ঢাকা      রবিবার ২১, অক্টোবর ২০১৮ - ৫, কার্তিক, ১৪২৫ - হিজরী

ডা. ডেনিস মুকওয়েগে

নোবেল বিজয়ী এক চিকিৎসকের জীবনের গল্প (ভিডিওসহ)

যুদ্ধ বিধ্বস্ত কঙ্গোর নির্যাতিত নারীদের ভরসাস্থল দেশটির প্রখ্যাত গাইনোকলজিস্ট ডেনিস মুকওয়েগে। অপারেশনের অসাধারণ দক্ষতায় যিনি সারিয়ে তোলেন নির্যাতিত ও ধর্ষিতা নারীদের ক্ষত। কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় শহর বুকাভুতে পাঞ্জি হাসপাতালের পরিচালক তিনি। এছাড়াও যৌন সহিংসতার শিকার নারীদের ট্রমা থেকে বের করে আনতেও তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। এ সাহসী অবদানের জন্য এ বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন এ মহান চিকিৎসক। আসুন জেনে নিই তার জীবনের গল্প।  

১৯৫৫ সালের ১ মার্চে তৎকালীন বেলজিয়ামের অধীনে থাকা কঙ্গোর পূর্বাঞ্চলীয় শহর বুকাভো শহরে জন্মগ্রহণ করেন ডা. মুকওয়েগে। রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণকারী ডা. মুকওয়েগে ৯ ভাইবোনের সংসারের তৃতীয় সন্তান। ৬৩ বছর বয়সী ডা. মুকওয়েগে ৫ সন্তানের জনক।

শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মজীবন শুরু

বাবার প্রেরণায় সাধারণ মানুষকে সেবাদানের জন্য তিনি চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। ১৯৮৩ সালে ইউনিভার্সিটি অব বুরুন্ডির মেডিকেল স্কুল থেকে এমডি ডিগ্রি নেন। শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মজীবনের যাত্রা শুরু করেন। তিনি কঙ্গোর বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ শিশুদের স্বাস্থ্য সমস্যা দূরীকরণে ব্যাপক সক্রিয় হন।

যে কারণে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ

কিন্তু হাসপাতালে যখন তিনি নির্যাতিত নারীদের কাতরতরা দেখে সিদ্ধান্ত নিলেন তাদের জন্য কিছু একটা করবেন। চলে যান ফ্রান্সে।  দেশটির ইউনিভার্সিটি অব অ্যাঙ্গার্সে ১৯৮৯ সালে তিনি গাইনোকলজি ও অবসট্রেট্রিক্সে ফ্রান্সের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গাইনোকোলোজি পড়েন।

জীবনের মূল গল্পগুলো যখন শুরু

ফ্রান্স থেকে গাইনি ও অবসে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে ১৯৮৯ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত কঙ্গোর এক হাসপাতালে কাজ ‍শুরু করেন ডা.  মুকওয়েগে। 

নারীদের বাঁচাতে দিনে ১০টিরও বেশি অস্ত্রোপচার করেছেন। প্রতিদিন ১৮ ঘণ্টা কাজ করার অসীম ধৈর্য আর একাগ্রতার কারণে নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য উচ্চতায়। সহস্রাধিক নারীকে একা হাতে চিকিৎসা করে বাঁচিয়ে তোলার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন ৬৩ বছর বয়সী এ চিকিৎসক। আর ৩০ হাজারের বেশি নারীকে চিকিৎসা দিয়েছেন তার নেতৃত্বাধীন চিকিৎসক টিম।

নিজের জীবনের পর্যবেক্ষণ মুকওয়েগে বর্ণনা করেছেন এভাবে-

১৯৯৯ সালে আমাদের হাসপাতলে প্রথম একজন ধর্ষিতা এল। ধর্ষণ করার পর তার জননাঙ্গ আর উরুতে গুলি করা হয়েছিল। আমি আঁতকে উঠলাম। এরকম বর্বরতা মানুষের দ্বারা কীভাবে সম্ভব!

আসল ধাক্কাটা এল তিন মাস পর। একই ধরনের ঘটনার শিকার ৪৫ জন নারী এল আমাদের হাসপাতালে। তাদের সবার গল্প মোটামুটি এক। গ্রামে হামলা চালিয়ে তাদের ধর্ষণ করা হয়, নির্যাতন করা হয়।

আরও অনেকে আমাদের কাছে আসছিলেন পোড়া ক্ষত নিয়ে। তাদের প্রথমে ধর্ষণ করা হয়েছিল, তারপর জননাঙ্গে ঢেলে দেওয়া হয়েছিল এসিড।

আমার মাথায় শুধু প্রশ্ন ঘুরছিল- এসব কী হচ্ছে! এগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়, এগুলো তো একটি কৌশলের অংশ।

এমন ঘটনা ঘটছিল, যেখানে একই সময়ে একাধিক নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছিলেন। কোনো কোনো রাতে পুরো গ্রামের সব নারীকে ধর্ষণ করা হচ্ছিল। এই বর্বরতা চলছিল সবার সামনে, প্রকাশ্যে। এর মাধ্যমে তারা যে কেবল সেই নারীদের ক্ষতি করছিল তা নয়, পুরো কমিউনিটিতে ক্ষত সৃষ্টি করছিল।

এই কৌশলের ফল হচ্ছিল এরকম- পুরো গ্রামের মানুষ তাদের ভিটেমাটি ছেড়ে, ক্ষেত খামার সম্পদ ছেড়ে, সব কিছু ছেড়ে পালাচ্ছিল। দারুণ কার্যকর এক কৌশল!

দ্বিতীয় কঙ্গো যুদ্ধের এক পর্যায়ে তিনি দেখতে পান, মেয়েদের সাধারণ রোগগুলোর বাইরে নানা বয়সী নারী ও শিশু তার কাছে চিকিৎসা নিতে আসছে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে। আক্রান্তদের অনেকের অবস্থা এতটাই খারাপ থাকে যে তাঁদের সার্জারি করতে হয়। মুকওয়েগে ও তাঁর সহকর্মীরা সেইসব নারীকে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।

স্পষ্টভাষীতাই চ্যালেঞ্জ হলো চিকিৎসকের

প্রবল সাহসী এ চিকিৎসক যুদ্ধক্ষেত্রে নারী সহিংসতার একজন স্পষ্টভাষী সমালোচক। অসহায় এ নারীদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে ব্যর্থতার জন্য তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দায়ী করেছেন বহুবার। তাদের দুর্বলতাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন বিভিন্ন সময়। আর এতেই তার প্রতি সমালোচনা ঝড় তুলে বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠী।  

কঙ্গোয় গৃহযুদ্ধ ও প্রেসিডেন্ট জোসেফ কাবিলা সরকারের কঠোর সমালোচনা করেন ডা. মুকওয়েগে। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘে এক ভাষণে মুকওয়েগে অন্যায় যুদ্ধ এবং যুদ্ধাস্ত্র হিসাবে নারীদের ওপর সহিংসতার বিরুদ্ধে যথেষ্ট ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্য কঙ্গো সরকারসহ অন্যান্য দেশের সরকারেরও সমালোচনা করেন।

এরপরই তার জীবন হুমকির মধ্যে পরে। বন্দুকধারীরা তার পিছু নেয়। নিজে প্রাণে বেঁচে গেলেও তার দেহরক্ষীকে হত্যা করা হয়।   

একপর্যায়ে বাড়ি থেকে সপরিবারে পালিয়েও যেতে বাধ্য হন এ চিকিৎসক। এ ঘটনার পর মুকওয়েগে পরিবার নিয়ে চলে যান সুইডেনে। এরপর যান বেলজিয়ামে।

কিন্তু দেশের নির্যাতিত নারীদের জন্য তার মন বিদেশে বেশিদিন টিকল না। জীবনের ঝুঁকি সত্ত্বেও ২০১৩ সালে তিনি আবার দেশে ফেরেন। দেশের নারীরাই প্রচার চালিয়ে তহবিল সংগ্রহ করে তার দেশে ফেরার টিকিটের ব্যবস্থা করে দেয়।

কিন্তু তার জীবন আর স্বাভাবিক নেই। হাসপাতালেই তাকে থাকতে হয় চব্বিশ ঘণ্টা।

মুকওয়েগে বলেন, “এরপর আমি আর না বলতে পারিনি। তাছাড়া, আমি নিজেও সহিংসতার শিকার নারীদের সহায়তা করতে সংকল্পবদ্ধ ছিলাম।”

“দেশে ফেরার পর জীবনধারা বদলাতে হয়েছে। এখন আমি হাসপাতালেই থাকি। আর কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা রেখেছি। তাই স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগটাও তেমন নেই।”

মুকওয়েগের হাসপাতালে বর্তমানে তার সুরক্ষায় নিয়োজিত আছে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীরা। মুকওয়েগের ওই হাসপাতালে এখন বছরে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৩ হাজার ৫শ’রও বেশি নারী।

তাঁবু খাটিয়ে হাসপাতালের যাত্রা

২০১৩ সালে বিবিসি কে তিনি বলেন, “আমি তাঁবু খাটিয়ে হাসপাতালের যাত্রা শুরু করেছিলাম। গর্ভবতী নারীদের জন্য একটি ওয়ার্ড এবং আর একটি অপারেশন থিয়েটার ছিল। ১৯৯৮ সালে ফের সব ধ্বংস হল। ১৯৯৯ সালে আমি আবার সব নতুন করে শুরু করলাম।”

 

ডা. মুকওয়েগেকে নিয়ে চলচ্চিত্র

দু’দশকেরও বেশি সময় ধরে নারীদের সেবায় এক লড়াকু এ চিকিৎসকের জীবনী এবং কাজ নিয়ে নির্মিত হয়েছে ২০১৫ সালের ‘দ্যা ম্যান হু মেন্ডস উইমেন’ শীর্ষক চলচ্চিত্র।

ডা. মুকওয়েগের যত পুরস্কার

২০০৮ সালে মুকওয়েগে জাতিসংঘের মানবাধিকার পুরস্কার পান। ২০০৯ সালে তিনি ‘আফ্রিকান অব দ্য ইয়ার’ হন।

বুকাভুতে তিনি পাঞ্জি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ২০ বছর আগে। সে সময় অস্ত্রধারীদের ধর্ষণের শিকার এবং গুরুতর জখম এক নারীকে তিনি প্রথম চিকিৎসা করে সারিয়ে তুলেছিলেন। সে অভিজ্ঞতা থেকেই পরে তিনি অত্যাচারিত নারীদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন।

নোবেল ঘোষণার সময় অপারেশন থিয়েটারে মুকওয়েগে

শুক্রবার নোবেল শান্তি পুরস্কার ঘোষণার সময় মুকওয়েগে অপারেশন থিয়েটারে ছিলেন।

তার কথায়, “অপারেশন করতে করতেই এ খবর এল। আমি লোকজনের চীৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। আমার এ সম্মানজনক পুরস্কারের খবর শুনে নারীরা সবচেয়ে বেশি খুশি হয়েছেন। আমি তাদের চোখেমুখে আনন্দের ঝিলিক দেখেছি। আমার কাজের স্বীকৃতিতে তারা যে রকম খুশী হয়েছে তা সত্যিই আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে।”

ডা. ডেনিস মুকওয়েগে সম্পর্কে নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান

এ বছর শান্তিতে যৌথভাবে নোবেল পুরস্কার পান কঙ্গোর চিকিৎসক ডা. ডেনিস মুকওয়েগে ও ইরাকের কুর্দি মানবাধিকার কর্মী নাদিয়া মুরাদ।  শুক্রবার (অক্টোবর) আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের নাম ঘোষণা করে নরওয়ের নোবেল কমিটি।

নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান বেরিট রেইস-অ্যান্ডারসন বলেন, ধর্ষণের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নাদিয়া মুরাদ-ডেনিস মুকওয়েজ জুটির ভূমিকা ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ ছিল।

স্ত্রীরোগবিশেষজ্ঞ মুকওয়েগে গত ১০ বছর ধরেই নোবেল শান্তি পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত তালিকায় ছিলেন।

তথ্যসূত্র: বিবিসি, সিএনএন, আলজাজিরা , চ্যানেল নিউজ এশিয়া

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আন্তর্জাতিক বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ময়মনসিংহ মেডিকেলের শিক্ষার্থীই ভুটানের নতুন প্রধানমন্ত্রী

ময়মনসিংহ মেডিকেলের শিক্ষার্থীই ভুটানের নতুন প্রধানমন্ত্রী

ভুটানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হয়েছেন ময়মনসিংহ মেডিকেলের প্রাক্তন ছাত্র ডা. লোটে শেরিং।…

২২ মিনিট হার্ট বন্ধ থাকা বিস্ময়কর শিশু!

২২ মিনিট হার্ট বন্ধ থাকা বিস্ময়কর শিশু!

মেডিভয়েস ডেস্ক: লন্ডনে সেন্ট জর্জ হাসপাতালে মাত্র ২৭ সপ্তাহে 1.4 বিলিয়ন (৬৩৫ গ্রাম)…

ভারতে জিকা ভাইরাসে ৫০ জন আক্রান্ত

ভারতে জিকা ভাইরাসে ৫০ জন আক্রান্ত

মেডিভয়েস ডেস্ক: ভারতে জিকা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ জনে পৌঁছেছে।   সম্প্রতি দেশটির…

ইবোলা ভাইরাসে প্রতি ৭ দিনে ২৪ জনের মৃত্যু!

ইবোলা ভাইরাসে প্রতি ৭ দিনে ২৪ জনের মৃত্যু!

মেডিভয়েস রিপোর্ট: আফ্রিকার দেশ কঙ্গোতে ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে গত ৭ দিনে ২৪…

বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে এঞ্জেলা মার্কেলের ঐক্যের ডাক

বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে এঞ্জেলা মার্কেলের ঐক্যের ডাক

মেডিভয়েস ডেস্ক: বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য হুমকির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন জার্মান চ্যান্সেলর…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর