ডা. তারিক আলম অনি

ডা. তারিক আলম অনি

রেজিস্ট্রার
ডিপার্টমেন্ট- এক্সিডেন্ট এন্ড ইমার্জেন্সী, 
গ্ল্যাডস্টোন হাসপাতাল। 
সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া।


২৭ অক্টোবর, ২০১৮ ১২:০৭ পিএম

লারনিং অপরচুনিটি

লারনিং অপরচুনিটি

ইমার্জেন্সিতে নাইট ডিউটি করছি। রাত ১২ টার মত বাজে। আমার সাথে এমা আর হ্যাডিন নামের আরও দুজন রেজিস্ট্রার আছে। ইমার্জেন্সি মোটামুটি ব্যস্ত। রিসাসিটেশনের দ্বায়িত্ব আমার। বাকী দুজন ফ্লোর সামলাচ্ছে। রিসাস রেজিস্ট্রারের কাজ আরামের যদি না রোগী ক্রিটিকাল হয়। রোগী ক্রিটিকাল হলে ‘খবর আছে’ অবস্থা হয়ে যায়। একটা রিসাস কেস মানেই মিনিমাম ৩/৪ ঘন্টার মাথার ঘাম ছুটে যায়।

আমার হাতে দুইটা রোগী, দুটোই মোটামুটি ম্যানেজড। আমি এই রাতে একটা ন্যুডলস বের করে গরম পানিতে ঢেলে দিয়ে নোট লিখার জন্য কম্পিউটারের সামনে বসে একটা বাংলা গান ইউটিউবে হাল্কা করে ছেড়ে দিব কিনা ভাবছি। এমন সময় শিফট লিডার শ্যারন জানালো, ‘তারিক, রেডি হও, ক্যাট ওয়ান, ব্রিদিং ডিফিকাল্টি, কামিং ইন টেন মিনিটস।’

মনে মনে ভাগ্যকে দুটা গালি দিলাম। এমা আর হ্যাডিনকে ডাকলাম। দুজন নার্সসহ মোট পাঁচজন নিয়ে রিসাস টীম রেডি করে কাজ ভাগ করলাম। কম্পিউটারে মিউজিক ছাড়া গেল না তবে ন্যুডলসের গরম পানি বন্ধ করলাম না। কাজ করতে করতে দেখেছি, প্রচন্ড ব্যস্ততার মধ্যেও খাবার খাওয়ার সময় ঠিক বের করে নেওয়া যায়। আর খাওয়ার জন্যই তো বেঁচে আছি নাকি? পেট ঠান্ডা তো মাথা ঠান্ডা, মাথা ঠান্ডা তো দুনিয়া ঠান্ডা!

রোগী এম্বুলেন্স থেকে নামল। মোটামুটি ৩৫ বছরের ১৩০-১৪০ কেজি ওজনের এক বিশালদেহী যুবক। পানি থেকে তোলা কাতলা মাছের মত লাফাচ্ছে আর শ্বাসকষ্টে খাবি খাচ্ছে। কোন হিস্ট্রি নেই। দুই ঘন্টা আগেও সম্পূর্ণ সুস্থ সে এবং মোটামুটি এটা তার জীবনে প্রথম হাসপাতালে আসা- অর্থাৎ আগের কোন রোগ বালাইও নেই।

এরকম হঠাৎ শ্বাসকষ্টের সম্ভাব্য যতগুলো ইমার্জেন্সি কারণ আছে তার মধ্যে রোগীর কথা শুনে আর তাড়াতাড়ি একটা এসেসমেন্ট করে প্রথমে মনে হল- নিউমোথোরাক্স, মানে ফুসফুসের আবরনের মধ্যে বাতাস জমা। এটা খারাপ জিনিস। বেশি বাতাস জমলে ফুসফুস চুপসে গেলে আর দেখতে হবে না, যমে-মানুষে টানাটানি শুরু হয়ে যাবে।

রোগীকে বললাম, ‘তোমার অবস্থা শুনে আমার মনে হচ্ছে তোমার ফুসফুসের আবরনের মধ্যে বাতাস জেমেছে, এটা মাঝে মাঝে হঠাৎ হতে পারে। ভয় পেও না, তোমার বুকের বা পাশে ছোট্ট একটা নল ঢুকাবো, ব্যথা পাবে না, বাতাস বের হলেই ভাল বোধ করবে। তবে এর আগে কিছু পরীক্ষা করে কনফার্ম হতে হবে। আপাতত অক্সিজেন খেতে থাক।’

এখানকার প্রটোকল বেড সাইড সনোগ্রাম করা। করলাম। কপাল খারাপ। এতই মোটা রোগী যে কিছুতেই নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না আসলেই যা ভাবছি তা কিনা। আমি এখনও সেরকম এক্সপার্ট কেউ না। অগত্যা এক্সরে ডাকলাম। এক্সরে দেখেও কিছু বোঝা গেল না- সব তো মনে হল ঠিকঠাকই আছে। শ্বাসনালী ক্লিয়ার, ফুসফুস ভালই আছে, ইনফেকশন দেখছি না, হার্ট ফেল করেছে এমনও মনে হল না।

ওদিকে নার্স ট্রলি সাজিয়ে ফেলেছে- বুকে ছিদ্র করার জন্য তৈরী। হাসিমুখে বলল, ‘লেটস রক এন্ড রোল!’ 
- আমি পাংশু মুখে বললাম, ‘রক এন্ড রোল একটু পরে করি। এখনও শিওর না।’ নার্সকে দেখে মনে হল বুকে ছিদ্র করতে না পারায় তার রক এন্ড রোলটা মাঠে মারা যাওয়ায় সে যারপরনাই দু:খিত!

সব রক্ত পরীক্ষা, ইসিজি, রক্তের গ্যাস সব করে ফেললাম। সবই নরমাল। শুধু রক্তে দ্রুত শ্বাস প্রশ্বাসের দরুণ যে গ্যাসীয় পরিবর্তন তা দেখাচ্ছে। অর্থাৎ রোগীর সম্পর্কে আমার কোন আইডিয়া নেই তার সমস্যা কী। একটা ব্যাপার আমি দেখেছি, প্রায় সময়ই আমি রোগীর বা রোগের কিছু বুঝি না। এবং ব্যাপারগুলো রাতেই বেশি হয়। প্রায় সময়ই আমি চোখে মুখে কনফিডেন্স ধরে রেখে টীম লীড করতে থাকি এবং ভিতরে ভিতরে একই সাথে হতাশ এবং ভীতি বোধ করতে থাকি, কোন মানে হয়!

যাহোক রোগীর ব্যাপারে আসি। একবার ভাবলাম হার্ট এটাক না তো? ইসিজি আর রক্ত বলছে অসম্ভব। তাতে কী? খা এসপিরিন। খা কিছু ট্যাবলেট। দেখি কী হয়। কিছুই হল না। রোগী কাতলা মাছের মত খাবি খাচ্ছিল, এখন থেকে বোয়াল মাছের মত শ্বাস নেওয়া শুরু করলো।

একবার ভাবলাম নিউমোনিয়া না তো? এক্সরে, রক্ত রোগের বর্ণনা সবই বলছে না। তাতে কী? এক ডোজ এন্টিবায়িক দিলে তো আর মরবে না, উল্টো শরীরের বদমাশ ব্যাকটেরিয়া যদি কোথাও ঘাপটি মেরে বসে থেকে থাকে তাও মেরে গেল। কিন্তু কোনটা দিব? গাইডলাইন মেনে দিলাম এন্টিবায়োটিক। বোয়াল মাছের পরিবর্তন নেই। অবশ্য আশাও করিনি। ওদিকে আমার নুডলসের পানি সিদ্ধ হয়ে কমতে শুরু করেছে।

হাঁপানি না তো? খা কিছু নেবুলাইজেশন। বোয়াল মাছের পরিবর্তন নেই। ড্রাগসের এফেক্ট না তো, হলেই কী! কী দিব?

ফুসফুসের রক্তনালীতে রক্ত জমাট না তো? ইমেপসিবল। আর রোগী এই ক্রিটিকাল অবস্থায় সিটি স্ক্যান মেশিনে ঢুকবে না। ইনভসিগেশন করে ডায়াগনসিস করা যাবে না। তাতে কী? খা দুটো ইনজেকশন। রক্ত জমাট থাকলে খুলে যাবে, না থাকলে রক্ত আরও টগবগিয়ে দৌড়াবে! দিলাম ইনজেকশন। লাভ হল না। বোয়াল মাছ আগের অবস্থায় অপরিবর্তিত।

একবার ভাবলাম অনেক ব্যথা না তো? দে পেইন কিলার। নো পরিবর্তন। বাই এনি চান্স মেন্টাল কেস না তো? এংসাইটি? খা কিছু বড়ি। কোন লাভ হল না। বোয়াল মাছের মুখ হা, বুক হাপরের মত উঠানামা করে।

আচ্ছা সিভিয়ার এলার্জী না তো? যদিও একদমই অসম্ভব। এতকিছুই দিলাম, একটা এড্রেনালিন ইনজেকশনে আর কী হবে? বড়জোর একটু পালস বাড়বে, দিলাম। তাই হল, পালস বেড়ে গেল। আগে শুধু শ্বাস দ্রুত ছিল, এখন পালসও দ্রুত হয়ে গেল। নার্স শ্যারন ভ্রু কুচকে আমার দিকে তাকালো। আমি চেহারায় হাসি হাসি ভাব ধরে ব্যাপারটা চালিয়ে দেওয়ার একটা ব্যর্থ প্রয়াস চালালাম। ভাবখানা এমন, ‘আরে পালস বেড়েছে তো কী হয়েছে, শুধু দেখই না কী হয়! বসন্ত এই এসো বলে, হা হা হা!’ ওদিকে আমার ন্যুডলসের পানি এখন শুকাতে শুরু হয়েছে।

মোটামুটি সব ইমার্জেন্সি আমি ভেবে ফেলেছি- কোনটাই না। আর একটা আছে- বুকের মহাধমনী ছিড়ে যাওয়া, ওটা হলে আমার কিছু করার নেই। আমার ন্যুডলসের পানি সিদ্ধ হয়ে শুকানোর আগে রোগী উপরে চলে যাবে।

একবার ভাবলাম সবই তো করলাম। চেস্ট ড্রেইনটা দিয়ে দিব নাকি? নাহ! বেশি হয়ে যাবে। কনফার্ম ডায়াগনসিস ছাড়া রাতের বেলা বুকে ফুটা করে রক এন্ড রোল করাটা জাস্টিফাই করা যাবে না। আর এরপর কম্প্লিকেশন হলে তো কথাই নেই। যদিও প্রসিডিওর করার জন্য আমার হাত সবসময়ই নিশপিশ করে।

হ্যাডিন আর এমার সাথে আলোচনা হচ্ছিল পুরো সময়টা জুড়েই। মোটামুটি দুই ঘন্টায় আমরা এসব করেছি। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘আর কোন আইডিয়া আছে কারও মাথায়? না হলে কনসালটেন্ট ডাকি।’ দুজনই সম্মত হল যে, আমি যতরকম গুলি ছিল সব খরচ করে ফেলেছি, এবার কনসালটেন্ট ডাকা উচিত। সে গোলা বারুদ কামান নিয়ে আসুক।

প্রদীপকে (ইমার্জেন্সির কনসালটেন্ট) ডাকলাম। সে দশ মিনিটে চোখ ডলতে ডলতে হাজির। সে একটা একটা করে বলে আর মাথা নাড়ে। কিছু ওষুধ রিপিট হলো। বোয়াল মাছের অবস্থা আগের মতই। রোগীকে গলায় নল দিয়ে লাইফ সাপোর্টে দিয়ে দেয়া যায়- এটা সহজ সমাধান। কিন্তু দেওয়া যাচ্ছে না, এতে নিউমোথোরাক্স যদি থেকে থাকে খারাপ হবে। রোগীকে স্ক্যানও করা যাচ্ছে না। প্রচন্ড ছটফট করছে আর আনসেটেলড। মোট কথা আমরা স্টাক আটকে আছি।

আধা ঘন্টা ম্যানেজ করে প্রদীপ প্রথম যে কথাটা বলল, ‘হোয়াট দ্য ফাক ইজ হ্যাপেনিং?’ 
- কনসালটেন্ট যখন এই কথা বলে তখন আমি আর কী বলবো! আমি বললাম, ‘ওয়েল, এখন তুমি টীম লিডার তুমি আমাকে বল কী আমি করব।’ 
- প্রদীপ বলল, সে একা বুঝতে পারছে না। তবে এটুকু বুঝতে পারছে রোগী ক্রিটিকাল, আইসিইউ কনসালটেন্টকে ডাকতে।

সালামীকে (আইসিইউ কনসালটেন্ট) ডাকলাম। সে ঘুমের পায়জামার উপর শার্ট চাপিয়ে চোখ ডলতে ডলতে হাজির। তাকে রোগী নিয়ে চিন্তিত বলে মনে হল না। সে হাসি হাসি মুখ করে জানালো, রোগীর সেন্ট্রাল লাইন/আর্টারী লাইন কিছু করতে হলে সে করবে, তার আইসিইউতে ভর্তি করতেও তার আপত্তি নেই কিন্তু সে মাথা ঘামানোতে নেই! 

এসব লাইন ফাইন করাতে আমরাই পারি! তাকে ডাকা হয়েছে মাথা ঘামানোর জন্য কিন্তু সে শ্রম দিতে আগ্রহী। মাথা ঘামিয়ে সে তার ঘুম তাড়াতে রাজী না। তাকে ডেকে লাভ আমাদের তেমন হল না। উল্টো সে জানিয়ে দিল যদি রোগী অজ্ঞান করতে হয় সেটা কিন্তু তার কাজ না। এনেস্থেশিয়া কনসালটেন্টকে যেন ডাকা হয়। সে অজ্ঞান করা রোগী নিতে রাজী আছে কিন্তু সজ্ঞান কাউকে অজ্ঞান করতে রাজী না!

মিডল ইস্টের যত ডাক্তার আমি দেখেছি সবগুলোই এরকম ক্রিটিকাল কেন কে জানে। এরা নিয়ম কানুন সবার আগে বুঝে এবং কিভাবে মিষ্টি কথা দিয়ে চিড়া ভিজিয়ে কাউকে আপসেট না করে ঘটনার মধ্যে থেকেও নিজেরটা অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে কেটে পড়তে হয়- সেটা সবচেয়ে ভালো পারে। সে কেটেই বের হয়ে যেত, প্রদীপের কারণে পারলো না। প্রদীপ সাউথ ইন্ডিয়ান, সহজ চীজ না। শঠে শাঠ্যং!

যাহোক, বোয়াল মাছের ক্রিটিকাল অবস্থা। ডাকলাম আনেস্থেশিওলজিস্ট রিচার্ডকে। সে ব্রিটিশ কনসালটেন্ট। রিচার্ড এসেই চওড়া হাসি দিয়ে প্রথম কথা, ‘ওকে গাইজ! আমি এসে গেছি। আমরা কাকে অজ্ঞান করছি আর কেন করছি? আর আমার সাথে এয়ারওয়ে নার্স কে?’ বলে উৎসুক দৃস্টিতে আমাদের দিকে তাকালো। 

প্রদীপ পুরো অবস্থাটা বর্ণনা করতেই আনেস্থেশিওলজিস্টের মুখের হাসি নিমিষে উড়ে গেল। সে বুঝতে পারছে না তার কী করার আছে এখানে! এই ব্লাডি অস্ট্রেলিয়ার রিজিওনাল হাসপাতালে কেন সুন্দর সোফা সেট ছাড়া এই সাপোর্ট নেই, সেই সাপোর্ট নেই সেটাই তার কাছে মূখ্য হয়ে দাড়ালো। ব্রিটিশরা ইংল্যান্ডের বাইরে সারা পৃথিবীটাকেই এখনও জঙ্গল মনে করে। এটা নতুন কিছু না। প্রদীপ সেই আলোচনায় গেল না। 
- সে বলল, ‘তুমি দাড়িয়ে থাক। তোমাকে দরকার হতে পারে। রোগী ক্রাশ করলে তোমাকে লাগবে। আপাতত কফি বানিয়ে এনজয় করতে পারো, কিচেন ওদিকে।’ আমার মায়াই লাগলো। বেচারা ব্রিটিশ। ২০০ বছর রাজত্ব করেছে যে ইন্ডিয়ানদের উপর। সেও রাত দুটোর সময় বলছে, ‘দাড়িয়ে থাক, কফি খাও।’

আমরা আগের জায়গাতেই আটকে আছি। কেউই বুঝতে পারতেছি না কী করবো! আমরা রেজিস্ট্রাররা অবশ্য আর বুঝার চেষ্টাও করছি না। তিন কনসালটেন্ট উপস্থিত। আমরা কেন চিন্তা করবো! তারা মারামারি করুক, চিন্তা করুক, নিজেদের মধ্যে ভাবতে থাকুক। রাত তিনটায় এসব ভাবার জন্যই তাদের মিলিয়ন ডলার স্যালারী দেওয়া হয়। বাকী দুজন রেজিস্ট্রার (এমা আর হ্যাডিন) লোকাম ডিউটি করছে, মানে পার্ট টাইম। তাদের স্যালারী একটু কম, তারা ফ্লোর সামলাবে। আমার স্যালারী সবচেয়ে কম, তাই আমি ন্যুডলস খাবো।

তিন কনসালটেন্ট আর রোগীর ম্যানেজমেন্টের দিকেই গেল না, তিনজনই সম্মত হল- ডিরেক্টরকে জানানো দরকার। ডাকো তাকে। রাত তিনটায় ডিরেক্টরসহ (যে নিজেও একজন কনসালটেন্ট) মোট চারজন কনসালটেন্ট আর তিনজন রেজিস্ট্রার এক রোগীর বেডের চারপাশে ঘিরে দাড়িয়ে আছে এবং কেউই শিওর না রোগীর আসলে সমস্যাটা কী/কোন পরীক্ষাটাই করা মোটামুটি নিরাপদ হবে বা এখন কী করা যায়! নার্সরা একই সাথে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত এবং সবচেয়ে বেশি খুশি। ডাক্তাররা কিছু বুঝতে না পারলে তারা কেন যেন খুব খুশি হয়। আমি রোগী নিয়ে আর চিন্তিত না, আমি ভাবছি নুডুলসের পানিটা ঠান্ডা হয়ে গেলে আবার গরম করতে হবে আবার ঝামেলা।

এখন টীম লীড দিচ্ছে দীলিপ। সে সবচেয়ে সিনিয়র। সে যুগান্তকারী সমাধান বের করে ফেলেছে ভাব করে আমাকে ডাকল। 
- তারিক, রোগী কার?
- আমার। 
- বল এখন তুমি কী করবে? এটা তোমার পার্ট অব এসেসমেন্ট।
- আমার আক্কেল গুড়ুম। বলে কী? এই কেইসে বেড সাইড এসেসমেন্ট, তাও আবার রাত তিনটায়! কোন মতে বললাম, যেভাবে পারি এয়ারওয়ে, ব্রিদিং আর সারকুলেশন মেনটেইন করে যাবো। 
- সেটা তো বুঝলাম। রোগীর রোগ কী তাই বল? এখন এই রোগীকে কোথায় পাঠাবে তাই বল? 
- আমি মিন মিন করে বললাম, আমি জানি না।

গুড। এই যে তুমি জানো না এবং তুমি বুঝতে পারছো যে তোমার জ্ঞান সীমিত। এখানেই তোমার লারনিং অপরচুনিটি! 
- আমি আমতা আমতা করে বললাম, জ্বী বুঝলাম। কিন্তু লার্নিংটা কী? 
- শুনো, আমরা চারজন কনসালটেন্ট মিলেও বুঝতে পারছি না যে রোগীর প্রবলেম কী। এর অর্থ কী? 
- আমি আকাশ থেকে পড়লাম! এর আবার কী অর্থ? 
- এর অর্থ হল এই রোগীটা একটা প্রবলেমেটিক রোগী। 
- ও আচ্ছা। 

যখন এরকম প্রবলেমে পড়বে তখন এর ম্যানেজমেন্ট কী? উদ্ধার পাওয়ার উপায় কী? 
- কী? আমি জানিনা। আমার সত্যি কোন আইডিয়া নেই। 
- শুনো, যখন এরকম প্রবলেমেটিক কেস পাবে আর দেখবে যে এর আর কোন সমাধান তোমার কাছে নেই তখনও এর একটা সহজ সমাধান আছে যেটা তোমরা ভাবনি এখন পর্যন্ত। 
- আমি খুবই কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কী সেই সমাধান? 
- তখন সমাধান হল- ‘ইউ হ্যাভ টু মেক ইট সামওয়ান এলসেস প্রবলেম।’ তোমার সমস্যাটাকে অন্য কারও সমস্যায় পরিণত করতে হবে, সমস্যা আর নিজের উপর রাখা যাবে না! অন্য কেউ সমাধান করুক। এটাকে বলে কন্টিনিউটি অব কেয়ার। আমরা এখন টারশিয়ারী হাসপাতালের আইসিইউ কনসালটেন্টকে ফোন করব আর বলব আমরা যথেষ্ট মাথা ঘামিয়েছি এবং সময় দিয়েছি। আমরা অপারগ, এবার তোমরা সমাধান কর।

আমার মুখে চওড়া হাসি। রাত তিনটায় রয়াল ব্রিজবেন হাসপাতালের অন কল কনসালটেন্টকে ফোন করে সব খুলে বললাম। তার রোগী ফিরিয়ে দেওয়ার উপায় নেই। বেচারা শুনে একটা কথাই জিজ্ঞেস করল, 
- ‘সো, তোমার হাসপাতালের চারজন কনসালটেন্ট রোগী দেখেছে এবং তোমার হাতে কোন ডায়াগনোসিস নেই, এইতো?’
- জ্বী। 
- ফোনের ওপাশ থেকে কনসালটেন্ট বিড় বিড় শোনা গেল, ‘ওহ গড, দেয়ার ইজ নো গড।’ 
- রোগী কী তাহলে পাঠাবো? এয়রলিফ্ট বুক করবো? 
- ওপাশ থেকে আবারও বিড় বিড় আওয়াজ। হ্যাঁ, পাঠাও। তাড়াতাড়ি করো, শুভ রাত্রি। 
- ফোন কেটে গেল।

আমি হাসিমুখে সবাইকে জানালাম যে রয়াল ব্রিসবেন হাসপাতালের আইসিইউতে রোগীকে এক্সেপ্ট করেছে। সবাই খুশি। সমস্যা গছানো গেছে। আমি খুশি। এয়ার লিফ্ট বুকিং এবং কিছু ফোন কল সারার পাশাপাশি এবার কম্পিউটারে গান ছেড়ে আরামে নুডল্স খাওয়া যায়।

দিলীপ পুরো টীমের সবাইকে থ্যাংকস দিল এবং কনসালটেন্টদের ঘুমাতে যেতে বলে নিজেও দরজার দিকে রওনা দিল। বের হওয়ার সময় আমাদের তিন রেজিস্ট্রারের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল, ‘দেখলে কেন এত বেতন দিয়ে আমাকে রাখা হয়েছে? কনসালটেন্টরাও যা সমাধান করতে পারছিল না আমি কত দ্রুত তার সমাধান করে দিলাম। গুড নাইট বয়েজ।’

আমি ন্যুডলসের দিকে তাকিয়ে ভাবছি, ডাক্তারিটা কখনও ক্লিয়ার স্যুপের মত পরিষ্কার আবার কখনও ধোয়া ওঠা ন্যুডলসের মতই প্যাচেনো! এটাই শিক্ষা, এগুলোই লার্নিং ...।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত