ঢাকা      বৃহস্পতিবার ১৫, নভেম্বর ২০১৮ - ১, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. তাইফুর রহমান

কনসালটেন্ট কার্ডিওলজি

জেনারেল হাসপাতাল, কুমিল্লা।


‘পান হইলো গিয়া জান্নাতি ফল’

‘যদি বরে আগুনে থাল লইয়া যায় মাগনে, যদি বরে পৌষে কড়ি হয় তুষে, যদি বরে মাঘের শেষ ধন্য রাজা পূণ্য দেশ’- এই ক্ষণার বচন বাংলার আবহাওয়া, ফসলাদি ও বৃষ্টির সম্পর্ক তুলে ধরেছে। অগ্রহায়ণ মাসে বৃষ্টি হলে ফসল বপন কষ্টকর হয়ে যায়। দুর্ভিক্ষ অবধারিত। আর মাঘ মাসের শেষে ফসল যখন ফল দেয়ার প্রস্তুতি নেয় তখন বৃষ্টি হলে ফলন ভাল হয়। দেশ উন্নত হয়। এটি একটি বিজ্ঞান সমর্থিত বচন। তার সাথে সাথে অনেক মনগড়া বচন নিয়ে বেঁচে আছে মানুষ।

এই বচনের মত হাজারো বচন ঘুরে বেড়ায় বাংলার মানুষের মুখে মুখে। সমাজে সমাজে, গোত্রে গোত্রে মুখরোচক বচনে ভরপুর এই বাংলা। অন্তরে নানা বদ্ধমূল ধারনা নিয়ে মানুষ কাটিয়ে দেয় তাদের জীবন।

পান বন্ধ করার জন্য ডাক্তার হিসাবে আমার পরামর্শ, আমার চেষ্টা সব ব্যর্থ হয়ে যায় তাদের চমৎকার সব থিওরিতে। বিশেষ করে মহিলা রোগীরা অকাট্য যুক্তি দেয়। স্যার, পান খাই দাতেঁর মাড়ির ব্যথা কমানোর জন্য। 
- কেউ কেউ বলে, স্যার মুখ চুকা হয়ে থাকে কী করবো? 
- অনেকে অকাট্য যুক্তি দেয় স্যার, খাবার পর এক খিলি পানের বিকল্প নাই। খাবার হজম করার মহৌষধ। 

সেফালি ঘোষের সেই মধুর কন্ঠ ক্ষণিকের জন্য মস্তিষ্কের কোষে অনুরণন তৈরী করে, ‘মহেষখালীর পানের খিলি তারে বানাই খাওয়াইতাম।’ তবুও মুখে বলি আপনার এই মহৌষধের খবরটা নিশ্চয়ই দাতের ডাক্তার বা খাদ্যনালী বিশেষজ্ঞরা জানেন না। জানলে সবার মুখে এক খিলি পান ঢুকিয়ে দিতেন। এক ভদ্রলোকতো পান চিবাইতে চিবাইতে আয়েশ করে বলে, বুঝবেন যেদিন দেখবেন বেহেস্তে পান খাওয়াইতাছে। বুঝলেন স্যার, পান হইলো গিয়া জান্নাতি ফল।

ধূমপান নিয়েও রোগীদের সাথে আমার বিতন্ডার অন্ত নাই। আমি জিজ্ঞেস করি, সিগারেট খান? 
- কঠিন অস্বীকার, জীবনে কোনদিন সিগারেট খাইনি। 
- আপনার মুখ থেকে গন্ধ পাচ্ছি! 
- মুচকি হাসি দিয়ে বলে স্যার, সিগরেট খাই না বিড়ি খাই, আকিজ বিড়ি। 

এ ব্যাপারে কথা শুনতে চায় না। স্যার, আমার বিড়ি চলুক, আপনার ওষুধ দেন। দরকার হলে কড়া ওষুধ দেন। সকালে বিড়ি না খাইলেতো বাথরুমই হয় না। অনেকে জ্ঞান দেয়, যারা বিড়ি খায় না তাদের ক্যান্সার হয় না? শোনেন রোগ যার হওয়ার তার এমনি হবে। বিড়ির সাথে কোন সম্পর্ক নাই। এক রোগীতো আরেক কাঠি সরেস। স্যার, সকালের বাথরুমে বিড়ির বিকল্প নাই। কত ওষুধ খাইলাম কাম হয় না কিন্তু বিড়ি অতুলনীয়।

অবজ্ঞার হাসি উপহার দিয়ে বলে, স্যার এটা কোন কথা কইলেন টক খাইলে ঘা শুকায়! টক দেখলেই মুখটা কেমন ঘাঁ ঘা লাগে।

আমার অনেক রোগী গলায় তাবিজ, হাতে তাবিজ, কোমরে তাবিজ বাধা অবস্থায় আসে। আমি তাবিজ নিয়ে কিছু বলি না। অনেকে আগ বাড়িয়ে জিজ্ঞেস করে, স্যার তাবিজ লাগাইতে পারবতো? 
- আমি অবাক হয়ে বলি, আর লাগানোর জায়গা কোথায়? সুযোগ থাকলে লাগান।

আমি জানি কোন লাভ হবে না। বরং তাবিজ লাগানো শিরক কিন্তু কী করব? প্রথমত আমি এ তর্কে প্রায়ই হেরে যাই। দ্বিতীয়ত যদি তাবিজ আমার কথায় খুলে আর তার পরেরদিন হার্ট এটাক হয় তাহলে আমার খবর আছে। তবুও রোগীকে বুঝাই, বুঝাতে যাই। কখনো রোগী থেকে উল্টা বুঝ নিতে হয়। কথায় আছে নেড়া বারেবারে বেলতলায় যায় না। আমি যাই, যেতে হয়। কারণ আমার দরজার সামনেই যে প্রকান্ড বেলগাছ!

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

প্রতিবছর রেসিডেন্সির রেজাল্ট দিলে আমি দেখতে চেষ্টা করি কোন ছেলে চান্স পেলো…

চাতক চাতকী

চাতক চাতকী

গাইনী আউটডোরে দেখতাম প্রায়ই রোগী আসে এবরশন করানোর জন্য। কখনও আসে কিভাবে…

সফল হওয়ার উপায়

সফল হওয়ার উপায়

মেয়েটির বয়ফ্রেন্ড নেশায় মত্ত। সারাদিন এ নিয়ে ঝগড়া হয়। কী করণীয় পরামর্শ…

মেয়ের বাবা ও ডাক্তারের গল্প

মেয়ের বাবা ও ডাক্তারের গল্প

ফ্ল্যাটের এক আঙ্কেল সরকারি এক ব্যাংকের রিটায়ার্ড উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ভদ্রলোককে আমি বেশ…

এনেস্থেশিয়া ছাড়া অপারেশান!

এনেস্থেশিয়া ছাড়া অপারেশান!

আম্মা বড় রকমের সার্জন, তার সামনে ডাক্তারি বিদ্যা জাহির করা কখনো খাটে…

আনন্দ বেকারি!

আনন্দ বেকারি!

আমাদের সময় ইন্টার্ন প্রশিক্ষণ ছিল ছয় মাস মেডিসিন বাকি ছয়মাস সার্জারি/গাইনি এন্ড…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর