ডা. জোবায়ের আহমেদ

ডা. জোবায়ের আহমেদ

নির্বাহী পরিচালক ডা. জোবায়ের মেডিকেয়ার এন্ড প্যাথলজি সেন্টার। 


০৩ অক্টোবর, ২০১৮ ০৯:৪৫ এএম

ফার্মেসির চিকিৎসাকে না বলুন

ফার্মেসির চিকিৎসাকে না বলুন

জনাব আফতার হোসেন, বয়স- ৫৯। জকিগঞ্জের বিরশ্রী ইউনিয়নের উজিরপুর থেকে আমার কাছে এসেছেন খাবারে অরুচি, বমি বমি ভাব, কিছু খেলে বমি হয়ে যাওয়া, খাওয়ার পর পেটে ব্যথা এবং মাথা ঘুরানো ও খুব দূর্বলতা নিয়ে।

স্থানীয় ফার্মেসি থেকে তথাকথিত গ্যাস্ট্রিক বলে গ্যাসের বড়ি ও ডমপিরিডন খেয়েছেন কয়েকমাস ধরে। সাথে ভিটামিন ফাইল। ক্লিনিকাল পরীক্ষা করে দেখি severe anaemia হিমোগ্লবিন ৫.৫ gm/dl.

তিন ব্যাগ ব্লাড ট্রান্সফিউশন করে রক্তশূন্যতা কারেকশন করে কেন রক্ত কমে গেল সেই কারণ বের করার জন্য UPPER GI ENDOSCOPY করাই। রিপোর্টে পাকস্থলীর ক্যান্সার ধরা পড়ে। 

কোন সমস্যাই ছোট নয়। খাবারে অরুচি, বমি বমি ভাব ও ক্যান্সারের উপসর্গ হতে পারে। কিছু হলেই ফার্মেসি থেকে বলে ওষুধ খাওয়ার অভ্যাস ত্যাগ করুন। আপনি সচেতন হলেই বেঁচে যায় আপনার প্রিয়জন।

কেইস-২
জনাব মো. মইন উদ্দিন, বয়স- ৬০। এসেছেন আমার কাছে পরচক, জকিগঞ্জ থেকে। বমি বমি ভাব, খাবারে অরুচি, খাবার খেতে কষ্ট হয়, খাবার বুকে আটকে থাকে যেটাকে মেডিকেলীয় ভাষায় ডিসফ্যাজিয়া বলা হয়ে থাকে।

দীর্ঘ ছয় থেকে সাত মাস ধরে এই সমস্যায় ভুগছিলেন। স্থানীয় বাজারের বিভিন্ন ফার্মেসি থেকে তথাকথিত গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা বলে অনেক ওষুধ খেয়েছেন। আমার কাছে আসার পর রোগী দেখে আমার ইসোফেজিয়াল ক্যান্সার (খাদ্য নালীর) মনে হলে upper GI endoscopy করাই। এবং আমার ক্লিনিক্যাল সন্দেহটা সঠিক হয়। রোগীর খাদ্যনালীর ক্যান্সার ধরা পড়ে।

অনেক মানুষ প্রচুর পরিমানে পান সুপারি খায় যেটাকে স্থানীয় ভাষায় গুয়া পান খাওয়া বলা হয়। অনেক রোগীকে পান খাওয়ার জন্য নিষেধ দিলে বলে ভাত না খেয়ে থাকতে পারবেন কিন্ত গুয়া পান ছাড়া যাবে না। অনেক রোগীরা বলেন গুয়া পান খেয়ে উনারা ঠেকে গেছেন, পান ছাড়া অসম্ভব।

মেডিকেল সায়েন্স গবেষণা করে প্রমাণ করেছে খাদ্যনালীর ক্যান্সার (Oesophagial carcinoma) এর অন্যতম কারণ এই পান সুপারি বা গুয়া পান খাওয়া। পান সুপারি ওরাল ক্যান্সারেরও কারণ।

কেইস-৩
জনাব আব্দুল লতিফ, বয়স-৬০। আমার কাছে এসেছেন কাশি নিয়ে। গত তিন চার মাস ধরে কাশি। ফার্মেসি থেকে কিনে অনেক কফ সিরাপ খেয়েছেন কিন্তু কিছুতেই কাশি না কমায় আমার কাছে আসেন। আমি উনার কাশির কারণ হিসেবে TB রোগ নির্ণয় করে দেই।

কাশি হলেই ফার্মেসি থেকে কফ সিরাপ খাওয়া কোন সমাধান নয়। কাশির আছে ভিন্ন ভিন্ন কারণ। সাধারণত ফ্লু বা ভাইরাস জনিত কাশি হলে তা এমনিতেই সেরে যায়। কিন্তু যক্ষ্মা, এ্যাজমা, এলার্জি, নিউমোনিয়া, সিওপিডি, ব্রংকাইটিস, ব্রংকিয়াক্টাসিস, ফুসফুসের ক্যান্সার, ফরেন বডির জন্য যেই কাশি হয় তার যথাযথ চিকিৎসা আছে। 

একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসক সেই কাশির কারণ বের করে যযথাযথ চিকিৎসা দিতে পারবেন। এক ধরনের হাই প্রেসারের ওষুধ আছে যাদেরকে এসিই ইনহিবিটর বলা হয়, সেই ওষুধগুলোর জন্যও কাশি হতে পারে।

এখন এসব ওষুধের জন্য কাশি হলে কফ সিরাপ নয়, এই ওষুধটি বন্ধ করে দিয়ে অন্য প্রেসারের ওষুধ খেতে হয়। আবার এসিড রিফ্লেক্স বা GERD যেখানে বুক জ্বালা, ঢেকুর ওঠা, মুখে পানি আসার পাশাপাশি কাশি হয়।

আপনার কাশির সাথে রক্ত গেলে, শ্বাস নিতে কষ্ট হলে, অল্প মাত্রায় জ্বর থাকলে, বেশি মাত্রায় জ্বর থাকলে, বুকে ব্যথা হলে, ওজন কমতে থাকলে দ্রুত একজন গ্রাজুয়েট চিকিৎসককে দেখাতে হবে।

বাজারে প্রচলিত কফ সিরাপগুলোর অনেক ক্ষতিকর দিক আছে যেমন ঝিমুনি, বেশি বেশি ঘুম, খিঁচুনি, পালপিটেশন, কিডনি ও লিভারের নানা ক্ষতি করতে পারে। অনেক কফ সিরাপ নেশা তৈরী করে। সুতরাং কাশি হলেই কফ সিরাপ খাওয়া বন্ধ করুন। চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে কাশির যথাযথ কারণ নির্ণয় করে সুচিকিৎসা নিন।

কেইস-৪
জনাব ওয়াসীর আলী, বয়স- ৭০। জকিগঞ্জের বারহাল ইউনিয়নের মনতইল গ্রামের অধিবাসী। আমার কাছে আসেন তিন মাস ধরে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, শুইলে দম বন্ধ হয়ে যায় এমন সমস্যা নিয়ে। যেটাকে মেডিকেলের ভাষায় orthopnoea বলা হয় এবং এটা হার্ট ফেইলরের সিম্পটোম। চাচার মাঝে মাঝে মুখ ও পা ফুলে যেত।

তিনি স্থানীয় বাজারের বিভিন্ন ফার্মেসি থেকে কয়েক ধরনের ইনহেলার ইউজ করেন কিন্তু দিন দিন অবস্থা খারাপ হওয়ায় আমার কাছে আসেন। আমি রোগী দেখে, ক্লিনিক্যাল এক্সামিনেশন করে বুঝতে পারি এটা heart failure এর কেইস। 

তারপর যথাযথ Investigation করাই এবং আমার ডায়াগনোসিস নিশ্চিত হয়। শ্বাস কষ্ট হলেই ফার্মেসি থেকে বলে ইনহেলার ইউজ না করে না করে একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের মতামত নিন। 

আরও পড়ুন-

►‘ম্যাডাম, আপনি হামাক ডায়াবেটিসের ওষদ দিছেন ক্যা?’

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না