ঢাকা      মঙ্গলবার ১৩, নভেম্বর ২০১৮ - ২৯, কার্তিক, ১৪২৫ - হিজরী



ইমরান হোসেন

শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ 


মেডিকেল কলেজ প্রসঙ্গ

কয়েকদিন আগে আমার এক ফেসবুক বন্ধুর এক স্ট্যাটাস থেকে জানতে পারলাম, তিনি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি তার এক নিকটাত্মীয়কে দেখতে যান। সেখানে এক শিক্ষানবিশ ডাক্তার রোগীর প্রেসার মাপ ছিলেন। বন্ধুর বর্ণনায় বুঝতে পারলাম তখন রাউন্ড চলছিল। তাই খুব স্বাভাবিক ভাবেই সেখানে একজন প্রফেসর ছিলেন।

বন্ধুর পর্যবেক্ষণে ঐ শিক্ষানবিশ ডাক্তার প্রেসার মাপতে পারছিলেন না, এ জন্য রোগীর এটেন্ডেন্টের (বন্ধু নিজে) সামনেই প্রফেসর সাহেব শিক্ষানবিশ ঐ ডাক্তারকে প্রত্যাখ্যান করেন। খাঁটি বাংলায় গালি দেন। 

সর্বশেষে এসে বন্ধুটি শিক্ষানবিশ ডাক্তারের ব্যর্থতার জন্য দায়ী করেছেন, মানহীন নাম সর্বস্ব যত্রতত্র বর্তমানকার বেসরকারি মেডিকেল কলেজকে। এবং আশংকা প্রকাশ করেছেন সামনে কী হবে!

বলে রাখা ভালো, বন্ধুটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স কমপ্লিট করেছেন। ভাবছেন হয়তো তিনি মেডিকেলে পড়তে পারেননি বলে ডাক্তার বিরোধী। বিনয়ের সহিত বলছি তা নয়, কারণ তার মা ঢাকা মেডিকেল কলেজের একজন প্রফেসর। নির্দ্বিধায় বন্ধুর সাথে সহমত হয়ে বলছি, এই আশংকায় আমরাও প্রচণ্ড আতঙ্কিত।

এ নিয়ে বিস্তারিত বলার আগে বর্তমানে আমাদের দেশে মেডিকেল শিক্ষায় কতগুলো সরকারি/বেসরকারি মেডিকেল ও ডেন্টাল কলেজ আছে তা জানা জরুরী।

সর্বশেষ তথ্য বলছে ২০ কোটি মানুষের এই দেশে সরকারি/বেসরকারি মোট মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ আছে ১৩১টি। এর মধ্যে মেডিকেল কলেজ আছে ১০৪টি। আর ডেন্টাল কলেজ ২৭টি। মেডিকেল কলেজের মধ্যে সরকারি ৩৬টি (প্রস্তাবিত আরো আছে ৫টি)। ডেন্টাল কলেজ সরকারি ৯টি। বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ ১৮টি। শুধু তাই নয় সরকার ঘোষণা দিয়েছে প্রতি জেলায় একটি করে সরকারি মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করবে। এছাড়া ইউনানি, আর ম্যাটস কতগুলো আছে আমি তা ধর্তব্যে আনিনি (তারাও নিজেদের ডাক্তার পরিচয় দেন)।

সব মিলিয়ে এখন আমরা যা দেখছি তাতে ফি-বছর মিনিমাম ১৫ হাজার ডাক্তার বের হচ্ছেন বা হবেন। প্রতিবছর ১৫ হাজার বের হোক বা ২৫ হাজার হোক তাতে মাথা ব্যথার কোনো কারণ নেই। মাথা ব্যথার কারণ অন্য জায়গায়। সেটা হচ্ছে চিকিৎসা সেবার মান ও শিক্ষার মান নিয়ে। কতটুকু ঠিক থাকছে এই মান, এই সেবা/শিক্ষা?

আমাদের শিক্ষকরাই মাঝেমাঝে বলতেন, ‘যত্রতত্র এই যে এতো সরকারি মেডিকেল কলেজ হচ্ছে, এগুলো আসলে ঠিক হচ্ছে না।’ আশংকা প্রকাশ করে আরো বলতেন, ‘বড় বড় মেডিকেল কলেজগুলোতেই শিক্ষক সংকট তা হলে এই নতুন নতুন মেডিকেল গুলোর কী অবস্থা হবে?’ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি স্যার এগুলা বলেছেন সরকারি মেডিকেল কলেজ নিয়ে। এখন বেসরকারি মেডিকেল নিয়ে আপনার আশাবাদ কেমন, কদ্দুর?

স্বীকার করতেই হবে আমাদের অনেক যোগ্য বন্ধু বেসরকারি মেডিকেল কলেজে পড়েও অনেক ভালো করছে। অনেক বেসরকারি মানসম্পন্ন মেডিকেল কলেজও আছে। কিন্তু তার মানে এই নয় ‘আমার মনে চাইছে’ (সোজা কথা- ‘আমার টাকা আছে’) আর একটা মেডিকেল দিয়ে দিবো। এখন অনেকটা ব্যবসায়ী মনোভাব থেকেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠান (সেটা হোক স্কুল, কলেজ কিংবা স্নাতক লেভেলের বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল বা ডেন্টাল কলেজ) করছে বিভিন্ন শিল্পপতি, এমনকি রাজনৈতিক ব্যক্তিরা। কিন্তু এর ফল কতটা সুফল হবে?

আমার অতি-সম্প্রতি এক বেসরকারি মেডিকেল আউট ডোরে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানের স্বার্থেই নাম বলছি না। সেখানে আউট ডোরে একজন প্রফেসরকে দেখানোর ন্যূনতম ফি ৫০০ টাকা, অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর ৪০০ টাকা, আর মেডিকেল অফিসার ৩০০ টাকা। সরকারি মেডিকেল কলেজ তথা হাসপাতালে এই মূল্য মাত্র ১০ টাকা। অথচ দেখবেন ওই একই ডাক্তার। ভেবেছেন কখনও?

ডাক্তারদের এই ফি হিসাব বাদ দিলাম। চলুন নতুন ছাত্রছাত্রী ভর্তির চালচিত্র দেখি। সদ্য প্রতিষ্ঠিত একটি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হতে গেলেও আপনার দরকার হবে মিনিমাম ১০-১৫ লক্ষ টাকা। আর নামী দামী মেডিকেল কলেজ হলে ৪০-৫০ লক্ষ টাকা (কিছুটা হেরফের হতে পারে)। অবশ্য সরকার আইন করেছে বর্তমানে ভর্তি হতে লাগবে ছাত্র প্রতি ২২ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা। আর প্রতি মাসে তো বড় অংকের মাসিক ফি আছেই। এই শিক্ষা (ব্যবসা) কোনো অংশেই ডাকাতির চেয়ে কম নয়।

আমাদের দেশে বাবা মায়ের প্রথম পছন্দ ডাক্তারি পেশা। ‘থ্রী ইডিয়টস’ সিনেমার মতো কোনো বাচ্চা হলে প্রথমেই বাবা মা বলেন, ‘আমার বাচ্চা ডাক্তার অইবো।’ কিন্তু তার পরিণতি যে কি, কদ্দুর আর কতটা ভয়ানক, তা কোনো বাবা মা-ই চিন্তা করেন না। আমার এক স্টুডেন্ট ছিল এমন। ছোট থেকে ডাক্তার ডাক্তার ডেকে ডেকে এমন অবস্থা হয়েছে, এখন তাকে বেসরকারিতে ভর্তি না করলে স্টুডেন্ট সুইসাইড করবে। কারণ সরকারিতে ২য় বারেও তার সুযোগ হয়নি।

এখনও সময় আছে লাগামটা টেনে ধরুন, নইলে শুধু বিপদ না মহামারি হিসেবে হাজির হবে পুরো মেডিকেল ব্যবস্থা। ঘরে ঘরে মেডিকেল আর জনে জনে ডাক্তার বানানোর এই ‘মিশন+মেশিন’ আর কতদিন?

অভিভাবক শ্রেণির প্রতি বিনিত অনুরোধ হল, আপনার সন্তানকে বর্তমান জামানার ‘নামের ডাক্তার’ না বানিয়ে একজন ভালো মানুষ বানান। অন্য কোনো পেশাই ডাক্তারের চেয়ে কম নয়। সেটা আর বুঝিয়ে বলার দরকার নেই।

আমার এক বন্ধু মেডিকেলে ২য় বারের চেষ্টায় চান্স না পেয়ে ভর্তি হয়েছিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। আজ সে অ্যাডমিন ক্যাডার। কে বলেছে ডাক্তার হলেই জীবন নিশ্চিত আর নিশ্চিন্ত সুখের? শুধুই টাকা আর টাকা। যদি ভেবেও থাকেন, সেই দিন আর নাই ভাই। খুবই বেহাল দশা। ভর্তি হওয়ার আগে কিংবা করার আগে, অনন্ত নিজের কাছের কোনো মেডিকেলীয় আত্মীয়স্বজন (যদি থাকে) জিজ্ঞেস করে দেখুন।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

প্রতিবছর রেসিডেন্সির রেজাল্ট দিলে আমি দেখতে চেষ্টা করি কোন ছেলে চান্স পেলো…

চাতক চাতকী

চাতক চাতকী

গাইনী আউটডোরে দেখতাম প্রায়ই রোগী আসে এবরশন করানোর জন্য। কখনও আসে কিভাবে…

সফল হওয়ার উপায়

সফল হওয়ার উপায়

মেয়েটির বয়ফ্রেন্ড নেশায় মত্ত। সারাদিন এ নিয়ে ঝগড়া হয়। কী করণীয় পরামর্শ…

আনায় পর্ব- ৩

আনায় পর্ব- ৩

আমি কোনওকালেই সংসারী ছিলাম না। মা আমাকে রান্নার কোর্সে ভর্তি করেছিলেন। তেমন…

বাহকের সাথে বাহকের বিয়ে হলে কেন শিশুর থ্যালাসেমিয়া রোগ হয়?

বাহকের সাথে বাহকের বিয়ে হলে কেন শিশুর থ্যালাসেমিয়া রোগ হয়?

থ্যালাসেমিয়া বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে গেলেই কয়েকটি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। আমার…

‘পান হইলো গিয়া জান্নাতি ফল’

‘পান হইলো গিয়া জান্নাতি ফল’

‘যদি বরে আগুনে থাল লইয়া যায় মাগনে, যদি বরে পৌষে কড়ি হয়…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর