ঢাকা      বুধবার ১২, ডিসেম্বর ২০১৮ - ২৮, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. শামীম আফজাল

ইন্টার্ন চিকিৎসক, সৈয়দ নজরুল মেডিকেল কলেজ, কিশোরগঞ্জ


‘ডেলিভারি কেন হসপিটালে হবে?’

হাসপাতালের গাইনী ওয়ার্ডে শোরগোল পড়েছে, কয়েকজন মানুষ মিলে হৈচৈ করছে। পুরুষের চাইতে মহিলার সংখ্যা বেশি, দুজন মহিলা একসাথ হলে কথা থামে না কিন্তু এখানে পাঁচজনের বেশি মহিলা আছে। মুখ বন্ধ থাকার কোন যুক্তি নেই। চুল সাদা পাকা এক মহিলা পান চিবোচ্ছে আর একটু পরপর হসপিটালের দেওয়ালে পানের পিক ফেলছে।

এত মানুষের ঝটলা দেখে উঁকি দিলাম। উঁকি দিতেই একজন মহিলা মাটিতে বসে কান্না শুরু করলো, সুরে সুরে কান্না ওরে আমার জাদুরে ডাকাতগুলো মেরে ফেলেছে। একটু পরপর সুরে টান দিচ্ছে। কয়েকজন মহিলা ঝাপটে ধরে আছে। বাচ্চা পেটে নিয়ে এক মহিলা মারা গেছে, কেউ মারা গেলে কান্না করারই কথা। আসলে মহিলাটি মারা যায়নি, ওকে মেরে ফেলা হয়েছে। শ্বশুর বাড়ির ও নাদান শ্বাশুড়ি বউকে হসপিটালে আসতে দেয়নি। বেশির ভাগ শ্বাশুড়ি এমন হয়। নিজের মেয়ে আর ছেলের বৌকে আলাদা চোখে দেখে।

দুই.
একবার হাসপাতালে এক রোগী ভর্তি হয়েছিলো। তার হিস্ট্রি নিতে গিয়ে জানতে পারলাম, বাচ্চা জন্মের পরদিন থেকে তাকে কাজে লেগে যেতে হলো, কি ভয়ংকর ব্যাপার! শ্বাশুড়িকে অনেকবার বলেছিলো, মা শরীরটা খারাপ লাগছে। শ্বাশুড়ি বলেছিলো বাচ্চা হলে একটু তো খারাপ লাগবেই। তোমরা আজকালকের মেয়েরা যে কী! আমাদের বয়সে আমরা এসব কত করেছি, ঢং দেখলে বাঁচি না। 

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম আপনি কাজ করলেন কেন? 
- মহিলাটি উত্তর দিয়েছিলো- বাবা, আমরা গ্রামে থাকি, নতুন ধান এসেছে, বসে থাকলে কী আর পেট চলে? 
- কথাটা বলেই একটা হাসি দিলো, সুখের নাকি কষ্টের হাসি আমি বিষয়টা খুঁজতে যাইনি। 

তিন.
গ্রামে এখনো কুসংস্কার আছে। বাচ্চা ডেলিভারির মরার আগ মুহূর্তে হসপিটালে আসে। তার আগে শ্বাশুড়িরা আসতে দেয় না। কবিরাজী ফুল পানিতে ভিজানো হয়, ঐ ফুল যত বড় হবে জরায়ুর মুখ নাকি তত খুলবে, ফুল কোথায় আর জরায়ু কোথায়? বিষয়টা মানুষের মাথায় ঢুকে না, এটা হলো অন্ধ বিশ্বাস। এই অন্ধ বিশ্বাসে পড়ে অনেক জীবন খোয়াতে হয়। ‘ডেলিভারি কেন হসপিটালে হবে, ছি ছি লজ্জার কথা! ডেলিভারির সময় কেন লাইট জ্বলবে? ডেলিভারি হবে অন্ধকার রুমে, গোয়াল ঘরে।’ 

জন্মের পর বাচ্চার নাভি কেটে গোবর লাগানো হবে। পরে যখন নিওনেটাল টিটেনাস হবে তখন বলবে অভিশপ্ত বাচ্চা! বাতাস লেগেছে। কবিরাজ বাচ্চাকে আধাঘন্টা উল্টো করে ঝুলিয়ে ১০০০ টাকা হাতিয়ে নিবে। পরে যখন বাচ্চার অবস্থা খারাপ হবে, বলবে জান জান সদরে নিয়ে যান। বাচ্চা হসপিটাল এসে আরো বেশি অসুস্থ হবে, সব দোষ ডাক্তারের! ধর রে মার রে বলে ডাক্তারের কলার চেপে ধরে নিজের হিরোগিরীর প্রমাণ দিবে।

চার.
হাসপাতালে একবার ৭/৮ বছরের এক বাচ্চা এসেছিলো। এক লোভনীয় বিজ্ঞাপন দেখে তার বাবা নিয়ে গিয়েছিলো। এক হুজুর সুন্নাতে খৎনা করায়, খুব কম টাকায়। হুজুর সাহেব বাচ্চাটার জীবনটা শেষ করে দিলো! টুনটুনির মাথার উপরের চামড়া কাটতে গিয়ে উনি টুনটুনির মাথা কেটে দিলেন। ইস কী কষ্ট! রক্ত বন্ধ করতে না পেরে উনি মাটি, গাছের রস কী ব্যবহার করেননি? তাও হসপিটালে আসতে দেয়নি। 

পরে যখন টুনটুনির মাথায় ইনফেকশান দেখা দিলো, তখন সবার মনে হলো- হায় হায় পোলাতো দেশ স্বাধীন করতে পারবে না! শেষ মুহূর্তে ডাক্তাররের কাছে এসে সব দোষ ডাক্তারের ঘাড়ে চেপে দেয়। ঐ ছেলের হয়তো আর কখনো দেশ স্বাধীন করার সুযোগ হবে না, বিয়ের পর হয়তো বৌয়ের কাছে রাজাকার নয়তো দেশদ্রোহী হয়ে সারাজীবন বেঁচে থাকতে হবে।

পাঁচ.
মহিলাটা মারা গেলো বাচ্চা পেটে নিয়ে, একটু পর ডেলিভারি রুম থেকে বাচ্চা কান্নার আওয়াজ শুনলাম, বাইরে কয়েকজন খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলো। ৩টা মেয়ের পর এই প্রথম ছেলে, সংসারের প্রদীপ জ্বলেছে। এক পাশে কান্না, আরেক পাশে হাসি, দুটো ঘটনাই পাশাপাশি। আমরা তাকিয়ে দেখি, একবার হেসে উঠি আবার কেঁদে দেই। এমন অভিনয়ে খেলতে খেলতে আমরা একদিন অনুভূতিহীন হই। তখন সবাই বলে উঠে ডাক্তারদের সত্যিই কোন মায়া দয়া নেই। অথচ প্রতিটা গল্পের ব্যাকগ্রাউন্ডে পড়ে থাকা আমাদের দীর্ঘ নিঃশ্বাস কারো কানে পৌঁছায় না। 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

প্রেসক্রিপশনের ব্যাপারে যত্নশীল হোন!

প্রেসক্রিপশনের ব্যাপারে যত্নশীল হোন!

রোগীর মুল সমস্যা, উপরের পেটে ব্যথা, বুকে জ্বালাপোড়া, পিঠে ব্যথা, দুর্বলতা। একটা…

মেয়েটি বেঁচে থাকলে হয়ত আগামীর মার্গারেট থ্যাচার হতো!

মেয়েটি বেঁচে থাকলে হয়ত আগামীর মার্গারেট থ্যাচার হতো!

আমার এসএসসি পাশের যোগ্যতা ছিল না। স্যারদের কথামত-‘‘ও কোন দিন পাশ করতে…

আবেগীয় স্মৃতির গুদামঘর

আবেগীয় স্মৃতির গুদামঘর

ইন স্টিমের উপরে কাঠবাদামের আকারের অঞ্চলটির নাম "এমাগডেলা"। লিম্বিক সিষ্টেমের দুটি অংশ…

অধ্যাপক মনসুর খলিল স্যারকে শেষ দেখা!

অধ্যাপক মনসুর খলিল স্যারকে শেষ দেখা!

আজ থেকে তিন বছর আগে ২০১৫ সনের ডিসেম্বরের ৭ তারিখে আমি বদলী…

সুইসাইড ও পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার

সুইসাইড ও পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার

"স্যার আদাব, অপিসি পয়সনিং, পুলিশ কেইস..." মোবাইলে ইমার্জেন্সী চিকিৎসকের ফোন পেয়ে আউট…

আত্মহনন কোন সমাধান নয়

আত্মহনন কোন সমাধান নয়

এফসিপিএস সেকেন্ড পার্টের জন্য তিন বছর ট্রেনিং লাগে। তিন বছর শুনতে যত…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর