ঢাকা শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১ ঘন্টা আগে
২৫ নভেম্বর, ২০১৮ ১১:০৮

ক্রমেই ভয়ংকর হচ্ছে ৩ রক্তরোগ

ক্রমেই ভয়ংকর হচ্ছে ৩ রক্তরোগ

মেডিভয়েস রিপোর্ট: দেশে সরকারি পর্যায়ে কোনো বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান না থাকায় সব ধরনের রক্তরোগের সমন্বিত চিকিৎসা প্রদান ব্যহত হচ্ছে। যায় ফলে ক্রমেই ভয়ংকর হচ্ছে রক্তের তিনটি জটিল রোগ থ্যালাসেমিয়া, হিমোফিলিয়া ও ব্লাড ক্যান্সার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্লাড ডিজিজ বা রক্তরোগ ও রোগের চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে সঠিক ধারণা না থাকায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। এমনকি এসব রোগে আক্রান্ত হয়ে অনেক মানুষের মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে।

থ্যালাসেমিয়া হলো বংশগত একটি রক্তরোগ। এ রোগে রক্তে অক্সিজেন পরিবহনকারী হিমোগ্লোবিন কণার উৎপাদনে ত্রুটি ঘটে। হিমোগ্লোবিন তৈরি হয় দুটি আলফা প্রোটিন ও দুটি বিটা প্রোটিন দিয়ে। যদি এ প্রোটিনগুলোর উৎপাদন শরীরে কমে যায়, তবে শরীরের হিমোগ্লোবিনের উৎপাদনও কমে যায়। তখন দেখা দেয় থ্যালাসেমিয়া। কিন্তু থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত রোগীর দেহে পর্যাপ্ত পরিমাণ লোহিত রক্তকণা উৎপাদন হয় না। বাবা অথবা মা, অথবা বাবা-মা উভয়েই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে বংশানুক্রমে এ রোগটি সন্তানের মধ্যে ছড়ায়।

থ্যালাসেমিয়া ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১৪ জনে একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহক। প্রতিবছর প্রায় ১০৪০ শিশু বিটা থ্যালাসেমিয়া মেজর এবং প্রায় ৬৪৪৩ শিশু হিমোগ্লোবিন ই-বিটা থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।  প্রতিদিন গড়ে ২০ জন থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। রক্ত পরিসঞ্চালনের মাধ্যেমে একটি শিশুকে ১৫ থেকে ২০ বছর বাঁচিয়ে রাখতে ব্যায় হয় ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা। যা একদিকে যেমন ব্যয়বহুল অন্যদিকে কষ্টসাধ্যও বটে।

রক্তের আরেকটি বংশানুক্রমিক জিনগত রোগের নাম হিমোফিলিয়া। এ রোগে রক্ত জমাট বাঁধার ক্ষেত্রে সমস্যা হয় তাই শরীরে কোথাও কেটে গেলে রক্তপাত বন্ধ করা দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। 

পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, বিশ্বে প্রতি দশ হাজার জনে একজন হিমোফিলিয়া রোগে আক্রান্ত হয়। সেই হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ১৬ হাজার হিমোফিলিয়া রোগী রয়েছে। রক্তে জমাট বাঁধার উপাদান বা ফ্যাক্টর জন্মগতভাবে কম থাকার কারণে হিমোফিলিয়া রোগটি হয়ে থাকে। এ রোগটি সাধারণত পুরুষের ক্ষেত্রেই লক্ষণীয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রক্তে ফ্যাক্টর-৮-এর ঘাটতির কারণে হিমোফিলিয়া-এ এবং ফ্যাক্টর-৯-এর অভাবে হিমোফিলিয়া-বি আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে। হিমোফিলিয়া হলে রোগীর খুব বেশি রক্তপাত হয়। মহিলাদের মাসিকের সময় অনেক দিন ধরে রক্ত ঝরা, সময়ে সময়ে নাক বা দাঁত দিয়ে রক্ত বের হওয়া, দাঁতের অপারেশনের পর প্রচুর রক্তপাত হওয়া এবং প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া এসবই হিমোফিলিয়া রোগের কারণ। সাধারণত দুই ধরনের হিমোফিলিয়া রোগী দেখা যায়, হিমোফেলিয়া-এ এবং হিমোফিলিয়া-বি। চিকিৎসকদের মতে, ৮৫ শতাংশ রোগীর হিমোফেলিয়া-এ এবং ১৫ শতাংশ রোগীর হিমোফেলিয়া-বি হয়ে থাকে। হিমোফিলিয়া একটি অনিরাময়যোগ্য রোগ।

রক্তের আরেকটি মরণব্যাধির নাম রক্তকোষের ক্যান্সার বা ব্লাড ক্যান্সার। দিন দিন যে হারে ব্লাড ক্যান্সার বাড়ছে সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বহুলাংশে বেড়ে যাবে।
ব্লাড ক্যান্সার বা লিউকেমিয়া মূলত দু’ধরনের। অ্যাকিউট লিউকেমিয়া ও ক্রনিক লিউকেমিয়া। অ্যাকিউট লিউকেমিয়া খুবই মারাত্মক হয়। দ্রুত চিকিৎসা না নিলে রোগী বেশি দিন বাঁচতে পারে না। অ্যাকিউট লিউকেমিয়া আবার দু’ধরনের, অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া বা এএলএল এবং অ্যাকিউট মায়েলোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া বা এএমএল। যে প্রকারেরই অ্যাকিউট লিম্ফোব্লাস্টিক লিউকেমিয়া বা এএলএল হোক না কেন, চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি।

শুধু কেমোথেরাপি দিয়ে চিকিৎসা করলে দুই থেকে আড়াই বছর চিকিৎসা নিতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে বোন ম্যারো ট্রান্সপ্লান্টেশন বা অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপন করতে হয়। ক্রনিক লিউকেমিয়ারও প্রকারভেদে চিকিৎসার ধরন ভিন্ন ভিন্ন। ক্রনিক লিউকেমিয়ার রোগী সঠিক চিকিৎসা নিয়ে অনেক দিন ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারে।

ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েই চলেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে শিশু ক্যান্সারের ৭৫ শতাংশ নিরাময় করা সম্ভব। দেশে যে হারে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে, তার মাত্র ১০ শতাংশেরও কম রোগী চিকিৎসার আওতায় আসছে। বাকি ৯০ শতাংশ ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু যথাযথ চিকিৎসার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে প্রতিবছর প্রায় ১৩ হাজার শিশু ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। প্রকৃত সংখ্যা অনেক বেশি। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে শিশু ক্যান্সারের ৭৫ শতাংশ নিরাময় করা সম্ভব। দেশে যে হারে ক্যান্সার আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে, তার মাত্র ১০ শতাংশেরও কম রোগী চিকিৎসার আওতায় আসছে। বাকি ৯০ শতাংশ ক্যান্সার আক্রান্ত শিশু যথাযথ চিকিৎসার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের পেডিয়াট্রিক হেমাটোলজি এ্যান্ড অনকোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান শিশু ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আফিকুল ইসলাম বলেন, শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবণতা ব্লাড ক্যান্সারের, এরপরে রয়েছে ব্রেন টিউমার, বোন টিউমার ইত্যাদি। ২০১২ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত রেজিস্ট্রেশনকৃত শিশু ক্যান্সার রোগীর অধিকাংশ এখনও এ বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি বলেন, চিকিৎসায় ৫৮ শতাংশ রোগী সুস্থ হলেও বাকি ৪২ শতাংশ রোগীকে সুস্থ করা সম্ভব হয়নি।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত