ঢাকা      শনিবার ১৫, ডিসেম্বর ২০১৮ - ৩০, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৫ - হিজরী




সন্তান ডাক্তার হলেই টাকা আর টাকা!

নবাগত আগামীর চিকিৎসকদের বাংলাদেশের চিকিৎসা জগতে স্বাগতম। তোমাদের আজন্ম লালিত স্বপ্ন আজ সত্য হতে চলেছে। তোমরা নিশ্চয়ই আনন্দে উদ্বেলিত। 

মানব সেবার এক মহান ব্রত নিয়ে তোমরা এ পেশায় আসতেছো। স্কুলের পরীক্ষার খাতায় লেখা আমার জীবনের লক্ষ্য রচনায় মনের মাধুরী মিশিয়ে নিষ্পাপ মনে লেখা রচনার বিষয় বস্তুগুলোর সবই ছিল পজিটিভ- মেডিকেল কলেজে ভর্তি হবো, ডাক্তারী পাশ করে গ্রামে ফিরে যাবো, গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষের সেবা করবো, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবো।

কিন্তু মেডিকেল জীবন সম্পর্কে ধারনা কতটুকু আছে? যাদের বাবা-মা বা পরিবারের অন্য কেউ চিকিৎসক তাদের হয়তো সামান্য ধারনা থাকতে পারে। মেডিকেল ভর্তির পর শুরু হবে ক্লাস, আইটেম, কার্ড, প্রফ পরীক্ষা- সামান্য ঘুরাঘুরি বা বেড়ানোর সময় বের করাও কঠিন। তারপর এমবিবিএস পাশ করার পর ইন্টার্ন জীবন, আর এক ব্যস্ততম জীবন।

ইন্টার্ন জীবন শেষে শুরু হয় আসল জীবন, গ্রামে ফিরে গ্রামের লোকদের সেবা দিবে? না নিজের ক্যারিয়ার গড়বে? আজকাল রোগীরা সিম্পল এমবিবিএস চিকিৎসকদের কাছে যেতে চায় না। হয় ফার্মেসীওয়ালা/কোয়াকদের কাছ থেকে ওষুধ কিনে খাবে, না হয় স্পেশালিস্ট দেখাবে। এখানেই তোমার মানব সেবার ব্রত ধাক্কা খাবে। তাছাড়া ইন্টার্ন জীবনেই হাসপাতালের আগত রোগী ও তার পরিজনদের থেকে এমন সব ব্যবহার পাবে তখন মনে হবে ডাক্তারী ছেড়ে দেই। কিন্তু চাইলেই কি এটা সম্ভব হবে তখন? মোটেই না।

গাঁয়ের মানুষের সেবা করতে গ্রামে থাকবে? তারাই তোমাকে বলবে তুমি কোন বিষয়ের ডাক্তার? তুমি এখনও কোন ডিগ্রি কর নাই? ভাবখানা এমন যে পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিগ্রিগুলো ছেলের হাতের মোয়া চাইলেই পাওয়া যায়। তোমার চোখের সামনে দিয়ে ফার্মেসি ওয়ালার থেকে ওষুধ কিনে খাবে, কোয়াক ডাক্তার দেখাবে, আর তোমার কাছে এসে বলবে- আমার এই এই সমস্যা কোন ডাক্তার দেখবো? 

মানে তুমি হবে বিনামূল্যের রেফারাল ডাক্তার! তারপর গ্রামের এই খেটে খাওয়া মানুষগুলো তোমার সামনে দিয়ে চলে যাবে শহরের বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছে। পরদিন তোমার কাছে আসবে প্রেসক্রিপশন যাচাই করাতে এবং রোগ সম্পর্কে বুঝতে (বিনামূল্যে)।
- এই ডাক্তার দেখতো প্রেসক্রিপশনে কী লিখছে? দেখতো পরীক্ষায় কী রোগ ধরা পড়লো, তোদের ডাক্তারদের এত ভাব ৫০০ টাকা ফি নিলো অথচ কথাই শুনলো না, সব কসাইয়ের দল (তুমিও কসাই)। এভাবেই সেবা দিতে হবে গ্রামের লোকদের।

আরও আছে। কেউ কেউ বলবে কিরে ডাক্তার বাড়ি করবি না? গাড়ি কবে কিনবি? অথচ এরাই ১০০% ফ্রি সেবা নিবে তোমার থেকে। এলাকার মসজিদ, মাদ্রাসা, ক্লাবের থেকে চাদা চাইবে বড় অংকের চাদা না দিলে এসব ফ্রি আত্মীয়রাই সামনে পিছনে সমালোচনা করবে। অথচ তখন তোমার নিজের অবস্থা শোচনীয়!

বাবা মায়ের বড় স্বপ্ন সন্তান ডাক্তার হলেই টাকা আর টাকা। ছোট ভাইবোন সবার ধারনা ভাই/বোন অনেক টাকা পায় শুধু তাদের দেয় না। আর যদি বিয়ে করে ফেল কোন নন মেডিকেল মেয়েকে তাহলে তো আরও বিপদ। নন মেডিকেল মেয়ের বাবা এমবিবিএস ডাক্তার মানে বিলিয়ন ডলারের মালিকের সাথে মেয়ে বিয়ে দিয়েছে, মেয়ে তো আকাশে উড়তে থাকে। যখন স্বামীর ঘরে আসে তখন স্বপ্ন ভাঙে একি! আমি কাকে বিয়ে করলাম? এতো কপর্দকহীন ডাক্তার এ কী দিবে আমাকে, আমার পরিবারকে? শুরু হবে বিবাদ!

পোস্ট গ্রাজুয়েশন করবে আবার ভর্তি পরীক্ষা আবার কোচিং। তারপর আবার ৫/৭ বছরের কঠোর সাধনা (যদি সবকিছু ঠিকঠাক থাকে তাহলে)। যারা বেসরকারী, তারা রেসিডেন্সিতে তবুও মাসে কিছু ভাতা পাবে। আর এফসিপিএস করতে চাইলে পুরা চার বছর ক্রীতদাসের চেয়ে অমানবিক অনারারী নামক প্রথায় ট্রেনিং করতে হবে। তখন নিজে কী খাবে কিভাবে চলবে, আর বাবা মা ভাইবোন, নব বিবাহিতা স্ত্রী আগত নতুন অতিথি সন্তান, কাকে কিভাবে সামলাবে? 

যদি ভাগ্যগুণে সোনার হরিণ বিসিএসের দেখা মেলে তাহলে আর্থিক কষ্ট কিছুটা লাঘব হলেও আবার সেই গ্রামে ফিরে যাও, সাব সেন্টারে ২/৩ বছর থাকো। তারপর যখন কোন রকমে একটা পোস্ট গ্রাজুয়েশন কোর্সে সুযোগ পাবে তখনও আসবে অনেক বাধা। আর ভর্তি হলেই তো পাশ নয়। ৫/৭ বছর কঠিন পরিশ্রম করে তখন হয়তো বা পাশ করে বিশেষজ্ঞ হবে।

কারও কারও আরও বেশি সময় লাগবে। ততদিনে হয়তো অনেকেই হারাবে বাবা মাকে। এরপর সরকারী চাকরি যারা পেল তাদেরও বঞ্চনার শেষ নেই। তোমার বিসিএস ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডার যখন ডিসি তুমি তখনও মেডিকেল অফিসার। একজন এসি ল্যান্ড গাড়ি করে ঘুরবে আর তুমি রিক্সা বা মটর সাইকেলে চড়বে। চোখের সামনে তাদের দ্রুত প্রমোশন দেখবে আর ধুকে ধুকে মরবে। একই সাথে চাকরিতে যোগদান করেও ১০ বছরেই বেতনের পার্থক্য, সুযোগসুবিধার পার্থক্য আসমান জমিন।

এরপর তুমি যে হাসপাতালে কাজ করবে সেখানে তুমি ছাড়া সবাই ওই হাসপাতালের মালিক। সুইপার, পিওন, কেরানী, আশপাশের পাতি নেতা, পানের দোকানদার ও সাংবাদিক সবাই তোমাকে কারণে অকারণে শাসাবে, ভয় দেখাবে এমনকি গায়েও হাত তুলতে পারে। তখন মনে হবে ধরণী তুমি দ্বীধা হও আমি তোমার গর্তে লুকাই। মন্ত্রী, মন্ত্রীর পিএ, পাতি নেতা বড় নেতা তোমাকে দিয়ে মিথ্যা সার্টফিকেট লিখতে চাপ দিবে, না দিলে বদলী করে দিবে বা মাস্তান দিয়ে ভয় দেখাবে এমনকি গায়ে হাত ও তুলতে পারে। তোমার ও তোমার পরিবারের জীবন অনিরাপদ।

ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মেসি ওয়ালা সবাই তোমাকে দিয়ে নিজ নিজ স্বার্থ হাছিলের জন্য চাপাচাপি করবে। যদি নিজেকে ঠিক রাখতে না পারো তাহলে মানব সেবার ব্রত নিয়ে যে ডাক্তারীতে ভর্তি হলে সেই ব্রত আর থাকবে না। তখন তুমি হবে বাংলাদেশের এক নম্বর কসাই।

একটা নিরেট সত্য কথা হলো এদেশে চিকিৎসকদের কোন বন্ধু নাই এমনকি তোমার ক্লাসমেট চিকিৎসকও তোমার কঠিন শত্রু হতে পারে স্বার্থের কারণে। আর বেশি কিছু লিখতে মন চাইছে না। তোমাদের যুগে তোমরা পাও সুন্দর সাজানো, নিরাপদ, সম্মানজনক কর্মস্থল এই সোনার বাংলায়। শুভ কামনা রইল।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

প্রেসক্রিপশনের ব্যাপারে যত্নশীল হোন!

প্রেসক্রিপশনের ব্যাপারে যত্নশীল হোন!

রোগীর মুল সমস্যা, উপরের পেটে ব্যথা, বুকে জ্বালাপোড়া, পিঠে ব্যথা, দুর্বলতা। একটা…

আবেগীয় স্মৃতির গুদামঘর

আবেগীয় স্মৃতির গুদামঘর

ইন স্টিমের উপরে কাঠবাদামের আকারের অঞ্চলটির নাম "এমাগডেলা"। লিম্বিক সিষ্টেমের দুটি অংশ…

ক্লিনিক মালিকের আবদার টেস্ট বেশি দিতে হবে!

ক্লিনিক মালিকের আবদার টেস্ট বেশি দিতে হবে!

নোয়াখালী অঞ্চলে এক ক্লিনিকে কিছুদিন চাকুরী করেছিলাম। ডাক্তার সমাজে খন্ডকালীন এসব চাকুরীকে…

অধ্যাপক মনসুর খলিল স্যারকে শেষ দেখা!

অধ্যাপক মনসুর খলিল স্যারকে শেষ দেখা!

আজ থেকে তিন বছর আগে ২০১৫ সনের ডিসেম্বরের ৭ তারিখে আমি বদলী…

সুইসাইড ও পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার

সুইসাইড ও পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার

"স্যার আদাব, অপিসি পয়সনিং, পুলিশ কেইস..." মোবাইলে ইমার্জেন্সী চিকিৎসকের ফোন পেয়ে আউট…

'এইবার মিয়াসাব তাবিজের পাশাপাশি ওষুধ খাইতে বলছেন'

'এইবার মিয়াসাব তাবিজের পাশাপাশি ওষুধ খাইতে বলছেন'

আফিয়া বেগম উদ্ভ্রান্তের মত ৩২ বছর এর ছেলেকে নিয়ে আমার চেম্বারে আসলেন।…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর