ডা. শামীম আফজাল

ডা. শামীম আফজাল

যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, ইন্টার্ন চিকিৎসক পরিষদ,

শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ, কিশোরগঞ্জ


২৫ অক্টোবর, ২০১৮ ০২:১৯ পিএম

পৃথিবীর পাতায় পাতায় গল্প

পৃথিবীর পাতায় পাতায় গল্প

জানোয়ারের বাচ্চা একটা,জানোয়ারের বাচ্চা না হলে কেউ এমন করে? হসপিটালের জরুরি বিভাগের বাইরে সাদা পাকা দাঁড়িওয়ালা এক লোক জানোয়ারের বাচ্চা বলে চিৎকার চেঁচামেচি করছেন। ট্রলির ওপর একটা ২০/২২ বছরের ছেলে শুয়ে আছে। নাক মুখ দিয়ে ফেনা যাচ্ছে। অচেতন। গায়ের গেঞ্জিটায় কাদা লেগে আছে। দেখে মনে হচ্ছে এই বৃষ্টিতে কাদার মধ্যে কেউ টানাটানি করেছে।

লোকটা আবার চিৎকার দিয়ে উঠলো ‘এই জানোয়ারের বাচ্চা এখানেই মরুক’। 

কাপড় এলোমেলো হয়ে থাকা মধ্যবয়সী এক নারী এবার চিৎকার দিয়ে উঠলো, ‘নিজের ছেলেকে বারবার কেন জানোয়ারের বাচ্চা বলছেন? আমি কি জানোয়ারের সাথে ঘর করি? আপনি কি জানোয়ার?

কথাটা শুনার পর লোকটা থতমত খেলো। মাথা নুইয়ে বসে পড়লো।

বুড়ো বয়সী এক মহিলা এসে ওদের দুজনকে থামিয়ে দিলেন। ‘এখানে কি তোদের ঝগড়া করার সময়?’ 

দুজন চুপ মেরে গেলো।

কিছুক্ষণ পরপর ছেলেটা নড়েচড়ে উঠছে, জীবনের আলো নিভু নিভু, হয়তো একটু পর পর জানান দিচ্ছে আমি বাঁচতে চাই, আমার ভুল হয়ে গেছে।

টুপ টুপ বৃষ্টি পড়ছে। স্টোমাক ওয়াস টিউব নিয়ে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। এই নলটা পেটে ঢুকিয়ে বিষ বের করা হবে। ডাক্তার এসে চোখ দেখলেন। চোখের মনিটা ছোট হয়ে আছে। এই চোখে ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে যে মরতে বসেছে!

সেই চোখ দেখেও ডাক্তাররা বুঝে ফেলেন বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে? ছেলেটার মুখে নল ঢুকানো হলো, পাশে এক নারী মুখে কাপড় দিলেন। ফিসফিস করে আরেকজনকে বললেন-আহ  কী কষ্ট!

এই কষ্টের চেয়ে মরে যাওয়া অনেক ভালো। পাশে একজন পুরুষ লোক শুনে মহিলাকে ধমক দিয়ে বললেন-‘এত কথা কিভাবে বলেন, চুপ থাকতে পারেন না?’ 

মহিলাটা রাগ করে সরে গেলো মনে হলো কেউ তার গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। ছোট খাটো একটা ঝটলা হলো, মনে হচ্ছে সার্কাস দেখাচ্ছে সবাইকে একবার করে উঁকি দিতে হবে। ছেলেটা বিষ খেয়েছে, যেনোতেনো বিষ না, ধান ক্ষেতে পোকা মারার জন্য বিষ!

ছেলে মানুষ বিষ খাওয়ার বিষয়টা মাথায় আসছে না। বিষ খায় মেয়েরা, বিষ খাওয়া যতগুলো রোগী দেখেছি তার ৮০ ভাগই মেয়ে। কেউ বয়ফ্রেন্ডের সাথে রাগ করে বিষ খায় কেউ স্বামীর সাথে। একবার সন্ধ্যা ওয়ার্ডে যাওয়ার সময় বিষ খাওয়া এক মহিলা দেখেছিলাম। শ্বশুরবাড়ি আর বাপের বাড়ি নিয়ে ঝগড়া করে মুক্তির আশায় বিষ খেয়েছিল। 

ভাগ্যক্রমে মেয়েটা বে্ঁচে যায়। বিষ খাওয়ার পর যখন ওর জ্ঞান এসেছিলো, চোখ গুলো লালটুকটুকে হয়েছিলো সাবকনজাংটিভাল হেমোরেজ ডেভেলপ করেছিল। চোখের ডাক্তারকে দেখাতে এসে জিজ্ঞেস করলো-স্যার আমি কি অন্ধ হয়ে যাবো? আমি কি বাঁচবো?

যে মানুষ মরতে চেয়েছিলো সে মানুষটার চোখে মুখে আতংক দেখেছি, সে মানুষটা অন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছে, মরে যাওয়ার ভয় পাচ্ছে। কী অদ্ভুত! 

স্টোমাক ওয়াশের পর ছেলেটাকে Atropine দিয়ে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালানো হলো কিন্তু ছেলেটা বাঁচলো না। জানোয়ারের বাচ্চা বলা মানুষটাও কান্নায় ভেঙে পড়লেন। ছেলেটার প্রেমিকার বিয়ে হয়েছিলো গত দিন, একরাত ও খুব চেষ্টা করেছে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার, বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করেছে। আবেগের কাছে হার মেনে বিষের বোতল তুলে নিয়েছে, জীবনের কাছে পরাজিত হয়েছে।
.
আবেগে পড়ে কখনো বিষের বোতল হাতে তুলে নিও না, একজনের জন্য জীবন কখনো থেমে থাকে না। হয়তো সাময়িক কষ্ট হবে, এই কষ্টই একদিন তোমাকে ইস্পাত বানাবে।  এমন পরিস্থিতি থেকে সবাই ফিরে আসে না, সবাই ফেরানো যায়ও না।

এই পৃথিবীটা অনেক সুন্দর, এখানে মানুষজন মরে যাওয়ার পরও বাঁচতে চায়। এই পৃথিবীর পাতায় পাতায় গল্প থাকে। জোৎস্না রাতে তারা ভরা আকাশের নিচে গল্প করে কাটিয়ে দেওয়া যায় বছরের পর বছর। কারো জন্য কিংবা কাউকে না পেলে তুমি কখনো পঁচে যাবে না, তোমার জীবনটা অনেক দামি। 

কেউ আপনার জীবনের মূল্য না দিলেও আপনাকে তো দিতে হবে,কারণ জীবনটা যে তোমার।

Add
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না