ডা. হামীম ইবনে কাওছার

ডা. হামীম ইবনে কাওছার

এমডি, পিএইচডি, এফএসিপি 
হেমাটোলজি এন্ড অনকোলজি 
ইউনিভার্সিটি অব ক্যানসাস যুক্তরাষ্ট্র।


০২ অক্টোবর, ২০১৮ ০৩:৪৮ পিএম

কী দুর্ভাগ্য! 

কী দুর্ভাগ্য! 

একটা ভেজিটেবল বার্গার আর কিছু ফ্রেঞ্চ ফ্রাই নিয়ে লাঞ্চে বসেছি ডক্টরস লাউঞ্জে। পিছন থেকে কচ কচ শব্দ হচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে। কৌতূহলে পিছনের দিকে তাকালাম। ত্রিশের কোঠার একটি মেয়ে (মহিলা?) লাঞ্চ করছে। তার প্লেটে শুধু কতগুলো গাজর। সামনে ল্যাপটপ। দীর্ঘক্ষণ ধরে কাজ করছে, আর গাজর খাচ্ছেন- কাঠবিড়ালির মত। মেয়েটির জন্য আমার খুব মায়া হচ্ছে। ইচ্ছে হচ্ছে তার মুখে কতগুলো ফ্রেঞ্চ ফ্রাই তুলে দেই। আহা! সারাদিনের কঠোর পরিশ্রমের পরও তার জন্য বরাদ্দ শুধু কতগুলো গাজর। কী দুর্ভাগ্য তার!

দুই.
সকালে বৃষ্টি হচ্ছে। ক্যাটস এন্ড ডগস এর মত ভারী বৃষ্টি না। গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাচ্ছি। দল বেঁধে কিছু শুকনো মেয়ে বৃষ্টিতে ভিজে রাস্তায় দৌড়াচ্ছে, জগিং বলে যাকে। পুরো মাথা-শরীর বৃষ্টির পানিতে ভেজা। ইচ্ছে হচ্ছে তাদের কোলে করে আমার গাড়িতে তুলে এনে তোয়ালে দিয়ে গা মুছে দেই। আমার মেয়েগুলোর জন্য খুব মায়া হচ্ছে। আহা! এমন বৃষ্টিতেও তাদের সকালের ১১ কিঃমিঃ দৌড় বাদ দেয়া যাচ্ছে না। কী দুর্ভাগ্য তাদের!

তিন. 
আমার নতুন এপার্টমেন্টে কাঠের সিঁড়ি বেয়ে উপর উঠতে হয়। সিঁড়ির নিচের দিকটা ফাঁকা। বৃষ্টিতে সিঁড়িটা কিছুটা আদ্র। আমি এপার্টমেন্টের বাইরে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছি। লক্ষ্য করলাম একটি মেয়ে বাসায় ফিরছে। আমি সিঁড়ি থেকে একটু সরে দাঁড়ালাম যাতে সে নির্বিঘ্নে হেটে যেতে পারে। আমি দূরে দৃষ্টি দিয়ে ফোনে মনোযোগী। হঠাৎ জোরে একটা কর্কশ শব্দ হলো। তাকিয়ে দেখি সেই মেয়েটির উঁচু হিলের জুতো পিচ্ছিল সিঁড়ি থেকে পিছলে তার পা সিঁড়ির ফাঁক দিয়ে নিচে পড়ে গেছে। 

আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কি করা উচিত। তাকে কোলে করে বাসায় দিয়ে আসবো? আমি এগিয়ে গেলাম। ব্যথা লুকিয়ে তিনি হাসির চেষ্টায় মগ্ন। তিনি উঠে দাঁড়ালেন, কিছুটা অস্বস্তির সাথে ধীরে ধীরে বাসায় হেটে গেলেন। আমার মেয়েটির জন্য খুব মায়া হচ্ছে। আহা! এমন বৃষ্টিতেও তার উঁচু হিলের জুতো পরে হাটতে হচ্ছে। কী দুর্ভাগ্য তার!

চার. 
আইসক্রিমের দোকানে এসেছি মেয়েদের নিয়ে। তারা পেয়ালা ভরে আইসক্রিম নিচ্ছে। মধ্য বয়সী একজন মহিলা তার বাচ্চা নিয়ে এসেছেন আইসক্রিম খেতে। বাচ্চাকে এক পেয়ালা আইসক্রিম দিয়ে মহিলা ছোট চামচের এক চামচ আইসক্রিম নিলেন। আমি তার খাওয়া লক্ষ্য করছি। তিনি চামচ আইসক্রিমে মিশিয়ে মুখে দিচ্ছেন, চামচে কোনো আইসক্রিম নেই। আমার ইচ্ছে হচ্ছে তাকে আমার পাশে বসিয়ে চামচ ভোরে আইসক্রিম খাইয়ে দেই। আমার মহিলার জন্য খুব মায়া হচ্ছে। আহা! দোকানে এত আইসক্রিম অথচ তিনি খেতে পারছেন না। কী দুর্ভাগ্য তার!

পাঁচ.
শীতের সকাল। বরফ পড়ে নি, তবে বরফ পড়ার মত শীত পড়েছে। আমি আমার কর্মস্থলে ওভারকোট পরে এসেছি। মোটা মোজা, ইংলিশ জুতো। করিডোরে উঁচু হিলের মস্তিস্কবিদারী শব্দে হেঁটে যাচ্ছেন সুন্দরী সহকর্মী তরুণী। এমন ঠান্ডায়ও তার ঊরু অনাবৃত রাখতে হচ্ছে। তিনি শীত শীত ভাবকে উষ্ণতার অভিনয় করছেন। আমার ইচ্ছে হচ্ছে আমার হাতমোজা দিয়ে তার অনাবৃত ঊরুকে জড়িয়ে দেই। আমার মেয়েটির জন্য খুব মায়া হচ্ছে। এমন শীতেও তার ঊরু দেখাতে হচ্ছে সৌন্দর্যের নামে। আহা! কী দুর্ভাগ্য তার!

ছয়.
আমার ক্লিনিকে প্রায়ই মাঝবয়সী রোগী আসেন। হয় পায়ের আঙুল, অথবা কোমর অথবা পায়ের তলায় অসম্ভব ব্যথা। তাদেরকে অনেক সময়ই আমি বলেছি উঁচু হিল বা বেশি সুঁচালো অগ্রভাগের জুতো না পরতে। তারা নিয়মিত ব্যথার ওষুধ খাচ্ছেন, এক্সরে করাচ্ছেন, কাইরোপ্র্যাক্টরের কাছে যাচ্ছেন। ব্যথা কমছে না, অথচ তাদের উঁচু হিল পড়তে হচ্ছে। আমার এদের জন্য খুব মায়া হচ্ছে। ব্যথায় সমতলে হাঁটতে না পারা মেয়েরা কি অবলীলায় উঁচু হিলে দিনের বেলায় হেটে রাতে ব্যথায় কাতর। আহা! কী দুর্ভাগ্য তাদের।

সাত.
পুরুষশাসিত সমাজে মেয়েদের ফ্যাশন শেখানো হয়েছে। সকালে জগিং, দুপুরে গাজর, বিকেলে কড়া মেকআপ, সন্ধ্যায় হাই-হিল, শীতে ঊরু অনাবৃত, রাতে ব্যথায় কাতর। তাদের প্যান্ট ছোট হতে হতে ইনগুইনাল ক্যানাল বের হয়ে যাচ্ছে, জামা খুলতে খুলতে এরিওলা! পুরুষ বশের এই নিষ্ঠুর খেলায় তারা জিরো ফিগারের জন্য মরিয়া, আর তিন কোটি বিবাহিত আমেরিকান পুরুষ নাম নাম লিখিয়েছেন ‘লাইফ ইজ শর্ট, হ্যাভ এন এফেয়ার’ স্লোগান সম্বলিত ‘এশলি ম্যাডিসন’ নামক ওয়েবসাইটে, গোপন যৌন অভিসারের প্ররোচনায়। আমার এই মেয়ে গুলোর জন্য খুব মায়া হয়। এদের বুকে মুখ রেখেই এদের স্বামীরা অন্যের স্ত্রীর ‘উপস্থে’ লিঙ্গ নোঙ্গর করেন অনায়াসে। আহা! কী দুর্ভাগ্য তাদের!

আট.
হাসপাতালে প্রায়ই বৃদ্ধ রোগী আসেন। হাঁপানি, বুকে ব্যথা, নিউমোনিয়া, ক্যান্সার- আরো কত কি! বৃদ্ধের পাশে কড়া লাল লিপিস্টিক পরে সেজেগুজে বসে থাকেন তার সত্তরোত্তর বৃদ্ধা সুন্দরী! তার সেবাসুশ্রুষায় নিমগ্ন পরিপাটি জীবন সঙ্গিনী। কি গৌরব তার চোখে! বৃদ্ধ মৃত প্রায়। জীবনের সব শখ মিটিয়ে বৃদ্ধ বিদায়ের অপেক্ষায়। আর সন্নিকটে, মেদহীনতায়, ইস্ট্রোজেন ন্যূনতায়, অস্টিওপোরোসিসে আক্রান্ত কোটর ব্যথায় কৃশকায় বৃদ্ধা। 

জীবনের সবকিছু বিলিয়ে দিয়েও সততা আর যৌনতায় যাকে আগলে রাখতে পারেননি আযৌবন, সেই তিনি আজ মৃতশয্যায় দুফোঁটা নয়নাশ্রুতে মুছে দেবেন পাপিষ্ঠ অতীত? এই বৃদ্ধাদের জন্য আমার খুব মায়া হয়। আমার খুব ইচ্ছে হয়, তাদের কপোলে আমার আবেগের আঙুল ছুঁইয়ে দেই ভালোবাসায়। আহা! কী দুর্ভাগ্য এই বৃদ্ধাদের!

নয়.
পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় মেয়েদের আয়ুষ্কাল পুরুষদের চেয়ে বেশি (গড়ে পাঁচ বছর বেশি)। এই পুরুষেরাই মেয়েদের শিখিয়েছেন সকালে জগিং, দুপুরে গাঁজর, বিকেলে জিমনেশিয়াম, জিরো ফিগার, সরু কটি, ভারী নিতম্ব। যৌবনে অসততা, প্রৌঢ়ে প্রেমের কপটতা। 

এই পুরুষ শাসিত সমাজ মেয়েদের পুরুষদের চেয়ে দীর্ঘায়ু করেছে যাতে প্রৌঢ়ে-রোগে-শোকে-মরণে তাদের স্ত্রীরা হন পরিচর্যাকারী! আহা! কী দুর্ভাগ্য তাদের!

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না