ডা. রাতিন মন্ডল

ডা. রাতিন মন্ডল

সহযোগী অধ্যাপক,

মেডিসিন বিভাগ

রংপুর কমিউনিটি মেডিকেল কলেজ।


০৪ নভেম্বর, ২০১৮ ১১:৩৫ এএম

ডাক্তাররা কেন কারণে অকারণে টেস্ট করাতে বলেন?

ডাক্তাররা কেন কারণে অকারণে টেস্ট করাতে বলেন?

একবার দুদিনের জ্বর নিয়ে ৩০ বছর বয়সী একজন রোগী আমাকে দেখালেন। আমি দেখার পর মনে হল ভাইরাল ফেভার। রোগীর প্রেসার কম আর খেতে পারছে না তাই রুটিন টেস্ট দিয়ে ভর্তি করলাম। 

ভর্তি হবার ২ ঘন্টা পর (তখনও রিপোর্ট আসে নাই) রোগী হঠাৎ খারাপ হয়ে গেল। রোগী খুবই restless, প্রেসার ২০০/১২০, শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, রোগীকে icu নেয়া হল, কিছুক্ষণ পর (৩০ মিনিট এর মধ্যে) রোগী মারা গেল। 

ওই সময় আমি আর ভাগ্যক্রমে বিধু স্যার সেখানে উপস্থিত ছিলাম। রোগী মারা যাবার পর রিপোর্ট আসল, আমরা দেখলাম platelet count ৩০০০০। রোগীর লোকের কাছে আবারো ইতিহাস নেয়া হল। রোগীর লোক বলল, গতকাল অনেক জ্বর হবার পর তাকে diclofen ট্যাবলেট জ্বর কমানোর জন্য দিয়েছিল গ্রামের ওষুধের দোকানদার। রোগীর platelet count কম ছিল, তার উপর diclofen খেয়ে ব্রেনে রক্তক্ষরণ হয়ে রোগী মারা গেছে।

 শিক্ষণীয় হচ্ছে- platelet count দেখে তা নরমাল হলে তারপর NSAID দেয়া উচিত।

দুই.
৩/৪ দিন আগে একজন ডায়াবেটিসের রোগী জ্বর নিয়ে আমাকে দেখালেন, আমার মনে হল তার প্রস্রাবে ইনফেকশন, আমি প্রস্রাবের পরীক্ষা দিলাম, কিডনির টেস্ট আগে করা ছিল, নরমাল ছিল তাই আর করালাম না। রোগী বাসায় গেল। 

২ দিন পর রোগী হাসপাতালে ভর্তি হল, রোগীর তেমন কোন উন্নতি নেই, C/S দেখার পর এ্যান্টিবায়োটিক পরিবর্তন করব, ভাবলাম কিডনি কেমন আছে দেখি, আগের রিপোর্টটা খুজে পেলাম না, তাই কিডনির পরীক্ষাটা করতে দিলাম, রিপোর্ট আসার পর আমার কোনভাবেই সঠিক মনে হয় নাই, কারণ S. creatinine 12 mg/dl ছিল, ল্যাবে বললাম রিপিট কর, রিপট একই আসল। 

S. electrolyes করে দেখলাম hyperkalaemia আছে। রোগীর গতকাল ডায়ালাইসিস করা হয়েছে। তাহলে এসব টেস্ট কি অকারণে করা হয়েছিল? 

শিক্ষণীয় হচ্ছে- ডায়াবেটিস/হাই-প্রেসারের রোগীর মাঝে মাঝে (অন্তত ৬ মাসে ১ বার) এবং যে কোন acute illness এ ভাইটাল অরগানগুলো চেক করা উচিত। (এই রোগীকে প্রথমেই কিডনির পরীক্ষা দিলে, রোগী বলত সামান্য জ্বর নিয়ে এলাম আর ডাক্তার এতগুলো পরীক্ষা অকারণে দিল, আর রোগী যখন খারাপ হয়ে গেল তখন রোগীর লোকের ভাষ্য- আপনি আগে কেন কিডনি টেস্ট করালেন না)।

এবার আসি পরীক্ষা-নিরীক্ষায়। আমরা সাধারণত কয়েকটি পরীক্ষাকে রুটিন বলে থাকি। এগুলো হল- CBC, RBS, S. creatinine, Urine R/E, ECG (after 40 years).

CBC করে আমরা অনেকগুলো তথ্য পাই, যেমন- শরীরে রক্তের পরিমান কেমন, শরীরে কোন ইনফেকশন আছে কিনা, ব্লাড ক্যান্সার আছে কিনা এবং platelet count কেমন, যা কমে গেলে শরীর থেকে রক্তক্ষরণ হতে পারে। যে কোন রোগীর এই টেস্ট না করে তার শরীরে সার্বিক অবস্থা বুঝা সম্ভব না।

RBS এই পরীক্ষা দিয়ে কারো ডায়াবেটিস আছে কিনা তা স্ক্রেনিং করি। ১৮ বছর পর এই পরীক্ষা বছরে অন্তত একবার করা উচিত, তবে যাদের বাবা-মায়ের ডায়াবেটিস আছে আর যাদের ওজন বেশি তাদের বছরে অন্তত ২ বার (৬ মাস পর পর) করা উচিত। 

কারো যদি ডায়াবেটিস untreated or uncontrolled থাকে তবে তার কিডনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে, হার্ট এ্যাটাক, স্ট্রোক, অন্ধত্ত্বসহ আরো অনেক জটিল রোগ হতে পারে।

S. creatinine এই টেস্ট দিয়ে আমাদের কিডনি ঠিক আছে কিনা দেখা হয়। কিডনি রোগ যত তাড়াতাড়ি ধরা পড়বে তত ভালো হবার সম্ভবনা বেশি। যাদের ডায়াবেটিস/হাই-প্রেসার আছে তাদের কিডনি নষ্ট হবার সম্ভবনা অনেক বেশি। তাছাড়া যে কোন ধরনের NSAID, কিছু প্রেসারের ওষুধ, কিছু ডায়াবেটিসের ওষুধ, বাত রোগের ওষুধ, ক্যান্সারের ওষুধ দেয়া না দেয়া, কি ডোজে দিতে হবে তা নির্ভর করে S. creatinine এর উপর। বছরে অন্তত একবার S. creatinine করা উচিত।

Urine R/E এটি খুবই সাধারণ একটি পরীক্ষা কিন্তু খুবই ইনফরমেটিভ, এটি দিয়ে প্রস্রাবের ইনফেকশন আছে কিনা, কিডনিতে কোন সমস্যা আছে কি না, কিডনিতে কোন পাথর আছে কিনা, ডায়াবেটিস আছে কিনা ইত্যাদি জানা যায়। এছাড়াও কারো কিডনিতে সমস্যা কেবল শুরু হয়েছে কিনা (যা চিকিৎসায় ভালো করা সম্ভব) তাও বোঝা যায় (প্রস্রাব দিয়ে যদি protein যায় তবে বুঝতে হবে কিডনিতে সমস্যা শুরু হয়েছে)।

ECG গত সপ্তাহে একজন ডায়াবেটিস রোগী দেখেছিলাম, যিনি ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলেন, ভেবেছিলেন ওষুধ খাবার আর দরকার নেই, তার ডায়াবেটিসের পরীক্ষা, কিডনির পরীক্ষা আর ECG করতে দিলাম। ECG তে Recent anterior MI আসল, ইকো করার পর Ischaemic cardiomyopathy আসল। ডায়াবেটিস ও হাইপ্রেসারের রোগীর বছরে অন্তত একবার ECG করা উচিত। কারণ Heart attack বয়স্ক এবং ডায়াবেটিসের রোগীর বুকে কোন ব্যথা ছাড়াই হতে পারে।

আমার নন-মেডিকেল বন্ধুদের বলছি কেউ যদি এসব টেস্ট (CBC, RBS, S. creatinine, Urine R/E, ECG) করেন, তাহলে ভাববেন না আর জীবনেও এসব করা লাগবে না। আপনি যদি আজ সব টেস্ট করেন আর কালকেই যদি আপনার বুকে ব্যথা হয় তবে আবারো ECG করতে হবে। দয়া করে ভুল বুঝবেন না। ডাক্তার যে টেস্ট করতে দেন তা আপনার জন্যই, আপনার চিকিৎসার জন্যই।

আমি আমার ছাত্র-ছাত্রীদের বলছি, তোমরা কোন রোগীকে চিকিৎসা দেবার আগে সবসময় চেষ্টা করবে রুটিন পরীক্ষাগুলো করাতে। কারণ একটা জিনিস মনে রাখবে, মেডিকেল সাইন্সে হিরো কখনি তুমি হতে পারবে না কিন্তু তোমার এক ভুলে তুমি জিরো হয়ে যাবে। রোগীকে পরীক্ষা করাতে বলবে, রোগী যদি করতে না চায়, চিকিৎসা দিবে, রোগী ভালো না হলে তোমাকে বেশি চার্জ করবে না। কারণ চিকিৎসার দরকারী পরীক্ষাতো তারা করান নাই। কিন্তু তুমি যদি পরীক্ষা না করাতে দাও আর রোগীর উন্নতি না হয় বা ওষুধের কোন সাইড ইফেক্ট হয় তবে তোমার ঘাড় ধরে বলবে আপনি কেন পরীক্ষা না করিয়ে চিকিৎসা দিলেন?

সবার জন্য বলছি আপনি আপনার টিভি, ফ্রিজ, বাইক, গাড়ি মাঝে মাঝে চেক করেন, সারভিসিং করেন, নিজের শরীরটার বছরে ১ বার সারভিসিং করেন, বছরে ১ বার CBC, RBS, S. creatinine, Urine R/E, ECG, Fasting lipid profiles করে একজন ফিজ়িশিয়ানকে দেখান। এসবের জন্য ২০০০ টাকার বেশি খরচ হবে না। নিজের জন্য বছরে অন্তত ২০০০ টাকা খরচ করুন, তাহলে ভবিষ্যতে অনেক ভালো থাকবেন।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত