ডা. হামীম ইবনে কাওছার

ডা. হামীম ইবনে কাওছার

এমডি, পিএইচডি, এফএসিপি 
হেমাটোলজি এন্ড অনকোলজি 
ইউনিভার্সিটি অব ক্যানসাস যুক্তরাষ্ট্র।


০১ অক্টোবর, ২০১৮ ১১:৫৫ এএম

‘আমার হাতে কি বছর দশেক সময় আছে, ডক্টর?’

‘আমার হাতে কি বছর দশেক সময় আছে, ডক্টর?’

ঊনপঞ্চাশ বছর বয়সের একজন রোগী এসেছেন। ভদ্রলোক আমেরিকার সেনাবাহিনীতে ছিলেন দীর্ঘদিন। সাথে এসেছেন তার সুন্দরী স্ত্রী। স্বেচ্ছায় অবসরে যাবার পর ট্রাক কোম্পানিতে কাজ করেন। দুই সপ্তাহ আগে ঘুম থেকে উঠে দেখেন যে তার ঘাড়ে ব্যথা। ভেবেছেন শোয়ায় ব্যত্যয় হবার কারণে ব্যথা হয়েছে। ওষুধ খেয়েছেন নিজে নিজে, ব্যথা কমছে না। 

অবশেষে, ডাক্তার দেখিয়ে একটা এক্সরে করেছেন ঘাড়ের। স্ক্যাপুলাতে মেটাস্টাটিক লেশন দেখা যাচ্ছে। সাথে সাথে বুক-পেটের সিটি স্ক্যান করিয়েছেন তার ডাক্তার। ফুসফুস, লিভার, এড্রেনাল গ্লান্ড, মেডিস্টাইনাম সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে ক্যান্সার। ফুসফুসের বায়োপসি করা হয়েছে, ‘মেটাস্টাটিক স্মল সেল কার্সিনোমা অব লাংস!’

দুই.
ভদ্রলোক জেনে এসেছেন যে তার ফুসফুসের ক্যান্সার হয়েছে এবং তা সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের কাছে পাঠানো হয়েছে ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্য। ক্যান্সার হয়েছে এটা কোনো রোগীকে বলা অত্যন্ত দুঃখজনক একটা ঘটনা। কিভাবে রোগীকে এমন দুঃখজনক খবর দিতে হবে আমেরিকায় তার উপর বিশেষ করে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। 

অবজেকটিভ স্ট্রাকচারড ক্লিনিক্যাল এক্জামিনেশন (অসকি) হয় এর উপর। ক্যান্সারের খবর রোগীকে বলার সময় কি বলতে হবে, কিভাবে বলতে হবে, তখন ডাক্তারের চোখ-মুখের অভিব্যক্তি কেমন থাকতে হবে- এসবের উপর বিস্তারিত প্রশিক্ষণ নেয়া আছে আমার। রোগী যেহেতু জেনেই এসেছে যে তার মেটাস্টাটিক ক্যান্সার আছে, একারণে আমার এই দুঃখজনক খবরটি তাকে বলা লাগেনি। রোগী এসেছেন আমাদের কাছে ক্যান্সারের চিকিৎসা নিতে।

তিন.
আমি রুমে ঢুকলাম। তিনি হাসছেন। আমরা ভীত-সন্ত্রস্ত হলে হাসি। এটা সাইকোলজির ভাষায় একটা ডিফেন্স মেকানিজম এটাকে নার্ভাস লাফটারও বলা হয়। নিজের ভয়-দুশ্চিন্তা ঢাকার জন্য আমরা এমন কপট হাসি দেই। আমি এ হাসির সাথে পরিচিত। চেয়ার টেনে নিয়ে তার পাশে বসলাম, তার শরীর থেকে ভুরভুর করে তামাকের গন্ধ। তিনি দিনে দুই প্যাকেট সিগারেট খান ৩২ বছর ধরে। আমি করমর্দন করলাম তার এবং তার স্ত্রীর সাথে। স্ত্রীকে চিন্তাগ্রস্ত মনে হচ্ছে। 

ভদ্রলোক আমাকে প্রথম প্রশ্ন করে বসলেন, ‘ডক্টর, আমার ফুসফুসে ক্যান্সার হয়েছে, আমি জানি যে আমি আরো কুড়ি বছর বাঁচবো না, তবে আমার বছর দশেক সময় দরকার, আমার অনেক কিছু করা যে এখনও বাকি!’

আমি প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে ফেললাম। মূল প্রশ্নপর্ব শুরু করলাম। তিনি হাসছেন, প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। বললেন, ‘তার স্ত্রীর জন্য একটা বাসস্থানের ব্যবস্থা না করে তিনি মরতে চান না।’

চার.
আমার প্রশ্নপর্ব শেষ হবার পর লাং ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ আমার অধ্যাপক এলেন। তিনি সব কথা শুনলেন। কী কী চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে, ব্যাখ্যা করলেন রোগীকে। সব কথা শেষ। রোগী উদ্বিগ্ন কণ্ঠে অধ্যাপককে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমার হাতে কি বছর দশেক সময় আছে? আমার বয়স মাত্র ঊনপঞ্চাশ। আমি তো এই ঘটনার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। ঘুম থেকে উঠলাম হঠাৎ ঘাড়ে ব্যথা নিয়ে। একটা এক্সরে করা হলো। এই এক্সরের রিপোর্ট আমার জীবনকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। আমি সেনাবাহিনীর লোক, শক্ত মনের মানুষ কিন্তু আমার জীবনের কোনো কিছুই এখনো করা হয়নি, ডক্টর। আমার হাতে কি বছর দশেক সময় আছে?’

অধ্যাপক চেয়ার থেকে উঠে রোগীর পাশে যেয়ে দাঁড়ালেন। তার ঘাড়ে এক হাত, আরেকহাত রোগীর স্ত্রীর ঘাড়ে রাখলেন। আমি নতুন এক অমানবিক দৃশ্য দেখার মানসিক প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমার এড্রেনালিন সার্জ হচ্ছে। নিজের হৃদকম্পন শুনতে পাচ্ছি। আমি অপেক্ষায় আছি কি উত্তর দিবেন অধ্যাপক এই ভদ্রলোককে? অধ্যাপক বললেন, ‘তোমার হাতে খুব সম্ভবত ১০-১২ মাস সময় আছে...।’

পিন পতন নীরবতা রুমে। আমি মেঝের দিকে তাকিয়ে আছি। ছোট্ট কক্ষকে বিশাল মরুভূমির মত নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছে। কাছের জিনিসকে দূরে দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে খুব দ্রুত অক্সিজেন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে এ রুমে। কেউ কোনো কথা বলছেন না।

পাঁচ.
আমি রোগীর স্ত্রীর দিকে তাকালাম। শব্দহীন অশ্রুতে তার কপোল সিক্ত হয়ে যাচ্ছে। ভদ্রলোক অশ্রু গোপন করতে পকেট থেকে সানগ্লাস বের করে চোখে দিলেন। আমি চোখের সামনে আমেরিকার সেনাবাহিনীর একজন শক্ত মানুষকে ভেঙে যেতে দেখছি। 

ভদ্রলোক অধ্যাপকের হাত ধরলেন। বললেন, আমি খুব সম্ভবত চিকিৎসা করাবো না। আমার তেমন কোনো সহায় সম্পত্তি নেই। আমার চিকিৎসার সব খরচ ইন্সুরেন্স থেকে দিবে না, আমার নিজের পকেট থেকে অনেক টাকা দিতে হবে। আমি আমার স্ত্রীর জন্য তেমন কোনো কিছুই করতে পারিনি জীবনে। আমার ইচ্ছে ছিল যে আমি তার থাকার একটা বাসস্থানের ব্যবস্থা করে যেতে পারবো মৃত্যুর আগে। ক্যান্সারের চিকিৎসা করতে গেলে তাকে উল্টো আমি ঋণের মধ্যে ফেলে রেখেই মরে যাব। আমি তা চাই না।

ছয়.
তাকে সব ধরণের সহযোগিতার আশ্বাস দিলাম আমরা। তিনি কয়েকদিন সময় চাইলেন সবকিছু ভেবে দেখার জন্য, এরপর তিনি সীদ্ধান্ত নিবেন যে তিনি ক্যান্সারের চিকিৎসা করবেন কি না।

অধ্যাপক বেরিয়ে এলেন কক্ষ থেকে। আমি থেকে গেলাম। আমি মানুষকে রোগ বিষয়ক দুঃসংবাদ দিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কিন্তু মানুষকে তার মৃত্যুর পরোয়ানা দিতে নয়। তিনি আমাকে বললেন, ‘ডক্টর, আমাদের জীবনের সবসময় একই গতিতে যায় না। তোমরা আমাকে মাত্র ১০/১২ মাস সময় দিলে, এই সময়ের মধ্যে আমার আগামী দশ বছরের কাজ শেষ করতে হবে।’

আমার প্রতিটা দিন কাটবে ঘন্টার মত, ঘন্টা কাটবে মিনিটের মত, মিনিট কাটবে... তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছেন। ভদ্রলোকের স্ত্রী তাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমার কাছে সব কিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। আমার কাছে একেকটি সেকেন্ড এক ঘন্টার মত মনে হচ্ছে। ভদ্রলোকের কাছে তার সময় সংক্ষিপ্ত মনে হচ্ছে, অথচ আমার কাছে এই রুমে থাকাটা দীর্ঘায়িত মনে হচ্ছে। 

কি আপেক্ষিক আমাদের এই সময়ের হিসেব!
কি অলীক এই মানবজীবন! 
কি ভঙ্গুর এই স্বপ্নমালা!

আরও পড়ুন-

‘আমাকে কেন ক্যান্সারের ডাক্তার দেখাবে?’

ক্যানসার রোগীদের জন্য কিছু একটা করতে পেরেছি-অ্যালিসন

‘আমার হাতে কি বছর দশেক সময় আছে, ডক্টর?’

বাংলাদেশে মৃত্যুর ষষ্ঠ প্রধান কারণ ক্যান্সার

ক্যান্সার ও কিডনি রোগ কেন হঠাৎ বেড়ে গেল?

ক্যান্সার সচেতনতায় আনোয়ার খান কলেজের কর্মসূচি ২ অক্টোবর শুরু

বছরে তিন লাখ মানুষ ক্যান্সারে আক্রান্ত হন

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না