ডা. সাঈদা ইসলাম

ডা. সাঈদা ইসলাম

চিকিৎসক ও লেখক    


১১ নভেম্বর, ২০১৮ ০২:৩২ পিএম

ডাক্তার-রোগীর ভালবাসার গল্প

ডাক্তার-রোগীর ভালবাসার গল্প

সবাই ভাবে ডাক্তার আর রোগী একে অপরের প্রতিপক্ষ। আজ আমি ডাক্তার-রোগীর কিছু ভালবাসাবাসির গল্প করবো।

এক.
ইন্টার্নী করি, পেডিয়াট্রিক্স ওয়ার্ড। Nephrotic syndrome- এর ৫ বছরের চটুরপটুর রোগী। অনেকদিন ছিল হাসপাতালে, প্রায় পনেরো দিনের মতো। পেডিয়াট্রিক্স ওয়ার্ডে বাচ্চাদের জন্য গিফট নিয়ে যাওয়া অনেকটা রুলসের মতো। নিয়েও যাই তার জন্য চকলেট, মিমি এই সেই। পনেরো দিনে ভালবাসা হয়ে গেল রোগীর সাথে। 

স্যার রাউন্ডে এসে সি.এ ভাইয়াকে বললেন, ‘আগামীকাল ছুটি দিয়ে দিও এই রোগীকে।’ ভালবাসা ভেঙ্গে গেলে মনে হয় এমন খারাপই লাগে। কেউ জানে না ঐ ছুটির আগেরদিন অর্ধেক রাত কেঁদেছি ঐ বাচ্চাটার জন্য। মায়া বাড়লে বড় যন্ত্রণা! রোগী, ডাক্তার, আত্মীয়স্বজন, পরিবার পরিজন কিচ্ছু বাছবিচার নাই ছেড়ে যাওয়া হয়তো চোখের জলেই সম্পর্কটার গভীরতার জানান দেয়।

দুই.
গাইনীতে সকালে ডিউটিতে এসেছি। যথারীতি এসেই শুনি লেবার রুমে রোগী। রোগী রাত থেকে লেবারে, বাচ্চার মাথা দেখা যাচ্ছে। রোগী চেপে চেপে বাচ্চার মাথায় কেপুট বানিয়ে ফেলেছে। রোগীর ব্যথাও আছে, রোগী অধৈর্য্য হয়ে গেছে সে আর এক মুহুর্তও ওয়েট করতে রাজী না, এখনই যাতে সিজার করা হয়। আমি পেটে হাত রেখে বুঝলাম ভাল কন্ট্রাকশন আছে। মোটিভেট করলাম একটু, একটু সাহস দিলাম। রোগী বকাবকি করছে, তাও হাল ছাড়লাম না। ওটি রেডি করতে যে টাইম লাগে তখনই দশ মিনিটের মধ্যে ডেলিভারি হয়ে গেলো। ঝড়ে বক মরে ফকিরের কেরামতি বাড়ে। আমি না গেলেও হয়তো ঐ টাইমে এমনিতেই ডেলিভারি হয়ে যেত। 

রোগী ডেলিভারির পর- ‘আল্লাহ ফেরেশতা বানাইয়া আফনারে আমার কাছে ফাঠাইছে (পাঠাইছে)। আমার কথায় মনে কোন কষ্ট নিবা না। আফনার লম্বরটা (নাম্বারটা) আমি যাওয়ার সময় আমারে দিয়া দিবা। আফনারে আমি কল দিমু সব সময় আর আমার ফুওয়ার (ছেলের) বিয়াত আফনারে দাওয়াত দিতাম।’ এই রোগীর অনেক আফসোস করছিল তার একটা মেয়ে কেন হলো না তাইলে আমার নামে নাম রাখত। রোগী আর আমার দুই একবার ফোনে কথা হয়েছে। যোগাযোগ নেই বহু বছর বাট ভালবাসাটা মনে রয়ে গেছে।

তিন.
একটা ক্লিনিকে সপ্তাহে একদিন একটা ডিউটি করতাম। ঐ ক্লিনিকে রিকারেন্ট এনিমিয়া নিয়ে রক্ত দেয়ার জন্য একজন বয়স্ক পেশেন্ট ভর্তি হতেন প্রায় প্রায়, ডায়াগনোসিসটা ঠিক মনে নেই এই মুহূর্তে। চাচা ক্লিনিকে ভর্তি হয়েই আমার খোঁজ করতেন। মাঝে মাঝে দেখা হতো, মাঝে মাঝে হতো না। যে বার দেখা হতো না সে বার ক্লিনিকে যাওয়ার পরই নার্সরা বলতো আপনারে তো চাচা এসেই খোঁজ করছে, ‘আমার ফুরি (মেয়ে) কই?’ ডাক্তারের অদৃশ্য ভালবাসায় হয়তো বাঁধা পড়েছে রোগী। তাই চান রোগের উছিলায় অন্তত দেখা হোক।

চার.
ঐ ক্লিনিকেই বিদেশ ফেরত ১৭/১৮ বছরের এক যুবক ভর্তি হয়েছে কিডনি ডিজিজ সাথে এনিমিয়া নিয়ে। রক্ত দেয়া লাগবে। এক ব্যাগ দেয়া হয়েছে, আরেক ব্যাগ লাগবে। অনেক খোঁজাখুঁজি করে তারা এক ব্যাগ ফ্রেশ ব্লাডের ব্যবস্হা করতে পারল না। আমার সাথে ব্লাড গ্রুপ মিলে কিন্তু দিতে পারব না আমি ব্লাড ডোনেট করেছি ২ মাস। ক্লিনিকের এক স্টাফের সাথে মিলে সেও এই রোগীকে এর আগের ব্যাগ দিয়েছে। তাদের পেরেশানী দেখে মায়া হলো। ছোটবোনকে কল দিয়ে আনালাম বাসা থেকে, এক ব্যাগ ব্লাড দিতে সম্পূর্ণ অচেনা অজানা কাউকে। এই রোগী বাড়ি যাওয়ার সময় আমার সাথে আর দেখা হয়নি। 

কয়েকদিন পর কোন এক সন্ধ্যায় ক্লিনিক থেকে কল এসেছে, আমি ভেবেছি ওটির জন্য হয়তো। ওপাশ থেকে ক্লিনিকের ম্যানেজার বলছে, ‘আপনার জন্য ১০৩ এর রোগী, ব্লাড যে দিছিলেন একটা মাছ পাঠাইছে। নিজের পুকুরের মাছ। ক্লিনিকে দিয়ে গেছে আর বলছে- আমার বইনের বাসাত মাছটা পাঠাই দিয়েন।’ এই রোগীর সাথে আমার আর দেখা হয়নি, জীবনে হবে বলেও মনে হয় না। কিন্তু ডাক্তার রোগীর ভালবাসার গল্প মনে বেঁচে থাকবে অনেক বছর।

আমি লেখালেখি করি খুব বেশি দিন না এক দেড় বছর। সব গল্প যদি আগে লিখে রাখতাম হয়তো এই গল্পে ওজনদার একটা বই হয়ে যেত। সবাই খালি ডাক্তারদের কসাই আর রোগীদের জবাই হওয়ার গল্প করে। আমার মতো চুনোপুটিরই যদি এত ভালবাসার গল্প থাকে, একজন অভিজ্ঞ ডাক্তারের ঝুলিতে অনুমান করুন তবে কত ভালবাসার গল্প!

সবাই হিরো হতে চায়, কেউ ভিলেন না। তবে কেন সাধারণ মানুষ একজন ডাক্তারের চেষ্টা নিয়ে কথা তুলে? আপনার কি মনে হয় ডাক্তার হিরো না হয়ে ভিলেন হতে চায়? আস্হার জায়গায়টায় কেন এত দুর্বলতা! আমি উপরে যে ভালবাসার গল্প করলাম সেগুলো পেতে একজন ডাক্তার কী পরিমাণ মরিয়া সেটা বলে বুঝানো যাবে না। ডাক্তাররাও বেশির ভাগ সময় প্রতিহিংসার গল্প করে আর রোগীরাও তাই। কিন্তু একবার ভেবে বলুন তো, রোগ হলে আল্লাহর পর আপনার সবচেয়ে আস্হার জায়গা কোনটা? আর ডাক্তারদের তো ঐ এক কর্মই অসুস্হকে সার্ভিস দেওয়া, এত জ্ঞানবুদ্ধি পড়াশোনা তো ঐ এক লক্ষ্য অসুস্হের সেবা করা। 

অনেকে বলবেন সেবা না, টাকা। তাদের বলি, আপনার কেটে গেলে সেলাই দিলেই হলো, এটা একজন এমবিবিএস ডাক্তারও পারে। কিন্তু আপনাকে কোন সেলাই দিলে আপনার দাগ পড়বে না, কোন সেলাই আপনার সমস্যা করবে না শুধু টাকাটা মুখ্য হলে এসব পড়ে আর ডাক্তাররা সময় নষ্ট করতো না, জীবন ফালাফালা করতো না। আর টাকার প্রশ্নে আরেকটা কথা বলি- সোনা যত নিখাদ তার দাম তত বেশি। অন্যভাবে বললে, গরু দামে সস্তা, ঘাস কম খাবে দুধ বেশি দিবে এমন গরু আপনে কই পাবেন বলেন?

একজন অসুস্হ রোগীর সুস্হ হওয়া দিয়ে যেখানে একজন ডাক্তারের কর্মদক্ষতা প্রকাশ পায় সেখানে গাফিলতির কি কোন সুযোগ আছে? আমার কাজে ঝামেলা হলো মানে আমার রেপুটেশন খারাপ হলো। তো কে নিজের খারাপিটা চায় বলুন তো ভাই?

ডাক্তার রোগীর ভালবাসার গল্প দেখি না ফলাও করে কোন নিউজ হয়। যা অল্পবিস্তর হয় তাও বেশির ভাগ বৈদেশিক! আমি ডাক্তার হয়ে যেমন ভালবাসার গল্প জানালাম আপনি রোগী হয়ে তেমন ভালবাসা জানান দিলে বৈরীতা অনেকখানি কমে যাবে আশা করা যায়, আর আস্হাও ফিরে আসবে। আমার মতো এতকিছু লিখেই যে জানান দিতে হবে তা কিন্তু না, মুখে বলা একটা কৃতজ্ঞতাপূর্ণ ধন্যবাদও কিন্তু অনেক সময় ভালবাসার স্বাক্ষর বহন করে।

ডাক্তার রোগীর ভালবাসায় অসুখ হয়ে উঠুক সুখের।

সিন্ডিকেট মিটিংয়ে প্রস্তাব গৃহীত

ভাতা পাবেন ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সের চিকিৎসকরা

প্রস্তুতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অক্টোবর-নভেম্বরে ২য় ধাপে করোনা সংক্রমণের শঙ্কা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না