ঢাকা      বৃহস্পতিবার ১৫, নভেম্বর ২০১৮ - ১, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. নুসরাত সুলতানা লিমা

সহকারী অধ্যাপক (ভাইরোলজি)
পিএইচডি গবেষক (মলিকুলার বায়োলজি)
ইন্সটিটিউট ফর ডেভলপিং সাইন্স এন্ড হেল্থ ইনিশিয়েটিভস।


ভাগ্যের নির্মম পরিহাস

২০১০ সালের জুন মাসে ঘটে যাওয়া নিমতলী ট্র্যাজেডির কথা কি মনে আছে? গভীর রাতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে প্রায় দেড়শত প্রাণহানী হয়েছিল। যারা বেঁচে আছেন তাদের খবর আর কে-ই বা রাখে।

২০১৭ সালে শিশু হাসপাতালে আমার পিএইচডির কাজের জন্য স্যাম্পল কালেকশন করতে গিয়েছি। টার্গেট গ্রুপ হচ্ছে থ্যালাসেমিয়া রোগী। প্রত্যেকেই নিতান্ত দরিদ্র। অনেকেই হয়তো জানেন এই রোগীদের নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনের জন্য শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে লৌহ (আয়রন) জমা হয়। ফলে খুব দ্রুত অঙ্গগুলো অকেজো হয়ে পড়ে এবং রোগীর মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে। এই জমাকৃত লৌহ দূর করার ও চিকিৎসা আছে যাকে বলে আয়রন চিলেটিং এজেন্ট, যা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। 

শিশু হাসপাতালে আগত থ্যালাসেমিয়া রোগীরা এতই দরিদ্র যে তারা নিয়মিত রক্ত সঞ্চালনই করতে পারে না, আয়রন চিলেটিং ওষুধ তো দূরের কথা। ফলে অতি অল্প বয়সে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে।

যাহোক, মূল গল্পে ফিরে আসি। ওই হাসপাতালেই একজন ৮ বছর বয়সী থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত শিশুকে পেলাম। নিতান্ত দৈন্যদশা। অত্যন্ত রুগ্ন, ফ্যাকাশে, শ্বাস প্রশ্বাসের গতি দ্রুত। পেটটা ফুলে আছে। চোখ দুটি হলুদ।

মা-কে জিজ্ঞাসা করলাম, বাবুর বাবা কী করেন?
- মহিলা ঝরঝর করে কেঁদে ফেললেন। বললেন, ‘ম্যাডাম আমগো অবস্থা খারাপ ছিল না। পোলার বাপে যা আয় করতো তা দিয়া দুইটা ডাইল ভাত খাইয়া ভালোই ছিলাম। দুইটা মাইয়া আর একটা পোলা নিয়া আমার সুখের সংসার ছিল। নীমতলীর আগুন আমার সব শেষ কইরা দিল। আমার বড় দুইটা মাইয়া আর ওগো বাপে আগুনে পুইড়া মারা গেল। বাইচা রইলাম আমি আর আমাগো অনেক সখের পোলা।

বুকের ভেতরটা চিনচিন করে উঠলো। কান্না গোপন করে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘আপনার মেয়ে দুইজন কি সুস্থ ছিল?’
- বললেন, ‘ওদের কোন সমস্যা ছিল না। কী হাসি খুশী ছিল। আমার ঘরের চাঁদের আলো ছিল দুইজন। ওই সময় পোলার মাত্র ৬-৭ মাস বয়স। ভাইরে যে কী আদর করত। সারাদিন কোলে কোলে। কত বকা দিসি। তোরা পোলাটার অভ্যাস খারাপ করতাসস। পরে তো আমারই কষ্ট হইব।’
- দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, ‘তখন তো বুঝি নাই পোলার আমার এত্ত বড় অসুখ। আমারে গাঙ্গে ভাসাইয়া দিয়া হেরা শান্তিতে আছে।’

ছেলেটার শরীরে একেবারেই রক্ত তৈরি হয় না। মাসে দুইবার অন্যের রক্ত শরিরে না দিলে ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে। কিন্তু তা এই অভাগা মা যোগাড় করতে পারেন না। সন্তানটিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিরন্তর যুদ্ধ করে যাচ্ছেন তিনি।

তার আপন বোন তাকে আশ্রয় দিয়েছেন বিনিময়ে তিনি বাসার সব কাজ করে দেন। মাসান্তে যে টাকা পান তা দিয়ে সন্তানের চিকিৎসা চালান। টাকার অভাবে রক্ত ও যোগাড় করতে পারেন না নিয়মিত। বাচ্চা যখন খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে তখনই রক্ত দিতে আসেন। চিলেটিং এজেন্টের কথা আর জিজ্ঞাসাই করলাম না তাঁকে।

দেখুন এই ভদ্রমহিলা এবং তার স্বামী দুজনেই থ্যালাসেমিয়ার বাহক বলেই তাদের একমাত্র ছেলে থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছে। মনে প্রশ্ন জাগে, মেয়ে দুজন কিভাবে সুস্থ হলো? মনে রাখবেন বাহকের সাথে বাহকের বিয়ে হলে প্রতি গর্ভে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত শিশু জন্ম নেবার আশংকা ২৫% আর বাকী ৭৫% ক্ষেত্রে শিশু সুস্থ অথবা বাহক হয়ে জন্মাতে পারে। 

উল্লেখ্য, প্রথম সন্তান থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হলে আমরা কেবল বাবা মায়ের থ্যালাসেমিয়া ক্যারিয়ার স্ট্যাটাস দেখি কিন্তু যদি সুস্থ হয় তাহলে নিশ্চিন্ত থাকি। এটা ভাবিনা ২য় বা ৩য় সন্তান হতে পারে রোগী। তাই যারা সন্তান নেয়ার কথা চিন্তা করছেন তাদের সকলেরই থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না তা জেনে নেয়া একান্ত জরুরী, গর্ভের ক্রম যাই হোক না কেন।

আর যারা এখনও বিয়ে করেননি তারা অবশ্যই হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস করে জেনে নেবেন আপনি থ্যালাসেমিয়ার বাহক কি না। যদি হয়ে থাকেন তবে আরেকজন বাহককে বিয়ে করা থেকে বিরত থাকুন।

আগামী প্রজন্ম হোক থ্যালাসেমিয়া মুক্ত। 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

প্রতিবছর রেসিডেন্সির রেজাল্ট দিলে আমি দেখতে চেষ্টা করি কোন ছেলে চান্স পেলো…

চাতক চাতকী

চাতক চাতকী

গাইনী আউটডোরে দেখতাম প্রায়ই রোগী আসে এবরশন করানোর জন্য। কখনও আসে কিভাবে…

সফল হওয়ার উপায়

সফল হওয়ার উপায়

মেয়েটির বয়ফ্রেন্ড নেশায় মত্ত। সারাদিন এ নিয়ে ঝগড়া হয়। কী করণীয় পরামর্শ…

মেয়ের বাবা ও ডাক্তারের গল্প

মেয়ের বাবা ও ডাক্তারের গল্প

ফ্ল্যাটের এক আঙ্কেল সরকারি এক ব্যাংকের রিটায়ার্ড উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ভদ্রলোককে আমি বেশ…

এনেস্থেশিয়া ছাড়া অপারেশান!

এনেস্থেশিয়া ছাড়া অপারেশান!

আম্মা বড় রকমের সার্জন, তার সামনে ডাক্তারি বিদ্যা জাহির করা কখনো খাটে…

আনন্দ বেকারি!

আনন্দ বেকারি!

আমাদের সময় ইন্টার্ন প্রশিক্ষণ ছিল ছয় মাস মেডিসিন বাকি ছয়মাস সার্জারি/গাইনি এন্ড…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর