ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াস

ডা. মোহাম্মদ ইলিয়াস

রেসিডেন্ট (নিউরোলজি), বিএসএমএমইউ


১১ নভেম্বর, ২০১৮ ০৭:২৩ পিএম

যৌথ পরিবার টু একক পরিবার, নিউরোমেডিসিন কী বলে?

যৌথ পরিবার টু একক পরিবার, নিউরোমেডিসিন কী বলে?

ময়নসিংহের একটি যৌথ পরিবারকে নিয়ে ফিচার করা হয়েছিলো ইত্যাদি’ তে। বৃদ্ধ আব্দুর রহমান, তার পাঁচ বিবাহিত সন্তান ও তাদের ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি মিলে চল্লিশজন সদস্যের বিশাল একটি পরিবার। সবাই থাকেন একই সাথে। তাদের প্রধান আয়ের উৎস মৎস্য ব্যবসা। বয়স্ক পুরুষ সদস্যরা সকলে সেই হ্যাচারির কাজ করেন, আর নারীরা সামলান ঘরকান্নার দায়িত্ব। নিত্যদিন তিন বেলা একই হাড়িতে রান্না চড়ে তাদের, একই সাথে বসে খাওয়া দাওয়া সারেন সকলে। সবমিলিয়ে তারা বেশ সুখেই আছেন মিলেমিশে, ভালোবেসে।

এমন একটি একান্নবর্তী পরিবারকে একসাথে দেখার বিষয়টি একদিকে যেমন আনন্দের, অন্যদিকে তা কষ্টেরও। এই তো অর্ধশতক আগেও ৯৯% পরিবারই ছিল যৌথ পরিবার, আর এখন কিনা ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে খুঁজে ফিরতে হয় তাদের। একান্নবর্তী পরিবার নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে আমাদের ঐতিহ্যের সাথে। পরিবারের সকল সদস্য একসাথে থাকছেন, পরিবারের যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে পরামর্শ করতে বসছেন সকলে মিলে, চাচাতো ভাই বোনেরা সবাই একসঙ্গে বেড়ে উঠছে, রাত্রে দাদির আঁচল ধরে রূপকথার গল্প শুনতে বসছে একসাথে- এমনই ছিল পরিবারগুলোর আবহ। যেন এক নিবিড় বন্ধন, আত্মার আত্মীয়তায় জড়িয়ে থাকতেন সবাই।

সময়ের আবর্তনে এসব কোনো এক উপন্যাসের দৃশ্য মনে হচ্ছে। আমাদের আজকের প্রজন্মের অনেকেরই সৌভাগ্য হয়নি এমনভাবে বেড়ে ওঠার। অধিকাংশই একক পরিবারেই বেড়ে উঠা।

কিন্তু বিবাহ বিচ্ছেদের ভয়াবহ হার দেখে এখন তো এই একক পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়েও শঙ্কিত হতে হচ্ছে। পরিবার ব্যবস্থা আদৌ টিকে থাকবে তো একশ বছর পর?

এনি ওয়ে সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানটি (যৌথ পরিবার) কী কারণে পরিবর্তন হয়ে গেল, কোন আর্থ সামাজিক আর মনস্তাতিক কারণগুলো এর পেছনে কাজ করেছে সেটা অন্য একটি লেখায় জানাব।

আপাতত এই লেখার আলোচ্য বিষয় – একক পরিবার হওয়ার মনস্তাত্বিক ফলাফল কী হয়েছে সেটা।

নন নিউরোলোজিক্যাল ভাষায় তিনটি নিউরোলোজিক্যাল ফলাফল ব্যাখ্যা করব।

 

১. নেতৃত্বের গুণাবলী সম্পন্ন শিশু তৈরি না হওয়া

আমাদের পিতামাতারা বড় হয়েছেন পিঠাপিঠি তিন-চার ভাইবোন নিয়ে, শেয়ারিং এন্ড কেয়ারিং করে, একটা বিস্কুটের প্যাকেট বা চিপস ৩-৪ ভাগ করে খেয়ে। সেক্রিফাইজিং মেন্টালিটি, শেয়ারিং এন্ড কেয়ারিং মেন্টালিটি পরোক্ষভাবে তৈরি হয়েছে সেই শৈশব থেকেই যখন শেয়ারিং কেয়ারিং এর মিনিং ই বোঝে না শিশুরা। যৌথ পরিবারে বিভিন্ন চাচার একসাথে প্রায় কাছাকাছি ৬-৭ ভাই বোন। সবচেয়ে বড়টার বয়স সাত বছর। আর এই সাত বছরের বাচ্চা কিনা আরও ৬-৭টা জুনিয়র বাচ্চার অভিভাবক। একসাথে সবাই স্কুলে যায়, একসাথে খেলতে যায় বড়টার নেতৃত্বে। আবার জুনিয়র ২-৩টার মধ্যে ঝগড়া লাগলে সমাধান করতে হত সিনিয়র এক দুইজনকেই। কারণ কোনভাবে এই ঝগড়া দাদা-দাদীর কানে যাওয়া যাবে না। সিনিয়র বাচ্চাগুলোর মধ্যে লিডারশীপ কোয়ালিটি আর শেয়ারিং কেয়ারিং মেন্টালিটি তৈরি না হওয়ার উপায় আছে?

আমার আপনার একমাত্র সন্তান, কিংবা দীর্ঘ গ্যাপে নেওয়া দ্বিতীয় সন্তান এবং কোন ভাই বোন না থাকা প্রথম সন্তান সেই সেক্রিফাইজিং মেন্টালিটির শিক্ষা পাচ্ছে কি? বরং মারাত্মক ধ্বংসাত্মক “One Baby Syndrome” এর রোগী (অসহিষ্ণুতা, একগুঁয়ে, জেদী, মেজাজের ভারসাম্যহীন, অল্প চাপে ভেঙ্গে পড়া প্রভৃতি এই রোগের লক্ষণ) হয়ে বড় হচ্ছে আপনার আমার আদরের একমাত্র সন্তান/ দীর্ঘ গ্যাপে নেওয়া সন্তান। যা চায় তাই দেওয়ার কারণে বাচ্চাদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে না সেক্রিফাইজিং এটিচুড। কারো সাথে শেয়ারিং না হওয়ার কারণে সেক্রিফাইস কাকে বলে সেটাই অজ্ঞাত থেকে যাচ্ছে তার কাছে। বরং যা চাচ্ছে তাই পেয়ে যাবার কারণে তার মধ্যে তৈরি হচ্ছে অসহিষ্ণুতা, একগুঁয়ে, জেদী, মেজাজের ভারসাম্যহীন, অল্প চাপে ভেঙ্গে পড়ার মত দুর্বল গুণাবলী।

সিমপ্লি এটা দেখেন এই প্রজন্মে বা আগামী প্রজন্মের যারা নেতা, কিংবা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রবীণ বা নবীণ নেতাদের মধ্যে গ্রামে/যৌথ পরিবারে বড় হওয়া কয়জন আর একক পরিবারে বড় হওয়া কয়জন?

মাম্মি ড্যাড্ডি প্রজন্মের কাউকে দেখছেন খুব ভাল লিডার হতে?

 

২. স্নায়বিক বিকাশ বাধা হওয়া

নবীণ পিতামাতারা আমাদের কাছে প্রচুর বাচ্চা নিয়ে আসে – বাচ্চার স্পীচ ডেভেলপম্যান্ট আপ টু মার্ক না হওয়ার কারণে।

বাচ্চার বয়স আড়াই বছর তিন বছর হয়ে গেছে, এখনো দুয়েকটা শব্দ ছাড়া তেমন কোন ভোকাবোলারী ডেভেলপ হয় নাই। ঠিক মত সোশ্যাল ইন্টারেকশান হয় নাই। বাচ্চা প্রচণ্ড এরোগেন্ট। অতিরিক্ত চঞ্চল।

আচ্ছা এই বাচ্চা সারাদিন থাকে কার কাছে?

বাবা মা দুইজনই তো চাকরিজীবী।

বাচ্চা পালিত হয় বুয়াদের কাছে।

কিংবা বৃদ্ধ দাদু নানুদের কাছে।

বাচ্চার সাথে কথা বলার মত, সঙ্গ দেওয়ার মত সমবয়সী কেউ বা কাছাকাছি বয়সের কিংবা ইয়াং বয়সের কোন মানুষ নেই বাসায়। বাচ্চারা শুনে শুনেই শব্দ শেখে। কথা না শুনলে, বাচ্চার সাথে ইন্টারেকশান না হলে বাচ্চা কথা বলা শিখবে কীভাবে?

যৌথ পরিবারে যেই সুবিধাটা ছিল, একক পরিবারে সেটা থাকল না।

ফলে বিশাল সংখ্যক বাচ্চা বড় হচ্ছে অটিস্টিক হিসেবে, স্পীচ ডেভেলপম্যান্টে এবনরমাল হিসেবে। গ্রামের একটা বাচ্চার ২ বছরে যেই ভোকাবোলারী ডেভেলপ হচ্ছে সিটিতে বড় হওয়া একটা বাচ্চার চার বছরেও সেটা হচ্ছে না।

 

৩. পরকীয়ার মহামারী

বিয়ে হয়েছে নতুন।

স্বপ্ন ছিল স্বামী ই হবে বয়ফ্রেন্ড।

কিন্তু ডিজিটাল যুগে এত সময় কোথায়?

সবাই তো ব্যস্ত।

ফিফথ ইয়ারেই ব্যাচমেটকে বিয়ে করেছেন এক চিকিৎসক।

চার বছর সংসার করার পর আর ব্যাচমেটকে ভাল লাগে না।

আরেক ব্যাচমেটের সাথে পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে তাঁকেও বিয়ে করে ফেলেন এই চিকিৎসক।

প্রথম স্ত্রীর কোন খোঁজ খবরই নেন না।

স্ত্রী আর এক সন্তান রেখে বিদেশে পাড়ি জমান এক যুবক।

মোবাইলে স্ত্রীর সাথে পরিচয় হয় সমবয়সী এক যুবকের।

পরিচয় থেকে পরিণয়, সেখান থেকে বিয়ে।

এক বছর যেতে না যেতেই রক্তাক্ত পরিণতি।

দাম্পত্য কলহে দ্বিতীয় স্বামী দ্বারা খুন হয় মেয়েটি।

এরকম অসংখ্য ঘটনা আমাদের সম্মুখেই ঘটতেছে।

একাকীত্ব একটি ভয়ংকর জিনিস।

ভয়াবহ একাকীত্বে মানুষ বন্ধুত্ব করে স্মার্টফোনের সাথে।

সেই স্মার্টফোন তাকে দিয়ে করিয়ে নেয় একের পর এক আন স্মার্ট কর্মকান্ড।

পরিবারে অনেক বেশি সদস্য থাকলে এই একাকিত্ব তৈরি হত না।

পাশাপাশি স্বামী – স্ত্রীর একক বন্ধনের চেয়ে পরিবারের সদস্যদের সাথে বহুমাত্রিক বন্ধন সম্পর্ককে স্থিতিশীল করত। পরিবারের সদস্যদের সাথে আলাপ আলোচনা কমিয়ে দিত ভয়াবহ নিসঃজ্ঞতাকে। কমে যেত পরকীয়া আর দাম্পত্য কলহ। কেউ ভুল বুঝবেন না। একক পরিবার - দাম্পত্য কলহ আর পরকীয়ার একমাত্র কারণ নয়, বরং অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কারণ।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না