ডা. হামীম ইবনে কাওছার

ডা. হামীম ইবনে কাওছার

এমডি, পিএইচডি, এফএসিপি 
হেমাটোলজি এন্ড অনকোলজি 
ইউনিভার্সিটি অব ক্যানসাস যুক্তরাষ্ট্র।


০৬ অক্টোবর, ২০১৮ ০১:০১ পিএম

‘আমার চারটি ছোট সন্তান, আমার এখন চলে যাওয়ার সময় হয়নি’

‘আমার চারটি ছোট সন্তান, আমার এখন চলে যাওয়ার সময় হয়নি’

সাঁইত্রিশ বছর বয়সের যুবক আলেকজান্ডার ফ্রীম্যান। মাস তিনেক ধরে ক্ষুধামন্দা। ভেবেছেন ধূমপানে এমন হতেই পারে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রিন্টিং প্রেসে কাজ করেন। নিজের জন্য সময় পান না। সহকর্মীরা বলেছে যে তাকে নাকি ইদানিং হলুদ দেখায়। গায়ে মাখেননি আলেকজান্ডার। বাড়িতে ছোট তিনটি বাচ্চা, মমতাময়ী স্ত্রী। সংসারে হাসিমুখ রাখতে যেয়ে নিজের গায়ের রং পরিবর্তন দেখার সময় হয়নি তার। ভেবেছেন যে সময় পেলে কয়েকদিন রৌদ্রে হাঁটলে গায়ের রং আবার কাঁচা হলুদের মত হয়ে যাবে।

স্ত্রীর মন! মেয়েরা অদৃশ্য দেখতে পায়। স্টিফানির মন ভালো ঠেকছে না। স্বামীর ক্ষুধামন্দায় তিনি শংকিত। তাকে বারবার বলেছেন যে ডাক্তার দেখিয়ে আসি। আলেকজান্ডারের সময় হয়নি, কাজ বাদ দিয়ে ডাক্তার দেখানোর। অনেকটা জোর করেই জরুরি বিভাগে নিয়ে এসেছিলেন গত সপ্তাহে। জরুরি বিভাগে রক্ত পরীক্ষার পরেই গোপনে জরুরি বিভাগ থেকে পালিয়ে তিনি কাজে চলে গেছেন। 

কাজ না হলে একার আয়ের সংসার কিভাবে চলবে? পরেরদিন হাসপাতাল থেকে তার বাড়িতে ফোন করা হয়েছে, আলেকজান্ডার যেন জরুরিভাবে হাসপাতালে চলে আসেন। রাতে ঘুম হয় না স্টিফানির, বাচ্চাগুলো রাতে অকারণে কেঁদে ওঠে ইদানিং। স্টিফানি অন্ধকারে ঘরের দেয়ালে অশ্রু দেখেন, অজানা অবয়ব দেখেন!

জোর করে আলেকজান্ডারকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। বিলিরুবিন ২৬.০। এলকালাইন ফজফটেজ তিন হাজারের উপরে। ভয়ভীতি দেখিয়ে আলেকজান্ডারকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। পেটের সিটি স্ক্যান করা হয়েছে। প্যানক্রিটিক হেড ম্যাস! অবস্ট্রাক্টিভ জন্ডিস।

হেপাটোলজিস্ট ইআরসিপি করে স্টেন্ট বসিয়ে দিয়েছেন। বায়োপসি করেছেন। প্যানক্রিয়েটিক এডিনোকার্সিনোমা! আমাদের ডাকা হয়েছে অনকোলজিস্ট হিসেবে দেখার জন্য। দেখার আগেই পজিট্রন এমিশন টমোগ্রাফি করা হয়েছে। শরীরের অনেক অঙ্গে ছড়িয়ে পড়েছে ক্যান্সার।

আমি দেখতে এসেছি আলেকজান্ডারকে। অন্ধকার রুমে একা শুয়ে আছেন। সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে নিমগ্ন, ভাসা ভাসা চাহুনি। পরিচয় দিয়ে পাশে বসলাম। আবেগঘন আলোচনা। কেমোথেরাপির প্রয়োজনের কথা বললাম। শান্ত ভাবে, মনোযোগ দিয়ে সব শুনলেন। 

তোমার কোনো প্রশ্ন আছে, আলেকজান্ডার? 
- জ্বি আছে। কেমোথেরাপি দিলে আমি সেদিন কাজ করতে পারবো? আলেকজান্ডারের নির্মোহ প্রশ্ন। 
- এটা আগে থেকে বলা মুশকিল। সাধারণত সেদিন হয়তো কাজ করতে পারবে না, তুমি দুর্বল অনুভব করতেও পারো। 
- আমি কাজ বাদ দিয়ে কেমোথেরাপি দিতে পারবো না। আমার বেতন দৈনিক ঘন্টা হিসেবে। আমার বাসায় তিনটি বাচ্চা, আমার প্রিয়তমা স্ত্রী। আমি একদিন কাজ না করলে আমার সংসার চলবে না। কিন্তু কেমোথেরাপি না দিলে তোমার রোগের দ্রুত বিস্তার হবে, তোমার জীবননাশের আশংকা আছে। আমার কণ্ঠে ভীতির সুর!

কেমোথেরাপি দিলে আমার নিরাময় হয়ে যাবে? আমি সুস্থ হয়ে যাবো?
- না তা হবে না, তবে রোগের বিস্তার শ্লথ হয়ে যাবে। 
- আমি কি মরে যাচ্ছি, ডাক্তার? তুমি কি মনে করো এই অসুখে আমি মরে যাবো?
- ঠিক এখনই না, তবে তোমার মত যাদের এই অসুখ হয়, তারা সাধারণত এক বছরের কম সময় বাঁচেন।

আলেকজান্ডার নির্বাক হয়ে গেলেন। আমার চোখের দিকে স্থির তার চোখ। অবিশ্বাসের চাহুনি। আমিও তাকিয়ে আছি, আশ্বাসের দৃষ্টি আমার চোখে। আলেকজান্ডারের চোখ আদ্র হয়ে যাচ্ছে। আমার দৃষ্টিও ঝাপসা। আলেকজান্ডারের দুচোখ বেয়ে নিঃশব্দ অশ্রুধারা। 

আমি নীরবতা ভাঙলাম। বললাম, তুমি চিন্তা করো না। আমরা পৃথিবীর সেরা চিকিৎসা দেব তোমাকে!
- আলেকজান্ডার উঁচু শব্দ করে কেঁদে উঠলেন। আমি যদি কাজে না যাই, আমার স্ত্রী-সন্তান কিভাবে চলবে? তারা কিভাবে বাঁচবে?
- আমি সান্ত্বনা দিলাম। টিস্যুর বাক্স এগিয়ে দিলাম। বললাম, তুমি ভেঙে পড়ো না। আমরা সকল ধরণের সহযোগিতা করবে তোমাকে। 
- আলেকজান্ডার এখন বিশ্বাস করছে না আমার কোনো কথা! আমি পরে ফিরে আসবো বলে রুম থেকে বেরিয়ে এলাম।

দুই.
ত্রিশ বছরের যুবক মাইকেল হাওয়ার্ড। অসম্ভব সুন্দরী স্ত্রীর গর্বিত স্বামী। চারটি ছেলে-মেয়ে তার। কাজের সময় অফিসে হঠাৎ খিঁচুনি হয়েছে। এম্বুলেন্স করে তাকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। সারা শরীর স্ক্যান করা হয়েছে। সমস্ত শরীরের লিমফ নোডগুলো বড়, ফুলে উঠেছে। লিমফ নোডের বায়োপসি করা হয়েছে। এগ্রেসিভ বি সেল লিম্ফোমা। তার চোখের মুভমেন্ট পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে, দৃষ্টিতে সমস্যা হচ্ছে। মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়েছে তার লিম্ফোমা। ষ্টেরয়েড দেয়া হচ্ছে। পৃথিবীর অন্যতম সেরা লিম্ফোমা বিশেষজ্ঞ ডা. জুলি ভোজের সাথে ই-মেইলে যোগাযোগ করা হয়েছে তার চিকিৎসার জন্য পরামর্শ চেয়ে। খুব একটা আশার কথা শোনা যায়নি।

মাইকেল-এর রুমে সারাদিন তার ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা করে। হাসপাতালে রুমের চার দেয়ালের নামকরণ করা হয়েছে তার চার সন্তানের নামে- ক্রিস্টিনা ওয়াল, ডেভিড ওয়াল, জ্যাক ওয়াল, এবং লিসা ওয়াল। যার যার নামের দেয়ালে সে ছবি একে বাবার সুস্থতা কামনা করে তারা ছবি একে হাসপাতালের দেয়ালে লাগিয়ে দিয়েছে। বাইবেল থেকে জীবনমুখী আশার বাণী সম্বলিত কথা লিখে দেয়ালে ঝুলিয়ে দিয়েছে মাইকেলের স্ত্রী-সন্তানেরা। হাসপাতালে তার রুমে গেলে মনে হয় মাইকেলের নিজের বাড়িতে এসেছি আমি। বাচ্চাদের খেলাধুলার সামগ্রী, ছবি আকার সামগ্রী সব হাসপাতালে নিয়ে এসেছে তারা।

আমাদের টিম ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়ছে মাইকেলের অসুখ নিয়ে। ব্রেনে রেডিয়েশন থেরাপি দিলে কোনো লাভ হবে কিনা জানতে চাওয়া হলো রেডিয়েশন অঙ্কোলজির কাছে, তারা উন্নতির আশার কথা বললেন তবে জীবনের সময় বৃদ্ধির আশ্বাস দিলেন না। আমাদের পুরো টিম মাইকেলের সাথে দেখা করলাম। সে পরিবারের কেউ উপস্থিত থাকুক তা চায় না।

মাইকেলকে আমাদের সব প্রচেষ্টার কথা বলা হলো। আশা-হতাশার কথাও বলা হলো। তার সীমিত জীবনের কথাও জানানো হলো। 
- মাইকেল উত্তেজিত হয়ে গেলেন। বললেন, ‘আমি যীশুখ্রীষ্টে বিশ্বাস করি। আমার লর্ড আমার জীবনে এমন পরীক্ষা দিতে পারেন না। তিনি জানেন যে আমার চারটি ছোট সন্তান আছে, তাদের দেখভাল করার জন্য আমার থাকার প্রয়োজন। আমার এখন চলে যাওয়ার সময় হয়নি।’
- আমরা বুঝালাম, সান্ত্বনা দিলাম। 
- হঠাৎ মাইকেল উঁচু শব্দে কেঁদে উঠলেন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন চার সন্তানের জনক, যুবক মাইকেল! আমার সন্তানদের কী হবে? তার আহাজারি সংক্রামক। তার অশ্রুধারায় ভেঙে যাচ্ছে আমাদের আবেগের দেয়াল!

তিন.
কথায় কথায় আমি মেয়েদের কাঁদতে দেখেছি। ছেলেদের কান্না আমার দেখা বিরল দৃশ্য। এরা সবাই পরিবারের অনুপস্থিতিতে কেঁদেছেন। কেঁদেছেন সন্তানদের কী হবে এটা বলে, প্রিয়তমা স্ত্রীর কী হবে সেটা বলে। কেঁদেছেন পিতা হিসেবে, কেঁদেছেন স্বামী হিসেবে। পুরুষ হিসেবে কাঁদেননি। এই পুরুষগুলো যুদ্ধে যায়, দেশের জন্য অকাতরে জীবন, শরীরের অঙ্গ হারিয়ে আসেন। 

আমেরিকায় তাদের হিরো বলা হয়, দেশের জন্য তাদের অবদানের জন্য। আমি প্রায় প্রতিদিনই আমেরিকার শক্ততম পুরুষদের দেখি, যুদ্ধে তাদের অঙ্গহানির বাস্তবিক দুর্দশা দেখি। আমি আজো কোনো পুরুষকে তার অঙ্গহানির জন্য অনুশোচনা করতে দেখিনি। বরং, দেশের জন্য কিছু করতে পারার অহংকার তাদের অভিব্যক্তিতে প্রকাশ্য! অথচ, এই পুরুষদের আমি অনায়াসেই কাঁদতে দেখেছি তাদের সন্তানদের কী হবে সেটা ভেবে! বাবা হিসেবে!

চার.
আচ্ছা, বাবারা কেন গোপনে কাঁদেন? পৃথিবীর প্রতিটি বাবাই একটি সন্তানের জন্য নিরাপত্তার স্থান। একটি পরিবারের জন্য আশ্বাসের স্থান। এই আশ্বাসের দৃঢ়তার জন্য, এই নিরাপত্তার নিশ্চয়তার জন্য বাবারা অশ্রু গোপন করেন। নিজের সংকুল জীবনপ্রান্তেও, নিজের প্রয়ানের চেয়েও সন্তানের নিরাপত্তার আশংকা তাদের ভঙ্গুর করে তোলে।

আমাদের জীবনে মায়েরা ভালোবাসার চাঁদোয়া তৈরি করেন কিন্তু বাবারা তৈরি করেন নিরাপত্তার আকাশবলয়। আমরা চাইলেই মায়ের ভালোবাসার চাঁদোয়া স্পর্শ করতে পারি কিন্তু আমরা চাইলেই বাবাদের আকাশ ছুঁয়ে দেখতে পারি না। 

বাবাদের জীবনের গভীরতা আমরা নিরুপন করতে পারি না, আমরা শুধু তাদের উপস্থিতি অনুভব করতে পারি। বাবারা সন্তানদের অনুভব বঞ্চিত করতে চান না বলেই তাদের আকাশ এত উঁচু হয়! তাদের কান্না এত গোপন হয়!

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না