ঢাকা      বৃহস্পতিবার ১৫, নভেম্বর ২০১৮ - ১, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. জোবায়ের আহমেদ

নির্বাহী পরিচালক ডা. জোবায়ের মেডিকেয়ার এন্ড প্যাথলজি সেন্টার। 


সব মৃত্যুই দুঃখের, সুখের কোন মৃত্যু নেই!

তখন আমি সিওমেক হাসপাতালের ইন্টার্ন। মেডিসিন ওয়ার্ডে রাউন্ড দিচ্ছেন প্রফেসর ইসমাইল পাটোয়ারি স্যার। একজন রোগীর বেডের কাছে গিয়ে স্যার খুব শান্ত ভাবে রোগীর দিকে তাকিয়ে আমাদের দিকে ফিরে জানতে চাইলেন রোগীর স্বজনদের কাউন্সিলিং করা আছে কিনা, এই রোগী কিছুক্ষণের মধ্যেই মারা যাবেন।

ঠিক ১০ মিনিট পরেই রোগীর মেয়ের গগনবিদারী চিৎকারে মেডিসিন ওয়ার্ড ভারী হয়ে উঠল। আমি অবাক বিস্ময়ে স্যারের শান্ত সৌম্য চেহারার দিকে তাকিয়ে আছি। একটা মানুষ পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়ে নিলেন। এই নীল আকাশ আর দেখবেন না, প্রিয়জনের মায়াবী মুখ আর দেখবেন না, স্ত্রীর হাতের এককাপ দুধ চা খেতে চাইবেন না, মা বলে প্রিয় মেয়েকে আর ডাক দিবেন না, জ্যোৎস্নাময়ী রাত কিংবা অস্তগামী সূর্যের রক্তিম লাল আভা দেখবেন না। কিন্তু স্যারের এতে কোন ভাবান্তর নেই। স্যার একজনের পর একজন রোগীকে দেখেই যাচ্ছেন।

দুই.
মেডিসিনের একা এডমিশন নাইট। কিছু রাত বিভীষিকার আরেক নাম। দুইটা ওয়ার্ড একা সামাল দিতে হত। রাতে সিনিয়র কেউ থাকতেন না। একা সব সামাল দিতে হয়। পুরুষ ওয়ার্ডে নতুন পেশেন্ট রিসিভ করতে গেলে মহিলা ওয়ার্ড থেকে ফোন সিস্টারের, অমুক বেডের রোগী এক্সপায়ার করছে।

মহিলা ওয়ার্ডে এসে ডেথ সার্টিফিকেট লিখতে লিখতে পুরুষ ওয়ার্ড থেকে কল আরেক জন এক্সপায়ার করছে। রোগী মারা যাওয়ার পর সবচেয়ে প্যাথেটিক ব্যাপার হল রোগীর স্বজনের কাছে ডেথ ডিক্লেয়ার করা। এই জীবনে কতবার সেই প্যাথেটিক ব্যাপারটার মুখোমুখি হতে হয়েছে তার হিসেব নেই।

মৃত্যু সত্য। মৃত্যু আসবেই। শুধু নির্ধারিত সময়ের অপেক্ষা। কিছু মৃত্যু মেনে নিতে আমাদের বুক ফেটে যায় কিন্তু মেনে না নিয়ে উপায় কী? মৃত্যুর সময় অসময় বলে কিছু নেই। কখন কার সময় সেটা মৃত্যুর মালিক জানেন।

তিন.
তখন কার্ডিওলজিতে ইন্টার্নশীপ প্লেসমেন্ট। শুক্রবার ছিল। আমার সাথে ডিউটিতে ছিল আমার বান্ধবী কাব্যশ্রী পাল। এত নরম ও শান্ত মনের মেয়ে আমি খুব কম দেখেছি। আমি আমার একটা পেশেন্ট যিনি একিউট মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশান নিয়ে এডমিট হয়েছিলেন, ছুটির কাগজ লিখে জুমার নামাজে গেলাম কাব্যশ্রীর কাছে ছুটির কাগজে সিএ ভাইয়ার সিগ্নেচার রাখার দায়িত্ব দিয়ে। 

২০ মিনিট পর নামাজ থেকে ফিরে দেখি রোগী লম্বা হয়ে শুয়ে আছে, সাদা বেড শীটে ঢাকা। বুকটা আতঁকে উঠল। একটু আগে যার সন্তানরা আনন্দে আত্মহারা ছিলেন প্রিয় বাবাকে নিয়ে বাড়ি ফিরবেন, নীচে গাড়ি রেডি ছিল, সেই বাবা এখন নিথর। সেই বাবার নাম এখন লাশ। সেই রোগীর স্বজনদের চেহারা আজো মনে পড়ে।

চার.
আমার দাদাভাই একবার খুব অসুস্থ হয়ে গেলেন। বাঁচার কোন আশা দেখা গেল না। উনাকে নিয়ে আমরা কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার বোয়ালিয়া গ্রাম থেকে APOLLO HOSPITAL এ রওয়ানা দিলাম। মাইক্রো বাস ছেড়ে দিল। দাদাভাইকে বিদায় দিতে উনার চাচাত ভাই হাবিব উল্লাহ দাদা এক লুঙ্গির উপর আরেক লুঙ্গি পড়েই দৌঁড় দিতে দিতে গাড়ির কাছে আসলেন। বংশের মুরুব্বি বড় ভাইকে বিদায় দিতে, দোয়া নিতে ব্যাকুল ছিলেন। হাবিব দাদার আশংকা ছিল আমার দাদার সাথে এটাই হয়ত শেষ দেখা। লুঙ্গি পাল্টানোর সময় পাননি। আমার দাদাভাই Apollo থেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেন। কিন্তু সেই হাবিব উল্লাহ দাদাভাই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন।

আমার দাদাভাই উনার জানাজার ইমামতি করলেন। বিষয়টা আমাকে আজো নাড়া দেয়। যিনি বাঁচার আশা ছিল না, তিনি বেঁচে গেলেন কিন্তু যার মৃত্যু নিয়ে আমাদের ভাবনা ছিল না তিনি যে আজরাইলের লিস্টে ছিলেন তা আমরা বুঝিনি।

পাঁচ.
কুরবানীর ঈদের ছুটি কাটিয়ে আন্তঃনগর পাহাড়িকা এক্সপ্রেসে কুমিল্লা থেকে সিলেট ফিরছি আমি ও ডা. নাবিলা। সিলেটে প্লাটফর্মে নেমে দেখা সাস্টের CSE DEPT এর সহযোগী অধ্যাপক আমাদের মামা ড. মো. খায়রুল্লাহর সাথে। মামা হাসি মুখে আমাদের কুশল জানলেন, কার্ড দিলেন, সাস্টে যেতে বললেন কিন্তু আমরা যাওয়ার আগেই মামা চলে গেলেন চিরদিনের জন্য সাস্ট ছেড়ে।

আমি ভাবছি মামার ছোট্ট পুত্র সন্তানের কথা। বাবা কী বুঝার আগেই বাবা হারিয়ে গেলেন দূরে, বহুদূরে, দূর অজানায়। কুমিল্লা থেকে ডা. নাবিলা যখন ফোনে জানালো এই বিষাদের খবর, তখন আমি নীরব হয়ে ছিলাম অনেকক্ষণ। গতরাতে উনার হাসিমুখের ছবিগুলো দেখলাম আর ভাবলাম মায়ার এই পৃথিবীর সাথে উনি কেন এত দ্রুত মায়া ছিন্ন করলেন? এখানে উনার ইচ্ছার কি কোন দাম আছে? মৃত্যুর কাছে মানুষের ইচ্ছের কোন দাম নেই।

ছয়.
মৃত্যু কত কাছে? গত ৩০ এপ্রিল বন্ধু ডা. জাবেদের সাথে রোগী দেখতে গেলাম কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের CCU তে। একটা রোগী দেখা শেষ করার আগেই ওর তিনজন রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। আমি রোগীদের অবস্থা দেখে বুঝে গেছি জনাব হযরত আজরাঈল (আঃ) আমাদের আশে পাশেই আছেন। ডাক্তারদের সকল চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ১৫ মিনিটের মধ্যে তিনজন রোগী মারা গেলেন। কিসের এই দুনিয়া? কিসের পিছনে ছুটে চলেছি আমরা?

সাত.
দুপুরে চেম্বারে বসে রোগী দেখছি। হঠাৎ মসজিদ থেকে একজন মানুষের মৃত্যুর সংবাদ মাইকে ঘোষণা হল। সাথে সাথে রোগী দেখা বন্ধ দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ হয়ে ভাবলাম। আহারে জীবন! একদিন আমার মৃত্যুর সংবাদও মাইকে ঘোষণা হবে। আজ আপনি কাঁদছেন, কাল আমি কাঁদবো। আজ আমার মা কাঁদছে, কাল আপনার মা কাঁদবে। খুব অল্প সময়, ক্ষণিকের এই জীবন। কোনদিন কারো ক্ষতি করতে নেই। কারো বিপদের কারণ হতে নেই।

আজ কাউকে বিপদে ফেলে আপনি হাসলেন অন্যায় ভাবে। কাল মহান প্রভু আপনাকে বিপদে ফেলে অন্যকে হাসির সুযোগ করে দিতে খুব বেশি সময় নিবেন না। একদিন তো চলেই যাবো এই মায়ার পৃথিবী ছেড়ে। তাই অন্যের বিপদে পাশে দাঁড়ান, সে আপনার অপছন্দের হলেও। আপনার দলের না হলেও। আল্লাহ অবশ্যই আপনার পাশে দাঁড়ানোর জন্য অনেককে পাঠাবেন। মানুষের বিপদের কারণ হবেন না অন্যায্য ভাবে।

মানুষই একমাত্র প্রাণী যে জানে তাকে মরতে হবে। তাই মানুষ মৃত্যুর প্রস্তুতি নেয়। অন্য কোন প্রাণীর সেই প্রস্তুতি নেই কিন্তু মানুষের আছে। সব মৃত্যুই দুঃখের। সুখের কোন মৃত্যু নেই। আমরা জানি একদিন আমরা মরে যাব তাই পৃথিবীটা এত সুন্দর লাগে, যদি জানতাম আমাদের মৃত্যু নেই তাহলে পৃথিবীটা এত সুন্দর লাগত না। জীবনকে দেখুন মৃত্যুর চোখ দিয়ে। তাহলে জীবন হয়ে উঠবে সুন্দর ও সুখের। তবে মরার আগে মরে যাবেন না।

Life is like an ECG.
It will go up, then down, then up again.
When it is a flat line, you are just dead.
So, enjoy your up and down in life.

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

প্রতিবছর রেসিডেন্সির রেজাল্ট দিলে আমি দেখতে চেষ্টা করি কোন ছেলে চান্স পেলো…

চাতক চাতকী

চাতক চাতকী

গাইনী আউটডোরে দেখতাম প্রায়ই রোগী আসে এবরশন করানোর জন্য। কখনও আসে কিভাবে…

সফল হওয়ার উপায়

সফল হওয়ার উপায়

মেয়েটির বয়ফ্রেন্ড নেশায় মত্ত। সারাদিন এ নিয়ে ঝগড়া হয়। কী করণীয় পরামর্শ…

মেয়ের বাবা ও ডাক্তারের গল্প

মেয়ের বাবা ও ডাক্তারের গল্প

ফ্ল্যাটের এক আঙ্কেল সরকারি এক ব্যাংকের রিটায়ার্ড উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ভদ্রলোককে আমি বেশ…

এনেস্থেশিয়া ছাড়া অপারেশান!

এনেস্থেশিয়া ছাড়া অপারেশান!

আম্মা বড় রকমের সার্জন, তার সামনে ডাক্তারি বিদ্যা জাহির করা কখনো খাটে…

আনন্দ বেকারি!

আনন্দ বেকারি!

আমাদের সময় ইন্টার্ন প্রশিক্ষণ ছিল ছয় মাস মেডিসিন বাকি ছয়মাস সার্জারি/গাইনি এন্ড…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর