ঢাকা      মঙ্গলবার ১৩, নভেম্বর ২০১৮ - ২৯, কার্তিক, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. মনিরুল ইসলাম

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল


শব্দযুদ্ধ?

ভদ্র মোরা, শান্ত বড়ো,
পোষ-মানা এ প্রাণ
বোতাম-আঁটা জামার নীচে
শান্তিতে শয়ান।" 

কবিগুরু চিরকাল সমকালীন, হয়তো সেটা অন্য শহরের, অন্য গ্রহের, অন্য সময়ের জন্য সত্য। আমি যাদুর শহরের কথা বলছি। এ শহরেও প্রাণ আছে,দু কোটির ও বেশি। প্রাণ পোষ মানা দুরের কথা বেরিয়ে গেলেই বাঁচে। বোতাম-আঁটা জামা আছে কিন্তু শান্তিতে শয়ান?? আজব! 

এ শহরের প্রতিটা রাস্তায়, প্রতিটা গলির চিপায় যুদ্ধ চলছে। যার যতটুকু আছে সবটুকু নিয়েই সে লড়ায়ে বিজয়ী হতে চায়। সকাল দুপুর কি গভীর রাত, একইরকম একইভাবে।অবিরাম অবিরত, শীত বর্ষা কি আহারে আজি এল বসন্ত। 

একটু সকাল হলে ঘুম ভাঙে হকারের প্রচন্ড শব্দে, সে শব্দ মাইকের শব্দের চাইতে কোনো অংশে কম নয়।খুব অদ্ভুত, এই যুদ্ধময় শহরে টিকে থাকার প্রয়াসে তার কণ্ঠস্বর হয়েছে যেনো বন্দুকের গুলি। ইলিশ মাছ থেকে শুরু করে মাছ কাটার ছাই, সব কিছুই হকারী করে বিক্রি হয়।পৃথিবীর এমন কিছু বাকি নেই এই হকারের তালিকায়।

কেউ কেউ আবার হ্যান্ড মাইকে ডাকতে শুরু করে,।আর ইঁদুর মারা বিষ, ছারপোকা তেলাপোকা থেকে শুরু করে বাতের ব্যাথার ওষুধ, ওসব গল্প সবার জানা শব্দ যুদ্ধের একেকজন বীর যোদ্ধা। এ শহরের গলির যোদ্ধা। সকাল থেকে শুরু হওয়া এ যুদ্ধ সন্ধ্যা নামলে কিছুটা গতি হারায়। বিকালে গলির রাস্তাগুলা যেনো একেকটা মিরপুর স্টেডিয়াম। এই বাচ্চাগুলাও শব্দযুদ্ধের অংশীদার। এরপর বিভিন্ন ছোট বড় গ্রপের ভাইদের দখলে রাতে ঘুমানোর আগ পর্যন্ত সে যুদ্ধ চলতে থাকে। অবশ্য সন্ধ্যা নামার আগে মাঝে মাঝে উঠতি প্রেমের রাজকাহিনী ও চলতে থাকে, সংগত কারণেই এরা শব্দযুদ্ধের পরাজিত সৈনিক!
 নদী যেমন সাগরে মিশে, এই গলি গিয়ে মিশে যায় শাখা সড়কে।যদিও সেগুলো রিকশা চলাচলের উপযোগী কিন্তু সেখানে বাস ট্রাকও চলে। হাইড্রলিক হর্ণের রণক্ষেত্র, যদিও মহামান্য হাইকোর্টের আদেশ গাড়িতে লাগানো যাবেনা হাইড্রলিক হর্ণ!আমাদের একমাত্র মেগাসিটির প্রায় সকল সম্মানিত নাগরিক সে নিয়ম অমান্য করে থাকেন। অকারণ বাজাতে থাকে অধিকাংশ সময়, শব্দঋণের বোঝা পরিশোধ অবশ্যই কর্তব্য।

শাখা সড়ক থেকে আরেকটু দুরে, সেন্ট্রাল রোড? ওখানে কী অরাজকতা চলতে থাকে সেটা আর না বলাই ভালো। দেখে যেনো মনে হয় কেয়ামত আর কয়েক সেকেন্ড বাকি! ডিজিটাল ট্রাফিক কন্ট্রোল বদলে দড়ি বেধে যেখানে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করতে হয় সেখানে শব্দ কমানোর চিন্তা করাটা বোকামি। 

উপরি পাওনা উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়নমুখী শব্দের মিছিল।অবশ্য যে কোনো মিছিল ই শব্দযন্ত্রের পরীক্ষার, ইদানিং হাজার বাইক একসাথে হর্ণ বাজিয়ে শোডাউন করার সংস্কৃতি চলমান, ট্রাফিকে একটু দেরি করলে একসাথে সমর যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েন শব্দকে সংগে নিয়ে, কখনো আবার ফুটপথ ও দখলে নিতে যায়। সব করা যায় এ শহরে! 

এ যুদ্ধের তালিকা থেকে বাদ যায়না গায়ে হলুদ বার বি কিউ অথবা অন্য সামাজিক (?) অনুষ্ঠান।উচ্চস্বরে বাজতে থাকে অদ্ভুত সুরের সব গান। খোদ রাজধানীতেও ফকির দরবেশের অভাব নেই। অলিপুরী থেকে দেওয়ানবাগ,খাজাবাবার নাম নিয়ে চলতে থাকে রাতভর শব্দের খেলা। মসজিদের শহর ঢাকা, শহরের অলিতে গলিতে মসজিদ। সম্মানিত মুয়াজ্জিনের সুমধুর ধ্বনি ঘরে ঘরে পৌছানোর জন্য রয়েছে বিদ্যুতের প্রতিটা খুটিতে মাইক এবং লাউডস্পিকারের সর্বোচ্চ প্রয়োগ। শব্দযুদ্ধের ব্যাপ্তি কতটা গভীরে সহজেয় অনুমেয়। 

গাণতিক হিসাব, কোথায় কত ডেসিবেল, কত থাকা উচিত এসব আলোচনা করার জন্য শীততাপনিয়ন্ত্রিত সুশীলের অভাব নেই। হয়তো তাঁদের গাড়িতেও পাবেন হাইড্রলিক হর্ণ। ছোটবেলায় শব্দদূষণের ক্ষতিকর দিক নিয়ে একটা রচনা লিখতে হতো। গরু রচনা লেখার মত সেটাও আজ বোধ হয় অপাংক্তেয়। আর রাস্তা পার হয়ে বাসায় গিয়ে বউয়ের বাজারের লিস্ট মিলয়ে ওসব নিয়ে ভাবার আসলেই সময় কই?

এই শব্দযুদ্ধে এখনও যারা কর্ণকুহরে কিছুটা শুনতে পান তারা ভাগ্যবান, আপনার জীবন প্রায় শেষের পথে। বাচ্চার কথা মনে আছেতো? এই তিন থেকে চারগুণ বেশি শব্দের অনরবত জীবন ভবিষ্যতে কী প্রভাব ফেলবে?? সেদিন হয়তো খুব বেশি দুরে নয় যেদিন বধির সম্প্রদায়ের জন্য আলাদা মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে।এখন প্রতিদিন প্রায় ৫-৭% আউটডোর রোগী শব্দযুদ্ধে আক্রান্ত, এটা কেবল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব।ঢাকা শহরের অন্য সব হাসপাতালের অবস্থা একইরকম। 

ড. মুহাম্মদ লুৎফর রহমান বলে গেছেন বাঙালীর তিনটা হাত। তবে তৃতীয় হাতটির ব্যবহার আমরা বেশি করতে পছন্দ করি। আর সবকিছুতে সরকারের ব্যর্থতা দেখতে পাওয়া লোকের সংখ্যাই বেশি। উনারা তারাই যারা একটা দিয়াশলায়ের কাঠি বাচাতে গ্যাসের চুলা বন্ধ করে না।

আর সরকারি মাল বলে একটা কথা প্রচলিত আছেই।পৃথিবীর কোনো সরকার কোনো আইন হয়তো পারবেনা এ শহরের শব্দযুদ্ধ বন্ধ করতে। এই রাজপথ,লক্ষ কোটি মুমূর্ষুর এই কারাগার"একদিন এই রাজপথে শব্দবোমায় সন্ধ্যা নামবেনা, এই যাদুর শহরে বধির প্রজন্মের আশংকা থাকবেনা,এ আশাটুকু রাখতে চাই।শব্দ দূষনের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসবে এ শহর, অধিকাংশ সময় অকারণ হর্ণ দেওয়ার অভ্যাসটা বদলাবে।

শব্দমিসাইল বন্ধ হোক সবখানে, প্রিয়তমার গোলাপের মত স্নিগ্ধ হোক শহর।
 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


সম্পাদকীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সন্তানকে প্রাইভেট মেডিকেলে পড়াতে চান?

সন্তানকে প্রাইভেট মেডিকেলে পড়াতে চান?

অনেকেই প্রাইভেট মেডিকেলে ভর্তি হতে চান। বিশেষ করে তাদের অভিভাবকগণ তাদেরকে ডাক্তার…

বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষার আইন প্রশ্নে হাইকোর্টের রিট, বাংলাদেশ কি প্রস্তুত?

বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষার আইন প্রশ্নে হাইকোর্টের রিট, বাংলাদেশ কি প্রস্তুত?

থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষার আইন করার বিষয়ে রিটে রুল জারি…

যৌথ পরিবার টু একক পরিবার, নিউরোমেডিসিন কী বলে?

যৌথ পরিবার টু একক পরিবার, নিউরোমেডিসিন কী বলে?

ময়নসিংহের একটি যৌথ পরিবারকে নিয়ে ফিচার করা হয়েছিলো ‘ইত্যাদি’ তে। বৃদ্ধ আব্দুর…

থ্যালাসেমিয়া নিয়ে ন্যাশনাল পলিসি গ্রহণের দাবি

থ্যালাসেমিয়া নিয়ে ন্যাশনাল পলিসি গ্রহণের দাবি

মানুষ যতক্ষণ না জানছে থ্যালাসেমিয়া কী, কেন হয় ততক্ষণ বিয়ের আগে রক্ত…

পৃথিবীর রহস্যময় বিজ্ঞানী কারা?

পৃথিবীর রহস্যময় বিজ্ঞানী কারা?

পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত অসম্ভব বলে যা কিছু আছে, তার মধ্যে একটি হল…

মেধাবীদের রাজনীতিতে আসা উচিত

মেধাবীদের রাজনীতিতে আসা উচিত

  অষ্টম শ্রেণীতে ভিত্তি পরীক্ষার জন্য গ্রাম থেকে চাঁদপুর মফস্বল শহরে যাই।বাংলা পরীক্ষায় রচনা…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর