ঢাকা বুধবার, ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ২ ঘন্টা আগে
ডা. সাঈদা ইসলাম

ডা. সাঈদা ইসলাম

চিকিৎসক ও লেখক    


১৩ নভেম্বর, ২০১৮ ১২:১৯

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের বিপর্যয় রুখতে করণীয়

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের বিপর্যয় রুখতে করণীয়

অ্যান্টিবায়োটিক জীবন রক্ষাকারী ঔষধ। ঔষধের মধ্যে প্রথম সারিতে যার অবস্হান। চিকিৎসা শাস্ত্রের আশীর্বাদ। কোন কোন রোগের জন্য তো বাধ্যতামূলকই। আজ আমাদের একটু অসর্তকতা আর অবহেলায় এই আশীর্বাদের সুফল আমরা হারাতে বসেছি। স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং যদি বেঁচে থাকতেন তবে তিনিই বোধ হয় সবচেয়ে বেশি দুঃখিত হতেন, তার আরাধনার বরং আজ বিপর্যস্ত।

অ্যান্টিবায়োটিকের রোগ প্রতিহত করার ক্ষমতা আজ হুমকির মুখে। অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স আজ বিশ্বজুড়ে আতংকের নাম। অনেকেই শব্দটা সম্পর্কে ভীত,যদিও বেশি কিছু জানে না।এক লেখায় আমি আপনাকে এই সম্পর্কে সব জানাতে পারবো না। শুধু একটু করে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স প্রতিহত করতে আমার আপনার করণীয় সম্পর্কে ধারণা দেয়ার চেষ্টা করবো এই লেখায়।

যে কারো, যে কোন বয়সের রোগীর অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স হতে পারে  ।একটু সতর্কতা এই হার বেশ কমিয়ে আনতে পারে। আসুন এবার জেনে নিই আমাদের করণীয়-

১.যদি মানুষের রোগ না হয় তাহলে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারেরও প্রয়োজন পরবে না। অ্যান্টিবায়োটিক যত কম ব্যবহার হবে এর রেজিস্ট্যান্স ডেভোলাপের চান্সও তত কম হবে। তাই পার্সোনাল হাইজিন মেইনটেইন করা ( যেমন খাবার আগে হাত ধোয়া,বাথরুম ব্যবহারের পর হাত ধোয়া) জরুরি। বিশুদ্ধ পানি,খাবার প্রসেসিং, সেইফার সেক্স, ভেকসিনেশনের ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।

২.মুড়ি মুড়কির মতো অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার ও এর সহজলভ্যতা রেজিস্ট্যান্স নামক অভিশাপের অন্যতম একটি কারণ।ফার্মাসিস্ট,কোনার মুড়ের ঔষধের দোকানের অশিক্ষিত কর্মচারী,ডিএমএফ নামধারী ডাক্তার সাহেবেরা মনের সুখে ব্যবহার করে অ্যান্টিবায়োটিকের সম্মান অলরেডী অনেকখানি খসিয়ে দিয়েছেন।রেজিস্টার্ড ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রয় নিষিদ্ধ করা উচিত।

৩.অনেক রোগী আছে যারা এসে ডাক্তারকে একরকম অনুরোধও করে করে ডাক্তার সাহেব দরকার হয় একটা ভাল দেখে অ্যান্টিবায়োটিক দেন যাতে তাড়াতাড়ি সুস্হ হয়ে উঠি। না দিলে এসব রোগী আবার দুইদিনের মাথায় কোন হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে যেয়ে একটা অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে একটু সুস্হবোধ করলে তো বলেই বসে-"আগে গেছিলাম শালার ৫০০ টাকার ভিজিটের ডাক্তারের কাছে দিল ৫০ টাকার ঔষধ কোন কাজ হয় নাই।"

অথচ দেখা গেল ভাইরাল ফিভার ছিল, আসলে এমনিতেই সেরে উঠার সময় হয়ে এসেছিল। আজকে বিনা দরকারে অ্যান্টিবায়োটিক খেয়ে হয়তো সাময়িক আরাম পেলেন কিন্তু নিজের ভবিষ্যত আর ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নামক অতিথিকে আমন্ত্রণ জানিয়ে রাখলেন।

৪.রেজিস্টার্ড ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রয় বন্ধ করলে রেজিস্ট্যান্স কমবে ঠিক আছে, কিন্তু এর মধ্যে একটা কিন্তু আছে। অ্যান্টিবায়োটিক মোটামুটি দামি ঔষধ।তাই বেশিরভাগ রোগী ফুলকোর্স ঔষধ একসাথে কিনতে পারে না। দুইদিন খেয়ে আরাম পাওয়ার পর বাকী ডোজগুলোর কথা ভুলেই যায়। ইনকমপ্লিট অ্যান্টিবায়োটিক কোর্সের ফলশ্রুতি অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স।

আমাদের দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে যেই ভুংভাং ঔষধগুলো দেয় তার বেশির ভাগ কিনে খাওয়ার সামর্থ্য জনসাধারণের আছে। উপকার যেহেতু করতেই চাইছেন তখন সত্যিকার অর্থেই উপকারটা করেন। এসব ভুংভাং ঔষধ বাদ দিয়ে যেসব রোগীর অ্যান্টিবায়োটিক দরকার তাকে ফুল কোর্স অ্যান্টিবায়োটিক দেয়ার ব্যবস্হা করেন। অর্থের ঘাটতি থাকলে দরকার হয় সেবামূলক কোন এনজিওর সাথে লিয়াজো করেন। আমাদের দেশের এনজিওরা তো টি.বি, এইডস এসব রোগীদের ভালোই সাহায্য করছে।

৫.এখন প্রায়ই শোনা যায় ঔষধ আর ঔষধ নাই আটার গোলা হয়ে গেছে। অথচ এই আমরাই বিদেশের বাজারে ঔষধ রপ্তানি করি গর্বের সাথে। ঔষধের ইফিকেসি মানে কার্যক্ষমতা কম হলে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স ডেভেলপ করে। তাই দেশের বাজারে বিদেশি মানের ঔষধ নিশ্চিত করতে সরকারি নজরদারি বাড়াতে হবে।

৬.অনেকে আবার দেখা যায়, ফুল কোর্স ঔষধ কেনেন ঠিকই, দুটা খেয়ে সুস্হ হয়ে যাওয়া পর পরে আবার অসুস্হ হলে সেবনের জন্য বাকিগুলো বিছানার পাশের ড্রয়ারে রাখেন। অনেক সময় আবার দেখা যায়, ডাক্তার দিয়েছেন ১৪ দিনের অ্যান্টিবায়োটিক,অনেকে মনে করে অ্যান্টিবায়োটিকের কোর্সতো ৭দিনের আন্দাজি এতদিন খাওয়ার কি দরকার। আপনার এই হেলা কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সকেই স্বাগতম জানাচ্ছে। আপনি যদি ভালো ডাক্তারের পরামর্শ নেন তবে উনি তো বুঝেই দিয়েছেন ৭ না ১৪তে আপনি নিরাপদ। তাই ডাক্তারের পরামর্শে নিয়মমত অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করুন।

৭.সব ডাক্তাদের জন্য- চেম্বার আর ব্যবহারকৃত ইন্সট্রুমেন্টের হাইজিনের ব্যাপারে সব সময় সতর্ক থাকবেন। আর জুনিয়র ডাক্তারদের শুধু একটু মনে করিয়ে দিতে চাই প্রয়োজনীয়তা অনুসারে সঠিক গ্রুপের,সঠিক ডোজে অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করুন। যদিও লোকে আমাদের কসাই বলে কিন্তু আমরা জানি আমরা আমাদের সবটা দিয়েই রোগীকে সার্ভিস দিতে চাই।

যাদের মনে করছেন তিন চারটা দিন পর অ্যান্টিবায়োটিক দিলে খুব ক্ষতি কিছু হবে না একটু অপেক্ষা করুন না কালচারের রিপোর্টটা আসা পর্যন্ত। রোগীর মঙ্গলের জন্য এই একটা একট্রা টেস্ট দিয়ে কমিশন খাওয়ার অপবাদটা আরেকটা বাড়ের জন্য মাথায় নিলেনইবা!

তারপরও তো পৃথিবীকে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নামক এক বিপর্যয় থেকে একটু আগলে রাখলেন।

ও আরেকটা কথা- অনেক রোগী আছে যারা হয়তো সম্প্রতি অন্য কোন ডাক্তার কিংবা ফার্মাসিস্টের কাছ থেকে অ্যান্টিবায়োটিক খেয়েই এসেছে-বলবে ডাক্তার সাব দুইদিন আগে অমুক ডাক্তারে পরামর্শে ঔষধ খাইছি কিন্তু নাম জানি না।

একটু কষ্ট করে দেখুন যে ঔষধ খেয়েছে তার কোন ডকুমেন্ট পাওয়া যায় কিনা এই যেমন ধরেন আগের প্রেসক্রিপশন,এক টুকরো কাগজে লেখা ঔষধের নাম কিংবা ঔষধের খালি পাতা।বারবার অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারও অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের একটা কারণ।

৮.একটা বিষয় আমরা অনেকে হয়তো জানি না যে এগ্রিকালচার সেক্টরে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছা ব্যবহার ও কিন্তু এই বিপর্যয়ের একটা কারণ। আর এই বিষয়ে নজরদারিও নেই।তাই শুধুমাত্র ভেটেনারি সুপারভিশনেই অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা উচিত।

৯.রোগীর সংখ্যা বিবেচনায় বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একজন ডাক্তারের পক্ষে সম্ভব না প্রেসক্রিপশনের সব ঔষধ সম্পর্কে রোগীকে ডিটেইলড জানানো।

কুদ্দুস বয়াতীর "এইদিন দিন নয় আরো দিন আছে" যেমন প্রাথমিক শিক্ষাকে অনেকটা এগিয়ে নিয়েছিল। আর ‘যক্ষা হলে রক্ষা নাই এই কথার ভিত্তি নাই’-যেমন অ্যান্টিটিউবারকুলার প্রোগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছে। ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্টিং মিডিয়ার সচেতনামূলক প্রচারণাই কিন্তু পারে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের বিরুদ্ধে জনসাধারণের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সচেতনতা তৈরি করতে।

ভালবাসার মাসে ফেইসবুকে রগরগে ভালবাসার পোস্টের পর পোস্ট, মেনশনের পর মেনশন দেখতে পাচ্ছি। এই সময়ে আমার এই লেখা বড় বেশি বেমানান খাটখোট্টা তবুও ডাক্তার হিসেবে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে লেখাটা লেখা। একজনও পড়ে যদি একটু সচেতন হয় তবেই এ লেখার সার্থকতা।

সর্বোপরি, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে রোগীর বেশি দিন হাসপাতালে অবস্হান করা লাগে। চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এমনকি রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। আসুন,নিজেরা একটু সচেতন হয়ে  অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স নামক বিপর্যয় রুখে দেই।.

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত