ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা

ডা. ফাহমিদা শিরীন নীলা

এমবিবিএস, এফসিপিএস (গাইনী)

ফিগো ফেলো (ইতালি)

গাইনী কনসালট্যান্ট, বগুড়া।


০২ অক্টোবর, ২০১৮ ১২:০২ পিএম

‘ম্যাডাম, আপনি হামাক ডায়াবেটিসের ওষদ দিছেন ক্যা?’

‘ম্যাডাম, আপনি হামাক ডায়াবেটিসের ওষদ দিছেন ক্যা?’

আমার হাসপাতালে আসা বেশিরভাগ রোগীই আমার কাছে থেকে মেডিসিন স্লিপ হাতে নিয়ে বলেন, একন ডাক্তারের গোড়ত যায়্যে ওষদ নিমু মা? যায়্যে কী কমো ডাক্তারেক?
- আমি হাসতে হাসতে বলি- যায়্যে কও, ওই পাঁচ নাম্বার ঘরের কম্পাউন্ডার ওষদ নেকে দিছে। তোমাক দিবা কল্যো।

আমাদের দেশের অশিক্ষিত রোগীরা বুঝতে পারে না। এরা ঔষধ দাতা বা বিক্রেতাকেই ডাক্তার মনে করে। আর এই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে কিছু দোকানদার। অতি সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া কয়েকটা উদাহরণ দেই।

১. রোগীকে খাবার পিল লাইনেস দেয়া আছে। ১ পাতা খেয়ে ৭ দিন বাদ দিয়ে আবার ১ পাতা খাবে। দোকানদারের পরামর্শমত ৭ দিন খেয়েছে, ৭ দিন বাদ দিয়েছে। ফলাফল সারা মাস ধরে উইথড্রোল ব্লিডিং। রোগী এসে বলে, ‘আপনে কী ওষদ দিলেন ম্যাডাম, অক্ত কোমা আরও বেশি ভাঙিচ্চে।’

২. রোগীকে দেয়া হয়েছে তিন দিনের ভিটি। দোকানদার তাকে একটা ভিটি দিয়ে বলেছে, ভেঙে তিনভাগ করে তিন রাতে দিতে। রোগী এসে বলে, ‘কী ওষদ দিছেন ম্যাডাম, ভাঙাই যায় না, খালি পিছলে যায়।’

৩. পলি সিস্টিকের রোগীকে মেটফরমিন দিয়েছি। রোগী পরেরদিন দৌড়াতে দৌড়াতে এসে বলে, ‘ও ম্যাডাম, আপনি হামাক ডায়াবেটিসের ওষদ দিছেন ক্যা? ডাক্তর ক্যলো, ম্যাডাম তো তোক ভুল কর‍্যা ডায়াবেটিসের ওষদ দিছে।’

৪. হাইপোথাইরেয়েডের রোগীকে একটানা ল্যাসিক্স খাইয়েই গেছে। রোগী বলে, ‘কত ওষদ খানু! ফুলা কমেনা।’

৫. আমার প্রি-এক্লাম্পসিয়ার রোগীর প্রেসার নরমাল হয়েছে তিনখানা এন্টিহাইপারটেনসিভ ড্রাগ খেয়ে। দোকানদার ভাই নিজের অতিরিক্ত জ্ঞান দিয়ে তিনখানাই বন্ধ করে দিয়েছে। তোমার প্রেসার নরমাল হয়্যা গেছে তো! আর ওষদ লাগপি না।

প্রিয় ঔষধের দোকানদার ভাইদের জন্য বিনা পয়সায় দেয়া কিছু দরকারি উপদেশঃ

১. ভাইজানেরা, দয়া করে আমার প্রেসক্রিপশনকে আপনার হিসাবের খাতা মনে করে ভুল করবেন না। কয়টা ঔষধ বিক্রয় করলেন, ক'খানা বাকী রাখলেন এসব হিসাব আমার প্রেসক্রিপশনে করে উহাকে ডাষ্টবিন বানাবেন না প্লিজ।

২. আপনার কলমটিকে সংযত করুন। অযথা ঔষধের পাশে টিক চিহ্ন দিয়া রোগীকে বিভ্রান্ত করবেন না। কারণ, পরবর্তীতে যখন কোন কোন ঔষধ চলবে বলে আমি টিক দিয়ে যাবো, তখন আপনার দাগের কারণে রোগী অহেতুক বিভ্রান্তির ভিতরে পড়বে।

৩. কোন ঔষধ কোন রোগের জন্য প্রেসক্রাইব করা হয়েছে এ নিয়ে খামাকা নিজের ক্ষুদ্র অসামান্য মস্তিষ্কের সামান্য ব্যবহার করতে উদ্যত হবেন না। কোন কোন ঔষধ কোন কোন রোগে ব্যবহার করা যাবে, এ সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান নিয়েই একজন ডাক্তার ঔষধ লিখে থাকেন। এই যেমন- মেটফরমিন ডায়াবেটিসের ঔষধ এটা আমরাও জানি। কিন্তু এটা ছাড়া কোন কোন ক্ষেত্রে ইহা ব্যবহার করা যাবে এটা সম্পর্কে আপনারা জানেন না। সুতরাং, অযথা আপনার অমৃতবাণী রোগীর উপর প্রয়োগ করে রোগীকে ভীত সন্ত্রস্ত করবেন না।

৪. আমি কোন কোম্পানীর ঔষধ লিখব বা না লিখব ইহা আমার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। কোনটা দামী আর কোনটা কমদামী কোম্পানী এটা নিয়া গবেষণা করাটাও আপনার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু আমি কমদামী/দামী কোম্পানীর ঔষধ লিখেছি বলে রোগীর ভেতরে সন্দেহের বীজ বপন করা আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার না। সুতুরাং, কলমের সাথে সাথে আপনার মুখটাকেও সংযত রাখুন।

৫. ঔষধের দামকে প্রাধান্য দিয়া শুধু শুধু রোগীকে আমার উপরে ক্ষীপ্ত করে তোলার অদম্য ইচ্ছাটা দমন করুন। মনে রাখবেন, ঔষধের দাম অপেক্ষা অসুখের গুরুত্বটাই আমাদের কাছে প্রাধান্য পায়।

৬. নিজের কাছে কোন ঔষধ না থাকলেই, আমি মার্কেট আউট ঔষধ লিখেছি বলে রোগীর সামনে মনগড়া মন্তব্য করবেন না প্লিজ।

৭. আমার ব্যবস্থাপত্র নিয়া গবেষণা করার অনধিকার চর্চা হতে বিরত থাকুন।

৮. আমার হাতের লেখা পড়তে না পারলে আমার চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার না করে, এই ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে ধান-চালের ব্যবসায় নেমে পড়ুন।

৯. আপনার দোকানে নাই বলে আমার প্রেসক্রিপশনে লেখা ঔষধের পরিবর্তে অন্য কোম্পানীর একই ঔষধ কিংবা নিজের ইচ্ছানুযায়ী অন্য ঔষধ রোগীর নিকট গুছাইয়া দেওয়া বন্ধ করুন।

১০. আমার প্রেসক্রিপশনে স্বহস্তে নোট লেখার পূর্বে আপনার নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে অবগত হন।

১১. আমার প্রেসক্রিপশনে দেওয়া ঔষধ খাওয়ার নিয়ম-কানুন নিজে না বুঝলে রোগীকে আমার নিকট পুনরায় প্রেরণ করুন। অহেতুক নিজের মনোমতো সেবনবিধি শিখিয়ে রোগীকে আরও ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিবেন না।

১২. দয়া করে ঔষধ বিক্রয় করবার ফাঁকেফাঁকে আমার প্রেসক্রিপশন মুখস্থ করে অন্য রোগীর উপর প্রয়োগ করার সাহসিকতা দেখাবেন না। এতে হীতে বিপরীত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থাকে।

১৩. আমার ডিগ্রী নিয়া ব্যবচ্ছেদ করার মত দুঃসাহস না দেখানোই উচিত। এফসিপিএস, এমএস, এমসিপিএস, এমআরসিপি, এমআরসিওজি ইত্যাদি ডিগ্রীর বিস্তারিত রূপ উচ্চারণ করতেই আপনার যেখানে দাঁত ভেঙে যাবে সেখানে আপনি তাঁদেরকে দাঁড়িপাল্লায় উঠানোর মত অসীম সাহসী কাজটিও নির্লজ্জের মত করেন, যা কাম্য নয়।

১৪. আমার সামনে এসে নিজের জ্ঞান জাহির করার চেষ্টা করবেন না। এতে যেকোন মুহূর্তে নিজের জ্ঞানের আলগা মুখোশ খুলে পড়ে বিবস্ত্র হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা অবশ্যম্ভাবী।

১৫. যখন তখন রোগীকে আমার ব্যবস্থাপত্রে উল্লেখিত সময়ের পূর্বেই ঔষধ বন্ধ করার নির্দেশ প্রদান করবেন না। ঔষধ যখন আমি শুরু করেছি, তখন বন্ধ করার ইখতেয়ারটা আমার কাছেই রাখুন।

১৬. সকল রোগীর প্রেসার মেপে তোতাপাখির মত লো-প্রেসার ঘোষণা দেয়া বন্ধ করুন। আর হ্যাঁ, উচ্চ রক্তচাপের ঔষধ খেলে রক্তচাপ নরমাল হবে, এটা যে নরমাল এটুকু আইকিউ আপনার নাই ইহা আমরা জানি, আজ আপনিও জেনে রাখুন। কাজেই প্রেসার নরমাল হয়ে গেছে বলে প্রেসারের ঔষধ বন্ধ করার মত বোকামী আর করবেন না। কারণ, উহা বন্ধ করা মাত্র রোগীর প্রেসার বেড়ে যেকোন দুর্ঘটনা ঘটতে পারে যেকোন মুহূর্তে।

১৭. স্যালাইনকে সকল রোগের মহাষৌধ গণ্য করা নিজেও বন্ধ করুন, রোগীদের ভেতরেও এই মহাজ্ঞান প্রসার করা হতে বিরত থাকুন। এই যেমন বুকেপিঠে ব্যথার রোগীও আপনার স্যালাইন থেরাপির হাত হতে রেহাই পায় না। অথচ আপনি জানেন না, ওই রোগীর হার্টের সমস্যা থাকলে আপনার পুসিং করা স্যালাইন তাকে পুসিং করে দ্রুত মৃত্যুর দিকে ধাবিত করতে পারে।

১৮. একই উপসর্গ যে একাধিক রোগ নির্দেশ করে এই জ্ঞান আপনার নাই। সুতরাং একটা লক্ষণের ঔষধ মুখস্থ করে ফেলেছেন বলে উহা ওই লক্ষণের সকল রোগীর উপর প্রয়োগ করার বৃথা চেষ্টা করবেন না। এই যেমন, রক্তস্রাবের রোগী হলেই আপনি মেথারেশপ্যান কিংবা ট্র‍্যাক্সিল দিয়া রক্তবন্ধের চেষ্টা করেন। কিংবা শরীরে একটু পানি জমা দেখিলেই ল্যাসিক্স মেরে দেন। কোন কোন ক্ষেত্রে আপনাদের এসব অপাত্রে দান করা ঔষধ মহাবিপদ আনতে পারে, এটা আপনারা জানেন না।

১৯. গর্ভবতীদের উপর আপনার ডাক্তারি জ্ঞান প্রয়োগ বন্ধ করুন। কারণ, আপনার অতিরিক্ত জ্ঞানের নীচে চাপা পড়ে দুটি প্রাণ আসন্ন বিপদের মুখোমুখি পড়তে পারে যেকোন সময়।

২০. শেষ কথা, আপনার ব্যবসা আপনি করুন। আমারটা আমাকে করতে দেন। অযথা আমার আলগা পালক কুড়িয়ে নিজের পুচ্ছে লাগিয়ে ময়ূর সাজার বৃথা চেষ্টা বন্ধ করুন।

আরও পড়ুন-

►ফার্মেসির চিকিৎসাকে না বলুন

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না