ঢাকা      বৃহস্পতিবার ১৫, নভেম্বর ২০১৮ - ১, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. মিথিলা ফেরদৌস

বিসিএস স্বাস্থ্য

সাবেক শিক্ষার্থী, রংপুর মেডিকেল কলেজ। 


আনায় পর্ব- ৩

আমি কোনওকালেই সংসারী ছিলাম না। মা আমাকে রান্নার কোর্সে ভর্তি করেছিলেন। তেমন করে ক্লাস করা হয় নাই। একটা সার্টিফিকেট আছে। সার্টিফিকেট পাওয়ার পর একদিন ইচ্ছে হলো সবাইকে রান্না করে খাওয়াই। রান্নার যাবতীয় জিনিস মিজারিং মগ থেকে শুরু করে হাবিজাবি কিনে রান্নাঘর থেকে পুরান সব তৈজসপত্র ফেলে দেয়া হলো।

দুইজন বাবুর্চি আর মাকে আমি রান্নাঘরের বাইরে থেকে ডিরেকশন দিলাম। নিজে হ্যান্ডগ্লাভস থেকে শুরু করে এপ্রন, শু সব পরেছিলাম। কিন্তু কিছুই না ধরে বহু প্রজাতির রান্নায় টেবিল ভরায় ফেললাম। বাবা আমার রান্নার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। এবং পরবর্তিতে আর যেনো রান্না না করি, নিষেধ করে দিলেন। আমি অবশ্য আর কখনওই রান্না করিনি, করতেও হয় নাই।

আমার কাজ নিজেকে সাজায় গুছায় রাখা। আমার নিজস্ব ডায়েটেশিয়ান আছে, নিজস্ব বিউটিসিয়ান প্রতিদিন আসে, বাসায় ছোটখাটো একটা জিম আছে, ট্রেইনার আসে প্রতিদিন, তাছাড়া নাচ শিখেছিলাম একটা নির্দিষ্ট সময় সেইটাও প্রাক্টিস করি। প্রতিটা কাজ চলে রুটিন মাফিক।

বাচ্চাদের জন্যে মিস্ট্রেস আছে স্কুল নিয়ে যাওয়া, পড়ানো, আয়া-বুয়া, সিকিউরিটি। বাচ্চাদের দায়িত্ব তেমন নিতে হয় না। মাঝে মাঝে পেরেন্টসদের স্কুলে ডাকলে যাই। সেখানেও মজার একটা মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেলি। স্কুলগুলিতে যে গার্জিয়ানরা যায় সবাই মিডল ক্লাস, আপাররা এসবে যায় না। এই মিডল ক্লাসটা একটা ফানি ক্লাস আমার কাছে। পেরেন্টস রুমে জটলা করে করে, মহিলাদের গল্পের বিষয় শাড়ি গয়না, এপার্টমেন্ট, গাড়ি, ভেকেশনে কে কোথায় ঘুরতে গিয়েছিল, কত স্টার হোটেলে কি খেয়েছে আজব সব কথা বলার সাবজেক্ট। 

তাদের আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ সাবজেক্ট পরকিয়া। এই ব্যাপারে কথা বলতে গেলেই তাদের চোখ মুখ চকচক করে। যাদের এমন বিষয় নিয়ে কথা বলাতে আনন্দ, তাদের যে কেউ এসবের সাথে যুক্ত নয় কিভাবে বুঝবো! এবং এরাই অন্যদের নিয়ে খারাপ ভাবে বলবে কিন্তু নিজেরা একেকজন রাবেয়া বাশরী হয়ে থাকবে। কপটতা আমার অসহ্য। আমি নিজে যা তাই প্রকাশ করতে পছন্দ করি, খারাপটাও। এতে আমাকে কে খারাপ ভাবলো তাতে কিছুই যায় আসে না। অন্তত হিপোক্রেট তো নই। আমার কাছে মনে হয় যে যত সাধু বাবা-মা সাজুক, সে হয় সুযোগের অভাবে ভাল বা সে ততই খারাপ। দুনিয়াতে কোন পরিপূর্ণ সাধু মানুষ নাই।

আমাকে ওখানে সবাই অহংকারী ভাবে এবং আমি অহংকারীই। যার মধ্যে অহংকার করার কিছু আছে সেইতো অহংকার করবে। অন্যরা কিভাবে করবে? যাহোক ওখানে কিছু পুরুষ গার্জিয়ান যায়। এদের চোখে স্পষ্ট লোভী দৃষ্টি দেখি আমি। ছেলেদের মধ্যে প্রেম জিনিসটা ইউনিভার্সিটি পর্যন্তই থাকে।

আমার কাছে মধ্যবিত্তদের চেয়ে নিম্নবিত্তদের বেশি পছন্দ। আমার বাসার সমস্ত কর্মচারীর নিয়োগ দিই আমি। প্রয়োজনের বাইরেও কিছু লোক রাখা হয়েছে। শুধু নিম্নবিত্ত কিছু মেয়েদের কর্মসংস্থানের জন্যে। মেয়েগুলি খুব বিনয়ী আর কৃতজ্ঞ। অফিসের নিয়োগের ব্যাপারে বোর্ড আছে, তাতেও আমি মেম্বার।

যাহোক, এখন আমার হাজবেন্ডের আয়ানের ব্যাপারে বলি। সে বছরের অর্ধেক সময় দেশের বাইরে থাকে। দেশে থাকলেও বেশিরভাগ সময় ব্যস্তই থাকে। আমি কখনওই কোনও কোয়েরিতে যাই না, সে কখন কোথায় কার সাথে যাচ্ছে। সেও আমার ব্যাপারে এমনই। পুরাদস্তুর বিজনেসম্যান সে। দেশের বাইরে একটা পত্রিকায় কাভার ফটো আমাকে দিয়েই বানালো, আমার লাইফস্টাইল নিয়ে ভিতরে কিছু ফিচার ছিল। পুরো ইনভেস্ট তার। এসবের পিছনে তার উদ্দেশ্য থাকে। আমাকে বিভিন্ন জায়গায় রিপ্রেজেন্ট করে ব্যবসায়ীক ফায়দা নেয়া। 

দেশে বা দেশের বাইরে যেকোন পার্টিতে আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে বিভিন্ন কন্টাক্ট গুলিতে আমার একটা বড় রোল প্লে করতে হয়। সেও বোঝে পার্টিতে যত সুন্দরীই যাক না কেন তার বউই স্পেশাল। আয়ান অসম্ভব প্রাকটিকাল একজন মানুষ। সে সংসারী মেয়ে চায় নাই কখনও। দেশে লেবার কসট কম তাই আমিও দেশেই সেটেল্ড করেছি। নিউয়র্কে থাকতে বেশ কষ্ট হতো।

আয়ান ওদেশেই মানুষ তাই সেই হেল্প করতো, তারপরেও বউকে সে শোপিচ করে রাখতে পছন্দ করতো। আমি নিজেই ডিসাইড করে চলে এসেছি। বউকে সাজায় রাখা কোন ইমোশন থেকে না, আমি আগেও বলেছি, এটা তার একটা ব্যবসার পার্ট। প্রতিটা কন্টাক্টের সময় সে আমাকে তার সাথেই নিয়ে যেতো, তারপরে বউকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিতো।

ভালবাসা জিনিসটা আমারও অনুভূতির বাইরে। আমি আগেই বলেছি এটা আমার একটা গেম। একজনের কাছে নিজেকে প্রয়োজনীয় করে তুলে সরে আসতাম। যেহেতু আমার জীবনে কাউকেই প্রয়োজনীয় মনে হয় নাই সেহেতু প্রেম ভালবাসা আমার জীবনে কখনওই আসেনি।

চলবে...

আরও পড়ুন

►আনায় পর্ব- ১

►আনায় পর্ব- ২

►আনায় পর্ব- ৩

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

প্রতিবছর রেসিডেন্সির রেজাল্ট দিলে আমি দেখতে চেষ্টা করি কোন ছেলে চান্স পেলো…

চাতক চাতকী

চাতক চাতকী

গাইনী আউটডোরে দেখতাম প্রায়ই রোগী আসে এবরশন করানোর জন্য। কখনও আসে কিভাবে…

সফল হওয়ার উপায়

সফল হওয়ার উপায়

মেয়েটির বয়ফ্রেন্ড নেশায় মত্ত। সারাদিন এ নিয়ে ঝগড়া হয়। কী করণীয় পরামর্শ…

মেয়ের বাবা ও ডাক্তারের গল্প

মেয়ের বাবা ও ডাক্তারের গল্প

ফ্ল্যাটের এক আঙ্কেল সরকারি এক ব্যাংকের রিটায়ার্ড উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ভদ্রলোককে আমি বেশ…

এনেস্থেশিয়া ছাড়া অপারেশান!

এনেস্থেশিয়া ছাড়া অপারেশান!

আম্মা বড় রকমের সার্জন, তার সামনে ডাক্তারি বিদ্যা জাহির করা কখনো খাটে…

আনন্দ বেকারি!

আনন্দ বেকারি!

আমাদের সময় ইন্টার্ন প্রশিক্ষণ ছিল ছয় মাস মেডিসিন বাকি ছয়মাস সার্জারি/গাইনি এন্ড…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর