১৪ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১০:৫৪ এএম

বুদ্ধিজীবী দিবস ও শহীদ তিন চিকিৎসক

বুদ্ধিজীবী দিবস ও শহীদ তিন চিকিৎসক

মেডিভয়েস রিপোর্ট: ডিসেম্বর শুধু বিজয়ের নয়, বেদনারও মাস। ডিসেম্বর আসতেই কেমন যেন অদ্ভুত এক শূন্যতা, অনেক বড় কিছু হারিয়ে ফেলার এক দমবন্ধ করা অনুভূতির বোধ হয়। ১৯৭১ সালের এ দিনে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে ঠাণ্ডা মাথায় স্বনামধ্য চিকিৎসক ডা. আলীম চৌধুরী, ডা. মুর্তজা, ডা. ফজলে রাব্বীসহ ডাক্তার, শিক্ষক,  সাংবাদিক ও অন্যান্য পেশার শ্রেষ্ঠ সন্তানরা পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন।

এসব বুদ্ধিজীবীকে নিজ বাসা থেকে তুলে নিয়ে চোখ বেঁধে অনেককে প্রথমে মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের (বর্তমান মোহাম্মদপুর সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ) টর্চার কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের ওপর নির্যাতন শেষে ১৪ ডিসেম্বর মিরপুর ও রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় গুলি ও বেয়নেট চার্জ করে অত্যন্ত নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।

ডা. আব্দুল আলীম চৌধুরী

১৪ ডিসেম্বর নারকীয় হত্যাকাণ্ডের শিকার ডা. আলীম চৌধুরী অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধের সময় কারফিউ উঠে গেলে ডা. আলীমের কাজ আরম্ভ হতো। গাড়ির বনেট ভর্তি করে ওষুধ সংগ্রহ করতো বিভিন্ন ফার্মেসি আর ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে। এগুলো আবার মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন ঘাঁটিতে পৌঁছে দিয়ে আসতো। এ ছাড়াও মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করার জন্য একটি গোপন হাসপাতাল ছিল। সেখানে ডা. আলীম, ডা. ফজলে রাব্বি এবং আরো অনেকেই ওখানে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঐ দিন বিকেল সাড়ে চারটায় ‘হ্যান্ডস আপ’ করা অবস্থায় বাসা থেকে তাকে ধরে নিয়ে যায়। ডা. রাব্বিকেও নেয়া হয়েছিলো ঐ একই দিনে বিকেল সাড়ে চারটায়। সারারাত নির্যাতনের পর ভোররাতে তাকে হত্যা করা হয়েছে। চিরকালে মতো নিভিয়ে দেয়া হয়েছে তাঁর প্রাণের প্রদীপ। এর তিনদিন পর ১৮ ডিসেম্বর রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে ডা. আবদুল আলীমের ক্ষত-বিক্ষত লাশটির সন্ধান পাওয়া যায়। ডা. আলীমের বুকে ছিল অনেকগুলো গুলির ও সারা শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন। কপালের বা-দিকে এবং তলপেটে ছিল বেয়নেটের গভীর ক্ষত। তাঁকে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।


জন্ম ও পরিচয়:

ডা. আব্দুল আলীম চৌধুরী কিশোরগঞ্জ জেলার খয়েরপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। কিশোরগঞ্জ হাই স্কুল থেকে ১৯৫৪ সালে ম্যাট্রিক এবং কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে আইএসসি পাশ করে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি বাম রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন এবং ৫২-র ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ডা. আব্দুল আলীম চৌধুরী ১৯৫৫ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।

পেশাগত জীবনে আবদুল আলীম চৌধুরী ১৯৬১ থেকে ১৯৬৩ পর্যন্ত লন্ডনের সেন্ট জেমস হাসপাতালের রেজিস্ট্রার ছিলেন। এরপর দেশে ফিরে ১৯৬৩ সালের শেষের দিকে তিনি মির্জাপুর কুমুদিনী হাসপাতালে যোগ দেন প্রধান চক্ষু চিকিৎসক হিসেবে। ঢাকার পোস্ট গ্রাজুয়েট মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন তিনি ১৯৬৭ সালে। ঢাকা মেডিকেল কলেজের চক্ষু বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন ১৯৬৮ সালে। এরপর কিছুদিন ছিলেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজের চক্ষু বিভাগে। তাঁর সর্বশেষ কর্মস্থল ঢাকার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ।

ডা. মোহাম্মদ ফজলে রাব্বী

তরুন বয়স থেকেই শোষণের বিরুদ্ধে কথা বলা শুরু করেন তিনি। স্বনির্ভর গণমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পক্ষে লড়াই করে যাওয়া ডাঃ ফজলে রাব্বি স্বাধীনতাকামী তরুন চিকিৎসক সমাজের কাছে হয়ে উঠেছিলেন স্বাপ্নিক মানুষের প্রতিকৃতি। তিনিও ডা. আলীমের সাথে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন। ১৯৭০ সালে অধ্যাপক ডাঃ ফজলে রাব্বি “Pakistan best professor award” এর জন্যে নির্বাচিত হন। কিন্তু, তিনি বললেন, স্যরি, শোষকদের কাছ থেকে আমি কোন পুরষ্কার নেবোনা।
১৫ই ডিসেম্বর, ১৯৭১। বিজয়ের দিনটির জন্য আর মাত্র একদিনের প্রতীক্ষা। কে যেন, দরজায় কড়া নাড়লো, কিন্তু না, এবার আর মুক্তিসেনা না, ফজলে রাব্বীর বাড়ির সামনে একদল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী!
বাবুর্চি ঘরে ঢুকে ফিসফিস করে তাঁকে বলল, 'সাহেব বাড়ি ঘিরে ফেলেছে।' তিনি বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন। দেখলেন একটা সাদা কাদা মাখানো মাইক্রোবাস আর একটি জিপ দাঁড়িয়ে আছে তাঁর বাসার সামনে। নিচু গলায় পেছন না ফিরে তিনি বললেন, 'টিঙ্কুর আম্মা, ওরা আমাকে নিতে এসেছে।' তিনি দারোয়ান ইদ্রিসকে ডেকে সদর দরজা ও সিঁড়ির দরজা খুলে দিতে বললেন। দারোয়ান দরজা খুলে দিল। পাঁচ-সাত জন সশস্ত্র সৈন্য চারপাশ দিয়ে তাঁকে ঘিরে ফেলল। তিনি ওদের সঙ্গে হাঁটতে শুরু করলেন। স্ত্রী জাহানারা বাধা দিতে চেষ্টা করলেন। ওদের মধ্যে থেকে দুজন এগিয়ে এসে জাহানারার বুকে বন্দুক চেপে ধরল। জাহানারা স্থানুর মতো স্থির দাঁড়িয়ে গেলেন। ডা. ফজলে রাব্বি মাথা নিচু করে গাড়িতে উঠে গেলেন। তার আর বিজয় দেখা হলনা! এর তিনদিন পর ১৮ ডিসেম্বর রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে ডা. ফজলে রাব্বির ক্ষত-বিক্ষত লাশটির সন্ধান পাওয়া যায়।

জন্ম ও পরিচয়:
ফজলে রাব্বি জন্মেছিলেন ১৯৩২ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পাবনা জেলার হেমায়েতপুর থানার ছাতিয়ানী গ্রামে। তিনি ১৯৪৮ সালে পাবনা জেলা স্কুল থেকে মেধা তালিকায় বিশিষ্ট স্থান দখল করে মাধ্যমিক পাশ করেন। পরবর্তী সময়ে চিকিত্সক হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ১৯৫০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি এমবিবিএস- এ প্রথম পার্ট পরীক্ষায় অ্যানাটমি ও ফার্মাকোলজিতে সম্মানসহ এমবিবিএস ফাইনালে শীর্ষস্থান অধিকার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বর্ণপদক লাভ করেন। 

১৯৫০-৫৫ সাল পর্যন্ত ছাত্র থাকাকালে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রসেক্টর হন। ১৯৫৫-৫৬ সালে কমপালসারি ইন্টার্নিশিপ ট্রেনিং নেন। ১৯৫৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজে এসিস্ট্যান্ট সার্জন পদে যোগ দেন। তিনি ১৯৫৯ সালে মেডিসিনের রেজিস্টার পদে উন্নীত হন এবং ১৯৬০ সালের মার্চ মাসে কলম্বো প্ল্যানের অধীনে উচ্চতর শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডের এডিনবরায় যান। দীর্ঘ অধ্যবসায়ের গুণে তিনি ঐ বছরের শেষের দিকে কার্ডিওলজিতে এমআরসিপি ডিগ্রী লাভ করেন। আরও ব্যাপক অভিজ্ঞতার জন্য তিনি লন্ডনের বিভিন্ন হাসপাতালে চাকরি করেন এবং সেইসঙ্গে পড়াশুনাও চালিয়ে যান সমান তালে। 

১৯৬২ সালে সাফল্যের সাথে জেনারেল মেডিসিন ও এমআরসিপি ডিগ্রী অর্জন করতে সক্ষম হন তিনির এরপর লন্ডনের হ্যামারস্মিথ হাসপাতালে সিনিয়র রেজিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এক বছর। ১৯৬৩ সালের ১ জানুয়ারিতে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে পুনরায় ঢাকা মেডিকেল কলেজে অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর অব মেডিসিন পদে যোগ দেন। ১৯৬৮ সালে একই সাথে তাঁকে প্রফেসর অব মেডিসিন ও প্রফেসর অব কার্ডিওলজির দায়িত্বও পালন করতে হয়।

ডা. মুর্তজা

ডা. মোর্তজা ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে দখলদার পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী হত্যা পরিকল্পনার একজন মর্মান্তিক শিকার। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব হাসপাতালে চিকিৎসক হিসাবে কর্মরত ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সমাপ্তিলগ্নে ১২ ডিসেম্বর ভোর বেলা অসামরিক পোশাক পরিহিত কয়েকজন ব্যক্তি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক এলাকায অবস্থিত তাঁর বাসায় আসে এবং তাঁকে ধরে নিয়ে যায়। তাঁর কন্যা মিতি'র ওড়না দিয়ে চোখ বেঁধে গাড়ীতে ক'রে তাঁকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। দু'দিন পর, ১৪ ডিসেম্বর তারিখে, তাঁকে রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে হত্যা করা হয়। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রায়ের বাজার বধ্যভূমির খোঁজ পাওয়ার গেলে সেখানে তল্লাশী চালিয়ে অন্যান্য মৃত দেহের সঙ্গে কন্যা মিতির ওড়না দেখে তাঁর মরদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়। তাঁর লাশ উদ্ধার করে তাঁকে আজিমপুর গোরস্থানে দাফন করা হয়।

জন্ম ও পরিচয়:
ডা. মোর্তজা ১ এপ্রিল ১৯৩১ সালে জন্ম গ্রহন করেন এবং ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর মৃত্যু বরণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক তিনি লেখক এবং প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী হিসেবে সবিশেষ পরিচিত ছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শেষ লগ্নে পাকিস্তান সেনাবাহিনী, রাজাকার ও আল-বদর বাহিনীর বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের অংশ হিসাবে তিনি ঢাকা বিশ্বদ্যিালয়ের ফুলার রোডে অবস্থিত স্বগৃহ থেকে অপহৃত হন, পরে তাকে হত্যা করা হয়।
মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক কন্যা এবং এক পুত্র রেখে গেছেন। তিনি ডাক্তার হলেও বামপন্থী চিন্তা ধারার মানুষ ছিলেন। এ কারণে তিনি ১৯৬০-এর দশকের শুরু থেকেই পাকিস্তানী শাসক চক্রের বৈরীতার শিকার ছিলেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বামপন্থী রাজনৈতিক মহলে একনামে সকলে ডাঃ মোর্তজাকে চিনতো।

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে সত্যিই যদি আমরা আমাদের বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধা জানাতে চাই, আমাদের উচিত হবে সত্য বলার সৎ সাহসটি অর্জন করা। কেননা শহীদ বুদ্ধিজীবীরা তাই করতেন। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে বেগবান করতে ব্যাপক ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন তারা। ক্ষমতাসীনদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তারা সত্য বলার সাহস দেখিয়েছেন। আত্মাহুতি দিয়ে দেশ ও জাতির মর্যাদা, ন্যায় সঙ্গত অধিকার সমুন্নত রেখেছেন। এ কারণে আজও তারা অমর, শ্রদ্ধায় স্মরিত হন। আজকের বুদ্ধিজীবীরা কি তাদের দেখানো পথে হাঁটছেন? সোচ্চার হচ্ছেন গণমানুষের ন্যায় সঙ্গত দাবি ও অধিকারের প্রশ্নে?

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত