ঢাকা      মঙ্গলবার ১৩, নভেম্বর ২০১৮ - ২৯, কার্তিক, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. মিথিলা ফেরদৌস

বিসিএস স্বাস্থ্য

সাবেক শিক্ষার্থী, রংপুর মেডিকেল কলেজ। 


ইন্টার্ন চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে কিছু কথা

ফাঁকিবাজির মহান ব্রত নিয়ে ইন্টার্নি শুরু করেছিলাম। আমি জন্মগত ভাবেই ফাঁকিবাজ। সবাই যদি সিনসিয়ার হতো, দুনিয়া এত বৈচিত্রময় হতো না, তাই সেই মহান দায়িত্ব আমিই নিয়েছিলাম।

যাহোক, আমাদের সময় মেডিসিন সবার করতে হলেও সার্জারি আর গাইনী ছিল অপশনাল। আমি খোজ নিয়ে দেখলাম গাইনীতে প্রচুর পরিশ্রম। ফাঁকি দেয়াই যেহেতু মূল লক্ষ্য, সার্জারি নেয়াই ওয়াইজ ডিসিশন মনে করলাম। ৫ বছরের কঠোর পরিশ্রমের পর একটু বিশ্রাম দরকার। ইচ্ছা মেডিসিনে ক্যারিয়ার করবো, তাই প্রথমে মেডিসিন করবো না প্রথমে সার্জারিতে ফাঁকি দিয়েই মেডিসিন করবো ডিসিশন ফাইনাল।

কিন্তু আমি চাইলেই তো হবে না, বিধাতাকেও চাইতে হবে। সার্জারিতে আমি একমাত্র মেয়ে বাকি সব ছেলে। ফাঁকি কেমনে দিবো? সব এডমিশন ইভনিং আমার, শুক্রবার মর্নিং কেউ করবে না, জুম্মারদিন এই অজুহাতে সব ছেলে এমনকি আমার হিন্দু ফ্রেন্ডটাও আসতো না। এডমিশনে একা সব ডিসিশন আমার। বিপদের উপরে বিপদ। আমার ডিউটিতেই মারামারি করে দুই পার্টির রোগীই আসতো। একা একা স্টিচ দিতাম আর সবাইকে গালি দিতাম মনের দুঃখে।

আবার ডিউটি দেয়া হয়েছিলো ফিমেল ওয়ার্ডে, মূল ওয়ার্ড থেকে অনেকদুরে। এখানে একটা শান্তি আমার যিনি সিএ ছিলেন, খুব সিনসিয়ার ছিলেন। সকাল সাড়ে সাতটায় এসেই ফলোআপ দিয়ে টুকটাক কাজ শেষ করে রাখতেন। আমার কাজ ছিল বড় কিছু ড্রেসিং করা আর পেশেন্ট প্রেজেন্ট করা। আমি ছিলাম লিজেন্ড সার্জন প্রফেসর সোবহান স্যারের ইউনিটে। সেখানে সিএ, আইএমওদের গেরিলা ট্রেনিং হতো। উনারা স্যারকে খুব ভয় পেতেন। স্যার আবার ইন্টার্নদের কিছুই বলতেন না।

মেল ওয়ার্ডেও কেউ না আসলে সেসব আমার দেখতে হতো। রাউন্ড ড্রেসিং পুরা ওয়ার্ড জুড়ে আমার বিচরণ, স্বেচ্ছায় না। অনেকে প্রশংসা করে গাছে উঠায় মই নিয়ে চলে যেতো। ওটির দিন ফাঁকি দেয়ার জন্যে কোনও এক কোনে লুকায় থাকতাম। যেখানে আমার বন্ধুরা ওয়াস নিয়ে হাত উঠায় বসে থাকতো, সেখানে স্যাররা এসেই আমাকে এসিস্টে ডেকে নিতো। ছেলেরা বিরক্ত আমার উপর। আমি বার বার বলতাম ওটি এসিস্ট করতে আমার ভাল লাগে না। স্যারদের কথা না শুনলেও বেয়াদবি।

যাহোক এই ফাঁকে অনেক বিটলামিও করতাম। ওয়ার্ডে যেকোন কুকাজের দায়ভার আমার উপরেই বর্তাইতো। কেউ কোল্ড ড্রিঙ্কস খাচ্ছে আমাকে না দিয়ে, খাওয়ার সময়, ক্যানে ঝাকি দিয়ে দৌড় দিতাম। ইন্টার্নরুমে বন্ধুদের কেউ থাকলে বাইরে থেকে চুপ করে লক করে রাউন্ডে স্যারের পিছে দাঁড়ায় থাকতাম। খেপলেও করার কিছুই নাই।

একবার এক রোগীর লোক, এক চিঠি নিয়ে কোনও এক ডাক্তারকে খুঁজতে আসছে। চিঠির সম্বোধন, দুলাভাই। আমি চিঠি আমার এক ফ্রেন্ডকে দিয়ে বললাম, তোর চিঠি। এরপর ঘটনা ওয়ার্ডের মধ্যে ছুটাছুটি। প্রায়ই এমন চলতো। সিএ ভাইয়াদের রুমে টংয়ের মতো একটা ছোটখাটো ফাইল কেবিনেট ছিলো, আমি ওখানে বসেই আড্ডা দিতাম। প্রায় আমার ব্যাগ থেকে টাকা চুরি যেতো, তারপর ওয়ার্ডে বিশাল খানাদানা, আমাকে খাতির করে খাওয়ানো। সবই বুঝতাম কিন্তু করার কিছুই নাই।

সার্জারির শেষে আমাদের গ্রুপের দুজনকে এপেন্ডিক্স অপারেশন করতে দেয়া হলো, তার মধ্যে আমি একজন। ওটি করতে গিয়ে দুজনেই এপেন্ডিক্স খুঁজে পাই না। সার্জনের জায়গা থেকে দুজনেই এসিস্টেন্টের জায়গায়। 
- পাশের ওটি থেকে আমার বন্ধু চিৎকার, ‘কি রে কাঠবিড়ালি, এসিস্ট করিস?’
- আমি দ্বিগুণ চিৎকার, ‘তোর লজ্জা করে না সজারু? তুই নিজে কই?’
যাহোক দুজন আল্টিমেটলি এসিস্টই করে রাত সাড়ে বারোটায় গেলাম সবাইকে খাওয়াতে। স্মৃতিগুলি এখনও চোখে ভাসে।

মেডিসিনে আমি যে ইউনিটে পড়লাম, সেই সিএ আমাকে দেখে ভ্রু কুচকায় বলে, তুমি সার্জারিতে ট্রেনিং করছো?
- জ্বী।
- আমার জানামতে, ইউ আর দি অনলি লেডি হু হ্যাভ ডান সার্জারি ট্রেনিং ইন হার ইন্টার্নি পিরিয়ড!

উনার জানার সীমিত গন্ডির মধ্যে আমার বিচরণ, খুব ভয়ে ভয়ে কাজ শুরু করলাম। যেহেতু সার্জারি আর মেডিসিন প্রায় রিলেটেড, আমার সমস্যা হতো না। প্রায়ই সার্জারির কেস ডায়াগনোসিস করে সার্জারিতে পাঠাতাম। সিএ স্যার তখন খুশী। তবুও সন্দেহ। 
- একদিন ডেকে একটা ইন্টারেস্টিং কেস দেখায় বলে, মিথিলা বলো এটা কী?
- আমি হিস্ট্রি নিয়ে এক্সামিন করে দৃঢ় ভাবে বললাম, লিম্ফোমা।
একটা ইন্টার্নির জন্যে এটা ডায়াগনোসিস বিশাল ব্যাপার। স্যার খুব খুশি। সেদিন উনিই বললেন, সবারই সার্জারি জানা উচিৎ।

মেডিসিনেও আমি আরেক লিজেন্ড প্রফেসর কাজী জাহাঙ্গীর স্যারের ইন্টার্নি ছিলাম, আমার সৌভাগ্য। স্যারও, বিচিত্র কারণে আমাকে খুব পছন্দ করতেন। রাউন্ডে বাই নেমে আমাকে খুঁজতেন। অবশ্য মেডিসিনের শেষের দিকে, আর ইন্টার্নিশিপ ভাল লাগতো না। ফাঁকি দেয়া শুরু করেছিলাম। বিশেষ করে ব্রাঞ্চে ফাঁকিবাজি করেছি।

শ্রদ্ধাভরে আমার সম্মানিত শিক্ষদের স্মরণ করি, সবার খুব স্নেহ পেয়েছি। যে ব্রাঞ্চেই যেতাম সবাই উৎসাহ দিতেন। আমাকে সেই সাবজেক্টে ক্যারিয়ার করতে বলতেন। যেহেতু প্রথমে সার্জারিতে ট্রেনিং করেছি, সবাই উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতেন, আরে মিথিলাকে একমাত্র সার্জন হিসেবে মানায়। এসব গাছ আর মইয়ের ব্যাপার আগেই বলেছি। তখন বুঝিনি, এত এত পড়া আমার মতো ফাঁকিবাজের পক্ষে হজম করা কঠিন।

যাহোক, এখানে নিজের কিছু গুণকীর্তন করেছি তার একটা বিশেষ কারণ আছে। লেখাটা মূলত যারা ইন্টার্নি করছো, করবে বা যারা স্টুডেন্ট তাদের উদ্দেশ্যে সামান্য কিছু বলার চেষ্টা।
১. যে সাবজেক্টে ক্যারিয়ার করতে চাও, তা আগেই ঠিক করে ফেলবে।

২. সেই সাবজেক্টেই ইন্টার্নি শুরু করতে হবে, তা যদি ব্রাঞ্চ হয়, তার পেরেন্ট ওয়ার্ড দিয়েই শুরু করবে। 

৩. ইন্টার্নিতে খুব সিনসিয়ার থাকতে হবে। প্রতিটা কাজ নিজে হাতে করতে চেষ্টা করবে। দরকার হয় কাড়াকাড়ি করে করবে। রোগী ভর্তি থেকে শুরু করে ছাড়পত্র দেয়া পর্যন্ত প্রতিটা কাজ নিজেই করার চেষ্টা করবে। ফাঁকি দিলে নিজেই সারাজীবন ফাঁকিতে পড়ে যাবে। ইন্টার্নির মতো আদর করে জীবনে আর কোথাও কেউ শিখাবে না।

৪. মনে রাখবে ইন্টার্নি ঠিকমতো করলে, জীবনে নিজের বাবা মা ছেলে মেয়ে আত্মীয় স্বজনের চিকিৎসা নিজেই করতে পারবে। ইন্টার্নিশিপ পুরোটাই ভালভাবে করলে তুমি সবকিছু সম্পর্কেই একটা গ্রস ধারনা নিতে পারবে।

৫. ইন্টার্নিশিপ শেষ সময়টা খুব খারাপ লাগবেই, এসময় সেসব সাবজেক্টগুলিতে একেবারেই তোমার ইন্টারেস্ট নাই সেগুলি রাখতে পারো। যদিও বার বার বলেবো, কোথাও ফাঁকি দেয়া মানে তোমার নিজের ক্ষতি।

৬. পারলে ফাঁকেফাঁকে বিসিএসের পড়া এবং ডিজিস রিলেটেড পড়াশুনা এখানেই করে ফেলতে পারো।

৭. সিনিয়রদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে। জীবনের বিভিন্ন জায়গায় কে কখন কাজে দিবে বলা যায় না।

যাহোক বেশি উপদেশ দিবো না। ডাক্তারি জীবন নিয়ে কোনও হতাশার কথা বলবো না, মনে রাখবে এই একটা প্রফেশনই তুমি মানসিক যে শান্তি পাবে অন্য কোনও প্রফেশনে তা পাওয়া যায় কিনা, আমি জানি না। অবশ্য সবার কাছেই তার নিজ প্রফেশনই সম্মানের তাই তুমিও তোমার পেশাকে সম্মানিত করবে এটুকু প্রত্যাশা রাখলাম।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

‘হে ঈশ্বর এটাই শেষ কেইস, আর ডেলিভারি রোগীর দায়িত্ব নেব না!’

প্রতিবছর রেসিডেন্সির রেজাল্ট দিলে আমি দেখতে চেষ্টা করি কোন ছেলে চান্স পেলো…

চাতক চাতকী

চাতক চাতকী

গাইনী আউটডোরে দেখতাম প্রায়ই রোগী আসে এবরশন করানোর জন্য। কখনও আসে কিভাবে…

সফল হওয়ার উপায়

সফল হওয়ার উপায়

মেয়েটির বয়ফ্রেন্ড নেশায় মত্ত। সারাদিন এ নিয়ে ঝগড়া হয়। কী করণীয় পরামর্শ…

আনায় পর্ব- ৩

আনায় পর্ব- ৩

আমি কোনওকালেই সংসারী ছিলাম না। মা আমাকে রান্নার কোর্সে ভর্তি করেছিলেন। তেমন…

মেডিকেল কলেজ প্রসঙ্গ

মেডিকেল কলেজ প্রসঙ্গ

কয়েকদিন আগে আমার এক ফেসবুক বন্ধুর এক স্ট্যাটাস থেকে জানতে পারলাম, তিনি…

বাহকের সাথে বাহকের বিয়ে হলে কেন শিশুর থ্যালাসেমিয়া রোগ হয়?

বাহকের সাথে বাহকের বিয়ে হলে কেন শিশুর থ্যালাসেমিয়া রোগ হয়?

থ্যালাসেমিয়া বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে গেলেই কয়েকটি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়। আমার…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর