ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

ডা. মুহাম্মাদ সাঈদ এনাম ওয়ালিদ

চিকিৎসক, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কলামিস্ট, জনস্বাস্থ্য গবেষক।


০৮ ডিসেম্বর, ২০১৮ ১০:৫৬ এএম

সুইসাইড ও পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার

সুইসাইড ও পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার

"স্যার আদাব, অপিসি পয়সনিং, পুলিশ কেইস..."

মোবাইলে ইমার্জেন্সী চিকিৎসকের ফোন পেয়ে আউট ডোরে রোগী দেখা রেখে দ্রুত ইমার্জেন্সীতে ছুটলেন সিনিয়র ডাক্তার।

ইমার্জেন্সীতে কান্না আহাজারি ভিড় সামলে রোগীর সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন সিনিয়র মেডিকেল অফিসার। পকেট থেকে টর্চ বের করে দেখলে পিউপিল ওয়াইডলি ডায়লেটেড, নন রি-একটিং টু লাইট। রোগীনীর কপালে হাত রাখলেন, দেখলেন, ঠান্ডা হীম। পালস নেই। নেই রেসপিরেশন।  ষোল কী সতেরো বছরের নিথর মেয়েটিকে চারপাশে স্বজনরা ঘিরে রেখেছে। মা হাউমাউ করে কাঁদছেন আর বার বার মুর্ছা যাচ্ছেন। এক আত্মীয় বললেন, "আমার ভাগ্নীটার কী হয়েছে ডাক্তার?"

ডাক্তার কিভাবে ডেথ ডিক্লেয়ার করবেন বুঝতে পারছিলেন না। তার নিজেরও খারাপ লাগছে। দেখতে একেবারে তার ছোট বোনটির মতো। এ রকম গুমট পরিবেশে ডেথ ডিক্লেয়ার করলে বেশ ঝামেলা হয়। স্বজন বা, আশপাশ আগন্তুক সবাই হাউমাউ করে হুমড়ি খেয়ে লাশের উপর পড়ে। কেউ কেউ আবার বিশ্বাস করেন না, পারলে ডাক্তারের উপর দোষ চাপান। "এতক্ষণ'তো শ্বাস নিচ্ছিলো, ডাক্তার  আসতে দেরী করেছেন, তাই সে মারা গেছে", এসব নিত্য নৈমিত্তিক অপমানজনক আর সন্দেহ মুলক কথা বার্তা ডাক্তারদের ফেইস করতে হয়। এসব হয়তো কেউ বুঝে বলেন, আবার না বুঝেও বলেন।

ইন্টার্ণ এর সময় অধ্যাপক স্যার খুব সুন্দর করে এইসব সুইসাইডাল ইমার্জেন্সী কেইসগুলো কিভাবে ডিল করতে হয় তা সিনিয়র ডাক্তার কে শিখিয়ে দিয়েছিলেন। কেননা, এসব কেইসে অনেক সময় ব্লেইম গেম লুকানো থাকে। কথার মারপ্যাঁচে ডাক্তারকে ফাঁসিয়ে দিয়ে সটকে পড়ে মুল হোতা। সুকৌশলে আড়াল করে ফেলা হয় মূল ঘটনা কে। তাছাড়া তার নিজেরও মনে হলো, তিনি যখন ঢাকা মেডিকেলে ইনডোরে ইন্টার্ণ ছিলেন তখন এসব ব্যতিক্রমী অনেক ঘটনা তার সামনেই ঘটেছে। তাই তিনি অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করলেন। সেনসিটিভ কেইস, সুইসাইড কেইস বলে।

রোগীনীর মা ডাক্তার কে ঝাপটে ধরে বললেন, "বাবা, আমার মেয়ে কি মারা গেছে?"

মা'কে ধরাধরি করে সরিয়ে নেওয়া হলো।

মামাসহ আরো নিকট আরো দুএকজন আত্মীয়কে রেখে সবাইকে বেরিয়ে যেতে বললেন ডাক্তার।  যদিও কেউ যেতে চাইলো না। তথাপি তিনি ওয়ার্ড বয়, নিরাপত্তা কর্মীদের ইশারা করলে তারা অনুনয় বিনয় করে সবাইকে বের করে দিলেন।

রোগীনির মামা জিগ্যেস করলেন, 'স্যার ওকি জীবিত?"

না। ওতো এখনো শ্বাস নিচ্ছিলো...'

"না। ও আরও এক ঘন্টা আগে মারা গিয়েছে। আপনি যা বলছেন সেটা শ্বাস নেওয়া নয়। মৃত্যুর পর এরকম শরীরের ভিতর বা বাহিরে হালকা কাঁপুনি হতে পারে। আপনার সেটাকেই শ্বাসপ্রশ্বাস বলছেন। যাহোক, রোগীনি আপনার কে?"। ডাক্তার জানতে চাইলেন।

'আমার ভাগ্নি'

"কেমন?"

'মামাতো বোনের মেয়ে'

"কী হয়েছিলো?"

'আমি কিছুই জানি না। ওর মা সকালে ফোন করে বললো, মেয়ে কেমন করছে। আমি ছুটে আসি'

"মেয়েকি কীটনাশক খেয়েছে?"

'স্যার আমি জানি না'

"কে জানে তাহলে?"

'মা আর বাবা ছাড়া আর কেউ জানে না'

"ঠিক আছে, মা' কে ভিতরে ডাকুন"

মা ঢুকলেন। সিনিয়র ডাক্তার জিগ্যেস করলেন, "আপনার মেয়ে?"

'জ্বী'

"ঘটনা কী সংক্ষেপে বলুন?"

'স্যার, কী হয়েছে, আমার মেয়ে কী নেই? ও তো এখনো,  এইতো হাসপাতালেও আহ উহ করছিলো..!'

"জ্বী। ও নেই। আমরা দুঃখিত"

মা কিছুক্ষণ হাউমাউ করে কাঁদলেন। তারপর চোখ মুছে বললেন, 'কী করবো এখন ডাক্তার সাহেব। আমার মেয়ে নেই। ও মারা গিয়েছে? আহা...এই সকালেও নাস্তা খেয়েছে। বাবুল, চলরে ভাই। আমার কইলজার টুকরা, বুকের ধন নাই। চল ওরে নিয়ে চল...'

"না। আপনারা যেতে পারবেন না। এভাবে যাবার নিয়ম নেই। এটা পুলিশ কেইস। " ডাক্তার বিনয়ের সাথে বললেন।

'আমাদের মেয়ে আপনি আসার আগেও কথা বলছিলো', কথাটি হাউমাউ করে কেঁদে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন মামা।

ডাক্তার নিরাপত্তা কর্মীদের ইশারা করলেন মামাকে বাইরে নিয়ে বসিয়ে রাখতে।

"দেখুন আপনি মেয়ের মা, এখন লাশের একমাত্র গার্জিয়ান। আপনিই সব। হাসপাতালের কিছু ফরমালিটি আছে। ও যেহেতু সুইসাইড করেছে সবাই বলাবলি করছে সুতরাং এটা পুলিশ কেইস হিসেবে নথিভুক্ত। আর যেহেতু পুলিশ কেইস সেহেতু সেটা পুলিশ আসার পর আপনি নিয়ে যাবেন। ব্রাদার থানায় ফোন দিন", ডাক্তার তার দায়িত্ব মোতাবেক থানায় রিপোর্ট করতে বললেন।

'স্যার আবার পুলিশ কেনো?' মা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন।

"এটা নিয়ম। ও কিছু না, প্লিজ আপনি ঘাবড়াবেন না। আচ্ছা কী হয়েছিলো বলুনতো?"

'স্যার, কিছুই না। সকালে বকাঝকা দিয়েছিলাম। তারপর গাড়ি নিয়ে ছোট মেয়েটাকে স্কুলে দিতে যাই। দারোয়ান ফোন করলো। কাজের বুয়াও ফোন করলো। ওরা কিছুই বুঝেনি। এসেই দেখি সে মাটিতে পড়ে আছে। আর তার হাতে এই বোতল।"

ডাক্তার বোতলটি হাতে নিয়ে। নাকের কাছে নিয়ে দেখলেন ওপিসি জাতীয় মেডিসিন।

"তারপর কী হলো বলুন?"

"বাসায় ঢুকেই দেখি সে লুটিয়ে পড়ছে, নিথর। আর কিছু না। সাথে সাথে ওর মামাকে ফোন দেই। সে এম্বুলেন্স নিয়ে আসে।"

"কেনো বকছিলেন?"

'এইতো কিছু না। পড়াশুনা করে না, কথা শুনে না। পরীক্ষায় ফেল করেছে। তাই...'

"এটাই?"

'জ্বী, এই'

"আর কিছু না?"

'হুম না। আর কিছু না'

"ঠিক আছে একটু বসুন। পুলিশ আসলেই আপনি মরদেহ নিয়ে যেতে পারবেন।"

'স্যার, আমরা থানা পুলিশ চাই না'

"দেখুন, এটা নিয়ম। এমনতো হতে পারে, ও খায়নি। কেউ খাইয়েছে। হতে পারে না...?"

'স্যার, আমি মিথ্যে বলছি না। আমি ওর মা। আমার মেয়ে মারা গিয়েছে। মরা মেয়ে নিয়ে কেউ মিথ্যে বলে?'

"প্লীজ আমি আপনাকে মিথ্যে বলছেন এটা বলিনি"

'তাহলে?'

"আমাকে সর্ট কেইস হিস্ট্রি নিতে হবে। এসব রেজিস্ট্রি বইয়ে নোট রাখতে হয়"

'স্যার, আমি আপনার সাথে একটু একা কথা বলতে চাই। প্লীজ'

"শিওর"

ডাক্তার লাশটাকে যত্ন করে ঢেকে একপাশে রাখার আদেশ দিয়ে মা'কে নিয়ে দ্রুত তার রুমে গেলেন। পুলিশ আসার কথা শুনে ইমার্জেন্সীর ভীড় কিছুটা কমতে লাগলো। মামাকেও আর আশেপাশে দেখা গেলো না।

[সম্মানিত চিকিৎসক ও প্রিয় মেডিকেল শিক্ষার্থী, আপনিও মেডিভয়েসের অংশ হয়ে উঠুন। মেডিকেল লাইফ, রোগব্যাধি, রোগের কেস স্টাডি, স্বাস্থ্য, চিকিৎসক সংগঠন ও মেডিকেল শিক্ষার্থীদের ভ্রমণ সংবাদ, অভিজ্ঞতা, সায়েন্স ফিকশন, গল্প, কবিতা, নারী স্বাস্থ্য, যৌন স্বাস্থ্য, ক্যারিয়ার বিষয়কসহ বিভিন্ন পরামর্শ ও টিপস নিয়ে লিখুন। লেখা পাঠানোর ঠিকানা: [email protected]]

নতুন শনাক্ত দেড় সহস্রাধিক

ঈদের আগে করোনায় একদিনে ২৮ জনের মৃত্যু

দাবি পেশাজীবী সংগঠনের, রিট পিটিশন দায়ের

‘বেসরকারি মেডিকেলের ৮২ ভাগের বোনাস ও ৬১ ভাগের বেতন হয়নি’

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না