার মেডিকেয়ারে আসলেন আমি ব্যস্ত ছিলাম অন্য রোগী দেখায়।

আফিয়া বেগম আমাকে অনুরোধ করলেন, ওনার ছেলের দ্রুত রক্ত পড়া বন্ধ করার জন্য।

আমি বললাম, সেলাই দিতে হবে।

উনি বললেন, যা লাগে করো বাবা।

আমি স্টাফদের টিটি টিআইজি দিতে বলে স্টিচ দেবার জন্য রেডি করতে বলে চেম্বারে আসলাম।

আফিয়া বেগম পিছন পিছন আসলেন।

তারপর উনার ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে সেই কীটটা বের করে আমাকে দেখালেন। বললেন, এটা কিসের মেডিসিন বাবা?

আমি বললাম, এবরশানের।

উনি, হুম বলে মাথা নাড়লেন।

কেমন চোখগুলো ভিজে গেলো উনার।

আমি তাকিয়ে রইলাম উনার দিকে।

পিনপতন নীরবতা।

কিছুক্ষণ পর এক ভদ্র মহিলা ঢুকলেন আমার চেম্বারে।

আমি এবং আফিয়া বেগম দুইজন এক সাথে তাকালাম ওনার দিকে।

উনি এসে আফিয়া বেগম এর হাত ধরে বললেন, বেয়াইন দামান ব্যাটা ভুল বুঝছেন সোমারে।

সোমার উপ্রির ধরা আছে।

আগেও মাসিক বন্ধ হইছিল, তখন মিয়াসাব এর তাবিজে ভালো হয়ে গেছিল।

এইবার মিয়াসাব তাবিজের পাশাপাশি ওষুধ খাইতে বলছেন।

আমি এনে দিয়েছি ফার্মেসী থেকে।

আমি ঘটনা ধরতে পেরে এক গাল হেসে বললাম, আলগা বাতাস লাগছিল মনে হয়।

আফিয়া বেগমের বেয়াইন, সাথে সাথে মাথা নেড়ে বললো, উপ্রির ধরা আছে ডাক্তারসাব।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

উত্তীর্ণ ৮৩৬০ চিকিৎসক থাকতে নতুন বিসিএস কেন?

উত্তীর্ণ ৮৩৬০ চিকিৎসক থাকতে নতুন বিসিএস কেন?

স্বাস্থ্য খাতের দুরবস্থা নিরসনে বর্তমান স্বাস্থ্যবান্ধব সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায়…

ফাংশনাল ওভারিয়ান সিস্ট: করণীয় কি?

ফাংশনাল ওভারিয়ান সিস্ট: করণীয় কি?

ওভারিয়ান সিস্ট এবং টিউমার দুটি আলাদা বিষয় হলেও অনেক সময় এ নিয়ে…

রক্ত পরিসঞ্চালনের ইতিহাস

রক্ত পরিসঞ্চালনের ইতিহাস

রক্ত নিয়ে মানুষের কৌতুহল বহুদিনের। এক কালে মানুষ ভাবতো রক্ত, পিত্ত, কফ…

ডিপ্রেশন ও আত্মহনন: কারণ ও প্রতিকার

ডিপ্রেশন ও আত্মহনন: কারণ ও প্রতিকার

আশিকের লাশটা গত দুই ঘন্টা ধরে সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলছে। কেউ আসছে…

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও তার চিকিৎসা

মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা ও তার চিকিৎসা

কেউ যদি বলে, 'আমি পাগল!' তাহলে সেটা neurosis. আর যদি বলে, 'আমি…

যে কারণে চিকিৎসায় রিস্ক নিতে চান না ডাক্তাররা

যে কারণে চিকিৎসায় রিস্ক নিতে চান না ডাক্তাররা

পত্রিকার কাটতি/টিআরপি বাড়ানোর জন্য সাংবাদিকদের বহুল জনপ্রিয় টার্ম/অস্ত্র হল "ভুল চিকিৎসায় রোগীর…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর