জয়নাল আবেদীন

জয়নাল আবেদীন

শিক্ষার্থী, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ, ঢাকা। 


১৮ অক্টোবর, ২০১৮ ১২:২০ পিএম

‘তোমরা তো একদিন ডাক্তার হবে, কেন বুঝতে পারছ না খাবার খেতে দিলে তোমারই ক্ষতি?’ 

‘তোমরা তো একদিন ডাক্তার হবে, কেন বুঝতে পারছ না খাবার খেতে দিলে তোমারই ক্ষতি?’ 

বছরখানেক আগের কথা। আমার মুখে গুনে গুনে ৩৪টা এফথাস আলসার হয়েছে। একটা আলসারেই জীবন বের হয়ে পড়ে, ৩৪টা মানে সাক্ষাৎ গজব। তবে গজব এখানেই শেষ হলো না। কীভাবে জানি এই অবস্থাতেই মুখ থেকে নিয়ে গলা পর্যন্ত হয়ে গেল ফাংগাল ইনফেকশন। মুখে ফাংগাস হয়েছে পরিচিত এমন কাউকে এখনো পাইনি। এই জিনিস কঠিন অভিশাপ। পুরো মুখ পুড়ে যায়। মুখের মধ্যে ঝাল, লবণ, টক, গরম, ঠাণ্ডা এমনকি সাধারণ পানি পর্যন্ত দেয়া যায় না। গলা পর্যন্ত ইনফেকশন চলে যাওয়ার কারণে খাবার ঢিল দিয়ে গলায় দেয়ার উপায়ও নেই। আমার খাওয়া দাওয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেল।

দুদিন খাই না এমন অবস্থায় একদিন সিলেটের স্টেডিয়াম মার্কেটে গেলাম ডাক্তার দেখাতে। স্টেডিয়াম মার্কেটের সামনে ভাজা পোড়া খাবারের মেলা বসে। আমার মতো ভাজা পোড়া ভক্তের জন্য স্টেডিয়াম মার্কেট তীর্থস্থান। সেদিন আমি এসব খাবারের ভ্যানের সামনে দিয়ে হাঁটছি। খাবারের গন্ধ নাকে এসে লাগছে। আমার পেটে জন্মের ক্ষুধা। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো আমার চেয়ে অসহায় বোধহয় এই পৃথিবীতে আর কেউ নেই। পেটে ক্ষুধা আছে, সামনেই আমার অতি প্রিয় খাবার আছে। আমি খেতে পারছি না, আমার সেই খাবারে হাত দেয়ার উপায় নেই।

একটা তীব্র অভিমান জাগল ভেতরে। অনুভব করলাম কান্না পাচ্ছে, চোখ ভিজে যাচ্ছে ক্ষুধায়, অসহায়ত্বে, অভিমানে। আমার খুব প্রিয় মানুষ সায়েম আহমেদ ছিল আমার সাথে। আমাকে আমার মতোই বুঝতে পারা এই মানুষটা আমাকে টেনে নিয়ে চলে আসল। আমি রেখে এলাম ক্ষুধাকে অনুভব করার তিক্ত স্মৃতি।

দুই.
২০১৬ সালের ২৫ জানুয়ারী রাত। আমার কিডনি অপারেশন হয়েছে। পোস্ট অপারেটিভে হুট করেই কেন যেন শরীর খারাপ হয়ে গেল। পুরো শরীরে তীব্র ঝাকুনি, পালস ৪ গুণ বেড়ে যাওয়া, স্যাচুরেশন বিপদসীমার বহু নিচে নেমে যাওয়ার মুহূর্তে আমার স্যালাইন খুলে দেয়া হলো। কী কষ্ট আর কী যন্ত্রণা উপর দিয়ে গেছে; মৃত্যুকে কতটা কাছে থেকে দেখেছি সেটা আলোচনার বিষয় না। আমার এই জীবনের সবচেয়ে কষ্টের এক ঘণ্টা সময় শেষে অনুভব করলাম আমি ভীষণ ক্ষুধার্ত। একটা সর্বগ্রাসী ক্ষুধা পেটের মধ্যে। শরীরের প্রতিটা কোষ যেন খাবারের জন্য চিৎকার করছে।

আমার এই ভয়ানক সময়ে পাশে ছিলেন পিতৃতুল্য শ্রদ্ধার মানুষ ডা. শহীদুল ইসলাম স্যার। আমি যখন খানিকটা স্থির হয়ে গেছি, বিপদ খানিকটা কেটে গেছে।
- স্যার আমার কানের কাছে এসে বললেন, কেমন লাগছে এখন?
- আমি এক কথায় উত্তর দিলাম, আমি পানি খাব। ভাত খাব।
- স্যার জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী বেশি কষ্ট হচ্ছে?
- আমি বললাম, আমার কিছু খেতে হবে। না খেতে পারলে আমি এমনিই মরে যাব।

আমার সাথে ভয়ানক রসিকতা করা হলো। প্রথমে তুলা ভিজিয়ে জিহ্বায় আদ্র করা হলো। এর কিছুক্ষণ পর বোতলের কর্কে করে কয়েক ফোঁটা পানি। ইমারজেন্সি বিবেচনায় তখন আমার খাবার গ্রহণ নিষিদ্ধ। আমার কাছে তখন পূর্ণিমার চাঁদ নয়, সমগ্র পৃথিবীকে খাদ্য মনে হচ্ছে। মিনিটের মধ্যে দুবার সবার কাছে খাবার চাচ্ছি, কেউ দিচ্ছে না।

আমার অশান্তি দেখে এক বর্ষীয়ান সুশ্রী এনেসথেশিয়ার ম্যাডাম কাছে আসলেন। মিষ্টি করে হেসে বললেন, বাবা! তোমরা তো একদিন ডাক্তার হবা। কেন বুঝতে পারছ না এখন তোমাকে খাবার খেতে দিলে তোমারই ক্ষতি? বুঝতে পারছি তুমি কষ্ট পাচ্ছ, খুব কষ্ট পাচ্ছ। কিন্তু আমরা তো নিরুপায়। খাবার দিয়ে আমরা তোমার মতো এত সুন্দর একটা ছেলেকে নিশ্চয়ই মেরে ফেলতে পারি না, তাই না? এই অবস্থা আমাদেরও হবে। আমিও একদিন তোমার মতো বেডে শুয়ে খাবারের জন্য কাতরাব। খাবার না দিলে গালি দেব, চিৎকার করব। তুমি যদি আমার দায়িত্বে থাকো, খবরদার আমাকে খাবার দিয়ো না। সে দিন এই প্রতিশোধ নিয়ে নিও।

আমার জীবনে খুব কম মানুষকে এত সুন্দর করে কথা বলতে শুনেছি। অন্য কোনো মুহূর্ত হলো উনার কথা শুনে মুগ্ধ হতাম, এসময়ে আমার কোনো প্রতিক্রিয়াই হলো না। ক্ষুধা আমাকে জাগতিক সকল সৌন্দর্য ভুলিয়ে দিয়েছে।

রাত ১১ টার দিকে আমাকে ৩-৪ পিস পাতলা রকমেরবিস্কিট খাবার অনুমতি দেয়া হলো। মেডিকেল জীবনে আমার সবচেয়ে কাছের মানুষদের একজন রাজীব একপিস করে মুখে তুলে দিচ্ছে। আমি সব বিস্কুট এক সাথে মুখে নিতে চাই, রাজীব বাঁধা দেয়। এক সময় বিরক্ত হয়ে আমি জীবনে রাজীবের সাথে যেভাবে কথা বলিনি সেভাবে বললাম, ‘তোমার আপত্তি কই বুঝলাম না। আমি যদি খেতে গিয়ে মরে যাই, মরসি। তোমার কী আসে যায় তাতে? আমারে সবটা খেতে দাও, নইলে গালি দেব।’

আহা ক্ষুধা! মানুষ আর অমানুষের মধ্যে পার্থক্য না রাখা ক্ষুধা!

তিন. 
বহুদিন আগের কথা। দিন তারিখ মনে নেই, মনে করতেও চাই না। একটা জীবন ছিল তখন, একটা কঠিন পৃথিবী। মানুষের হিংস্রতা আর নিষ্ঠুরতা দেখার সে একটা সময়ে ক্ষুধা নিয়ে পেয়েছিলাম জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

বাবা থাকতেন দেশের বাইরে। আমাদের জন্য টাকা পাঠান, টাকা মায়ের হাতে পৌঁছায় না; তার আগেই বেহাত হয়ে যায়। কোনো একদিন ঘরের চাল ফুরিয়ে গেল। মায়ের হাতে নেই কোনো কানা কড়ি। দুপুর পেরিয়ে যাচ্ছে, রান্না হয় না। দুপুর পেরিয়ে বিকেল হলো, বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা। শৈশবে অস্বাভাবিক সুবোধ ছিলাম। মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে খাবারের কথা বলতে সাহস হলো না। পেটে তীব্র ক্ষুধা থাকলে ঘুম আসে না। সারাদিনের ছোটাছুটির ক্লান্তির কাছে একসময় ক্ষুধা হার মানল। ঘুমিয়ে পড়লাম।

রাত ঠিক কটায় ঘুম ভাঙল জানি না, চোখ খুলে দেখলাম সামনে ভাত। ধোঁয়া ওঠা সাদা ভাতের মধ্যে অপার্থিব সুঘ্রাণ। আমি খেতে ভুলে গেলাম। আমার ইচ্ছে করল তাকিয়ে থাকি, কেবলই তাকিয়ে থাকি। এক প্লেট সাদা ভাতের চেয়ে বড় সুন্দর দৃশ্য এই পৃথিবীর কোথাও নেই, ভাতের গন্ধের চেয়ে সুগন্ধ সবচেয়ে দামি পারফিউমেও নেই। একটা শিশু, একটা রাত আর ধোঁয়া ওড়া সাদা ভাত... এক জীবনের সবচেয়ে করুণ দৃশ্য, এক জীবনের সবচেয়ে মধুর দৃশ্য।

একটা ছিল বিশেষ দিবস। ফেসবুকের রঙিন, বিরহি, কবিতা-গল্পময় এই জগতে দিবসটা খুব বেশি পাত্তা পায়নি। দুএকটা সামাজিক সংগঠনের কর্মীদের কার্যক্রম ছাড়া পুরো ফেসবুক নীরব। অভিযোগের কিছু নেই। যাদের হাতে ফেসবুক চালানোর মতো একটা ফোন আছে, যারা ডাটা কিনে ইন্টারনেট ব্যবহার করার ক্ষমতা রাখে তাদের অভুক্ত থাকার সম্ভাবনা নেই। বিশ্ব খাদ্য দিবসের আবেদন এখানে এসে পৌঁছাবে না এটাই স্বাভাবিক।

দুদিন আগেই ‘নো ব্রা ডে’ নিয়ে পক্ষ বিপক্ষ মিলিয়ে বেশ সরব ছিল ফেসবুক। তার দুদিন আগে ডিম দিবস নিয়েও বিস্তর কথাবার্তা হয়েছে। নারী দিবস, বাবা দিবস, মা দিবসের মতো প্রয়োজনীয় কিংবা হাগ ডে, চকলেট ডে, কিস ডের মতো অপ্রয়োজনীয় দিবস নিয়ে আমরা তুমুল মাতামাতি করি। একটা ছবিতে তামিমের বউকে কেউ সইচ্ছায় ইমরুলের বউ বললে সেটাকে চেইনের মতো স্ক্রিনশটময় করে সস্তা হিউমারে ডুবি। আজকে আমরা নীরব। খাবার আর ক্ষুধার মতো এত বড় জিনিস আমাদেরকে স্পর্শ করেনি।

হ্যাঁ, আমিও এই পোস্ট দিতাম না যদি এই বিশেষ তিন ঘটনা আমার জীবনে না আসত। রোজা রাখা, রাগ করে না খাওয়া, কাজের চাপে খেতে ভুলে যাওয়া, জার্নিতে খাবার না পেয়ে অভুক্ত থাকা। এসব জিনিসে আমরা ক্ষুধার কষ্ট পাই কিন্তু ক্ষুধা কত কঠিন সেটা বুঝতে পারি কতটুকু? একটা নির্দিষ্ট সময় পর নিশ্চিতভাবেই খাবার পাওয়া যাবে বা চাইলেই খাওয়া যায় এই সিচুয়েশন ক্ষুধাকে সঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত করে না। যখন তীব্র ইচ্ছা এবং চোখের সামনে খাবার থাকা সত্বেও খাওয়া যাবে না, জানা যাবে না ঠিক কখন পেটে কিছু পড়বে সেই অনিশ্চয়তা জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা দিয়ে যায়।

একটা কথা প্রায়ই শুনতাম। একজনকে প্রশ্ন করা হলো তুমি হিন্দু না মুসলিম? সে উত্তর দিল, আমি ক্ষুধার্ত! ক্ষুধা হচ্ছে সেই রাক্ষস অনুভূতি যে নিজেই সবচেয়ে বড় ধর্ম, সবচেয়ে বড় জাতীয়তা, সবচেয়ে বড় সত্ত্বা। সবার উপরে এই ক্ষিধাই সত্য।

ভাতের অভাবে না পড়ার কারণে এই অনুভূতি আমাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব না। আমাদের অনেকেই জানি না এই একটা মুহূর্ত একজন মানুষকে কতটা কষ্ট দেয়, কতটা দুর্বল করে, কতটা অসহায় করে, ক্ষেত্রবিশেষে কতটা অমানুষ করে দিতে পারে। প্র্যাক্টিক্যালি জানার দরকার নেই। অন্তত একটু অনুভব করার চেষ্টা করা উচিত। এখনো এ দেশ ক্ষুধামুক্ত নয়। দেশের একটা বড় অংশ না খেয়ে দিন পার করে। এ দেশের কয়েক লাখ শিশু ভাতের স্বপ্ন দেখতে দেখতে ঘুমোয়, ভাতের আশায় ঘুম থেকে ওঠে। আমাদের আশেপাশেই এরা বাস করে। আমরা দেখি না, দেখার চেষ্টা করি না বা দেখলেও না দেখার ভান করে চলে যাই।

হয়তো বাকি জীবনে ভাতের অভাবে পড়তে হবে না আমাদের কাউকেই। জানতে হবে না এই অশ্লীল অনুভুতির নির্মমতা। তবুও একটু না হয় হাত বাড়াই। কে জানে যদি একবার পাকস্থলির ক্যান্সার হয়ে যায়; আমার কিংবা আমার প্রিয়জনের। খেতে না পারার তীব্র জ্বালা বুঝতে বুঝতে তখন কী বেশি দেরি হয়ে যাবে না?

আমরা সভ্য জাতি, আমরা সভ্য মানুষ। আমাদের চোখের সামনে দিয়ে কেউ না খেয়ে না থাকুক। কোনো বাচ্চার কান্না খাবারের অভাবে না হোক। খুব অল্প করে হলেও আমি জানি এই কষ্ট। আমি জানি এই কষ্ট বড় নোংরা, এই কষ্ট বড় আদিম। আমাদের খাবারের সামান্য ভাগেই এই নির্মমতা দূর হতে পারে।

একটু সাহায্য আর একটু সহানুভূতিতে পৃথিবীটা হয়ে যেতে পারে স্বপ্নের মতো!

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না