ডা. হামীম ইবনে কাওছার

ডা. হামীম ইবনে কাওছার

এমডি, পিএইচডি, এফএসিপি 
হেমাটোলজি এন্ড অনকোলজি 
ইউনিভার্সিটি অব ক্যানসাস যুক্তরাষ্ট্র।


১৭ অক্টোবর, ২০১৮ ১০:৪১ এএম
ছোট গল্প

‘দে লুকড এট মি বাট দে ডিড নট সি মি’

‘দে লুকড এট মি বাট দে ডিড নট সি মি’

দোতলার পূর্বকোনে আমার থাকার ঘর। বিছানা, পড়ার টেবিল, চেয়ার, কম্পিউটার, প্রিন্টার, আর শেলফভর্তি সদ্য প্রকাশিত মেডিকেল জার্নাল। বিছানার পাশেই সুপ্রশস্ত জানালা। জানালার গা ঘেঁষেই জাপানী ম্যাপল ট্রি। এই গাছের মেরুন রঙের বাহারি পাতা নীল আকাশকে ঢেকে দেয় সযত্নে, আদরে। 

আমি বিছানায় ডান দিকে শুয়ে এই পাতার ফাঁক দিয়ে ঠিকরে পড়া রৌদ্রের আলোকরশ্মি দেখি, গভীর ভাবনায়, নিরবিচ্ছিন্ন মনোযোগে। এমন একদিনের কথা। সূর্য অস্তপ্রায়। সূর্যরশ্মির গোলাপী আভায় আমি তন্দ্রাচ্ছন্ন। এক অপূর্ব সুঘ্রাণে আমি মোহান্বিত। অন্ধকারে ছেয়ে ফেলছে সব, হঠাৎ মনে হচ্ছে আমি উপরে উঠে যাচ্ছি, অসীম উচ্চতায়, আর আমার দেহ ছুটে পড়ছে নীচে, গভীর অন্ধকারে। অনুভব করলাম, আমার দেহ থেকে আত্মা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে।

দুই.
বিজ্ঞানীরা অনেক দশক ধরে গবেষণা করেছেন প্রাণ নিয়ে, জীবন নিয়ে। অদ্যাবধি তারা সর্বজনগৃহীত জীবনের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে পারেননি, মৃত্যুর সংজ্ঞা তো অনেক পরের কথা। আমি মৃত্যুর একটি সংজ্ঞা বের করেছি, ‘লিবারেশন অব সোল ফ্রম এনকেজমেন্ট অব ডিকম্পোজেবল বডি ইজ ডেথ।’ আমি আমার দেহ থেকে আত্মার মুক্তি অনুভব করছি। পড়ন্ত বিকেলে, ম্যাপল লিফের ভিতর থেকে ঠিকরে পড়া সূর্যরশ্মির আলোয় আমার আত্মা দেহত্যাগ করলো এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতায়।

তিন.
এখন আমি বলতে আমার দেহত্যাগী আত্মা। আমি এখন আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছি। আমি সব দেখতে পাই, শুনতে পাই, বলতে পারি, স্পর্শ করতে পারি কিন্তু কেউ আমাকে স্পর্শ করতে পারে না, কেউ আমাকে দেখতে পারে না। কেউ অবশ্য আগেও আমাকে দেখতে পারতো না, একটা দেখার ভান করতো। দেহত্যাগ করার পর এক নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে- আমি মানুষের মনের মধ্যে প্রবেশ করতে পারি। আমি দূর থেকে আমার দেহকে দেখছি। বিছানায় পড়ে আছে- নিথর দেহ। অপেক্ষায় আছে কেউ এসে দেখবে, ধরে-নেড়ে-চেড়ে। যখন অনুভব করবে আমি আত্মাহীন, তখন শুরু হবে সংশ্লিষ্ট সামাজিক অশ্রুপাত। দেহের সৎকারের ব্যবস্থা।

চার.
আমি দেহ ছেড়ে চলে আসার পর দেহের পরিবর্তন দেখতে পাচ্ছি। রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে শরীরে। হৃদকম্পন বন্ধ, ফুসফুসে অক্সিজেন নেই। ধীরে ধীরে কোষে এটিপি তৈরী বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, এনেরবিক গ্লাইকোলাইসিস হচ্ছে। আমার নিথর দেহের জীন এক্সপ্রেশন চলছে। একটা বিস্ময়কর ঘটনা ঘটছে আমার ফেলে আসা শরীরে। শত শত জীন এক্সপ্রেশন শুরু হয়েছে কোষে। কোষগুলো মৃত্যুর স্ট্রেসকে অন্য সময়ের স্ট্রেসের সাথে গরমিল পাকিয়ে ফেলেছে। স্ট্রেস ঠেকানোর জন্য দ্বায়ী জীনগুলো দ্রুত ট্রান্সক্রিপশন হচ্ছে, মেসেঞ্জার আরএনএ তৈরি করছে- ট্রান্সলেশনের মাধ্যমে স্ট্রেস প্রোটিন তৈরী করবে। 

কোষগুলোর আপ্রাণ চেষ্টা কিভাবে মৃত্যুর স্ট্রেস থেকে কোষগুলোকে বাঁচিয়ে আবার জীবন ফিরিয়ে আনা যায়। কোষ বিভাজন বাড়িয়ে দেবার জন্য ক্যান্সার প্রোমোটিং জীনের এক্সপ্রেশনও বাড়তে শুরু করছে। ভ্রূণাবস্থায় যে জীনগুলো তাদের কার্যক্রম শেষ করে নীরব হয়ে গিয়েছিলো, একে একে তারাও সরব হচ্ছে- এপিজেনেটিক সাইলেন্সিং প্রক্রিয়াকে নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে। কোষ-জীনের সামগ্রিক প্রচেষ্টা কিভাবে মৃত্যুর হাত থেকে কোষগুলোকে রক্ষা করা যায়। আমি অবলীলায় অবলোকন করছি আমার নিথর দেহের সামগ্রিক ব্যর্থ প্রচেষ্টা।

পাঁচ.
দেহের সৎকারের ব্যবস্থা হচ্ছে। সবাই ব্যতিব্যস্ত। আমি আমার দেহের পাশাপাশি আছি। সবাইকে দেখছি, তাদের আলোচনা শুনতে ভালো লাগছে। এক জনের অশ্রুতে আরেকজন সিক্ত হচ্ছে। আজ আমি তাদের অন্তর দেখতে পাচ্ছি, ভেজা চোখের মানুষদের কারো অন্তরে অশ্রু দেখা যাচ্ছে না। তাদের স্ট্রেস জীন এক্সপ্রেশনে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। 

আমার দেহকে মাটির নিচে রেখে দেয়া হলো। সবার সাথে সাথে আমিও আমার দেহের অন্তেষ্টিক্রিয়া শেষ করে ফিরে এলাম। এখন আমি কোথায় যাব? আমার তো কোনো ঘর নেই! আমি সবার চোখের দিকে তাকাচ্ছি, কেউ আমাকে দেখতে পাচ্ছে না। আমার খুব নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছে। এমন নিঃসঙ্গ তো আমি সারাজীবনই ছিলাম কিন্তু কাউকে বুঝতে দেইনি। আচ্ছা, আমার এত চেনা এই মানুষগুলোর কেউ কী আমাকে চিনতো, জানতো?

ছয়.
রাতের বেলা আমার শবের কাছে ফিরে যাই আমি। থাকার জায়গা নেই আমার। শবের কোষে এটিপির ঘাটতি হচ্ছে। একটিন ফিলামেন্টের সাথে মায়োসিন হেড লেগে আছে, ক্রস ব্রিজিং হচ্ছে। একটিন-মায়োসিন কাপলিং এর জন্য এখন কন্ট্রাকশন হচ্ছে মাংসপেশিতে। সব ক্যালসিয়াম ব্যবহৃত হয়ে যাচ্ছে মাংসপেশির সংকোচনে, উদ্বৃত্ত এটিপি নেই এই সংকোচন বন্ধ করার- রাইগর মর্টিস হচ্ছে আমার দেহে। আমি অবাক হয়ে আমার শবদেহের শারীরতত্বীয় কার্যক্রম দেখছি। 

সংকোচনে শবদেহ ধীরে ধীরে বেঁকে যাচ্ছে। কোষগুলো তাদের প্রচেষ্টা সচল রেখেছে। সকল রেসকিউ জীন এক্সপ্রেশন অব্যাহত আছে এখনো। কোনোভাবেই তারা অবধারিত গন্তব্য ঠেকাতে পারছে না। বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করছে বোঝার, কতদিন এই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে। তারা বিজ্ঞানের এই শাখার নাম দিয়েছেন- ‘থানাটোট্রান্সক্রিপটোম’।

সাত.
সারাদিন আমি আমার শবের পাশে থাকি, রাতে চলে আসি আমার ঘরের জানালার পাশের জাপানিজ ম্যাপল ট্রিতে। আমার শবে কীট-পতঙ্গের আগমন হচ্ছে। আমি এদের খাদ্য হচ্ছি। জীবিত থাকতে অন্য প্রাণী আমার খাদ্য ছিল, তাদের দেহের পুষ্টি নিয়ে আমার শরীর গড়েছিলাম। এখন আমার দেহের পুষ্টি নিয়ে তাদের দেহ গড়ছে। আমি মাটি পছন্দ করতাম। 

ছোটবেলায় খালি পায়ে মাটিতে খেলতাম, পুকুরে ডুব দিয়ে মাটি তুলতাম, বয়স্কালেও আমি বাগানের মাটিতে হেঁটে বেড়াতাম। মাটির কাছে থাকতে আমার ভালো লাগতো। আজ আমার শরীর সেই মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে- আমার খুবই আনন্দ হচ্ছে, এই মাটিতে মিশে যাবার জন্য আমি এত বছর অপেক্ষা করেছি!

আট.
আমি মানুষের মন ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করতাম। তাদের হৃদয়ের উত্তাপ অনুভব করার চেষ্টা করতাম। আচ্ছা, আপনারা কি জানেন, কিভাবে হৃদয় স্পর্শ করতে হয়। হোয়াট ইজ দ্য পোর্ট অব এন্ট্রি টু দ্য সোল? মানুষের চোখ! আমি মানুষের চোখের দিকে গভীর ভাবে তাকাতাম। আমার চোখের দিকে তাকিয়েই অনেকে কেঁদে ফেলতে পারতো, কারণ তারা জানতো যে আমি তাদের হৃদয়ের দরজা ভেদ করে ফেলেছি। 

আমরা মানুষের শরীর স্পর্শ করেই হৃদয় স্পর্শের অভিনয় করি। আচ্ছা, শরীরের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ কোনটি? শরীরের সবচেয়ে কোথায় বেশি নার্ভ এন্ডিং আছে, এই নার্ভ এন্ডিংগুলো কোথায় সবচেয়ে বেশি উন্মীলিত? আমরা মানুষ দেখলে তার শরীরের কোন অঙ্গ সবচেয়ে বেশি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করি? আমরা কী মানুষের দেহ দেখি না কী হৃদয় দেখি? শরীর স্পর্শ করি না হৃদয় স্পর্শ করি? আপনি কি কখনো কারো হৃদয় উদ্বেলিত করেছেন?

নয়.
যারা আমাকে চেনে বলে দাবি করতো, আমি মাঝে মাঝে তাদের কাছে যাই। তারা ভয়ংকর স্বপ্ন ভেবে কান্নায় জেগে ওঠে। কেন আমার এত চেনা মানুষগুলো আমাকে দেখে স্বপ্নে ভয় পায়? তারা কি আসলে আমাকে চিনতো? আমি বেঁচে থাকতে তারা আমার দিকে তাকাতো, কিন্তু দেখেনি। দে লুকড এট মি বাট দে ডিড নট সি মি। তারা কেউ আমাকে জানতো না। তারা অনর্থক আমাকে চিনতো বলে দাবি করতো। আচ্ছা, আপনাকে কি কেউ চেনে?

দশ.
দেহ ত্যাগের পর আমি ভালো আছি। আমার কোনো ছায়া নেই। আমাকে কেউ স্পর্শ করে না। কেউ আমার মালিকানা দাবি করে না। আমাকে কেউ চেনা-জানার অভিনয় করে না। আমি এখন শরীরবদ্ধ নই। আমি উন্মুক্ত। আমি ইচ্ছে করলেই যেয়ে আমার শরীরকে ছুঁয়ে দেখে আসতে পারি। আই এম এনজয়িং মাই লিবারেশন ফ্রম মাই ডিজপোজেবল বডি।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না