ডা. মোঃ এজাজ বারী চৌধুরী

ডা. মোঃ এজাজ বারী চৌধুরী

ডায়াবেটোলজিস্ট এবং হেড অব ডায়াবেটিস সেন্টার

মুন্নু মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল


২৬ অক্টোবর, ২০১৮ ০৩:৫৪ পিএম
পর্ব- ১

একজন দ্বিতীয়ার গল্প

একজন দ্বিতীয়ার গল্প

আমি মিসেস Gray. এনাটমির মহাকাব্য, Grays Anatomy যেটা এখন শুধু লাইব্রেরিতেই শোভা পায়। সেটা পড়ার দুঃসাহস আমি দেখিয়েছিলাম৷ বন্ধুরা বলতো, এই পৃথিবীতে একমাত্র উনার স্ত্রী ছাড়া। এই বইয়ের আর কোন পাঠক নেই! তাই রাতারাতি নিজের আসল নামটি হারিয়ে আমি হয়ে গেলাম Mrs. Gray!

প্রথম প্রথম বিরক্ত হলেও একসময় উপলব্ধি করলাম, টাইটেলটা আমি উপভোগ করা শুরু করেছি৷ ক্লাশ কিংবা টিউটোরিয়ালের ফাঁকে, বন্ধুদের আমায় ঘিরে বসে পড়া এবং তাদের আবদার মেটাতে এনাটমি পড়ানোর সময়, নিজের বুকটা কেমন গর্বে ভরে উঠতো! কিন্তু নামের ছায়া যে জীবনেও পড়তে পারে এবং জীবনকে ধূসর দুঃস্বপ্নে বদলে দিতে পারে এটা কল্পনা করিনি তখনো৷

দুই.
ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনাকে ধ্যানজ্ঞান করে বেড়ে ওঠা এই আমি, হৃদয়ে কোনদিনও কারো প্রতি দুর্বলতা অনুভব করিনি৷ ক্লাশের প্রথম স্থানটিই ছিলো আমার একমাত্র ভালোবাসা, যাকে আমি কখনোই হাতছাড়া হতে দিতাম না৷ বান্ধবীদের কাছে শুনেছিলাম আমাদের ব্যাচেরই এক ছেলে সজীব আমাকে খুব পছন্দ করে৷ কিন্তু অর্থহীন সেই প্রসঙ্গ আমাকে কৌতূহলী করে তুলতে পারেনি৷ তবে অবাক হয়েছিলাম হঠাৎ করেই সজীব পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থানটি দখল করা শুরু করলো অনেকটা ধূমকেতুর মতোই৷ বান্ধবীরা বলাবলি করা শুরু করলো, এখন তো তোর কাছাকাছি চলে এসেছে এবার তো একটু খেয়াল কর৷

তিন.
ভর্তি পরীক্ষায় নিজের স্বপ্নের মেডিক্যালে চ্যান্স পেলাম না৷ জীবনে প্রথম ব্যর্থতার ধাক্কায় দিশেহারা হয়ে পড়লাম৷ তবে হারও মানলাম না৷ ভর্তিই হলাম না কোথাও৷ দ্বিতীয়বার সফল হয়ে ভর্তি হলাম স্বপ্নের মেডিক্যাল কলেজে৷

সজীব কিন্তু প্রথমবারেই চ্যান্স পাবার সুবাদে, ঐ মেডিক্যালে আমার বড় ভাই হয়ে গেলো৷ নিজ থেকেই আমার কাছে আসতো, বিভিন্ন টিপস নিয়ে এবং পড়াশোনায় গাইড করার অজুহাতে৷ পড়াশোনার চাপে নিজের চেহারার প্রতি তেমন একটা যত্ন নিতে না পারলেও অনেক ভীড়ের মাঝে আলাদাভাবে চোখে পড়ার মতো দেখতে আমি৷

মেডিক্যালে আমার প্রতি আমার সহপাঠী এবং সিনিয়র ভাইদের অতিরিক্ত কেয়ারিং এবং ভাব জমানোর চেষ্টায় অতিষ্ট হয়ে উঠতে লাগলাম৷ এবারও রক্ষা করলো সেই সজীব৷ কেমন করে যেন সব মহলে রটিয়ে দিলো, ‘We are in a relationship.’ শুনে প্রথমে খুব রেগে গিয়েছিলাম আমি এতো বড় মিথ্যা রটনা, তাও আমার নামে! ক'দিনের মধ্যেই টের পেলাম, ছেলেদের মনোযোগ আমার প্রতি কমতে শুরু করেছে! আমি স্বস্তির সুবাতাস উপভোগ করা শুরু করলাম৷

চার.
দিন গড়াতে লাগলো৷ সজীবের সাথে বন্ধুত্ব তৈরী হলো কিন্তু ওর প্রতি ভালোবাসা অনুভব করতাম না কখনো৷ প্রথম দুই প্রফে প্লেস করলাম৷ ফিফথ ইয়ারে যেয়ে কি যে হলো আমার! প্রেমে পড়লাম আমাদের তিন ব্যাচ সিনিয়র কবীর ভাইয়ের৷ উনিও সাড়া দিলেন৷ শুরু হলো আমার নতুন এক জীবন। যে জীবনের পরতে পরতে রোমান্স আর সুখের অনুভূতি৷ তাকে কয়েক ঘন্টা না দেখে কেন থাকতে পারি না, তার গলা না শুনলে কেন মেজাজ খিটখিটে হয়ে থাকে, তার সাথে কাঠফাটা রোদে হাঁটতেও কেন এতো ভালো লাগে। এসব রহস্যগুলোর কূল কিনারা মেডিক্যাল সাইন্সের কোথাও খুঁজে পেতাম না৷

এরপর ফাইনাল পরীক্ষাতেও যথারীতি প্লেস করে ডাক্তার হলাম৷ যে জীবনে কখনো কাউকে ভালোবাসতে পারবে বলেই বিশ্বাস করতো না, সেই বিয়ের স্বপ্নে বিভোর হয়ে গেলো!

পাঁচ.
কিন্তু কবীর আরো বছরখানেক সময় চাইলো৷ আমি আপত্তি করিনি৷ মন দিয়ে ইন্টার্নি করতে থাকলাম৷ কবীরও ব্যস্ত থাকতো পড়াশোনা নিয়ে৷ তাই, অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমাদের দেখা সাক্ষাৎ কমে যেতে লাগলো৷ কিন্তু ফোনে কথা হতো প্রতিদিন৷ ওর সাথে আধা ঘন্টা কথা বললে, ৬ ঘন্টা ঘুমের ফ্রেশনেস অনুভব করতাম আমি!

আমার ইন্টার্নির শেষ দিকে এসে একদিন কবীর বললো, দিন পনেরোর জন্য দেশের বাইরে যাবে কোন এক ট্রেনিংয়ে৷ এই কদিন আমাদের কোন যোগাযোগ হবে না৷ আমি অবাক এবং কিছুটা ব্যথিত হলাম৷ বিদেশ যাবার একদম আগের দিনই আমায় জানাতে হলো কেন?

এর সপ্তাহখানেক পরের কথা৷ আমি তখন ওয়ার্ডে রোগী দেখছি৷ আমার এক বান্ধবী হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে একরকম জোর করেই আমাকে বাইরে নিয়ে গেলো৷ অনেক সংকোচ আর বিস্ময় নিয়ে বললো, কবীর ভাই বিয়ে করেছে৷ আমি প্রথমে ঠিকমতো বুঝলাম না৷ বললাম, কোন কবীর ভাই? যখন বুঝলাম, তখন আমার অনুভূতি কী হয়েছিলো নিজেও মনে করতে পারি না৷ সব যেন মিথ্যে হয় মনে মনে প্রার্থনা করতে করতে ওকে ফোন দিলাম৷ এরপর আবার এভাবে দিতেই থাকলাম৷ কিন্তু প্রত্যেকবারই একই উত্তর পেলাম, ‘আপনার ডায়ালকৃত নম্বরে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

ছয়.
আমি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লাম৷ ঠিকমতো খেতাম না, ঘুমাতাম না, হাসপাতালে যাওয়াও বন্ধ করে দিলাম৷ কেউ আমাকে সান্ত্বনা দিতে আসলে, প্রচন্ড রাগ হতো৷ পৃথিবীর সকল পুরুষকেই মন থেকে ঘৃণা করা শুরু করলাম৷ একমাস পর আমার হোস্টেলের ঠিকানায় একটি চিঠি আসলো৷ চিঠিটা ছিলো অনেকটা এরকম-

প্রিয় নাবিলা।

জানি, অনেক কষ্টে আছো তুমি৷ তবুও দয়া করে পুরো চিঠিটা পড়ো আরেকটু কষ্ট করে৷

পারুলের সাথে আমার প্রেম ৭ বছর ধরে৷ তুমি আমার জীবনে আসার কিছুদিন আগে, তুচ্ছ কিছু বিষয়ে ভুল বুঝে সে আমাকে ছেড়ে চলে যায়৷ খুব কষ্টে ছিলাম আমি৷ তাই তুমি যখন আমার জীবনে আসতে চাইলে, না করতে পারিনি৷ আমাকে তুমি অনেক ভালো রেখেছো সেজন্য তোমার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ৷ কিন্তু কেন জানি না, সবদিক থেকে সেরা হওয়া সত্ত্বেও, তোমাকে আমি পারুলের জায়গাটা দিতে পারিনি৷ মাঝে মাঝে বলতামও, তুমি আমার সেরা বন্ধু। কিন্তু কথাটার মর্মার্থ তুমি কখনোই বোঝোনি বা বুঝতেও চাওনি৷ আর আমার অপরাধ, তোমাকে পারুলের কথাটা বলতে না পারা। মৃত অতীত টেনে নিজেদের সম্পর্ক নষ্ট করতে চাইনি বলে৷

কিছুদিন আগে পারুল আবার আমার জীবনে ফিরে আসে এবং সবকিছুর জন্য ক্ষমা চেয়ে, ঘর বাঁধতে চায়৷ আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না৷ কোটিপতি বাবার একমাত্র মেয়ে পারুল৷ আর আমার ভেতরেও দ্রুত ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন৷ তাই পারুলের বাবার অফার আমি ফেরাতে পারিনি৷ ঢাকায় ফ্ল্যাট-গাড়ী, পৃথিবীর যেকোন দেশ থেকে ডিগ্রী এবং ডিগ্রী কমপ্লিট হবার আগ পর্যন্ত সংসারের যাবতীয় খরচ। আমার স্বপ্নের চেয়েও অনেক অনেকগুন বেশি!

আমার ব্যাচের অন্যান্য যারা বিয়ে করেছে তাদের মতো দিনরাত পরিশ্রমে ধুঁকে ধুঁকে সংসার চালানো আর ক্যারিয়ারে পিছিয়ে যাওয়া আমার কাছে দুঃস্বপ্ন বলে মনে হয়৷ তুমি ভালো ছাত্রী, বাস্তববাদী এবং সাদা মনের মেয়ে৷ আমার চেয়েও অনেক ভালো ছেলে তুমি অবশ্যই পাবে৷ অনেক ওফারের ভীড় থেকে প্রতিষ্ঠিত কাউকে সিলেক্ট করো, যেন তোমার ক্যারিয়ারটা থমকে না যায়৷ চাকরি করে সংসার চালানোর পাশাপাশি পড়াশোনা একসঙ্গে চালাতে গেলে, কোনটাই ঠিকমতো পারবে না৷

পারুলকে বিয়ে করে নিজের ভালোবাসা, ক্যারিয়ার আর সুখ স্বাচ্ছন্দ্যকে একসঙ্গে পাওয়ার বিনিময়ে আজীবন তোমার ঘৃণার পাত্র হয়ে থাকার যে অপশনটা আমি বেছে নিয়েছি, তোমার ক্ষেত্রেও যদি এমন সুযোগ আসতো তাহলে তুমিও হয়তো এরকমটাই করতে!

তুমি শক্ত মেয়ে এভাবে ভেঙে পড়া তোমায় মানায় না৷ দরকার হলে একজন সাইকিয়াট্রিস্টের সাহায্য নাও৷ তবুও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসো তাড়াতাড়ি৷

ইতি,
তোমার ঘৃণা!

কবীরের প্রতি সমস্ত আক্রোশ চিঠিটার উপর এসে পড়লো৷ প্রথমে কুচি কুচি করে ছিড়লাম৷ তারপর আগুন দিয়ে পোড়ালাম৷ আমার মনের আগুন দিয়ে সারা পৃথিবীটা জ্বালিয়ে দিতে পারলে হয়তো একটু শান্তি পেতাম৷ যে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে দোনোমনা করছিলাম, সেটা নিয়ে ফেললাম৷ কবীরকে আমি কঠিন শাস্তি দেবো এমন আগুন জ্বালাবো ওর মনে, পৃথিবীর সব সুখ মিলেও যা নেভাতে পারবে না! হ্যাঁ, আমি আত্মহত্যা করবো৷ আমার লাশই হবে, কবীরের বিয়ের সবচেয়ে বড়ো উপহার!

সিন্ডিকেট মিটিংয়ে প্রস্তাব গৃহীত

ভাতা পাবেন ডিপ্লোমা-এমফিল কোর্সের চিকিৎসকরা

প্রস্তুতির নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

অক্টোবর-নভেম্বরে ২য় ধাপে করোনা সংক্রমণের শঙ্কা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না