ডা. ছাবিকুন নাহার

ডা. ছাবিকুন নাহার

মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


১০ নভেম্বর, ২০১৮ ১২:২৪ পিএম

কিডনি চুরি কতটা সত্য?

কিডনি চুরি কতটা সত্য?

মানুষের অতি প্রয়োজনীয় একটি অঙ্গের নাম কিডনি। আমরা যে খাবার খাই, তার উচ্ছিষ্ট অংশ দুইভাবে আমাদের শরীর থেকে নিঃসৃত হয়। 
এক. জলীয় অংশ কিডনি দিয়ে প্রস্রাবের মাধ্যমে।
দুই. কঠিন অংশ নাড়িভুঁড়ি হয়ে মলের মাধ্যমে। 

কঠিন জিনিস থাক, আজকে কথা বলি জলজ বিষয় নিয়ে কাজ করা কিডনি নিয়ে। শুনতে চাইলে চুপটি করে বসেন।

আমরা কোন খাদ্য গলাধকরণের সাথে সাথে স্টমাক তার মধ্যে থাকা এসিড জাতীয় এনজাইম দিয়ে খাবারকে এমন ডলা দেয় যে, খাবার নরম হয়ে যায়। সেখান থেকে খাদ্যরস শোষণের মাধ্যমে রক্তে ঢুকে যায় এবং রক্ত থেকে কোষে কোষে প্রাণশক্তি ছড়িয়ে পড়ে। আমরা রিচার্জ হয়ে যাই, নিমিষেই। খাদ্যের বাকি অংশ নাড়িভুঁড়ির ভিতর দিয়ে জার্নির সময় কিছু খাদ্য, রস হিসাবে রক্তে যায় আর কিছুটা বর্জ্য হিসাবে ওয়াশরুমের কমোডে।

রক্ত আসলে শরীর নামক রাষ্ট্রের যোগাযোগ ব্যাবস্থা হিসাবে কাজ করে। সে যেমন খাদ্য কোষে পৌঁছিয়ে দেয়, তেমনি কোষ থেকে তার বর্জ্য নিয়েও আসে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কিডনি আবার ওস্তাদ। সে কী করে জানেন? সে রক্তকে ছেঁকে দুষিত অংশটুকু নিয়ে নেয় এবং প্রস্রাব হিসাবে বের করে দেয়। কি চমৎকার, নাহ! তবে এই চমৎকারিত্ব সে তখনই দেখাতে পারে, যতক্ষণ সে চমৎকার থাকে। এটা অবশ্য সব ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। নিজে ভালো থাকলে, অন্যকে ও ভালো রাখা যায়।

শরীরের ভিতরে কিংবা বাইরে ছাকনির কাজ হচ্ছে, অপ্রয়োজনীয় জিনিসটা প্রয়োজনীয় জিনিস থেকে আলাদা রাখা। সুস্থ থাকতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। শরীরের ছাকন যন্ত্র তাহলে কে?
- কে আবার, কিডনি।
- কিডনি না থাকলে কী হতো?
- কি হতো আবার! প্রস্রাব হতো না।
- প্রস্রাব না হলে কী হতো?
- আশ্চর্য কথা! এটা তো সবাই জানে, শরীরে জমা হতো।
- শরীরে জমা হলে কী হতো?
আরেহ মুশকিল! শরীর ফুলে ঢোল হতো, প্রেশার বেড়ে যেতো। প্রেশারের চাপে রক্তনালি ছিড়ে যেতো। জায়গায় জায়গায় রক্তপাত হতো। আর ব্রেইনে রক্তপাত হলে তো কেল্লাফতে। দ্যা এন্ড।

বাপরে, কিডনি তো কঠিন চিজ একটা! এতক্ষণে বুঝলাম কিডনি কেনো এত গুরুত্বপূর্ণ। বেঁচে থাকতে হলে কিডনি লাগবেই। এজন্যই অহরহ কিডনি চুরি যায়। হা হা, দারুণ কথা! কিডনি চুরি। এই কিডনি চুরি করে চোরের দল কী রান্না করে খায়?
- আরেহ, কী বলো? বিক্রি করে, কোটি কোটি টাকার বিজনেস, বোঝলে? 
- হা হা করে এতো হাসির কী হলো। একজনের জান যায়, আর তুমি হাসছো!
- হাসছি তোমার অজ্ঞতা দেখে। তোমার প্রতি আমার রীতিমতো করুনা হচ্ছে, একদম সত্যি। না জেনো কথা বলতে দারুণ ওস্তাদ হয়েছো দেখছি।

বাঙালি বলে কথা! বুঝি আর না বুঝি, কথা একটা না বললে মান থাকে না যে। কিডনি খুব গুরুত্বপূর্ণ এতে কোনো সন্দেহ নেই। গাড়ির পার্টস বদলানোর মতো, এটা বদলিয়ে অন্যের গায়ে লাগিয়ে দেয়া যায়, এটাও মিথ্যা নয়। তবে ওই যে চুরি টুরি বললে সেটা বিজ্ঞান সম্মত নয়।

আচ্ছা তাহলে বিজ্ঞান কী বলে একটু বলো তো শুনি।
- সত্যি শুনবে?
- আবার জিগায়!
- শোনো, একটা কিডনি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় বেঁচে থাকতে পারে মাত্র ত্রিশ মিনিট।
- মাত্র ত্রিশ?
- ইয়েস। ওই যে চুরি টুরি বললে, এই ত্রিশ মিনিটের মধ্যে করে ফেলতে হবে। শুধু তাই না, দাতার শরীরের কিডনি খুলে গ্রহীতার শরীরেও পটাপট ফিট করে দিতে হবে এই ত্রিশ মিনিটের মধ্যে। তবেই এটা ওয়ার্ক করবে। না হলে নিজে তো পঁচবেই, যার গায়ে জুড়ে দেয়া হয়েছিল, পঁচাবে তাকেও।

কী বলো!
- হুম সত্যি বলছি, গুগল মামাকে জিজ্ঞেস করে দেখো।
- তাহলে ধরো, আমি একজনকে ধরে নিয়ে এসে গ্যাচাং করে তার পেট কেটে কিডনিটা বের করে, যার দরকার তার গায়ে লাগিয়ে দিলাম, ত্রিশ মিনিটের মধ্যে। তাহলে তো হয়ে গেলো, না?
- হা হা, এত্ত সহজ হলে তো কথাই ছিলো না রে পাগলা। এক গাড়ির পার্টস খুলতাম, অন্যের গাড়িতে লাগিয়ে দিতাম। বাসেরটা ট্রাকে, ট্রাকেরটা প্রাইভেট কারে। একই তো। টেকাই টেকা, আহা!
- হেয়ালী করো না তো! অনেকটুকু যখন বলছো, বাকী টুকুও বলো।
- বিশ্বাস করবে? 
- নিশ্চয়ই, কী যে বলো না।

আচ্ছা বলছি শোনো, কিডনি চাইলেই দেয়া যায় না আবার নেয়াও যায় না। এটা করতে হলে দাতা গ্রহীতার রক্তের গ্রুপ মিলতে হয়। শুধু গ্রুপ মিললেই হবে না, HLA নামক একটা জিনিস আছে, সেটা মিলতে হবে। এটা সাধারণত আত্মীয়দের সাথে মিলে। এ জন্যে কিডনি সাধারণত পরিবারের অন্য কারো থেকে নিতে বলা হয়। HLA টাই আসল কথা। আরো অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার ব্যাপার আছে। সবগুলো যদি মিলে, তাহলে দাতা গ্রহীতাকে একই সময়ে একই হাসপাতালে পাশাপাশি দুটো অপারেশন থিয়েটারে অপারেশন করতে হয়। দুটো আলাদা সার্জিক্যাল টীম দুজনকে অপারেশন করবে। ডিজিজড কিডনিটা ফেলে দিয়ে নতুনটা লাগাবে। যত সহজে বললাম, তত সহজ না কিন্তু। তার উপর ত্রিশ মিনিটের কথাটা ভুলে গেলে কিন্তু চলবে না। যেখানে একেকটা অপারেশনে করতে লাগে দুই থেকে তিন ঘন্টা!

এখন বলো, কিডনি চুরি করে নিয়ে গেছে সেটা কী ঠিক? চোরেরা ধরে ধরে হাজার হাজার মানুষকে পরীক্ষা করবে আর তারমধ্যে যে দুয়েক জনের সাথে মিলবে, তাকেই তুলে নিয়ে কিডনি নিয়ে নিবে, এটা পসিবল? হুজুগে না, লজিকে বলো।

আর লজ্জায় ফেলো না, এত বড় অপবাদ না জেনে এতদিন দিয়ে এসেছি, ছি ছি! তোমরা আমাদের কথায় কী পরিমাণ কষ্ট পেতে ভাবতেই কেমন যেনো ঘেন্না লাগছে! মাফ করে দিও, আর কখনো এমন হবে না। কত্ত ভুল জানতাম। আসলে এক্সপার্ট না হয়ে, প্রফেশনালদের ব্যাপারে আঙ্গুল তোলা অন্যায়, অনেক বড় অন্যায়। কিন্তু তোমরা কেনো মিথ্যা অভিযুক্ত হয়েও প্রতিবাদ করতে না কেনো?

আসলে প্রতিবাদ বোঝার জন্য জরুরি সে বিষয়ক জ্ঞান, সেটা না দিতে না পারলে প্রতিবাদ করে লাভ নেই। তা হবে উলু বনে মুক্তা ছাড়ানোর নামান্তর। তাই একটু জ্ঞান দিলাম আরকি, বোঝলে! এবার আমার ভিজিটটা দাও দিকিনি।

কী যে বলো, আমরা আমরাই তো!
- আচ্ছা, এই কথা। ঠিকাছে তোমার কনসালটেন্সি ফার্মে যাবো, চেম্বারটার ইন্টেরিয়রের ব্যাপারে কথা বলতে, ফি নিও না কেমন।
- না মানে মানে বোঝই তো...।
- হা হা, শুধু আমার বেলায় আমরা আমরা, তোমার বেলায় আমরা তোমরা!

আচ্ছা যাও, না দিলে না দাও প্রেসক্রিপশন মতো ঠিকঠাক ওষুধগুলো খেয়ো। আর ফাউ ফাউ যে জ্ঞানটা দিলাম সেটা অন্তত কাজে লাগিও, কেমন? জ্ঞানার্জন আর তার সঠিক ইমপ্লিমেন্টেশন দারুণ কিছু! প্রিয় সুহৃদ, আসুন জানি আলোকিত করিও ভিতর ও বাহির।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না