ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

ডা. সাদেকুল ইসলাম তালুকদার

বিভাগীয় প্রধান, প্যাথলজি,

শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ।


১৪ অক্টোবর, ২০১৮ ০৫:০২ পিএম

প্যারালাইসিস থেকে রক্ষা পেতে যেসব সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে

প্যারালাইসিস থেকে রক্ষা পেতে যেসব সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে

প্যারালাইসিস স্নায়ুরোগের লক্ষণ। মাথার খুলির ভিতর থাকে ব্রেইন বা মস্তিষ্ক বা মগজ। এই মগজ বেঁচে থাকার জন্য অপরিহার্য। নার্ভ ফাইবার সূক্ষ্ম তারের মত। এই ফাইবার মগজ থেকে শুরু হয়ে শরীরের সব যাগায় ছড়িয়ে পড়েছে। নার্ভ ফাইবারকে পাটের আশের সাথে তুলনা করাও যেতে পারে। ব্রেইন থেকে উৎপত্তি হয়ে এই আঁশ গুচ্ছাকারে মেরুদন্ডের ভিতর দিয়ে স্পাইনাল কর্ড হিসাবে মেরুদন্ডের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত চলে গেছে। 

স্পাইনাল কর্ড থেকে ডাল পালা বের হয়ে সমস্ত অঙ্গ প্রত্যঙ্গে বিস্তার লাভ করেছে। মস্তিষ্ক থেকে ঘাড়ে প্রবেশ করার আগে নার্ভফাইবারগুলি ক্রস করে। অর্থাৎ মস্তিস্কের ডান পাশে উৎপত্তি হওয়া ফাইবারগুলি বাম অঙ্গে বিস্তৃত হয় আর বাম পাশেরগুলি ডান পাশে বিস্তৃত হয়।

ব্রেইন ছোট হলেও এর অনেক কাজ। ব্রেইনের এক এক পয়েন্টের কাজ একেকটি। এই পয়েন্টগুলিকে সেন্টার বলা হয়। বুদ্ধি রাখার সেন্টার মাথার সামনের দিকে থাকে। হাসি কান্নার সেন্টারও এখানে। কোন কারণে হাসির সেন্টার নষ্ট হলে মানুষটি সারাক্ষণ কাঁদতে থাকবে। কাঁদার সেন্টার নষ্ট হলে সারাক্ষণ হাসতে থাকবে। বুদ্ধি বা মনে রাখার সেন্টার নষ্ট হলে সব ভুলে গিয়ে নির্লিপ্তভাবে তাকিয়ে থাকবে। কথা বলার সেন্টার নষ্ট হলে কথা বলতে পারবে না কিন্তু সব বুঝতে পারবে। শোনার জন্যও সেন্টার আছে। জন্ম থেকে কেউ শুনতে না পারলে সে কথাও বলতে পারবে না। কারণ, সে কখনো কথা শুনেনি। তাই সে ইশারায় মনের ভাব প্রকাশ করে।

ব্রেইন সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। তাই ব্রেইনে সংকেত যেতে হবে। যেসব ফাইবার দিয়ে শরীরের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ থেকে সংকেত ব্রেইনে যায় সেগুলি সেনসরি নার্ভফাইবার। যেসব নার্ভ ফাইবার দিয়ে ব্রেইন থেকে অঙ্গ প্রত্যঙ্গে সংকেত পৌঁছানো হয় সেগুলি মটর নার্ভ ফাইবার। মটর নার্ভ ফাইবার মাংশপেশী সংকোচনের মাধ্যমে অঙ্গ প্রত্যঙ্গ নড়াচড়া করায়। সেনসরি নার্ভ ফাইবার অকেজো হয়ে পরলে অনুভুতির সংকেত ব্রেইনে পৌঁছে না। তাই বোধশক্তি থাকে না। 

শরীর পোকা মাকড়ে কামড়িয়ে খেয়ে ফেললেও রোগী জানবে না। আগুন পোহানোর সময় গরমে চামড়া পুড়ে গেলেও রোগী টের পাবে না। নাকের অলফ্যাকটরি নার্ভ নষ্ট হয়ে গেলে ঘ্রাণ পাবে না। জিব্বার টেস্ট নার্ভ নষ্ট হলে কোন কিছুর স্বাদ পাবে না। একজন চিত্রাভিনেতাকে আমি বলতে শুনেছি,
- আমি জন্ম থেকেই কোন কিছু খেতে স্বাদ পাই না। তাই, খেতে বসে প্রথমে কিছু লবন খাই, তারপর কিছু ভাত খাই, তারপর কিছু সবজি খাই, তারপর খাই মাছ/মাংশ। শেষে দুই গ্লাস পানি পান করি।
- আমাদের মতো ভাত-মাছ-লবন মিশিয়ে খান না কেন?
- আপনারা তো মিশিয়ে খান স্বাদ পাওয়ার জন্য। আমার বেলায় মিশালেও যা, না মিশালেও তা।
- তাহলে এত কিছু খান কেন?
- সুষম খাদ্য পেতে এতকিছু খেতে হয়। স্বাস্থ্য ঠিক রাখার জন্য ও শক্তি পাওয়ার জন্য খাই।

মোটর নার্ভ ফাইবার নষ্ট হলে অঙ্গ অবস হয়ে যায়। শরীরের এক পাস অবস বা প্যারালাইজড হলে এটাকে হেমিপেরেসিস বলা হয়। কেউ কেউ এটাকে অর্ধাঙ্গের বাতাস লেগেছে বলেন। দুই পা প্যারালাইজড হলে বলা হয় প্যারাপ্লেজিয়া। দুই হাত ও দুই পা প্যারালাইজড হলে কোয়াড্রিপ্লেজিয়া বলা হয়। মুখের এক পাস প্যারালাইজড হলে বলা হয় বেলস পলসি।

নার্ভ নষ্ট হয় কিভাবে?
এখন জানতে ইচ্ছে হতে পারে নার্ভ নষ্ট হয় কিভাবে। নার্ভ নষ্ট হওয়ার অনেক কারণ আছে। আঘাত পেয়ে চাপ খেয়ে, রক্তক্ষরণ হয়ে ও ভিটামিন কম পড়ে সাধারণত নার্ভ নষ্ট হয়। মেরুদন্ডের ভিতর দিয়ে স্পাইনাল কর্ড হিসাবে নার্ভ এসে হাড়ের পাশ দিয়ে বের হয়ে পায়ের মাংশপেশীতে সাপ্লাই হয়। ভার্টিব্রা নামের মেরুদন্ডের হাড়গুলির মাঝখানে তালের আটির ভিতরের অংশের মতো ইন্ট্রাভার্টিব্রাল ডিস্ক নামে পিচ্ছিল চাকতি থাকে কোমড় আকাবাকা করার সুবিধার জন্য। হুতি দিয়ে ভারী জিনিস উঠাতে গেলে অথবা রিক্সা জার্নি করার সময় থেকনা লেগে এই ডিস্ক সামনের দিকে স্লিপ খেয়ে সরে যেতে পারে। এই অবস্থাকে বলা হয় প্রলাপস ইন্ট্রাভার্টিবার ডিস্ক। 

ডিস্কের চাপ খেয়ে নার্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঐ নার্ভ যেসব স্থানে সাপ্লাই দেয় সেই সব স্থানে ঝিন ঝিন করে, জ্বালাপোড়া করে অথবা ছালাছালা লাগে। পা ও কোমর আক্রান্ত হয়। আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে অথবা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে অথবা টিউমার-ক্যান্সার হয়ে কোমরের নার্ভ নষ্ট হতে পারে। তখন দুই পা প্যারালাইজড বা প্যারাপ্লেজিয়া হতে পারে। ঘাড়ের স্পাইনাল কর্ড ক্ষতিগ্রস্ত হলে হাত প্যারালাইজড হতে পারে। ঘাড় ভেঙে গেলে কোয়াড্রিপ্লেজিয়া বা হাত-পা এক সাথে প্যারালাইজড হয়। 

প্যারালাইসিসের কারণ:
মস্তিস্কের এক পাশে রক্তক্ষরণ হলে বা টিউমার হলে শরীরের অন্য সাইডের হাত-পা প্যারালাইজড হয়। কারণ, মেরুদন্ডের ভিতর প্রবেশের আগে ফাইবারগুলি ক্রস করে। কিন্তু মুখে সাপ্লাইয়ের নার্ভগুলি ক্রস করার আগের নার্ভ। তাই যেদিকের মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ হয় সেই দিকের মুখের মাংশ প্যারালাইজড হয়। লক্ষ্য করে দেখবেন কারো ডান হাত ও ডান পা প্যারালাইজড হলে তার বাম দিকের মুখের মাংশ প্যারালাইজড হয়। অর্থাৎ তার মস্তিস্কের বাম দিকে রক্তক্ষরণ হয়েছে। মস্তিস্কে রক্তক্ষরণ হলে বলা হয় স্ট্রোক। মস্তিস্কের দুই পাশে রক্তক্ষরণ হলে কোয়াড্রিপ্লেজিয়া হবে। অনেকে ভুল করে হার্ট এটাক্ট বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশনকে হার্ট স্ট্রোক বলে থাকেন। স্ট্রোক শুধু ব্রেইনে হয়। 

উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, রক্তের কোলেস্টেরল বেশি, কম শারীরিক পরিশ্রম ইত্যাদির প্রভাবে সাধারণত এথেরো স্ক্লেরোসিস নামে রক্তনালীর রোগ হয়। আমাদের দেশে ধূমপান এথেরো স্ক্লেরোসিস হওয়ার অন্যতম কারণ। হুক্কার নইচ্চার নলে কাই জমে যেমন নইচ্চার নালী বন্ধ হয়ে যায় তেমনি রক্তনালীর ভিতরের স্তরে এথেরোমা নামে তৈলজাতীয় পদার্থ জমে রক্তনালী সরু এমনকি বন্ধ হয়ে যায়। এথেওরোমা ছিড়ে গিয়ে রক্তক্ষরণ হতে পারে। এতে স্ট্রোক হয়। স্ট্রোক হওয়ার সাথে সাথে অপারেশন করে রক্তের চাকা বের করে দিলে প্যারালাইসিস থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। 

নিউরোসার্জনগণ ব্রেইন ও স্পাইনাল কর্ডের অপারেশন করেন। প্যারালাইসিস হয়ে গেলে কিছুটা ভাল থাকার জন্য ও স্ট্রোক প্রতিরোধ করার জন্য নিউরোলজিস্টগণ মেডিসিন দিয়ে চিকিৎসা করেন। অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সচল করার জন্য ফিসিওথেরাপিস্টগণ ফিজিওথেরাপি দিয়ে থাকেন। কোয়াড্রিপ্লেজিয়া রোগী বিছানায় নড়াচড়া করতে পারে না। তাই কোমরের নিচের হাড়ের জায়গায় রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে পঁচে ঘা হয়ে যায়। এই ঘা সহজে সারে না। এটার নাম ডিকুবিটাস আলসার। গ্রামের কোন কোন লোক এটাকে বলে যম ঠোয়া বা যম ঘা। 

কারণ, তারা দেখেছে যে এরপর রোগী সাধারণত বাঁচে না। তাই, এই ধরনের রোগীকে মাঝে মাঝে সাইড পরিবর্তন করে শোয়াতে হবে। নিউমোনিক মেট্রেস নামে এক ধরনের বেড পাওয়া যায়। ইলেক্ট্রিক মেশিন দিয়ে মেট্রেসের ভিতর বাতাস প্রবাহিত করা হয়। তাতে মেট্রেসের বিভিন্ন অংশ উচুনিচু হয়ে শরীরে সমভাবে রক্ত সঞ্চালিত হয়। কাজেই, রোগীকে নিউমোনিক মেট্রেসে শোয়াতে হবে।

স্ট্রোক করে প্যারালাইসিস হলে কোন কোন অজ্ঞ লোক ঝাড়ফুঁক করে। পানি পড়া খাওয়ান। তারা ইঞ্জেকশন দিতে মানা করেন। বলেন, ‘ইঞ্জেকশন দিলে রোগ ডাইব্বা যাবে।’ একবার টাঙ্গাইলে এক আজব কবিরাজের আবির্ভাব হয়েছিল। তিনি পানি পড়া দিলে প্যারালাইসিস ভালো হতো। পত্রিকায় প্রচার পেলে হাজার হাজার রোগী দূর দুরান্ত থেকে আসতো পানি পড়া নিতে। এত গ্লাসে ফু দেয়া সম্ভব না। তাই তিনি সবাইকে গ্লাস উচু করে ধরতে বলতেন। মন্ত্র পড়ে মাইকে ফু দিতেন।

হিস্টেরিয়া নামে একটা মানসিক রোগ আছে। সেই রোগেও অঙ্গ অবস হতে পারে। এই জাতীয় রোগী মানসিক ভাবে দুর্বল ও অসহায়। এই ধরনের প্যারালাইসিস পানি ফুতে ভালো হতে পারে। ভিটামিন বি-১, বি-৬ ও বি-১২ এর অভাবে নার্ভ দুর্বল হতে পারে। ডায়াবেটিস রোগেও নার্ভ দুর্বল হতে পারে। পানি পড়া খাওয়ার পর কোন কারণে ডায়াবেটিস কন্ট্রোল হলে কিংবা ভিটামিনের অভাব দূর হলে প্যারালাইসিস ভালো হয়ে যাবে। নাম হবে ঝাড়ফুঁককারীর।

এমআরআই, সিটি স্ক্যান ও এক্সরে পরীক্ষা করে ব্রেইন ও স্পাইনাল কর্ডের রোগ ধরা যায়। ক্যান্সার/টিউমার সনাক্ত করার জন্য বায়োপসি পরীক্ষা করতে হয়।

বিশিষ্ট ব্যাক্তিদের প্যারালাইসিস ও চিকিৎসা: 
১৯৩৯ সালে আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্ত্রী প্রমিলা দেবীর প্যারাপ্লেজিয়া হয়েছিল। কি কারণে হয়েছিল তা আমি জানি না। কবি তাতে ভেঙে পড়েন। নিজে স্ত্রীর সেবা করেন। গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে ৪০০ রুপি ধার নিয়ে গানের রয়াল্টি মরগেজ দেন স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য। ১৯৪১ সনে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মৃত্যুর পর তিনি আরো ভেঙে পড়েন। তার মেজাজ খারাপ হতে থাকে। আসতে আসতে স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়ে নির্বাক হয়ে যান। কিন্তু তার শরীর সচল ছিল। তার বুদ্ধি বিলুপ্ত হয়। তার মানে মস্তিস্কের সামনের অংশ বিকল হয়। তাকে হোমিও ও এলোপ্যাথি মতে এলো মেলো চিকিৎসা করানো হয়। অনেক বছর পর ইংল্যান্ড নিয়ে চিকিৎসা করাতে গেলে সেখানকার ডাক্তারগণ তার রোগ নির্ণয় করেন পিক্স ডিজিজ। এই রোগে ব্রেইন শুকিয়ে যায়। তারা ঘোষণা দেন তার আর ভালো হওয়ার সম্ভাবনা নাই। তিনি ১৯৭৬ সন পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন এই অবস্থায়।

এযুগের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হকিং ২০১৮ সনের মার্চ মাসে ৭৬ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তিনিও প্যারালাইজড ছিলেন। তার বুদ্ধি শুদ্ধি ঠিক ছিল। তার শরীরের মটর নার্ভ নষ্ট হয়েছিল। এই রোগের নাম মটর নিউরন ডিজিজ। এটা ব্রেইনের রোগ না। অঙ্গ প্রত্যঙ্গের মটর নার্ভ ফাইবারের রোগ। এটা শুরু হয় তার একুশ বছর বয়স থেকে। রোগ বাড়তে বাড়তে সারা শরীর নিস্তেজ হয়ে যায়। এক সময় লিখা ও কথা বলাও বন্ধ হয়ে যায়। ব্রেইনের সাথে কম্পিউটার চিপ্স যোগ করে বিশেষ সংকেতের মাধ্যমে মনের ভাব প্রকাশ করতেন। এই অবস্থায় তিনি বিভিন্ন থিওরিও প্রকাশ করেছেন। তিনি সাহিত্যও রচনা করেছেন। 

এক সময় ডাক্তারগণ তাকে মৃত্যু অনিবার্য ভেবে আর্টিফিশিয়াল ভেন্টিলেটর খুলে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তার স্ত্রী তাতে অনুমতি দেননি। সেই স্ত্রী এক সময় তার থেকে ডিভোর্স নেন। মৃত্যুর আগে তিনি তার রচনায় প্রকাশ করে গেছেন যে তার ডিভোর্স হওয়া স্ত্রীই তার কাছে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। কারণ তিনি বারণ না করলে হকিং অনেক আগেই মারা যেতেন। ডিভোর্স দেয়া স্ত্রীই একমাত্র তার জীবনের মূল্য বুঝেছিলেন।

আমাদের আসে পাশে এমন অনেক প্যারালাইজড মানুষ আছেন। কেউ কেউ কাজী নজরুলের মতো চলাফেরা ঠিকই করছেন কিন্তু কিছুই বুঝছেন না। আবার কেউ কেউ হকিংয়ের মতো হুইল চেয়ারে বাঁধা অথবা নিউমোনিক বিছানায় পড়ে আছেন। মশায় কামড়াচ্ছে। ব্যথা পাচ্ছেন। কিছুই করতে পারছেন না। খুশীর সংবাদ শুনে খুশী হচ্ছেন। প্রকাশ করতে পারছেন না। চোখের সামনে অন্যায় দেখছেন। প্রতিবাদ করতে পারছেন না। 

আমার চাচা- শশুর, ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ মরহুম আব্দুল কদ্দুস সাহেব সারা শরীর প্যারালাইজড হয়ে প্রায় ১২ বছর নিউমোনিক মেট্রেসে পড়ে ছিলেন। তার আপনজনদের সেবায় তিনি খুবই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ভাবে বেঁচে গেছেন। তিনি কথাও বলতে পারতেন না। শুধু মৃদু ঠোট নাড়িয়ে সংকেত দিয়ে সাধারণ মনের ভাব প্রকাশ করতে পারতেন। ঠোট নাড়িয়ে মনের ভাব প্রকাশ করাকে বলা হয় লিপ স্পিচ। 

আমি আমার বড় মেয়ে মুনাকে নিয়ে একবার তাকে দেখতে গেলাম। এই মেয়েটার জন্মের পর কিছুদিন তার বাসায় ছিলাম। তাই তিনি আমার মেয়ের কথা স্মরণ করতেন। মুনা তখন বড় হয়েছে। মুনাকে দেখে তিনি ঠোট নাড়ালেন। আমি চাচী শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কাক্কা, কি বুঝাতে চাচ্ছেন?’ 
- কাক্কী বললেন, ‘তোমার কাক্কা নাতনীর সাথে ঠাট্টা করে বললেন, ‘পাত্রীটা সুন্দরি হয়েছে।’
- কাক্কা একধরনের সংকেত দিলেন। কাক্কী বললেন, ‘আমরা বুঝতে পেরেছি বলে তোমার কাকা হাসছেন।’ 

শুনে কাক্কার চোখে আনন্দ প্রকাশ হলো। চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। মুনা লজ্জা পেলো। আমার মাথায় আইডিয়া এলো কাক্কার জন্য একটা কম্পিউটার সফটওয়্যার প্রোগ্রাম তৈরি করব আমি নিজে। কম্পিউটার বা মোবাইল ক্যামেরা কাক্কার ঠোটের মুভমেন্ট (নড়াচড়া) বিশ্লেষণ করে শব্দ তৈরি করবে। আমি এই নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। ২০০৮ সনের দিকে কাক্কার মৃত্যুর পর সেই স্পৃহা হারিয়ে ফেলেছি।

প্যারালাইসিস থেকে রক্ষা পেতে যেসব সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে:
যাহোক, প্যারালাইসিস থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমাদের কিছু সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল কন্ট্রোলে রাখতে হবে। ধূমপান থেকে দূরে থাকতে হবে। কোমর, পিঠ ও ঘারে যাতে আঘাত বা চোট না লাগে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। পর্যাপ্ত ভিটামিন-বি যুক্ত খাবার খেতে হবে। প্যারালাইসিস হয়ে গেলে ঝাড়ফুঁক না দিয়ে, বিলের ঘোলাপানি না খাইয়ে রেজিস্টার্ড ডাক্তার দেখিয়ে চিকিৎসা নিতে হবে। 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত