ডা. মো. মোজাহারুল ইসলাম শাওন

ডা. মো. মোজাহারুল ইসলাম শাওন

প্রভাষক, ফরেনসিক মেডিসিন


১০ নভেম্বর, ২০১৮ ০১:০২ পিএম

আনন্দ বেকারি!

আনন্দ বেকারি!

আমাদের সময় ইন্টার্ন প্রশিক্ষণ ছিল ছয় মাস মেডিসিন বাকি ছয়মাস সার্জারি/গাইনি এন্ড অবস। সাধারণত ছেলেদের কম্বিনেশনে মেডিসিন সার্জারি আর মেয়েদের কম্বিনেশনে মেডিসিন গাইনি বেশি হত। আমিও নিলাম সার্জারি এবং তা প্রথম ৬ মাস। বিভাগীয় প্রধান প্রখ্যাত অধ্যাপক ডা. এম এ মাজিদ এফআরসিএস স্যারের অধীনে আমার প্রশিক্ষণ শুরু হলো। স্যার এত একাডেমিক ছিলেন যে অনেকেই তার অধীনে কাজ করতে ভয় পেত।

কিন্তু জীবনের মজা এখানেই। এক্কেবারে কাছে না মিশে দূরে দূরে থেকে আবছা জানলে সেই জানা কখনো পূর্ণতা পায় না। আমরা সেই কড়া, রাগী, কথায় কথায় দাঁত চিবিয়ে চিবিয়ে ‘ব্লাডি বাস্টার্ড’ গালি দেওয়া মজিদ স্যারের সানিদ্ধে কাজ শিখেছি, আদব কায়দা শিখেছি, রোগী ম্যানেজ শিখেছি, রোগীর প্রতি গুরুত্বের সীমারেখা শিখেছি, জীবনচর্চার রুচিবোধের কারুকার্জ শিখেছি। সর্বোপরি একজন চিকিৎসকের ন্যায় নীতি ও নিষ্ঠাবান কর্তব্য পরায়নতা শিখেছি।

স্যারের অধীনে কাজ করার সময় প্রতিটি রোগীর সকল তথ্য আমাদের মগজে নিয়ে ঘুরতে হত। স্যার দিনে কতবার রাউন্ড দিতেন এটি তার মর্জিতে। একবার আবশ্যিক এরপর তার ইচ্ছামত! রোগীর চিকিৎসার সমুদয় আপডেট তিনি নিজেও রাখতেন, আমাদেরও রাখতে বাধ্য করতেন। কোন রোগীর মৃত্যু হলে সেদিন অবধারিত সভা বসত কখনো স্যারের রুমে, কখনো সিএদের রুমে। স্যারের সামনে সবার থাকা সেদিন বাধ্যতামুলক ছিল।

প্রথমে যার বেড তাকে মৃত্যুর কারণ ব্যাখ্যা করতে হত। এরপর অন্যদের ভিন্নমত থাকলে তা বর্ণিত হত, এরপর সিএকে তার মত দিতে হত। সবশেষে স্যার তার মত দিতেন; আমরা মুগ্ধ হয়ে যেতাম! এরপর এমন হলে আমাদের আরো কী কী করণীয়, করা উচিত তার বিস্তারিত শিখাতেন। এভাবেই আমাদের শিক্ষা এগিয়ে চলত। এখন এমন হয় কিনা আমার জানতে ইচ্ছা করে।

প্রতি সপ্তাহে দুইদিন আমাদের অপারেশনের তারিখ পড়ত। আমরা বলতাম জিওটি ডে। সেদিন ইউনিটের সবাই ওটিতে থাকা বাধ্যতামূলক ছিল এবং সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত সকলের ব্যস্ততায় কাটত। কাজ করার ফাকেঁ বেলা ১১টার দিকে নাস্তা খাওয়া হতো। সেই নাস্তা সকলের চাঁদায় ব্যবস্থা হত। প্রথম দুমাস আমাদের বন্ধুদের দুজন দায়িত্ব পালন করল। নিয়মিত খাওয়া সিঙ্গারা আর সমুচা।

কখনো দুই সিঙ্গারা বা দুই সমুচা বস এক সিঙ্গারা এক সমুচা! বিরক্তিকর এই মনোটোনাস খাবার! যে ব্যবপস্থাপক থাকত তার এক কথা দেড় শ টাকা চাঁদায় এরচেয়ে ভাল খাবার সম্ভব না, কারণ সবাই চাঁদা দেয় না। নব্বইয়ের প্রথমদিকে দেড়শ টাকা কম না। ইউনিটে ডাক্তার প্রায় ১০ জন তবে নার্স ওয়ার্ডবয়দের আমাদের খাওয়াতে হত!

ব্যবস্থাপককে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম যে স্যার নিজেই চাঁদা দেন না। স্যারের কাছে চাঁদা চাওয়া হয়েছিল কিনা জিজ্ঞাসায় জানা গেল, তারা নিয়মিত স্যারের কাছে বিষয়টি উত্থাপন করেছে, ফলাফল শূন্য! স্যারের কারণে কিছু সিনিওর ভাইয়েরাও মাঝে মাঝে দেন আবার মাঝে মাঝে ফাঁকি দেন। তাদের কাছে টাকা উঠানো বিশাল কষ্টের কাজ! ফলে ব্যবস্থাপকদের অসহায়ত্ব নিদারুন কষ্টের অভিপ্রায় উপস্থাপিত হতো।

৩য় মাসে এসে আমার উপর দায়িত্ব পড়ল এই ব্যবস্থাপনার। স্যারকে এবং প্রায় নিয়মিত ফাঁকি দেয় এমন এক বড় ভাইকে বাদ দিয়েই আমি হিসাব করে দেখলাম কত উঠবে, কয়টি জিওটি দিবস পড়বে এবং মাথাপিছু কত করে বরাদ্দ করা সম্ভব! ব্যাস সেই হিসাব ধরে প্রথম জিওটিতে নিয়ে এলাম আনন্দের চিকেন বার্গার সকলের জন্য একটি করে। প্রতি জিওটিতে সকালের দিকের প্রথম এক-দুটি ওটি স্যার নিজে করতেন। এরপর অন্যদের পালা আসত। স্যারের ওটি শেষ হলেই নাস্তা পর্ব শুরু হত।

ব্যবস্থাপক নিজে দাঁড়িয়ে থেকে স্যার ও সিনিওরদের খাওয়াতাম। এরপর নার্স কর্মচারিদের দিয়ে ইন্টার্নি বন্ধুরা কাজের ফাঁকে ফাঁকে খেয়ে নিতাম। যারা ওটিতে ব্যস্ত থাকত তাদের খাবার রাখা থাকত। তারা কাজ শেষ করে খেতেন। টাকা ও এই খাবার বিতরণের সমন্বয়ের দায়িত্ব ব্যবস্থাপকের। কেউ বেশি খেলে কারো সমস্যা নাই কিন্তু কেউ না পেলে গালির অভাব নাই! টাকা কম পড়লে ব্যবস্থাপকের কাঁধে এই ঘাটতি। এভাবেই নাকি যুগ যুগ ধরে চলে আসছিল!

স্যার খেতে এসেই চমকে উঠলেন, চুপচাপ খেলেন! এরপর মিটিং আছে বলে ওটিতে অন্যদের কাজ বুঝিয়ে দিয়ে বেড় হয়ে গেলেন। অন্যরা এই খাবারে খুব উচ্ছাস প্রকাশ করছিলেন। আগের ব্যবস্থাপকের একজন বলতে লাগল এবার শাওন তুই বুঝবি, কত টাকা পকেট থেকে ভরতে হয়! এই হৈচৈয়ের মধ্যেই স্যারের পিওন এসে হাজির! 

এসেই বলল, এই মাসের ম্যানেজার কে? তাকে স্যার রুমে ডেকেছেন। সবাই মুখ চাওয়াচায়ি করছি, কী ব্যাপার! কী ভুল হলো? সিএ আমার কাছে জানতে চাইলেন যে, আমি কি স্যারের কাছে চাঁদা চেয়েছি কিনা! আমি না সুচক উত্তর দিয়েই স্যারের রুমের দিকে দৌঁড়ালাম। 
- স্যার আমাকে দেখেই বলে উঠলেন- শাওন, তুমি এমাসের ম্যানেজার হয়েছো? 
- আমি মাথা নেড়ে হা বুঝালাম। আসলে আমরা সবাই ভিতরে ভিতরে স্যারকে খুব ভয় করতাম। ভুল হলেই 'ব্লাডি ননসেন্স' গালি থাকত অবধারিত! 
- স্যার বললেন, আমি এই খাবারে খুব খুশি হয়েছি। কোথা থেকে এনেছো?
- বললাম- স্যার, আনন্দ বেকারি থেকে।
- স্যার বললেন- বলো কি, শুনেছি ওদের খাবারের দাম খুব বেশি! 
- আমি বললাম- স্যার, ওদের খাবারের মান ভালো তো, দাম একটু বেশিই। আপনার ভালো লেগেছে, স্যার?
- স্যার মাথা নীচু করে দুইবার মাথা দোলালেন যে ভালো লেগেছে। এরপর পকেট থেকে টাকা বের করতে করতে বললেন, তোমাদের চাঁদা কত? 
- আমি ভয়ে ভয়ে বললাম- স্যার, ১৫০ টাকা করে আপনাকে দিতে হবে না! 
- স্যার আমার দিকে ১৫০ টাকা বাড়িয়ে দিলেন। আমি না না করলাম!
 
স্যার এবার বলে উঠলেন, ব্লাডি ননসেন্স এত ভাল খাবার দিয়েছো পকেট থেকে টাকা দিবে নাকি? রাখো, আর যদি সর্ট পড়ে আমাকে জানিও। তবে ভাল খাবার দিও! আমি টাকা নিয়ে স্যারের রুম থেকে এক দৌঁড়ে ওটিতে এলাম। সবাইকে টাকা দেখিয়ে দেখিয়ে বললাম, স্যার নিজে থেকেই ডেকে চাঁদা দিয়েছেন, চাঁদা দিয়েছেন! সবাই ভীষণ অবাক!

আনন্দ বেকারির খাবার আমার কাজ অনেক সহজ করে দিলো। কারণ স্যার নিজের চাঁদা দেওয়ায় বাকিরা বিনা বাক্য ব্যয়ে সময়মত আমাকে ডেকে চাঁদা দিয়ে দিলো, আমার আর চাঁদা চাইতে হয়নি। আমাকে সবার অনুরোধে দুমাস একটানা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকতে হয়েছিল! এবং সব সময় ভালো খাবার দিতে আমার কোনই সমস্যা হয়নি।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না