ঢাকা      বুধবার ১২, ডিসেম্বর ২০১৮ - ২৮, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. মাহফুজুর রহমান রাজ

ডেন্টাল সার্জন

রাজশহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে


আড়াল হয়ে যাচ্ছে অরিত্রির মূল হত্যাকারী

তুমুল বিতর্ক চলছে কে অপরাধী। অরিত্রি, তার বাবা-মা, স্কুল শিক্ষক-শিক্ষিকা নাকি স্কুল কর্তৃপক্ষ। কার দায় কতটুকু। অত্যন্ত জোরেশোরে প্রচারণা চলছে মেয়েটি নকল করতে গিয়ে ধরা পড়েছিল।

নকলের প্রশ্নে এত কঠোর একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে, এ ধরনের পরীক্ষায় নকল করার দুঃসাহস, ফেল করে যাবে এরকম ছাত্র-ছাত্রী ছাড়া কেউ করবে না। সেখানে অরিত্রি ছিল ক্লাসে টপ ফাইভ থেকে সেভেন এর মধ্যে থাকা একটি মেধাবী মেয়ে। ততটুকু শোনা যাচ্ছে সে মোবাইল ফোনে থেকে একটি ম্যাপ দেখে খাতায় আঁকছিল। ছোটবেলায় আমাদের সময় কথা যতোটুকু স্মরণ করতে পারি ইতিহাস পরীক্ষায় সাল এবং বিভিন্ন রাজা-মহারাজাদের নাম মনে রাখা ছিল দুরূহ বিষয়। অনেকেই হাতের তালুতে লেখে নিয়ে যেতেন ছোটখাটো সাল বা নাম। বীজগণিতের সূত্র জ্যামিতি বক্সে লিখে নিয়ে যায়নি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়াটাও কঠিন। এগুলোর জন্য ধরা পড়লে মৃদু শাস্তি পেতে হয়েছে। একে অপরের সাথে কথা বলার জন্য কিংবা অন্যের খাতা দেখে লেখার জন্য কিছু সময়ের জন্য খাতা কেড়ে নিয়ে রেখেছেন শিক্ষক।

একটা বাচ্চা মেয়েকে তার অপরাধের জন্য শাস্তি দেওয়া যেতেই পারে কিন্তু সেটার একটা সীমা পরিসীমা আছে। প্রয়োজন ছিল তাকে কাউন্সেলিং করা, সেই সাথে মৃদু শাস্তির ব্যবস্থা করা। কিন্তু টিসি দিয়ে শিক্ষাজীবন ধ্বংস করে ফেলার পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সেটার পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে আজ আমরা উপলব্ধি করছি।

আমরা আমাদের বুকে হাত দিয়ে এ কথা কী বলতে পারব যে, আমরা কেউই কোনদিন কাউকে নকল করতে দেখিনি কিংবা আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেউ নকল করেছে এমন টা শুনিনি? নকলের ইতিহাস মনে হয় প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই চলে আসছে। নকল করে সাধারণ মানের ছাত্র ছাত্রী যাদের পাশ ফেল নিয়ে সংকট থাকে। ভালো ছাত্র-ছাত্রীদের কেউ পরীক্ষায় প্লেস করার জন্য নকল করার ঝুঁকি নেয় না।

অরিত্রির দায় 

তার অপরাধ ছিল পরীক্ষার হলে মোবাইল নিয়ে যাওয়া। এই অপরাধের জন্যই স্কুল কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থানে যায়। মেয়েটি যখন ভর্তি হয় তখন সে তৃতীয় স্থান অধিকার করেছিল।ক্লাসে আর রেজাল্ট যথেষ্ট ভালো ছিল। সে মোবাইল থেকে একটি ম্যাপ আঁকছিল। এটা অবশ্যই অপরাধ কিন্তু এই অপরাধের জন্য তাকে সংশোধন হবার সুযোগটা দেওয়াটা কি খুবই কঠিন ছিল? মোবাইলে বড় প্রশ্নের উত্তর লিখে, দেখে দেখে দীর্ঘ সময় এর কাজ করার মত ঝুঁকি এই ছোট্ট মেয়েটির কখনোই নেয়া সম্ভব না।

শাস্তিটা কী দেওয়া হয়েছিল? প্রথমে শোনা গেছে তাকে টিসি দিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। শোনা যাচ্ছে স্কুল কর্তৃপক্ষ দাবি করছে তাকে টিসি দেওয়ার কথা বলা হয়নি। তাহলে কী এমন কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছিল যাতে বাবা-মা এবং অরিত্রি নিজে এতটা করুণভাবে বারবার মাফ চেয়েছে।

অস্বীকার করলেও একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে আসছে যে টিসি দেওয়ার কথাতেই অরিত্রি এবং তার বাবা-মা ভেঙে পড়েছিল কারণ তার রেজিস্ট্রেশন আগেই হয়ে গেছিলো। এখন কোন স্কুলে ভর্তি হয়ে আর রেজিস্টেশন সম্ভব ছিল না। অর্থাৎ তার বছর নষ্ট হতো একটা মেধাবী ভালো ছাত্রীর শিক্ষাজীবনের উপরে কলঙ্কের দাগ লেগে যেত টিসি প্রদানের মধ্য দিয়ে।

অরিত্রির বাবা-মার দায়

গরিব দুঃখী মানুষের মাঝেও তার সন্তানকে নিয়ে স্বপ্ন থাকে সেটা ততটাই অসম্ভব স্বপ্ন হোক না কেন। অরিত্রির বাবা-মা’র স্বপ্ন ছিল। দুই দিনের ব্যবধানে সমস্ত স্বপ্ন পুড়ে ছারখার হয়েছে। শনিবার পর্যন্ত এক অসম্ভব শান্ত লক্ষী মেয়ে তারা দেখেছে। কোন দিন স্বপ্নের মাঝেও কল্পনাতে আসেনি মোবাইল কাছে রাখার জন্য এত বড় শাস্তি পেতে হবে। ব্রেক অফ স্টাডি কত ভয়াবহ জিনিস তা ভুক্তভোগীরাই জানেন।

শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দায়

বাড়ীতেও তো লেখাপড়া হতে পারতো। কিন্তু মানুষ বাচ্চাদের স্কুলে পাঠায় কেন? শিক্ষা-দীক্ষার মাঝ দিয়ে নিজের সন্তানকে মানুষ হিসাবে সমাজে দাঁড় করানোর চিন্তা থেকে। স্কুলে শিক্ষকদেরই দায়িত্ব বাচ্চাদের শিক্ষার ক্ষেত্রে ঘাটতি কিংবা মনোসংযোগে সমস্যাসহ নানান বিচ্যুতি সংশোধন করার জন্য বাচ্চাকে কাউন্সেলিং করা। তারপরও যদি নাহয় তাহলে বাবা-মাকে ডেকে বিষয়টি আলোচনা করা। এখানে শিক্ষক বিষয়টি কর্তৃপক্ষের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন। স্কুলের অধ্যক্ষ ও প্রধান শিক্ষক মূলত কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব পালন করেন।

কর্তৃপক্ষের দায়

আমাদের দেশের নামকরা স্কুলের প্রধানগণ সাধারণত কঠোর লেবাসে অভিভাবকদের সাথে ছাত্র ছাত্রীদের সাথে নির্মম নিষ্ঠুর আচরণ করতে অভ্যস্ত। বিষয়টা এমন যে কর্তৃপক্ষ কঠোর নাহলে স্কুল ভালো হবে না কিংবা মানুষ স্কুলের প্রতি আস্থা রাখবে না। নেটে ভিডিও দেখে মনে হয়েছে মহারানি ভিক্টোরিয়া তার সভাসদ নিয়ে গরিব প্রজার বিচার করছেন।

কবি নজরুল ইসলাম স্কুল থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। আজকে কী সময় এসেছে বলার মত যে স্কুল পালানো ছেলের লেখা কবিতা কেন স্কুলেই পড়ানো হচ্ছে? এটা কি স্কুল থেকে পালানোকে উৎসাহিত করে না? অরিত্রির ভিতরে কি কোনোই সম্ভাবনা ছিল না?

আত্মহত্যা

ক্লাস নাইনের একটি ছেলে বা মেয়ে কতটা আনন্দের সাথে জীবন কাটায় তা আমরা আমাদের এবং পরিচিত সকলের ছোটবেলা দেখেই বুঝতে পারি। বাচ্চাগুলো কত সহজেই আনন্দিত হয়, কত সহজেই কষ্ট পায়। ছোটবেলায় সবচেয়ে বেশি ভয় পেতাম মৃত্যুকে। কী ধরনের মানসিক পরিবর্তন আসলে একটা বাচ্চা ছেলে বা মেয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে চায়। অরিত্রি তার বাবা-মাকে নিয়ে যখন ফিরে আসছিল বাবা মার চোখে শুধুই ছিল কান্না আর আফসোস। কী হয়ে গেল জীবনে, কোথায় ভর্তি হবে, কিভাবে রেজিস্ট্রেশন করবে অরিত্রি। বাবা-মায়ের তীব্র আহাজারি ছোট্ট মেয়েটির মনে চরম অপরাধবোধ সৃষ্টি করে। সেই সাথে তার ভিতর তৈরি হয় সামাজিক লজ্জা।

কতটা তীব্র অপরাধবোধ আর লজ্জা সৃষ্টি হলে ক্লাস নাইনের একটি হাসিখুশি শান্ত মেয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে। এটি একটি প্ররোচিত হত্যাকান্ড। ছোট্ট মেয়েটি জীবনের কিছুই বোঝেনি। আত্মহত্যা যে পরাজয় সে জানতো না। সে যদি নকল করেই থাকে তাহলে তার শাস্তি কি ছোট্ট মনের বাচ্চা মেয়েটার মৃত্যু?

মূল খুনি 

যা কিছু ঘটেছে, যা কিছু ঘটছে সবই আমাদের পচে নষ্ট হয়ে যাওয়া শিক্ষা ব্যবস্থার ফলাফল। বর্তমানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেতার ঘনিষ্ঠজনদের নকল করার সহজ চাপ দিয়ে পরীক্ষায় পাস করা আরো সহজ। বাজারের আলু পটলের মত প্রশ্নপত্র বিক্রি হয়। স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের আর সেখানে শেখাতে ভালো লাগে না। অনেকেই প্রাইভেট পড়ানোর দিকেই বেশি মনোযোগী। রাজশাহীতেই এক শিক্ষক তিনটি ব্যাচ পড়ান সেখান থেকে প্রতি ব্যাচে ৪০ জন ছাত্রছাত্রী থেকে ৪০ হাজার টাকা অর্থাৎ এক লক্ষ বিশ হাজার টাকা আয় হয়। কার কাছে পড়া ছেলেমেয়েরা দাবি করেন বাসায় যেভাবে পড়ান স্কুলে তার পড়ানোর সাথে মিল নাই। যদিও এর বাইরে ভালো কিছু শিক্ষক এখনো আছে। সারাদেশ কোচিং সেন্টারে সয়লাব। ভর্তি পরীক্ষার আগে কোচিং সেন্টারগুলো বন্ধ করে দিতে হয় কারণ তারা নাকি প্রশ্ন বেচাকেনায় যুক্ত থাকে। যারা প্রশ্ন বেচাকেনায় যুক্ত থাকে তারা কেমন কোচিং সেন্টার চালায় আর কী কোচিং দেয় সেটাও অস্পষ্ট। পুরো শিক্ষা ব্যবস্থায় মেধার মূল্যায়ন আজকে কোথায়। সহযোগী অধ্যাপক, অধ্যাপক পদোন্নতির ক্ষেত্রেও আজকাল তদবিরই একমাত্র ভরসা।

এই নষ্ট শিক্ষাব্যবস্থায় সাথে মোবাইল থাকার অপরাধে সেটি নকল এ ব্যবহৃত বলে, তাকে সংশোধনের সুযোগ না দিয়ে, একটি ছোট্ট জীবনকে পা দিয়ে পিষে ফেলতে বিন্দুমাত্র আবেগ অনুভূতির সৃষ্টি হবে না এটাই তো স্বাভাবিক।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ডিপ্রেশন বা হতাশাঃ খুঁজে বের করুন মন ভালো রাখার উপায়

ডিপ্রেশন বা হতাশাঃ খুঁজে বের করুন মন ভালো রাখার উপায়

দিনের মধ্যে কতবার তো কত কারণেই মন খারাপ হয়! সব মন খারাপের…

আত্মহত্যা নিয়ে যতকথা!

আত্মহত্যা নিয়ে যতকথা!

সুইসাইড বা আত্মহত্যা হলো নিজেই নিজেকে হত্যা করা।  এটা হলো অস্বাভাবিক চিন্তার…

অরিত্রির আত্মহত্যা, কপিক্যাট ইফেক্ট ও আমাদের ২৬ টি ভুল ধারণা

অরিত্রির আত্মহত্যা, কপিক্যাট ইফেক্ট ও আমাদের ২৬ টি ভুল ধারণা

কপিক্যাট ইফেক্ট ব্যাপারটা কী, মাত্র কদিন আগে আরো অনেকের মতো আমি নিজেও…

অরিত্রি মা, তুমি কি আমাদের ক্ষমা করবে?

অরিত্রি মা, তুমি কি আমাদের ক্ষমা করবে?

নবম শ্রেনীর ছাত্রী অরিত্রি। বয়সটা স্বপ্ন দেখার সময়। অল্পেও এরা আনন্দিত হয়,…

খবরের কাগজে মোড়ানো খাবার ও গণস্বাস্থ্যঝুঁকি

খবরের কাগজে মোড়ানো খাবার ও গণস্বাস্থ্যঝুঁকি

এই ব্যাপারটা অবশ্য চোখে পড়ার মতো না, কিন্তু চোখে পড়লে বোঝা যাবে…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর