ডা. ছাবিকুন নাহার

ডা. ছাবিকুন নাহার

মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


০৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ ০২:৩৬ পিএম

দ্বিতীয় বাড়ি

দ্বিতীয় বাড়ি

নিরানব্বই এর কোন এক মায়াময় সকালে অবাক করা চোখ আর কাঁপন ধরা বুক নিয়ে ক্যাম্পাসে হাজির হই। যা দেখি সব যেনো চোখে বসে যায়। বড় বড় হল রুম, বিশাল বিশাল দরজা জানালা, ক্যাম্পাসের ছায়া পথ আর ইয়া বিশাল হাসপাতাল সবই আমার লিলিপুট চোখে গালিভারের ন্যায় লাগছিল।

কিংবা এমন বলা যায়, আমিই বিন্দু থেকে বিন্দু হয়ে শেবাচিমের আকাশ বাতাশ পানি মাটির সাথে মিশে গেলাম যেনো! আসলে প্রিয় কিছু জিনিসের একটা নিজস্ব গন্ধ থাকে, ওম থাকে, মায়ের কোলের মতো মায়া থাকে, তেমনি একটা ব্যাপার ঘটে গেলো আমার ভিতর ক্যাম্পাসকে ঘিরে। এই অনুভূতি আরো জোড়ালো হলো যখন মাইগ্রেশন ফর্ম পুরণ করে সাইন নিতে প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে গেলাম। স্যার বললেন,

আরেহ, মুন্সিগঞ্জ কোন দুরত্ব হলো? মাইগ্রেশন ফরম পুরণ করতে হবে না, আমরা আমাদের মেয়েকে দিয়ে আসব নিয়ে আসব!

এরপর আর কথা চলে না, মাইগ্রেশন ফরমে স্যারের ফাইনাল সাইন আর নিলেন না বড় ভাইয়া। এমন অভিভাবক ছেড়ে কোন মেয়ে পরের বাড়িতে পড়তে যায়!

ভর্তির ফর্মালিটি শেষে খেতে গেলাম সদর রোডের রয়েলে। ভর্তি প্রক্রিয়ার সবটুকুই করেছেন মেডিসিন ক্লাবের এক সিনিয়র ভাই। কবে ক্লাশ শুরু হবে, সেই ব্যাপারটিও জানাবেন বলে আশ্বস্ত করেছিলেন এবং চিঠি লিখে জানিয়েছিলেনও। প্রসঙ্গত তখন মোবাইল কেবল আসি আসি করছে। কাজেই চিঠিই ভরসা ছিলো।

প্রথমদিনের আন্তরিক আতিথ্যে দারুণ মুগ্ধ হয়েছিলাম। পরে অবশ্য আমিও জুনিয়রদের ক্ষেত্রে সেটার পুনরাবৃত্তি করেছি। ক্যাম্পাসের রীতিই ছিলো এমন মনজুড়ানো! শেবাচিমের প্রথম দিনেই বুঝে গেলাম, এইখানেই খরচ হবে কিংবা জমা হবে আমার সোনালী আলোর দিনগুলো। শের- ই- বাংলা মেডিকেল কলেজকে আমরা শেবাচিম বলি। এই নামটার সাথে পাখির পালকের মতো নরম একটা ভালোবাসা লেগে থাকে তার সন্তানদের চোখেমুখে! ভালোলাগে।

তারপরও কেমন যেনো হাহাকার লাগে! এই বিদেশ বিভুঁইয়ে কিভাবে থাকব? উল্লেখ্য যে বরিশাল তখন আমার জন্য বিদেশই ছিলো। গ্রামী সবুজে আমার বেড়ে ওঠা। দখীনের হাওয়া, পশ্চিমের সূর্য ডোবা আলোয় ঘাসের গালিচায় হুটোপুটি খাওয়া এই আমার বাইরের পৃথিবী খুব একটা চেনা ছিলো না। কিভাবে কাটবে এখানে? একজনকেও তো চিনি না।

দিগন্ত বিস্তৃত মুগ্ধতা নিয়ে ভ্যানে পা ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে গেলাম আমার প্রথম হোস্টের বাড়ি। কাশিপুর। সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো দ্বিগুণ মুগ্ধতা আর আশ্চর্য ভালোবাসা। মায়ের কোমল আদর আর বাবার বুকের জমিন, নির্ভরতা। চিরকালই আমি বেশি পাওয়া মানুষ, মানুষের অদ্ভুত অপার্থিব ভালোবাসায় সিক্ত হই, কিছু না করেই। আলহামদুলিল্লাহ!

বরিশালে এই প্রথম এসেছি, ওঠেছি বড় ভাইয়ার অফিসের এক সাবঅর্ডিনেটের বাসায়। এইটুকু পরিচিতিই তখন আমার পরিবারকে এই বার্তা দিয়েছিলো যে তাদের মেয়েকে তারা দেখে রাখবে। বার্তা তো অনেকেই দেয়, রাখে কয়জন? তবে এরা যে স্রোতের বিপরীতে বাস করা মানুষ, সেটা আমার ছোট্ট মাথা তখন না বুঝলেও আমাকেও এই বোধটুকু দিয়েছিলো, যে আমি একা নই। ওই সময় এটা আমার জন্য এটা দরকার ছিলো। বাড়ির কথা, শেষ বিকালের আলোয় প্রিয় পোষা ছাগলটির ঘরে ফেরার সঙ্গী না হওয়া, এমনকি দুটো পোষা হাঁসকে তই তই শব্দে দানা খাওয়াতে না পারার দুঃখে যখন তখন কান্না আসত। এমনি যখন মনের অবস্থা তখন তাদের সাপোর্ট উপস্থিতি আমাকে একটু স্বস্তি দিয়েছিলো, স্থিরতা দিয়েছিলো।

নানারকম মুখরোচক খাবার আর আতিথেয়তার মাঝে আমি কিংবা আমরা দেখতে পাই এক জোড়া দেবদূত মা-বাবা তাদের কন্যার আলোয় আলোকিত হলেন যেনো। কিংবা ব্যাপারটা এমন করেও বলা যায়, কন্যাটি তার ফেলে আসা আপন বলয় নতুনভাবে ফিরে পেলেন যেনো। শুধু পার্থক্য এইটুকু যে, কন্যাটি তাদের বুকে এসেছে একটু দেরী করে, মেডিকেলে চান্স পেয়ে, আঠারো বছর পর। যে কন্যার জন্য এখনো নিয়ম করে বাড়ির আঙ্গিনায় পাট শাক বোনা হয়, বোম্বাই মরিচ গাছটা শোবার ঘরের ঠিক পাশেই শোভা বর্ধন করে, বাবা নিয়ম করে তাতে দুবেলা জল ঢালেন। তার কন্যা যে পাটশাক পছন্দ করে, পছন্দ করে বোম্বাই মরিচের ঝাঁঝ। লাউ ডগা লতিয়ে ওঠে টিনের চালে, পুকুরের সবচেয়ে বড় মাছটা ফি বছর বড় হয়, মেয়ে এবার আসতে পারেনি তো কী হয়েছে, পরের বছর তো আসবেই।

কন্যা তার চোখের পাতা বন্ধ করলে, দুই জোড়া মা বাবাই দেখে। তাদের একজনের চেহারা আরেকজন থেকে আলাদা না। আলাদা করা যায়ও না। ইনফ্যাক্ট কন্যা চায়ও না, আলাদা হোক। সন্তান হতে হলে বাবা মায়ের শুক্রাণু ডিম্বাণু লাগে, নয় মাসের কষ্টকর জার্নি লাগে এটা আমরা জানি। কিন্তু এসব বায়োলজিক্যাল বস্তুগত জিনিস ছাড়াও বাবা, মা এবং সন্তানের স্বর্গীয় বলয় সৃষ্টি করা যায়। যেখানে এসব কিছুই লাগে না একমাত্র হৃদয় ছাড়া। যে হৃদয়ে থাকে সন্তানের মঙ্গলের জন্য অপার আকুতি, আকাশ উপুড় করা ভালোবাসা।

অবাক হওয়ার কিছু নেই, পৃথিবীতে ব্যাখ্যাতীত অনেক কিছু ঘটে, আমরা তার কতটুকুই বা জানি! এরপর থেকে কন্যাটির জন্য বরিশাল আর বৈদেশ রইল না। হয়ে গেলো তুলতুলে নরম মনোভূমি। আপন জায়গা। দ্বিতীয় বাড়ি।

[সম্মানিত চিকিৎসক ও প্রিয় মেডিকেল শিক্ষার্থী, আপনিও মেডিভয়েসের অংশ হয়ে উঠুন।  মেডিকেল লাইফ, রোগব্যাধি, রোগের কেস স্টাডি, স্বাস্থ্য, চিকিৎসক সংগঠন ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ভ্রমণ সংবাদ, অভিজ্ঞতা, সায়েন্স ফিকশন, গল্প, কবিতা, নারী স্বাস্থ্য, যৌন স্বাস্থ্য, ক্যারিয়ার বিষয়কসহ  বিভিন্ন পরামর্শ ও টিপস নিয়ে লিখুন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]] 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত