ঢাকা      বুধবার ১৮, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৩, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী

অধ্যাপক ডা. আশরাফুল ইসলামের সাক্ষাৎকার

সার্জনদের ঈগল চক্ষু হতে হবে

অধ্যাপক ডা. আশরাফুল ইসলাম। রাজধানীতে অবস্থিত বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজের নাক কান গলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। তিনি দেশের এ সেক্টরের একজন প্রথিতযশা চিকিৎসক হিসেবে খ্যাতি কুড়িয়েছেন। বরেণ্য এই চিকিৎসক কর্মজীবনে সেনা ও বিমানবাহিনীতে ১৪ বছর কাটিয়েছেন।  দেশ-বিদেশে নাক কান গলা রোগের ওপর নিয়েছেন উচ্চতর প্রশিক্ষণ।  তার কর্মস্থল বাংলাদেশ মেডিকেলে বসে মেডিভয়েসকে একান্ত সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন চিকিৎসা বিষয়ক তার নানা অভিজ্ঞতার কথা। জানিয়েছেন তার জীবনের গল্পও।  সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মামুন ওবায়দুল্লাহ

মেডিভয়েস : বাংলাদেশে নাক কান গলার চিকিৎসায় কী ধরণের অগ্রগতি এসেছে?

অধ্যাপক ডা. আশরাফুল ইসলাম: বাংলাদেশে নাক কান গলার অ্যাডভান্স চিকিৎসা হচ্ছে নাকের জন্য এন্ডোসকপিক সাইনাস সার্জারি। নাকের মধ্যে ছোট ছোট কোষ থাকে যেগুলো বাইরে থেকে দেখা যায় না। এটা খুব জটিল একটা অবস্থা এবং এর সংযোগ আছে চোখ এবং ব্রেনের সাথে।  এখন এক্ষেত্রে  খুব সহজে যদি মাইনর ডিটেইলসে যেতে পারি তাহলে ভেতরে যে ডিজিসগুলো আছে তা সহজে দেখা যায়। আর সেটা দেখার জন্য নতুন একটা যন্ত্র দরকার যার নাম এন্ডোসকপি।  এটা মনিটরের সাথে যোগ করা থাকে। এ যন্ত্রের মাধ্যমে পুরো নাকের ভেতরে কী আছে সব দেখে আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি। 

মেডিভয়েস : এ প্রযুক্তি কি সরকারি বেসরকারি সব জায়গায় পৌছেছে ?

অধ্যাপক ডা. আশরাফুল ইসলাম: কিছু কিছু হাসপাতালে আছে।  আর আমাদের হাসপাতালে( বাংলাদেশ মেডিকেলে) গত দশ বছর ধরে আছে।

মেডিভয়েস : এর বাইরে  গত দশ বছরে নাক কান গলার চিকিৎসায় আর কী নতুন প্রযুক্তি এসেছে ?

অধ্যাপক ডা. আশরাফুল ইসলাম: এছাড়া আছে স্কালবেজ সার্জারি। এটাকে রিফাইনমেন্ট করা হচ্ছে প্রতিদিন।  বিজ্ঞান প্রতিনিয়তই আপডেট হচ্ছে। ডিজিস ক্লিয়ারেন্স যতটুকু আছে আমরা ততটুকু যাচ্ছি।  সিটিস্ক্যান এবং এন্ডোসকপি দিয়ে আমরা মিলিমিটার পর্যন্ত ডিজিসগুলো বের করে আনতে পারি।  এটা হচ্ছে নতুন অ্যাডভান্সমেন্ট।

মেডিভয়েস : নাক কান গলা পোস্ট গ্রাজুয়েশন করার ক্ষেত্রে কী কী সুযোগ-সুবিধা আছে?

অধ্যাপক ডা. আশরাফুল ইসলাম: এমবিবিএসের পর বিভিন্ন ধরনের স্টেজ আছে। বিসিপিএস থেকে এফসিপিএস দেয়া হয়।  এছাড়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএস ও ডিএলও ডিগ্রি দেয়া হয়। এছাড়া বিসিপিএস থেকে আরেকটা ডিগ্রি দেয়া হয় যেটা এমসিপিএস নামে পরিচিত।  এছাড়া কতগুলো সাব স্পেশালিটি ও সুপার স্পেশালিটি ডিগ্রি আছে।  যেমন  কেউ যদি শুধু নাকের কাজ করে সেটা হচ্ছে রাইনোলজি, আবার কেউ যদি কানের কাজ করে সেটা হচ্ছে অটোলজি।  আর যদি গলার বিষয়ে কাজ করে সেটা ল্যারিংগোলজি নেক সার্জারি।  এখন এই সাবজেক্টের নাম পরিবর্তন হয়ে হয়েছে হেড নেক সার্জারি।

মেডিভয়েস : যারা নাক কান গলায় ক্যারিয়ার গড়তে চান তাদের ভবিষ্যত কেমন? ভালো করার উপায়  কী?

অধ্যাপক ডা. আশরাফুল ইসলাম: নিঃসন্দেহে এটার ভবিষ্যত ভালো।  অনেক শিক্ষার্থীই এটার উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী এবং এগিয়ে এসেছে।  বাংলাদেশ মেডিকেল থেকে অনেক ট্রেইনিকে ভালো করে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে এবং তারা বিভিন্ন জায়গায় খুব সুন্দর করে কাজ করে যাচ্ছে। 

আর এ পেশায় ভালো করতে হলে দরকার ডেডিকেশন।  সিনসিয়ারিটি, ডেভোশন এবং ডেডিকেশন মনের মধ্যে গেঁথে নিতে হবে।  এক্ষেত্রে নিজের সন্তুষ্টি থাকতে হবে।  ভাবতে হবে আমি কেন ডাক্তার হয়েছি।  আমি ডাক্তার হয়েছি রোগীর জন্য। তাই রোগীর স্যাটিসফেকশনের কথা ভাবতে হবে।  আগে রোগীকে সন্তুষ্ট করতে হবে, রোগীর সন্তোষ না হলে ডাক্তারের সন্তোষ হওয়ার কথা নয়।  আপনার ব্যবহার, সেবা সবকিছু মিলিয়ে যখন রোগী স্যাটিসফাইড হয় তখনই কিন্তু ডাক্তারের পরিপূর্ণ স্যাটিসফ্যাকশন আসে।

মেডিভয়েস: একজন সার্জনকে কী কী বিষয় মাথায় রাখতে হয়?

অধ্যাপক ডা. আশরাফুল ইসলাম: একজন সার্জনকে প্রথমেই অ্যানাটমি বুঝতে হবে।  অ্যানাটমি ইজ দ্যা ল্যাংগুয়েজ।  একজন সার্জন যখন সার্জারিতে ঢুকবেন তখন কিন্তু তিনি অ্যানাটমির ভাষা ব্যবহার করবেন।  একজন সার্জন যখন গলার মধ্যে কাজ করবেন, নাকের মধ্যে কাজ করবেন, কানের মধ্যে কাজ করবেন, তখন তার ভাষা থাকবে অ্যানাটমি।  একজন সার্জনের বেসিক কনসেপশন হচ্ছে অ্যানাটমিতে। 

সার্জনকে ঈগল চক্ষু হতে হবে।  যেমন একটি ঈগল অনেক উপর থেকে দেখতে পায় তেমনি সার্জনেরও দূরদৃষ্টি থাকতে হবে।  সার্জনের হাত হবে লেডিস ফিঙ্গার মানে অত্যন্ত নরম।  তার হাতে কোন আড়ষ্টতা থাকবে না।  একজন সার্জন যে যন্ত্র বা মেশিনই ব্যবহার করুক না কেন তা হতে হবে লেডিস ফিঙ্গারের মতো, যেন তার হাতের ইশারায় কাজ হচ্ছে।

একজন সার্জনের তিনটি গুণ থাকা চাই- ঈগল আই, লেডিস ফিঙ্গার ও লায়ন্স হার্ট।  অপারেশনে রক্ত দেখে ঘাবড়ানো যাবে না।  সিংহের মতো সাহসী হতে হবে।  পরিস্থিতি মোকাবিলা করার মতো মানসিকতা থাকতে হবে। পাশাপাশি অপারেশন শেষ করে বেরিয়ে আসার মতো দক্ষতা রাখতে হবে। 

আর একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, সার্জন সবসময় ল্যাবরেটরিতে থাকবেন।  সেখান থেকে তিনি অপারেশন থিয়েটারে গিয়ে তার গবেষণার প্রয়োগ করবেন মাত্র।

মেডিভয়েস: গণমাধ্যম এবং চিকিৎসকদের মধ্যে একটা দূরত্ব দেখা যায়। এটা কেন? উত্তরণের উপায় কী?

অধ্যাপক ডা. আশরাফুল ইসলাম: এটা হচ্ছে গণমাধ্যমের সাথে একটা গ্যাপের কারণে।  দ্রুত সময়েই এই গ্যাপটা কমানো দরকার।  একজন ডাক্তার অপারেশন করলে তার কমপ্লিকেশন হতেই পারে।তাতে কী ডাক্তারের চিকিৎসা বন্ধ থাকবে? ডক্টর প্যাশেন্ট রিলেশন আরো বিল্ড আপ করতে হবে।  আর ডাক্তারদের উচিত অপারেশনের আগে রোগী বা তার স্বজনদের সাথে রোগের বিষয়ে কথা বলা।রোগীর স্বজনদেরও সাইন করার আগে জানা দরকার তারা কিসে সাইন করছেন। এটা রোগীর স্বজনদের বিরাট বড় একটা দায়িত্ব।

মেডিভয়েস: আপনার শিক্ষা ও কর্মজীবন সম্পর্কে জানতে চাই

অধ্যাপক ডা. আশরাফুল ইসলাম: কুষ্টিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমি বেড়ে উঠেছি।  সেখানে আমি প্রথমে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করি।  তারপর মুথরাপুর হাইস্কুলে ভর্তি হই।  সেখান থেকেই প্রথম শ্রেনিসহ মেট্রিক পাশ করি।  আরেকটি বিষয়, আমি যখন ক্লাস টেনে পড়ি তখন দেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। 

যুদ্ধের কারণে ৫/ ৬ মাস গ্যাপ হয়। আমাদের মেট্রিক পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল ১৯৭১ সালে, হয়েছে ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।  পরে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকায় এসে ভর্তি হই ঢাকা কলেজে।  ১৯৭২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেই।  সেখানও প্রথম শ্রেণিতে পাস করি। 

প্রথমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য চেষ্টা করি।  তারপর ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে এগ্রি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে  ভর্তি হই।  সেখানে তিন মাস ক্লাস করি। আমার মা-বাবা আর বড় ভাইয়ের ইচ্ছে ছিল আমি ডাক্তার হই।  পরবর্তীতে তাদের ইচ্ছায় আমি রাজশাহী মেডিকেলে ভর্তি পরীক্ষা দেই।  সেখানে ভর্তির সুযোগ পাই।  সেখান থেকে এমবিবিএস পাস করি।  আর প্রথম কর্মজীবন শুরু করি সেনাবাহিনীর মেডিকেল কোরের মধ্যে দিয়ে। 

সেখানে ১৪ বছর চাকরি করি।  চাকরি অবস্থায় আমি এফসিপিএস সম্পন্ন করি।  সেনাবাহিনীতে চাকরি অবস্থায় ডেপুটেশনে বিমান বাহিনীতেও চাকরি করি।  এর মধ্যে আমি বঙ্গবন্ধু হাসপাতাল (তৎকালীন পিজি হাসপাতাল) থেকে এফসিপিএস করি।  পরে  ঢাকার সিএমএইচে পোস্টিং হয়।  ওখানে আমি পাঁচ বছর চাকরি শেষে সেনাবাহিনী থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে চলে আসি।

১৫ জুন, ১৯৯৭ সাল থেকে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজে আছি।  এর মধ্যে দেশ-বিদেশে চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার ওপর প্রশিক্ষণ নিয়েছি।  হার্ভাড মেডিকেল স্কুল, জার্মানি, অষ্ট্রিয়া থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে মনে করেছি আমার দেশে গিয়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানের জন্য কিছু করা দরকার।  তখন থেকেই দেশে এ পেশার সাথে জড়িত আছি।  আমি স্টুডেন্টদেরও পড়াচ্ছি।

মেডিভয়েস: স্যার, সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

অধ্যাপক ডা. আশরাফুল ইসলাম: আপনাকেও ধন্যবাদ।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ
























জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর