ঢাকা      বৃহস্পতিবার ১৫, নভেম্বর ২০১৮ - ১, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. নুসরাত সুলতানা লিমা

সহকারী অধ্যাপক (ভাইরোলজি)
পিএইচডি গবেষক (মলিকুলার বায়োলজি)
ইন্সটিটিউট ফর ডেভলপিং সাইন্স এন্ড হেল্থ ইনিশিয়েটিভস।


অপাপবিদ্ধ বন্ধন

চেম্বারে রোগী দেখছি। হঠাৎ দরজায় প্রচন্ড করাঘাত। বিদ্রোহী কবিতার ‘কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙ্গে ফেল কররে লোপাট’ পঙতিটির কথাই মাথায় আসছিল তখন। কাঁচের দরজা হলেও কাগজ সাঁটানো থাকায় ওপারের মানুষটিকে দেখা যাচ্ছিলো না। অনবরত করাঘাতের শব্দে খানিক অতিষ্ঠ হয়ে রোগীর স্বামীকে অনুনয় করে বললাম, ‘দয়া করে দরজাটা একটু খুলে দেবেন?’

স্লাইডিং দরজাটির কিছু অংশ উন্মুক্ত করতেই ফাঁক গলে প্রত্যয়ী ভঙ্গীতে ভেতরে যিনি ঢুকলেন তিনি আড়াই ফুট উচ্চতার একজন ক্ষুদ্র মানব। বিশ্ব জয়ের আনন্দ উনার চোখে মুখে। ক্ষুদ্র, শুভ্র দাঁতগুলো বিকশিত করে তিনি আমার পানে তাকিয়ে হাসছেন আর অনর্থক শব্দ করছেন। রোগী ও তার স্বামী ব্যাপারটিতে খুব মজা পাচ্ছিলেন।

হঠাৎ করে ক্ষুদে মানবটি দরজার পাশেই দাঁড়িয়ে এক হাত বাড়িয়ে দিলেন। রোগীর স্বামী হাতটি ধরলে তিনি এক ঝটকায় হাতটি ছাড়িয়ে নেন এবং চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করেন।

অগত্যা আমি ওঠে গিয়ে ছোট্ট কোমল হাত ধরতেই উনি যেন কৃতার্থ হলেন। থপ থপ করে চেয়ার অব্দি আসতেই আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন দুই হাত। আবদার ও আহ্লাদ রক্ষার্থে উনাকে কোলে তুলে নিলাম। দুহাতে আমার গলাটি বেষ্টন করে তিনি পরম নির্ভরতায় আমার কাঁধের উপর মাথা রেখে চোখ দুটি বুজলেন। উনাকে কোলে নিয়েই পূর্বের রোগীটিকে ব্যবস্থাপত্র দিয়ে বিদায় জানালাম।

মানবটির পরিচয় হচ্ছে, উনি উনিশ মাস বয়সী একজন শিশু এবং আমার নিয়মিত রোগী। প্রায় ছয় মাস বয়স থেকেই যেকোন সমস্যায় আক্রান্ত হলেই তিনি আমার দ্বারস্থ হন। এ কদিনেই আমার সাথে তার যে সম্পর্কের সৃষ্টি হয়েছে তার আসলে কোন নাম নেই। কেন যে আমাকে এত ভালোবাসেন তাও ব্যাখ্যাসাধ্য নয়। তবে এই বিস্ময় বালকটি আমার অপার্থিব আনন্দের খোরাক।

রোগী বের হতেই শিশুটির বাবা মা আমার কক্ষে ঢুকলেন। কোলে শিশুটিকে দেখে খানিক বিমূঢ় ও লজ্জিত হলেন। দুজনেই কোল থেকে নামার জন্য তাকে যত অনুনয় বিনয় করেন উনি তত শক্ত করে আমাকে আঁকড়ে ধরে আমার বুকের সাথে মিশে যান। অগত্যা কোলে নিয়েই উনার রোগের উপসর্গগুলো শুনি আর শারীরিক পরীক্ষা করি।

এবার বিদায়ের পালা। কিন্তু উনি কোল থেকে নামবেন না। বাবা মা জোর করছেন তবুও না। এদিকে চেম্বারের সময় পেরিয়ে গেছে ২০-২৫ মিনিট। উনারা বারবার আমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছেন। আর শিশুটিকে বকছেন। শিশুটিও তার স্বরে চিৎকার করছে আর আমাকে আঁকড়ে ধরে আছে শক্ত করে। এবার আমি মুখ খুললাম। যাও সোনা। মায়ের কাছে যাও। এক্ষুণি দোকান বন্ধ হয়ে যাবে। তারপর অন্ধকার হবে। আমরা সবাই ভয়েই মরে যাব।

শিশুটি কী বুঝলো জানি না তবে বন্ধন কিছুটা আলগা হলো। আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি দিলো আর গালে একটা চুমু খেল। তারপর নির্দ্বিধায় মায়ের কোলে চলে গেল। আমিও ওর কপালে চুমু খেয়ে বিদায় জানালাম। এটা কিন্তু তার নিত্য দিনের ঘটনা।

বাসায় ফিরতে ফিরতে ভাবছি, আত্মীয়তার বন্ধনহীন এই সম্পর্কের কী আসলে কোন নাম বা সংজ্ঞা আছে? আমার প্রতি এই দেব শিশুটির অমোঘ আকর্ষণ কী ব্যাখ্যাতীত নয়? এর চাইতে অকৃত্তিম, নিষ্পাপ, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর কি কিছু হতে পারে?

মহাজাগতিক সফরের এই ক্ষুদ্র পরিভ্রমনে বিধাতার কাছে আমার আর কিছুই চাওয়ার নেই। আমি পরিতৃপ্ত, আমি কৃতজ্ঞ। 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

প্রতিবছর রেসিডেন্সির রেজাল্ট দিলে আমি দেখতে চেষ্টা করি কোন ছেলে চান্স পেলো…

চাতক চাতকী

চাতক চাতকী

গাইনী আউটডোরে দেখতাম প্রায়ই রোগী আসে এবরশন করানোর জন্য। কখনও আসে কিভাবে…

সফল হওয়ার উপায়

সফল হওয়ার উপায়

মেয়েটির বয়ফ্রেন্ড নেশায় মত্ত। সারাদিন এ নিয়ে ঝগড়া হয়। কী করণীয় পরামর্শ…

মেয়ের বাবা ও ডাক্তারের গল্প

মেয়ের বাবা ও ডাক্তারের গল্প

ফ্ল্যাটের এক আঙ্কেল সরকারি এক ব্যাংকের রিটায়ার্ড উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ভদ্রলোককে আমি বেশ…

এনেস্থেশিয়া ছাড়া অপারেশান!

এনেস্থেশিয়া ছাড়া অপারেশান!

আম্মা বড় রকমের সার্জন, তার সামনে ডাক্তারি বিদ্যা জাহির করা কখনো খাটে…

আনন্দ বেকারি!

আনন্দ বেকারি!

আমাদের সময় ইন্টার্ন প্রশিক্ষণ ছিল ছয় মাস মেডিসিন বাকি ছয়মাস সার্জারি/গাইনি এন্ড…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর