ঢাকা      শনিবার ২৩, মার্চ ২০১৯ - ৯, চৈত্র, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. সাঈদা ইসলাম

চিকিৎসক ও লেখক    


স্ট্রোক প্রতিরোধে করণীয়

আগে স্ট্রোকের রোগী মানেই মাথায় আসতো বুড়ো কোন রোগীর মুখ। ।কিন্তু এই দিন বদলের সময়ে রোগ আর রোগীর চেহারাও পাল্টেছে। এখন আর স্ট্রোক মানে শুধু বুড়ো মুখ না। অনেক অল্প বয়স্ক রোগীর দেখাও মেলে। প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ শ্রেয়।  আসুন, জেনে নেই স্ট্রোক প্রতিরোধে কিছু করণীয়-

১. হাই ব্লাড প্রেসার বা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণঃ যারা উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন তারা সতর্ক হয়ে যান। কারণ স্ট্রোকের সর্বনাশ ঘটানোর জন্য এটা কিন্তু প্রধান কারণ। রক্তচাপ ১৪০/৮৫  mmHgকিংবা এর নীচে রাখার চেষ্টা করুন। যারা প্রেসারের ঔষধ খান তারা যেন তিনবেলা খাবার খেতে যেমন ভুলেন না এটাও তেমন ভুল না হয়। লবণ খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকুন। অতিরিক্ত লব পরিহার করুন। চর্বিযুক্ত খাবার পরিহার করুন। শাকসবজি ফলমূল বেশী করে খান। তবে ডায়বেটিস রোগীরা ফল ও এর পরিমাণ নির্বাচনে ডাক্তারের পরামর্শ  মেনে চলুন।

২. ওজন কমানোঃ ফাস্টফুড আর বসে বসে কাজ করা মানে কায়িক শ্রমের অভাব। দুটোই আমাদের এই প্রজন্মের জন্য অভিশাপ। এ দুটো কারণেই প্রধানত ওজন বাড়ে যা উচ্চ রক্তচাপ আর ডায়বেটিসের নিয়ামক। তাই ফাস্ট ফুডকে টাটা বলুন। শখে দুই একদিন বন্ধুদের সাথে খেলেন সেটা মার্জনীয়। কম্পিউটার আর মোবাইল গেইমসের কারণে মাঠে যেয়ে খেলাটা আমরা ভুলতেই বসেছি। ওজন কমানোর একটা ভাল উপায় ব্যায়াম। যদিও আমরা অনেকে তা বিপুল উৎসাহে শুরু করি, দুইদিন পর উৎসাহ উদ্বায়ী হয়ে উড়ে যায়।BMI২৫ কিংবা এর নীচে রাখার চেষ্টা করুন। ।ডিজিটাল যুগে BMI কী আর কিভাবে হিসাব করতে হয় তা গুগলে সার্চ দিলেই পেয়ে যাবেন।

৩. হাঁটার অভ্যাস করুনঃ দৈনিক অন্তত ২৫-৩০ মিনিট হাঁটার অভ্যাস করুন।Elevator কিংবা লিফটের পরিবর্তে সিড়ি বেয়ে উঠার অভ্যাস করুন। তবে যাদের হার্টে সমস্যা আছে তারা সর্তকতার সাথে এই উপদেশটি মানুন।

৪. Atrial fibrillation থাকলে চিকিৎসা করানঃ এটি Heart এর একটি রোগ। পালপিটিশান (বুক ধরফর করা), অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, ঘন ঘন শ্বাসপ্রশ্বাস হলো এ রোগের লক্ষণ। এ রোগ স্ট্রোকের সম্ভবনা অনেকগুন বাড়িয়ে দেয়। তাই উপরোক্ত কোন লক্ষণ দেখা দিলে কিংবা বয়স ৪০ বা তদ্ধোর্ধ হলে রুটিন চেকআপ হিসেবে একটি ECG করুন ও ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন। যদি Atrial fibrillation ধরা পড়ে তবে টেনশন না করে অনতিবিলম্বে নিয়মমতো ডাক্তারের দেয়া নতুন ঔষুধ শুরু করুন। হার্টের আরো কিছু রোগ স্ট্রোকের সম্ভাবনা বাড়ায়-coronary heart disease, cardiomyopathy, heart failure. তাই হার্টের কোন সমস্যা মনে হলে দ্রুত ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করেন।

৫. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখুনঃ ডায়াবেটিস রোগীর রক্তবাহী নালীগুলো damage হয়ে স্ট্রোকের সম্ভবনা বাড়িয়ে দেয়। তাই, নিয়মিত ব্লাড সুগার চেক করুন।  ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণে নিয়মমতো ঔষধ সেবন করুন।  ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী Food habit ও lifestyle maintain করুন।

৬. ধূমপান পরিহার করুনঃ একদিনে তো সম্ভব না।  যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পরিহার করুন।  নয়তো নয় নম্বর বিপদ সংকেত দেখিয়ে ছাড়বে। আর যাদের একবার স্ট্রোক হয়ে গেছে তাদের জন্য চিরতরে সিগারেটের মুখ দেখা বন্ধ করা অনেকটা ফরজ কাজের মতো।

৭. অ্যালকোহল পরিহার করুনঃ যদিও আমাদের দেশে এটা তেমন কোন প্রধান কারণ না। ইদানীং উচ্চবিত্তদের মাঝে এই বদঅভ্যাস পরিলক্ষিত হচ্ছে। ধর্মীয় অনুশাসন তো আপনাকে দমাতে পারেনি, স্ট্রোকের ভয়ে এবার অন্তত একটু দমুন। কারণ আপনাদের কিন্তু স্ট্রোক হওয়ার সম্ভবনা যারা এইসব ছাঁইপাশ সেবন করে না তাদের থেকে অনেক বেশী।

৮. দুশ্চিন্তা কম করুন।

৯. কিছু ঔষধ সেবনের পূর্বে অবশ্যই ডাক্তারের শরণাপন্ন হোন।  যেমন: জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি, Ibuprofen, Naproxen ইত্যাদি। এগুলো স্ট্রোকের সম্ভবনা বাড়িয়ে দেয়।

এছাড়াও আসলে স্ট্রোকের আরও কিছু  Risk factor আছে। যেগুলো আপনি চাইলেও প্রতিকার করতে পারবেন না। এগুলোর উপর আপনার কোন হাত নেই।  ধরেন, বয়স্কদের স্ট্রোক বেশী হয়, নারীর তুলনায় পুরুষের স্ট্রোক বেশী হয়, কিন্তু স্ট্রোক হলে পুরুষদের চেয়ে নারীরা বেশী মারা যায়, কিছু কিছু জাতিগোষ্ঠী লোকের স্ট্রোক হওয়ার সম্ভবনা জন্মগতভাবে বেশী, যাদের একবার স্ট্রোক হয়ে গেছে তাদের আরেকবার স্ট্রোক হওয়ার সম্ভবনা যাদের কখনও স্ট্রোক হয় নি তাদের চেয়ে বেশী, যাদের পরিবারে স্ট্রোকের ইতিহাস আছে তাদের স্ট্রোক হওয়ার সম্ভবনা অন্যদের চেয়ে বেশী।

উপরে যা যা বললাম এসব আপনার স্ট্রোকের সম্ভবনা কমিয়ে দিবে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না রোগ শোক হায়াত মওত সব আল্লাহর হাতে। এ সবকিছু মেনে চলার পরও আপনার স্ট্রোক হতে পারে। রাস্তায় বেরুলে আপনার এক্সিডেন্ট হতেই পারে। এটা সম্পর্কে একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। তাই বলে কি আপনি সতর্ক হয়ে থাকেন না? ইচ্ছে করে গাড়ির নীচে পড়বেন? এই সতর্কতাটাও তাই।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি এবং স্ট্রোক

জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি এবং স্ট্রোক

জন্মনিয়ন্ত্রন বড়ি বা ওরাল কণ্ট্রাসেপটিভ পিল (ওসিপি) খুব জনপ্রিয়। আবিষ্কারের পর যুগ…

ওভার ডোজে ভিটামিন মিনারেল নয়!

ওভার ডোজে ভিটামিন মিনারেল নয়!

৪৭ বছর বয়সী একজন নরমোটেনসিভ, নন-ডায়াবেটিক পেশেন্ট ইমার্জেন্সী তে আসলেন বেশ কয়েকদিনের…

ব্যাথানাশক ওষুধ থেকে সাবধান

ব্যাথানাশক ওষুধ থেকে সাবধান

অনেকে ওষুধের দোকান থেকে ওষুধ কিনে খান। আমাদের দেশে এই কালচার বহুল…

ডায়রিয়া থেকে আকস্মিক কিডনি বিকল

ডায়রিয়া থেকে আকস্মিক কিডনি বিকল

একিউট কিডনি ইনজুরি বা আকস্মিক কিডনি বিকল বিভিন্ন কারণে হতে পারে। তারমধ্যে…

অস্টিওনেক্রোসিস রোগের কারণ ও প্রতিকার

অস্টিওনেক্রোসিস রোগের কারণ ও প্রতিকার

অস্টিওনেক্রোসিস রোগে অস্থির কিছু অংশ নষ্ট হয়ে যায়। অস্থিতে রক্ত চলাচলে সমস্যা…

বাচ্চাদের ন্যাপি র‌্যাশ ও করণীয়

বাচ্চাদের ন্যাপি র‌্যাশ ও করণীয়

বাচ্চাদের ন্যাপি র‌্যাশ খুব পরিচিত এই সমস্যা। এখনকার দিনে শহরাঞ্চলে প্রায় সব বাচ্চাকেই…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর