ঢাকা      মঙ্গলবার ১৩, নভেম্বর ২০১৮ - ২৯, কার্তিক, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. জোবায়ের আহমেদ

নির্বাহী পরিচালক ডা. জোবায়ের মেডিকেয়ার এন্ড প্যাথলজি সেন্টার। 


পিতা মাতার অকৃত্রিম ভালবাসা

একজন মা তাঁর দশটা সন্তানকে একা লালন পালন করেন কিন্তু দশজন সন্তান মিলেও একজন মায়ের যত্ন নিতে পারে না। এই ব্যাপারটা আমাকে খুব কষ্ট দেয়।

আমিনা বেগম, বিয়ানীবাজার দুবাগ ইউনিয়নেরর দক্ষিণ চরিয়া গ্রামের আটাশি বছর বয়স্কা একজন মা। একটা সময় উনারও সংসার ছিল। কোল জুড়ে ছেলে সন্তান আসল যখন, তখন খুব কেঁদেছিলেন আনন্দে। অভাবের সংসারে ভালবাসা ভরপুর ছিল। স্বপ্ন দেখতেন সুদিন আসবে। কিন্তু সেই সুদিন আর আসেনি। সুপারি বিক্রেতা স্বামী গত হয়েছেন ১৬ বছর আগে। ছেলেটা বড় হয়েছে। বিয়ে করে মাকে ফেলে শ্বশুর বাড়িকে আপন করে নিয়েছে, মায়ের আর খোঁজ নেয় না। আমিনা বেগম আমাকে জড়িয়ে ধরেছেন, আজ থেকে আমিই তার ছেলে, নিজের পেটের সন্তান তার কাছে জীবিত থেকেও মৃত।

ছেলে সন্তান জন্মালে আনন্দে কেঁদেছিলেন আমিনা বেগম, নিষ্ঠুর জীবনে আনন্দটা হারিয়ে গেছে অনেক আগেই কিন্তু কান্নাটা স্থায়ী হয়ে গেছে। কয়েক মাস আগে আমিনা বেগম মারা গেলেন। খবর পাইনি বলে জানাযায় যেতে না পারার একটা আক্ষেপ রয়েই গেল আমার।

দুই.
পরতেঙ্গা বিবির কথা। তিনি আমার রোগী ছিলেন না। তিনি ছিলেন আমার মা। উনাকে আমি মাই বলে ডাকতাম। তিনি কানাইঘাট ডিগ্রী কলেজের ফিজিক্সের সহকারী অধ্যাপক আজাদ ভাইয়ের মা। ডাক্তার-রোগী সম্পর্ক যেখানে মা ছেলের সম্পর্কে রুপ নিয়েছিল। ‘কী দেখ এমন করে মাই?’ 
- উত্তর ছিল মাইর, তোমার সুন্দর মুখ দেখি বাবা। এটাই ছিল পরতেঙ্গা বিবির শেষ কথা। এরপর এই সুন্দর ধরণীতে আর মাই কথা বলেননি। একজন চিকিৎসক হিসেবে আর কিছু পাওয়ার নেই।

তিন.
আমার বন্ধু ও বড় ভাই কানাডা প্রবাসী ডা. নওফেল মিনহাজের ছোট্ট মেয়ে নুয়েরী উনাকে নিয়ে নিজ হাতে গত বাবা দিবসে একটি কার্ড লিখেছে। daddy when you hold my hand, you hold my heart- nuery.

আসলেই ব্যাপারটা স্বর্গীয় একটা অনুভূতি দেয়। পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ আছে কিন্তু একজন খারাপ বাবাও নেই। আমাদের বাবাদের বয়স হচ্ছে। উনারা আমাদের সাথে গল্প করতে চান, পাশে থাকতে চান, আমরা যখন উনাদের জন্য নিষেধ করার পরও একটা পাঞ্জাবি কিনে নেই তখন কিন্তু মুচকি হাসি দিয়ে বলেন কী দরকার ছিল? এই মুচকি হাসিটাই ভালবাসা।

চার.
গতবছর বাবাকে একটা অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল গিফট করেছিলাম, তখন খুব কপট একটা রাগ দেখালো, কী দরকার, আমাকে পরের দিন ভিডিও কল দিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়েছে। এই কপট রাগই ভালবাসা। এই মুচকি হাসিই বাবার ভালবাসা। শ্বশুর বাবার আরটিকেরিয়া ও কাশি হল। ওষুধ কিনে নেওয়াতে খুব বকা দিলেন। এই বকাই ভালবাসা।

পাঁচ.
একজন সেলিম সাহেব। বয়স ৪৮ বছর। নিজে ভূগছেন ডায়াবেটিস, হাই ব্লাড প্রেশার, ডিস্লিপিডেমিয়ার মত রোগে। উনি মদন মোহন কলেজের সাবেক প্রিন্সিপাল সৈয়দ আব্দুস শহীদের ছেলে। সৈয়দ আব্দুস শহীদ স্যার ও উনার স্ত্রী দীর্ঘ এগার বছর যাবত বার্ধক্য জনিত রোগে বিছানায় বন্দি। সেলিম সাহেব এগার বছর ধরে নিজ হাতে পরম মমতায় নিরলস ভাবে বাবা মায়ের সেবা করে যাচ্ছেন। নিজ হাতে বাবা মায়ের পেশাব পায়খানা পরিষ্কার করেন। কোন বিরক্তি নেই। কাজের লোক রাখলে বেশি দিন থাকে না। 

গত বছর সেলিম সাহেব ভাইরাল ফিভারে আক্রান্ত হলেন। দুষ্ট ভাইরাস উনাকে খুব কাবু করে ফেলেছিল। হঠাৎ সেলিম সাহেব আমার সামনে বাচ্চাদের মত ডুকরে কেঁদে উঠলেন। গত সাত দিন নিজ হাতে বাবার পেশাব পায়খানা পরিষ্কার করতে পারেননি এই দুঃখে। খুব আক্ষেপ নিয়ে বললেন, আজ সাত দিন নিজ হাতে বাবা মায়ের সেবা করতে পারছি না। খুব কষ্ট পাচ্ছেন উনি। যদিও উনার প্রিয়তমা স্ত্রী উনার বাবা মায়ের ব্যাপারে খুব যত্নশীল।

খুব ভাল লাগলো। আমি সেলিম সাহেবের গড়িয়ে পড়া অশ্রু দেখছিলাম। খুব ইচ্ছে করছিল সেই অশ্রুকে ছুঁয়ে দিতে। একটা শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভালবাসা অনুভব করলাম সেলিম সাহেবের জন্য। এই রকম সেলিম সাহেব চাই ঘরে ঘরে। বৃদ্ধ বাবা মাগুলোকে আমরা আগলে রাখি পরম মমতায়।

ছয়.
আমার ইন্টার্নশীপের প্রথম প্লেসমেন্ট ছিল গাইনীতে। প্রথম নরমাল ডেলিভারি করানোর দৃশ্যটা আজো ভুলিনি। ১৭ বছর ছিল মেয়েটির বয়স, খুব চিৎকার দিচ্ছিল ব্যথায়। ইপিসিওটোমি দিতে হয়েছিল। বাচ্চাটি ডেলিভারি হবার পর মাসী যখন মেয়েটিকে দেখতে দিল তখন সে চুপ হয়ে গেল, ব্যথা ভুলে কী এক হাসিমাখা মুখ নিয়ে বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে ছিল। তাকে লোকাল এনেস্থিসিয়া না দিয়েই সেদিন সেলাই করেছিলাম কিন্তু সে একটু উহও করেনি। আমি অশ্রুভেজা চোখে সেই অপূর্ব পবিত্র দৃশ্য দেখছিলাম আর ভাবছিলাম আমার মায়ের কথা।

সাত.
মা বাবাকে ফিরিয়ে দেই কিছু মায়া। একজন চিকিৎসক হিসেবে জীবনকে অনেক কাছ থেকে দেখার সুযোগ আসে মাঝে মাঝে। জীবনের স্বার্থকতা খুঁজে বেড়াই। ছোট্ট বাচ্চাকাচ্চাগুলো নিয়ে মা বাবা চিকিৎসা নিতে আসেন। সন্তানকে নিয়ে উনাদের উদ্বিগ্নতা, অস্থিরতা দেখি। কী পরম যত্ন আর ভালবাসায় আদরের সোনামনিকে বড় করেন। নিজের মা বাবার মায়াবী মুখখানি চোখে ভেসে ওঠে।

আমার ৩৩ বছরের জীবন জুড়ে বাবা মা শুধু দিয়েই গেলেন। প্রায়শই আমি ভাবি এই যে আমাদের মাতা পিতা আমাদের জীবনকে এত এত আদর, যত্ন, মায়া আর ভালবাসায় ভরপুর করে রাখেন, আমরা কতটুকু মায়া উনাদের ফেরত দিতে পারি। আমরা কি মাতা পিতার প্রাপ্য যত্ন নেই?

মা বাবার জন্য কাঁদছে সন্তান। অনেক পবিত্র দৃশ্য। এমন দৃশ্য আমার আত্মাকে প্রশান্তি দেয় খুব। একজন মা মায়ায় এই পৃথিবীতে মায়ায় সংসার গড়ে তুলেন। মায়া বিলিয়ে যান আমৃত্যু। একদিন সে মায়ের একটু মায়া দরকার। একটু ভালবাসা দরকার। সেদিন যেন মা বাবার প্রাপ্য সেই মায়া ফিরিয়ে দেই আমরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

প্রতিবছর রেসিডেন্সির রেজাল্ট দিলে আমি দেখতে চেষ্টা করি কোন ছেলে চান্স পেলো…

চাতক চাতকী

চাতক চাতকী

গাইনী আউটডোরে দেখতাম প্রায়ই রোগী আসে এবরশন করানোর জন্য। কখনও আসে কিভাবে…

সফল হওয়ার উপায়

সফল হওয়ার উপায়

মেয়েটির বয়ফ্রেন্ড নেশায় মত্ত। সারাদিন এ নিয়ে ঝগড়া হয়। কী করণীয় পরামর্শ…

আনায় পর্ব- ৩

আনায় পর্ব- ৩

আমি কোনওকালেই সংসারী ছিলাম না। মা আমাকে রান্নার কোর্সে ভর্তি করেছিলেন। তেমন…

মেডিকেল কলেজ প্রসঙ্গ

মেডিকেল কলেজ প্রসঙ্গ

কয়েকদিন আগে আমার এক ফেসবুক বন্ধুর এক স্ট্যাটাস থেকে জানতে পারলাম, তিনি…

বাহকের সাথে বাহকের বিয়ে হলে কেন শিশুর থ্যালাসেমিয়া রোগ হয়?

বাহকের সাথে বাহকের বিয়ে হলে কেন শিশুর থ্যালাসেমিয়া রোগ হয়?

থ্যালাসেমিয়া বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে গেলেই কয়েকটি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। আমার…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর