ঢাকা      বুধবার ১২, ডিসেম্বর ২০১৮ - ২৮, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. আব্দুর রব

মেডিকেল অফিসার, বিসিএস (স্বাস্থ্য)। 

এফসিপিএস-২ ট্রেইনি (সার্জারি)।

 সাবেক শিক্ষার্থী, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ। 


বিদঘুটে অসুখ ও কিছুকথা

২০১২ সাল থেকে বিদঘুটে এই অসুখটা হয়েছে আমার। কয়েকমাস পর পর হঠাৎ করে পিরিওডিক ইনসোমনিয়া। সারা রাত হয়ত বসে কাটাব নয়ত শুয়ে শুয়ে রাজ্যের চিন্তা করে। রাতে ঘুম না আসলে জীবনের তাড়া করে বেড়ানো চিন্তাগুলোই বার বার মাথায় আসে। জীবনে একদিন টাকা হবে আর সেই টাকায় বাড়ির জন্য এটা করব ওইটা করব, ছোট ভাইয়ের জন্য কী করব, পুকুরটা কোথায় কাটব, বিল্ডিংটা কোথায় দিব, টাইলস সহ নাকি টাইলস ছাড়া, আমার নির্ঘুম রাতগুলোতে এইসব সুখ স্বপ্ন দেখে কাটাতাম একসময়। বুকের ভিতরটায় কেমন যেন একটা চিনমিনে ভাব হত।

আমার মনে হয় এ দেশের বেশিরভাগ মধ্য ও নিম্নবিত্ত পরিবারের বড় ছেলেগুলোর নির্ঘুম রাতের জেগে দেখা স্বপ্ন গুলো প্রায় একই রকম হয়। একসময় ভবিষ্যতের দিকে উতসুক হয়ে চেয়ে থেকে যে সব স্বপ্ন দেখেছি মাঝরাতে, তার বেশিরভাগই পুরণ হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। জীবনের সেই টানপোড়নটা আর নাই। বিসিএস হয়ে জীবনের কিছুটা স্থিতি এসেছে। সেটা সবকিছুতেই।

শুধু কিভাবে যেন আমার সেই নির্ঘুম রাতগুলো এখনও রয়ে গেছে। ফিরে আসে কিভাবে যেন। মাঝে মাঝে রাতে ইমার্জেন্সি অপারেশনে যাই। সেটা অবশ্য অন্য জিনিস। ইনসোমনিয়া না থাকলে কোন সমস্যা হয় না।

ঝামেলা হয় সকাল বেলায়। ভোর রাতে ঘুম আসলে পরে উঠতে কষ্ট হয়। অফিসে যেতে দেরি হচ্ছে। আমাকে নিতে আসা ভাইটা মাঝে মাঝে ফোনেও আমাকে তুলতে পারছে না। পরে দরজা ধাক্কা দিয়ে তুলে। এই নিয়ে আজকেও কথা শুনেছি উপর থেকে।

সন্ধায় হতাশা আর দুশ্চিন্তায় ভোগা একজন রোগী এসেছিল। বললাম, ঘুম কেমন হয়?

সে বললো, ঘুম আর খাওয়া স্যার আমার খুবই ভাল, কোন সমস্যা নেই।

অভিনন্দন জানিয়ে বললাম, আপনার ওষুধ লাগবে না। আপনি সুখী মানুষ। রাতে ঘুম না হলে বুঝতেন জীবনটা কাকে বলে।

এক সময় তিন ব্যাচ সিনিয়র এক বড় ভাই বলছিলেন প্রতি রাতে ঘুমানোর পূর্বে গোসল করবা। করে দেখেছি, কাজ হয় না, শুধু শুধু সর্দি হয়। আরো অনেকে অনেক রকম পরামর্শ দিয়েছে তাদের মত করে। তাতেও লাভ হয় না। ইনসোমনিয়ার পিরিওড শেষ হলে এমনি এমনি ভাল হয়ে যায়।

ঢাকায় থাকতে সুবিধা ছিল। সারা রাত ওটিতে থাকতাম। ঘুম না আসাটাই বেনিফিট ছিল। আগের পোস্টিং টাতেও সুবিধা ছিল। একা একা হাঁটতাম। এখন শুধু অন্ধকার আর আমি। হাঁটার জায়গা নেই। আপ সাইড ডাউনের মত জীবনেও যদি এমন একটা ব্যপার থাকত! আমাদের মত কিছু মানুষ বেঁচে যেত। দুবাই, হংকং, গুয়াংজুর মত মেগা শহরে দিন আর রাতের কোন পার্থক্য থাকে না। আলো দূষণের কারণে আকাশে তারা উঠে না। ওদের জীবনটাও অনেকটা আমার মত। কৃতিম রাতে ঘুমাতে হয়।

একবার শিকাগো শহরে বিদ্যুত বিপর্যয় হয়। পুরো সিটিতে কোথাও আলো থাকে না। রাতের আকাশে হাজার হাজার তারা উঠে। উত্তর থেকে দক্ষিণে যাওয়া আমাদের মিলকিওয়ে গ্যালাক্সিটা পরিষ্কার দেখা যায়। বহুকাল লোডশিডিং না হওয়ায় একটা জেনারেশনের কেউ কখনও রাতের আঁধারে মিলকিওয়ে গ্যালাক্সি আর তারা দেখেনি। ওরা ভয় পেয়ে সমানে ৯১১ তে কল দিচ্ছিল আকাশে কী যেন দেখেছে! আলো দূষণ পুরো একটা জেনারেশন কে অন্ধ করে রেখেছিল।

ঘুমের দূষণ পুরো একটা জিন্দেগি আমার নষ্ট করে দিল।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

প্রেসক্রিপশনের ব্যাপারে যত্নশীল হোন!

প্রেসক্রিপশনের ব্যাপারে যত্নশীল হোন!

রোগীর মুল সমস্যা, উপরের পেটে ব্যথা, বুকে জ্বালাপোড়া, পিঠে ব্যথা, দুর্বলতা। একটা…

মেয়েটি বেঁচে থাকলে হয়ত আগামীর মার্গারেট থ্যাচার হতো!

মেয়েটি বেঁচে থাকলে হয়ত আগামীর মার্গারেট থ্যাচার হতো!

আমার এসএসসি পাশের যোগ্যতা ছিল না। স্যারদের কথামত-‘‘ও কোন দিন পাশ করতে…

আবেগীয় স্মৃতির গুদামঘর

আবেগীয় স্মৃতির গুদামঘর

ইন স্টিমের উপরে কাঠবাদামের আকারের অঞ্চলটির নাম "এমাগডেলা"। লিম্বিক সিষ্টেমের দুটি অংশ…

অধ্যাপক মনসুর খলিল স্যারকে শেষ দেখা!

অধ্যাপক মনসুর খলিল স্যারকে শেষ দেখা!

আজ থেকে তিন বছর আগে ২০১৫ সনের ডিসেম্বরের ৭ তারিখে আমি বদলী…

সুইসাইড ও পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার

সুইসাইড ও পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার

"স্যার আদাব, অপিসি পয়সনিং, পুলিশ কেইস..." মোবাইলে ইমার্জেন্সী চিকিৎসকের ফোন পেয়ে আউট…

আত্মহনন কোন সমাধান নয়

আত্মহনন কোন সমাধান নয়

এফসিপিএস সেকেন্ড পার্টের জন্য তিন বছর ট্রেনিং লাগে। তিন বছর শুনতে যত…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর