২২ নভেম্বর, ২০১৮ ০৬:২০ পিএম

নানা বৈষম্যের শিকার বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার

নানা বৈষম্যের শিকার বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার

মেডিভয়েস রিপোর্ট: লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অভ্যুদয় ঘটেছিলো এই বাংলাদেশের। স্বাধীনতার ৪৭ বছরে পা দেয়া এই রাষ্ট্র হাটি হাটি পা পা করে এগিয়ে আজ বিশ্ব মানচিত্রে মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে, রাষ্ট্রের নাগরিকদের মৌলিক অধিকার পূরণের ব্যবস্থা করা। এবং স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক অধিকার। নানা বাধা বিপত্তি পেরিয়ে রাষ্ট্র তার নাগরিকের এই প্রয়োজন পূরণে চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য যারা প্রধান ভূমিকা পালন করেন, রাজধানী থেকে শুরু করে একেবারে প্রত্যন্ত গ্রামে মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য সরকারিভাবে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে নিয়োগকৃত সেই চিকিৎসকরা আসলে কেমন আছেন?

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সাধারণত ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী ছেলে বা মেয়েটিই চিকিৎসা পেশায় আসেন। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো এদেশেও চিকিৎসাবিদ্যার পড়াশোনা জটিল এবং কঠিন। তাই ক্লাসের মেধাবী ছাত্র বা ছাত্রীটি ডাক্তারি পড়তে আসার পরও অন্য ছাত্র বা ছাত্রীদের চাইতে তাকে পড়াশোনা নিয়ে সবচেয়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়।

অথচ বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বন্ধুটি যদি প্রশাসন বা অন্যান্য ক্যাডারে পাস করে এবং ডাক্তারি পড়ুয়া বন্ধুটি যখন স্বাস্থ্য ক্যাডারে পাশ করে, তখন চিত্রটি পুরোই উল্টে যায়। অসংখ্য সীমাবদ্ধতা আর প্রতিকূলতায় দায়িত্ব পালনের ফলে একসময় চিকিৎসক বন্ধুটির মনে হওয়াই স্বাভাবিক যে, ডাক্তারি পড়ে সম্ভবত সে বড় কোনো অপরাধ করে ফেলেছে, যার মাশুল তাকে দিতে হবে আজীবন।

ডাক্তার হিসেবে সিভিল সার্ভিসে চাকরি করতে আসা ছেলেটি তার অভিজ্ঞতা, সুবিধা-অসুবিধা অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সাথে মেলাতে পারে না। বোধ করি দেশের যে কোন সচেতন মানুষ এতোটা বৈষম্য দেখে অবাক না হয়ে পারেন না। সদ্য এমবিবিএস পাশ করা একজন তরুণ চিকিৎসক বিসিএসে জয়েন করার আগে কল্পনাও করতে পারেন না, সামনের দিনগুলোতে জীবন কতবার, কীভাবে রঙ পাল্টাবে, কতো বার ভুগতে হবে স্বপ্নভঙ্গের বেদনায়!

বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারের সাথে অন্য ক্যাডারদের অসংখ্য বৈষম্য থেকে অল্প কিছু কথা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:

 

পোস্টিং এবং আবাসন সমস্যা:

বিসিএস পাশ করে আসা যে কোনো সরকারি অফিসারের ন্যুনতম পোস্টিং হয় থানা পর্যায়ে। বিসিএসে পররাষ্ট্র ক্যাডারে যারা পাশ করেন, তাদের রাজধানীর বাইরে যেতে হয় না এবং ইউরোপ-আমেরিকায় পোস্টিং নাহলে তাদের ভালো জায়গায় পোস্টিং হয়েছে বলে ধরা হয় না। বিসিএসে পুলিশের প্রথম পোস্টিং হয় অন্তত জেলা পর্যায়ে। বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারদের প্রথম পোস্টিং হয় ডিসি অফিসে। অন্য ক্যাডারদের অন্তত থানা পর্যায়ে। শুধুমাত্র বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারদের জন্য পোস্টিং রাখা হয়েছে থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে ইউনিয়ন সাব-সেন্টারগুলোতেও। কিন্তু থানা পর্যায়েই অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের জন্য নেই ভালো কোনো আবাসন ব্যবস্থা। ইউনিয়নের পর্যায়ের কথা বলাই বাহুল্য। ইউনিয়ন পর্যায়ে অধিকাংশ জায়গায় বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে জয়েন করা তরুণ চিকিৎসককে ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার ভিজিটর (এফডব্লিউভি) নামে পরিচিত একজন সরকারি স্বাস্থ্যকর্মীর সাথে অফিস শেয়ার করতে হয়। এফডব্লিউভিরা আবার স্বামী-স্ত্রী নিয়ে সাব-সেন্টারেই বসবাস করেন। তদুপরি, এই এফডব্লিউভিরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীন নন, বরং পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের আওতাধীন। ফলে বিসিএস কর্মকর্তা হিসেবে একজন ডাক্তার, এফডব্লিউভিকে কোন কিছুর জন্য অধিকার বা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কিছু বলবেন, সে সুযোগ থাকে না বললেই চলে। আর কোন অব্যবস্থাপনা দেখে ডাক্তার সাহেব যদি কোন কিছু শেকায়েত করেও বসেন সবসময় তার মনোলোভা উত্তর ফেরত পাবেন তারও নিশ্চয়তা নেই। অথচ, এফডব্লিউভি তৃতীয় শ্রেণীর একজন কর্মচারী। অধিকাংশ সময়ে এসব সাব-সেন্টার এতো দুর্গম জায়গায় থাকে যে, সেখানে কোনো গাড়ি যায় না। ভদ্রভাবে বাস করার সুযোগ সুবিধা থাকে না। অথচ প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান করা তরুণ অফিসারের জন্য রয়েছে আলাদা সরকারি কোয়ার্টার, আলাদা অফিসরুম, সরকারি খরচে বুয়া, আয়া, আর্দালি, পিয়ন। সত্যিই সেলুকাস কী বিচিত্র এই দেশ; দেশের আমলাতন্ত্র!

 

প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে বৈষম্য:

প্রশাসন, পুলিশসহ মোটামুটি সব ক্যাডারেই (শিক্ষা ব্যতীত) চাকরিতে যোগদানের পরপরই তাদের জন্য আলাদা করে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব প্রশিক্ষণ ছাড়া অফিসারদের কর্মক্ষেত্রে পাঠানো হয় না। অথচ বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেয়া একজন চিকিৎসককে দেখা যায় যোগদানের পরদিনই হাতিয়া কিংবা গারো পাহাড়ের শ্বাপদসংকুল কোনো জনপদে ইমার্জেন্সি ডিউটি ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলশ্রুতিতে স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্যান্যদের চেয়ে সবদিক থেকে এগিয়ে থাকা ছেলেটির মাঝে অফিসারসুলভ কোন মানসিকতা গড়ে উঠে না বরং কেরানি নির্ভর হয়ে চলতে হয়। অথচ তিনি দেশের প্রথম শ্রেণীর একজন সরকারি কর্মকর্তা। সরকারি চাকরিতে বেতনের বাইরেও টিএ ডিএসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা আদায়তো দূরের কথা, অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিকিৎসক মহোদয় জানেনও না। অন্যান্য ক্যাডারের জন্য এ চিত্র অকল্পনীয়। সব ক্যাডারদের জন্যে ছয় মাস ব্যাপী বিপিএটিসিতে সর্বাধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। এ ছাড়া তাদের নিজস্ব ব্যবস্থাপনা বিষয়ভিত্তিক আলাদা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকে। আর অন্যদিকে স্বাস্থ্য ক্যাডারদের জন্য নামকাওয়াস্তে দুই মাসের বুনিয়াদী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। সে প্রশিক্ষণের মান সংরক্ষণে কর্তৃপক্ষ কতোটুকু সচেতন, সেটাও গবেষণার বিষয়।

 

বেতনভাতা সংক্রান্ত বৈষম্য:

চিকিৎসার মতো একটি জটিল বিষয়ে পড়ার পরও এর জন্য আলাদা করে কোনো সুবিধা পাচ্ছেন না একজন চিকিৎসক। জরুরী বিভাগে দিনের পর দিন ঘটে চলেছে নানা হামলা লাঞ্চনার ঘটনা। তবু তারা পাচ্ছেন না কোন ঝুঁকিভাতা। নেই ওভারটাইমের কোন ব্যবস্থা। যে কোন ছুটির দিনে আগে থেকেই জরুরী বিভাগ চব্বিশ ঘন্টা খোলা রাখা হয় অনেক আগে থেকেই। ইদানীং শুরু হয়েছে বন্ধের দিনেও বহিঃবিভাগ চালু রাখার নিয়ম। এর জন্যেও দেয়া হচ্ছে না কোন বাড়তি প্রণোদনা। তবে কি স্বাস্থ্যখাতের কর্মচারীরা মানুষ নন? তাদের বিশ্রামের বা বিনোদনের প্রয়োজন নেই? তাদের এ ত্যাগের ন্যূনতম কোন মূল্যায়ন নেই? অথচ প্রশাসন, পুলিশসহ অন্য ক্যাডারে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্যে অফিসারগণ আলাদা ভাতা পান, প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভিজিটের জন্য পান ধরণের টিএ ডিএ। প্রশাসন ক্যাডারের উপ-সচিব থেকে শুরু করে উপরের দিকের অফিসারদের জন্য বাবুর্চির বেতন, মালির বেতন বরাদ্দ থাকে, গাড়ি কেনার জন্য আলাদা করে ৪০ লক্ষ টাকার সুদমুক্ত ঋণ, সেই গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি মাসে ২৫ হাজার টাকা, মোবাইল কেনার জন্য ৭৫ হাজার টাকা এবং সেই মোবাইলের জন্য আলাদা করে বিলসহ নানা ধরণের বরাদ্দ থাকে। অথচ বিসিএস হেলথ ক্যাডারদের ক্ষেত্রে এ সুযোগ সুবিধার প্রত্যাশা করাই কষ্টকল্পনা।

 

উচ্চশিক্ষার জন্য প্রেষণ লাভের ক্ষেত্রে বৈষম্য:

বর্তমানে অধিকাংশ ক্যাডাররা ৫৫ বছর পর্যন্ত শিক্ষা ছুটি নেয়ার সুযোগ পান। অথচ স্বাস্থ্য ক্যাডারের অফিসাররা ৪৫ বছর পর্যন্ত ছুটি নেয়ার সুযোগ পান। এ বৈষম্য থাকার কারণে চাকরিতে ঢোকার পরপরই চিকিৎসকেরা শিক্ষা ছুটির সুযোগ হারানোর ভয়ে চিন্তিত থাকেন। এতে হ্রাস পায় কর্মোদ্যম; মান হারায় তার নিজ কর্মস্থলের চিকিৎসা সেবা। এর সাথে হৃষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে আছে আরো নানা সমস্যা। বাংলাদেশের মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থা গ্র্যাজুয়েট, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট দু-স্তরেই অনেকটা এমনভাবে সাজানো আছে যে, এখানে একবার পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে ফেলা বলতে গেলে অসম্ভব ব্যাপার। তারপরও স্নাতকোত্তর কোর্সে ফেল করলে চিকিৎসকদের ফের পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে দুর্গম পরিবেশে তথা গ্রামে। এতো কাজের চাপে থেকে আবার পরীক্ষা দিয়ে পাশ করা আরও কয়েকগুণ কঠিন হয়ে যায় যা বুঝতে পিএইচডি গবেষক হতে হয় না। ফলাফল? ফেলের পর ফেলের ঘূর্ণাবর্তে গোত্তা খাওয়া এক দুর্বিষহ জীবন বয়ে যাওয়ার অব্যক্ত বেদনায় ক্রমশ নিঃশেষ হয়ে যাওয়াই হয়ে ওঠে একজন চিকিৎসকের নিয়তি।

 

চাকুরির প্রমোশনের ক্ষেত্রে বৈষম্য:

আজীবন ক্লাসের প্রথম থাকা ছাত্রটির কর্মজীবনে গ্রেড থ্রির উপর ওঠার নিয়মই রাখা হয়নি বর্তমান নিয়মে। সব ধরণের যোগ্যতা অর্জনের পরেও একজন চিকিৎসক অধ্যাপক হিসেবে তৃতীয় গ্রেডের উপরে উঠতে পারেন না, যেখানে একজন সচিব গ্রেড ওয়ান কর্মকর্তা হওয়ার পর আবার অতিরিক্ত আরেক ধাপ প্রমোশন পেয়ে সিনিয়র সচিব হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এই বৈষম্যের বাইরেও অসংখ্য বৈষম্যের শিকার বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার। এ ক্যাডারে প্রমোশনের জন্য উচ্চশিক্ষাকে একদিকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে অন্যদিকে কঠিন করে দেয়া হয়েছে উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগ। ফলে একজন চিকিৎসক মেডিকেল অফিসার হিসেবে চাকরি শুরু করে মেডিকেল অফিসার হিসেবেই কর্মজীবন শেষ করেছেন এমন ঘটনা কম নয়। হয়তো সর্বোচ্চ ইউএইচএফপিও বা সহকারী পরিচালক পর্যন্ত গিয়েই ছুঁতে হয় অবসরের মাইলফলক। অথচ প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান করা একজন তার চাকরিতে প্রবেশকালীন যোগ্যতা দিয়েই সচিব, সিনিয়র সচিব হয়ে যাচ্ছেন। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে নানা সময় প্রতিবাদ হলেও আমলাতন্ত্রের একগুঁয়েমি এবং নানা কূটচালের কাছে বিফলে গেছে সব প্রতিবাদ। এ সংক্রান্ত বৈষম্য প্রতিনিয়ত হতাশ করে রাষ্ট্রের মেধাবী সন্তানদের।

দেখা যাচ্ছে, রাষ্ট্রের মেধাবী অংশের প্রতিনিধি হওয়া সত্ত্বেও প্রতিনিয়ত নানা অব্যবস্থাপনার কারণে নানা ধরণের বৈষম্যের শিকার হচ্ছে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডার। এর বাইরে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা, জনশক্তির অপ্রতুলতা, চিকিৎসা সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতাসহ নানা সমস্যাতো রয়েছেই। সরকারি চিকিৎসকদের প্রতি এই বৈষম্যের জন্য আমলাতন্ত্রকে দায়ী করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক শেখ আদনান ফাহাদ বলেন, "বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের কোন কোন অংশ আজ এতটাই আধিপত্যবাদী হয়ে উঠেছে যে, স্বাস্থ্যের মত মহা জনগুরুত্বপূর্ণ খাতেও নানা খুঁত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সবচেয়ে মেধাবী পেশাগত শ্রেণী হওয়া সত্ত্বেও এদেশের সরকারী ডাক্তারগণ এই রাষ্ট্রের সবচেয়ে কম সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন চাকরি করে থাকেন।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি