ঢাকা      মঙ্গলবার ১৩, নভেম্বর ২০১৮ - ২৯, কার্তিক, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. ছাবিকুন নাহার

মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


মুলারিয়ান এজেনেসিস: প্রকৃতির অবিবেচক খেয়াল ও প্রমিতির কান্না

প্রমিতি, বয়স- ১৬। এইচএসসি ১ম বর্ষে পড়ে। প্রাণবন্ত, উচ্ছ্বল প্রজাপতির মতো। যখন কথা বলে, মনে হয় কোথাও ঝিরঝিরে হাওয়া বইছে! ভালো লাগে শুনতে।

বান্ধুবীরা যখন মাসের নির্দিষ্ট কিছুদিন নিয়ে আকারে ইঙ্গিতে কথা বলে তখন ওর খটকা লাগে। বুঝতে পারে না। কই ওর তো এমন কিছু হয় না! তবে সে কি ভিন্নতর? কিন্তু তার সবকিছুই তো অন্য মেয়েদের মতো। শারীরিক গঠন তো অদ্ভূত সুন্দর। নিজেরই নজর লেগে যায় অবস্থা। কেউ কেউ 'মিস কলেজ' বলে, শুনেছে সে। কিন্তু ওই ব্যাপারটা শুধু তার মধ্যে নেই।

কেন? কাকে জিজ্ঞেস করবে ভেবে পায় না। এই সেদিন মা জিজ্ঞেস করেছিল, ‘কিরে প্রমি তোর পিরিয়ড কি সত্যি হয় না, নাকি মাকে লুকাস?’
- মা, কী যে বলো! যাও তো!
- মা অবশ্য সামনে থেকে চলে গিয়েছিল কিন্তু মাকে যে খুব চিন্তিত দেখাচ্ছিল! তবে কি তার আসলেই সমস্যা?

প্রমিতি তার মায়ের সঙ্গে আমার কাছে এসেছে। চোখে মুখে অজানা আশংকার ছায়া। প্রথমেই আশ্বস্ত করলাম। সহানুভূতি নিয়ে সবটুকু শুনলাম। খুব শান্ত স্বরে এবং আর্দ্র কন্ঠে বললাম, ‘আহারে মেয়ে! তুমি জানো না, প্রকৃতির কী এক অবিবেচক খেয়ালের শিকার তুমি! তোমার মাসিক হবে না কখনো মা...’

চোখের সামনে মা মেয়ে দুজনকেই রক্তহীন ফ্যাকাশে বিবর্ণ হয়ে যেতে দেখলাম। হাতটি ধরে বসালাম। ভরসা দিয়ে বললাম, শোন কেনো এমন হলো তোমার। পাঠক আপনারাও শুনুন-

প্রমিতির জরায়ু জন্মগত ভাবে তৈরী হয়নি। হ্যাঁ ঠিক শুনছেন। একে ডাক্তারি ভাষায় বলে মুলারিয়ান এজেনেসিস। আর যেহেতু জরায়ু নেই তাই মাসিক বা পিরিয়ড ও নেই! এই মাসিক না হওয়া কে বলে প্রাইমারী এমেনোরিয়ায়। এতে মেয়দের কখনো মাসিক হয় না। এমনকি বাচ্চাকাচ্চাও হয় না।

প্রথমে মা, মেয়ে কেউই বিশ্বাস করতে পারেনি। অবশ্য বিশ্বাস করার কথাও না। তারপর আলট্রাসাউন্ড করে দেখা গেল আসলেই জরায়ু নেই। তখন আর প্রমিতির চোখের দিকে তাকাতে পারি না। তবে আমি না তাকিয়েও বলতে পারি, ওর ছলছল চোখ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। জানতে চাইছে, আমার সাথেই কেন এমন হলো ম্যাম?

আসুন দেখি প্রমিতির কেন এমন হলো:
প্রমিতি প্রাইমারী এমেনোরিয়া ডিউ টু মুলারিয়ান এজেনেসিস নামক রোগে ভুগছে। এই রোগে আক্রান্ত নারীদের জন্মগত ভাবে জরায়ু তৈরী হয় না। মেয়ে শিশুর ভ্রুণ অবস্থায় মুলারিয়ান ডাক্ট থেকে জরায়ু, ফেলোপিয়ান টিউব এবং যোনি তৈরী হয়। কোন কারণে এই ডাক্ট তৈরী না হলে বা ডেভেলোপ না করলে উক্ত অরগানগুলোও তৈরী হয় না। ফলে এর সংশ্লিষ্ট কাজগুলোও করতে পারে না। যেমন- এদের মাসিক বা পিরিয়ড হয় না, বাচ্চাকাচ্চা ধারণ করতে পারে না। এমনকি কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া স্বামী সহবাসও করতে পারে না।

খুব সহজ করে বললে জরায়ু নেই তাই মাসিক নেই। জননাঙ্গ নেই তাই সহবাস নেই। প্রকৃতির এক অমানবিক, অবিবেচক প্রহশনের শিকার এরা। তবে আশার কথা ডাক্তাররা এ প্রহসনের বিরুদ্ধবাদী এবং সোচ্চার। আসুন দেখি উত্তরনের জন্য চিকিৎসা বিজ্ঞান কী যুদ্ধ শুরু করেছে।

চিকিৎসা প্রণালী:-
• কাউন্সিলং
• পড়াশোনা করে স্বাবলম্বী হওয়া
• মাসিক, বাচ্চাকাচ্চা কখনোই হবে না এটা মেনে নেওয়া।

বিয়ে করা এবং সহবাস করা যাবে?
হ্যাঁ, যাবে। সেক্ষেত্রে কৃত্রিম জননাঙ্গ তেরী করে দেয়া যায়। কিছুটা সমস্যা হলেও ৭০/৮০ ভাগ ক্ষেত্রে সহনীয় হয়।

বাচ্চা নিতে পারবে?
হুম পারবে, তবে টেস্টটিউব পদ্ধতিতে। প্রমিতির ডিম্বানু, ওর স্বামীর শুক্রাণু নিয়ে ভ্রুণ তেরী করে অন্য কারো জরায়ুতে বড় করা যায়। একে বলে সারোগেসি। সম্প্রতি শাহরুখ খানের তৃতীয় সন্তান এই পদ্ধতিতে পৃথিবীতে এসেছে।

রিসেন্ট এডভান্সড:
আলেয়ার আলো হিসাবে আছে জরায়ু প্রতিস্থাপন। অন্য কারো জরায়ু এনে প্রমিতির শরীরে প্রতিস্থাপন করে দেয়া। যদিও অনেক ব্যয়বহুল এবং উন্নত বিশ্বে হয়। জরায়ু ট্রান্সপ্লানটেশনের পর বাচ্চাও হয়েছে এমন নজিরও আছে।

শেষ কথায় আসি, কাউন্সিলিং হচ্ছে সবচেয়ে বড় ঔষধ। যদি প্রমিতিদের বুঝানো যায় যে, মাসিক, সহবাস এবং সন্তান জন্ম দেয়াই মানুষের একমাত্র উদ্দেশ্য হতে পারে না। তার জন্ম এর চেয়ে বড় কিছুর জন্য। সে পরিবার, সমাজ এবং সর্বোপরি দেশের জন্য কিছু করতে পারে।

প্রমিতিরা ভালো থাকুক মেধা ও মননে। নিজেকে ভালোবাসুক আর পৃথিবীর ভালোবাসা কুড়াক। আসুন আমরা আমাদের ভালোবাসার হাতটা বাড়াই। প্রকৃতি তাদের বঞ্চনা করেছে আমারা যেনো না করি।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

প্রতিবছর রেসিডেন্সির রেজাল্ট দিলে আমি দেখতে চেষ্টা করি কোন ছেলে চান্স পেলো…

চাতক চাতকী

চাতক চাতকী

গাইনী আউটডোরে দেখতাম প্রায়ই রোগী আসে এবরশন করানোর জন্য। কখনও আসে কিভাবে…

সফল হওয়ার উপায়

সফল হওয়ার উপায়

মেয়েটির বয়ফ্রেন্ড নেশায় মত্ত। সারাদিন এ নিয়ে ঝগড়া হয়। কী করণীয় পরামর্শ…

আনায় পর্ব- ৩

আনায় পর্ব- ৩

আমি কোনওকালেই সংসারী ছিলাম না। মা আমাকে রান্নার কোর্সে ভর্তি করেছিলেন। তেমন…

মেডিকেল কলেজ প্রসঙ্গ

মেডিকেল কলেজ প্রসঙ্গ

কয়েকদিন আগে আমার এক ফেসবুক বন্ধুর এক স্ট্যাটাস থেকে জানতে পারলাম, তিনি…

বাহকের সাথে বাহকের বিয়ে হলে কেন শিশুর থ্যালাসেমিয়া রোগ হয়?

বাহকের সাথে বাহকের বিয়ে হলে কেন শিশুর থ্যালাসেমিয়া রোগ হয়?

থ্যালাসেমিয়া বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে গেলেই কয়েকটি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। আমার…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর