ঢাকা      শনিবার ২৩, ফেব্রুয়ারী ২০১৯ - ১০, ফাল্গুন, ১৪২৫ - হিজরী

সব খারাপ আর অন্যায় কি আমার সাথেই হচ্ছে?

মাহদী ইসলাম: খুব ছোটবেলা থেকেই অনেক বড় কিছু ঘটে চলেছে আমার নিজের সাথে। সেগুলোতে আলোকপাত করবো না। বর্তমানে ঘটে চলা ছোটখাটো কিছু নিয়েই বলি।

গত দেড় বছর যাবত ভুগেছি সিভিয়ার ক্লিনিক্যাল ডিপ্রেশনে। সিভিয়ারিটির এক পর্যায়ে পড়ালেখা-পরিবার সব ছেড়েই দিবো ভেবেছিলাম। 

এক্সিডেন্টের শিকার হয়ে কমপ্লেক্স ফুট ফ্র্যায়কচার হওয়ায় প্লাস্টার নিয়ে শুয়ে বসে, ক্রাচ নিয়ে বাসায় হেঁটে-চলে আর নির্মম ব্যাথা নিয়ে কাটাচ্ছি আজ একমাস। 

মোলার টুথ ইম্প্যাকশনের জন্যে আক্কেল দাঁত এক্সট্রাক্ট করার পর মাথা ছিঁড়ে খুলে যাওয়ার মতো ব্যাথায় ভুগছি আজকে ৮ দিন। টানা ৩ দিন পারিনি মুখ খুলতে। এখনো পারিনা ঠিকমতো কথা বলতে আর খাওয়া দাওয়া করতে।

বাসায় পড়ে থাকার সু্যোগে চুরি হয়ে গেছে নিজের সবথেকে প্রিয় আর সাধের সাইকেলটি।

ক্লাস আইটেম আর টার্ম পরীক্ষা দিতে না পারায় পিছিয়ে গেছি মাসের পর মাস।

প্রশ্ন উঠতেই পারে নিজের মাঝে, সব খারাপ কেন আমার সাথেই হয়? আমি তো কারো কোনো ক্ষতি করিনি! সৃষ্টিকর্তা কেন আমাকেই এতো দুর্বিষহ অবস্থার মাঝে রাখলেন? কেন হলো এমন? আমি তো এমন জীবন চাইনি!

এই ধরণের প্রশ্ন প্রত্যেকের মনেই কমবেশি উঁকি দিয়েছে। কেন এইসব সিচুয়েশনে আমাদের পড়তে হয়? আর যা ঘটে, তা কি কেবল নিজের সাথেই ঘটছে?

দুই.

এই পৃথিবীতে আমাদের সাথে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা যে আসলেই খারাপ, এই ধারণা করাটা আমাদের জন্যে সবথেকে বোকামি। কেন? একটি উদাহরণ দিচ্ছি-

একটি সিচুয়েশন কল্পনা করুন, একটি বাচ্চাকে একদল মাস্ক পড়া লোক টেনে ছিঁচড়ে একটা রুমে নিয়ে যাচ্ছে। ছেলেটা গগণবিদারী চিৎকার করছে। বাবা মা কেউ ঐ ছেলের কাছে যেতে পারছে না। ছেলেটার শরীরে লোকগুলো জোরে ঢুকিয়ে দিলো ৫-৬ টা মোটা সুঁই। এরপর করাত দিয়ে কেটে দিলো ছেলেটার পা। চিরতরে পঙ্গু হয়ে গেল ছেলেটি। 

কি? গালি দিচ্ছেন মুখোশধারী ওই লোকগুলোকে? কি নিষ্ঠুর, তাইনা?

আর ছেলেটির দিক থেকে সিচুয়েশনটি কল্পনা করুন একবার। কি ভাবছে বাচ্চা ছেলেটি?

তিন.

এবার আসল সিচুয়েশন শুনুন। 

মাস্ক পড়া হৃদয়হীন লোকগুলো ছিল ডাক্তার। খেলতে গিয়ে ছেলেটির পা কেটে যআয়। বাবা মা কেয়ার না দেয়ায় ইনফেকশন হয়ে পঁচে (গ্যাংগ্রিন) হয়ে গিয়েছিল। পায়ের গ্যাংগ্রিনটি যদি সরিয়ে না ফেলা হতো, তাহলে সেটি ছড়িয়ে যেতে পারতো পুরো শরীরে।

আজকে সেই ছেলেটি প্লাস্টিকের পা দিয়ে হেসে হেসে দিব্যি ফুটবল খেলছে। বাবা মা আজ পূর্বের তুলনায় অনেক সজাগ। অথচ সেই পা যদি না কাটা হতো, তাহলে তাকে বিছানায় পড়ে থেকে পড়ে থেকে গুনতে হতো অপেক্ষার প্রহর।

কি? এবার পারবেন, মুখোশধারীদের গালি দিতে?

চার.

আরেকটি উদাহরণ দিই- 

একটি দম্পতির প্রথম বাচ্চা পৃথিবীর আলো দেখার আগেই মারা গেল। পরে আরেকটি বাচ্চা হলো। সেটিও পানিতে ডুবে মারা গেল। চিন্তা করে দেখুন তো কি অবস্থা হতে পারে সেই দম্পতির? ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের কি শিকার টাই না হলো? তাইনা?

এরকম ঘটনা কি অহরহ আমাদের মাঝে ঘটছে না?

পাঁচ.

১০ বছর পর দেখা গেল সেই দম্পতি ৩ সন্তান নিয়ে দিব্যি হাসিখুশির সাথে সংসার চালাচ্ছে। কিভাবে? আসল ঘটনা বলি..

বাবা ছিল সংসার আর তার স্ত্রীর প্রতি কেয়ারলেস। মায়ের জানা ছিল না গর্ভাবস্থায় কিভাবে বাচ্চার আর নিজের যত্ন নিতে হয়। শ্বশুর শাশুড়ির মানসিকতা ছিল কুসংস্কারে পরিপূর্ণ। প্রথম বাচ্চার ঘটনা সেই বাবা কে সংসার আর স্ত্রীর প্রতি কেয়ারফুল করে তোলে। মা কে বাধ্য করে গর্ভাবস্থায় যত্নশীলা হতে। শ্বশুর-শাশুড়ি ছিঁড়ে ফেলে তাদের কুসংস্কারের জাল কে।

দ্বিতীয় বাচ্চার ঘটনা তাদের প্রত্যেককে আগের থেকেও আরো বেশি সিরিয়াস করে তোলে। অবস্থা আর পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে।

লাভবান হলো কে?

ছয়.

এরকম আরো অনেক বাস্তব ঘটনার প্রমাণ দেয়া হয় যা আমাদের সাথে নিত্যদিনই ঘটেছিল, ঘটছে আর ঘটবে।

আসল কথা হলো, আমরা মানুষ। আমাদের চিন্তা করার ক্ষমতা, অনেক অসীম নয়। তাই একটি ঘটনা ঘটার পেছনে কি প্রজ্ঞা লুকিয়ে থাকে, তা আমাদের পক্ষে জানা সম্ভব নয়।
আমি যা বলছি তার প্রমাণ কি? বলছি-

"পক্ষান্তরে তোমাদের কাছে হয়তো কোন একটা বিষয় পছন্দসই নয়, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হয়তোবা কোন একটি বিষয় তোমাদের কাছে পছন্দনীয় অথচ তোমাদের জন্যে অকল্যাণকর। বস্তুতঃ আল্লাহ্ই জানেন, তোমরা জান না।" [সূরা বাকারা ২:২১৬]

চিন্তা করুন, কে বলেছে কথাটা! আমি আপনি? না? যিনি সর্বময় প্রজ্ঞার অধিকারী তিনিই বলেছেন।

আদমকে তৈরীর সময় ফেরেশতারা যখন আল্লাহকে আদম তথা "দাঙ্গা-হাঙ্গামা ও রক্তপাত সৃষ্টিকারী মানুষকে" সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলো- "....তখন তিনি বললেন, আমি কি তোমাদেরকে বলিনি যে, আমি আসমান ও যমীনের যাবতীয় গোপন বিষয় সম্পর্কে খুব ভাল করেই অবগত রয়েছি? এবং সেসব বিষয়ও জানি যা তোমরা প্রকাশ কর, আর যা তোমরা গোপন কর!" [সূরা বাকারা ২:৩৩]

আমরা যা দেখি, আমাদের সাথে যা ঘটে, এই বিশ্বে যা ঘটছে, তার সামগ্রীক রেজাল্ট বা লব্ধি ফলাফল আসলে আমাদের জ্ঞানসীমার মধ্যে নেই। বড়জোর আমরা হয়ত আমাদের এই লিমিটেড জ্ঞান আর প্রজ্ঞা দিয়ে কিছুটা অনুমান করতে পারি, কিন্তু সামগ্রীক চিত্র বা লব্ধি ফলাফল জানা এই ইহজগতে আমাদের জন্যে জানা কখনোই সম্ভব নয়। তাই যা আপাতদৃষ্টিতে খারাপ মনে হয়, তার ফলাফল যে আসলেই খারাপ হবে এটা ভাবার কোনো সুযোগ নেই।

সাত.

আমাদের অবস্থাটা আমরা এইভাবে কল্পনা করতে পারি-

আমাদের একটি বিশাল (মনে করুন এই পৃথিবীর ব্যাসের সমান) এলইডি স্ক্রিনের উপর ফেলে দেয়া হলো। সেই এলইডি স্ক্রিনে একটি ১০০০০ ঘন্টার মুভি ছাড়া আছে। আপনি সেটার উপরে দাঁড়িয়ে কি দেখবেন? মুভি? অসম্ভব!

আপনি দেখবেন কিছু ঘোলাটে বক্স বা পিক্সেল যেগুলো কিছুক্ষণ পরপর কালার পরিবর্তন করছে। এখান থেকে কি আপনি চাইলেও মুভির প্লট বুঝতে পারবেন?

চিন্তা করে দেখুন তো! কতই না ক্ষুদ্র আমাদের প্রজ্ঞা আর জ্ঞানের পরিসীমা!

লেখক: মাহদী ইসলাম, শিক্ষার্থী,  স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, ঢাকা।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

একটি ভুল, একটি গুজব আর বিনা অপরাধের শাস্তি

একটি ভুল, একটি গুজব আর বিনা অপরাধের শাস্তি

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের (শেবাচিম) একটি বিভাগে ডিপ্লোমা কোর্স আনার প্রক্রিয়া চলছিল। উৎসাহী…

সৌদি অপারেশন থিয়েটার বনাম আমাদের অপারেশন থিয়েটার

সৌদি অপারেশন থিয়েটার বনাম আমাদের অপারেশন থিয়েটার

সৌদি আরবে প্রথম অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার দিনটা আমার কাছে মনে রাখার মত…

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে অগ্নিকান্ড ও ডাক্তারদের অর্জন

সোহরাওয়ার্দী মেডিকেলে অগ্নিকান্ড ও ডাক্তারদের অর্জন

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গতকালকে সংঘটিত অগ্নিকান্ডে সমাজের সব স্তরের মানুষের…

মানুষের ভালবাসায় আমি ঋণী

মানুষের ভালবাসায় আমি ঋণী

আমি ময়মনসিংহ শহরে ৩ বছর ৪ মাস কাটাচ্ছি। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের…

রেইপ কেইস ও ধর্ষণ সার্টিফিকেট

রেইপ কেইস ও ধর্ষণ সার্টিফিকেট

কেবল মাত্র ভোরে হয়েছে। পাখির ডাক শুনা যাচ্ছে। আমাদের ইমার্জেন্সী ডাক্তার রুম…

নতুন চেম্বারে অশরীরী আত্মা

নতুন চেম্বারে অশরীরী আত্মা

নতুন একটা চেম্বার পেয়েছি আমি। দামী হাসপাতালের চালু চেম্বার। আজ থেকে একমাস…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর