ডা. মো. মাহফুজুর রহমান

ডা. মো. মাহফুজুর রহমান

এমবিবিএস (ঢাকা মেডিকেল কলেজ), বিসিএস, এফ.সি.পি.এস (নিউরোসার্জারি)

সহকারী রেজিস্ট্রার, নিউরো সার্জারি বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল


২৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০১:২৪ পিএম

জোর পূর্বক অপারেশনের ফল!

জোর পূর্বক অপারেশনের ফল!

খুলনার আবুল কালাম সাহেব, বয়স ৪০। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, নিজের বড় ছেলে একটা বিরোধের কারণে তার বাবাকেই লাঠি দিয়ে মাথায় পিটাতে পিটাতে মাথার খুলি অনেক গুলো টুকরো (পরে অপারেশন এর সময় বোঝা যায় সংখ্যা টা ৮) করে ফেলে। মাথার ভাংগা খুলির নিচে রক্ত জমাট বেধে গিয়ে (Extra Dural haematoma) চাপ সৃষ্টি করে। আবার ব্রেইন টাও কিছুটা থেতলে যায় (small Haemorrhagic contusion)। ঘটনাটা এবছর, ফেব্রুয়ারি মাসের।

অপারেশন শুরুর আগে ভালো করে দেখে নিলাম, ব্রেইন এর থেতলানো অংশ টা খুব ছোট, তাই আমি শুধু ব্রেইন এর বাইরে খুলির নিচে জমে থাকা রক্ত টা অপারেশন এর মাধ্যমে বের করে দিলাম। সাধারণত এধরনের অপারেশন এর ক্ষেত্রে আমাদের আশা থাকে রোগীর অপারেশন এর পরের দিন থেকেই উন্নতি হতে থাকবে এবং দ্রুত ভাল হয়ে যাবে।

কিন্তু কালাম সাহেবের ক্ষেত্রে এটা ঘটল না। তার অবস্থার কোনই উন্নতি হল না। তবে খারাপও হয়নি। অপারেশন হয়েছিল সোমবার। বৃহস্পতিবার রাউন্ডে গিয়ে দেখি রোগীর অবস্থা উন্নতি হবার পরিবর্তে আরো অবনতি হয়েছে। জ্ঞানের মাত্রা ১৫ এর মধ্যে ৭। সাথে কিছুটা শ্বাসকষ্ট। 

দ্রুত আবার সিটি স্ক্যান করতে বললাম। রোগীর লোকজন বেশ গরিমশি করে শেষ পর্যন্ত করল। দেখা গেল, ব্রেইন এর ছোট সেই থেতলানো অংশটা বেড়ে গিয়ে ব্রেইন এর মধ্যে প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করে আছে। মনে হল, অতি দ্রুত এই চাপ সরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা না করলে রোগী মারা যাবে নিশ্চিত।

আমার শ্রদ্ধেয় শফিকুল ইসলাম স্যার কে দেখালাম। স্যারও একই মতামত দিলেন যে দেরি না করে মাথার হাড় অর্ধেক খুলে রাখার অপারেশন (Decompressive craniectomy) করে দেয়ার জন্য। স্যারের সিদ্ধান্ত মানে আমার উপর হুকুম। যেহেতু এই রোগীর প্রথম অপারেশন আমি করেছিলাম, স্বাভাবিকভাবেই দ্বিতীয় অপারেশন করাটাও আমার দায়িত্ব। পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে এম সামসুল ইসলাম খান সহ আরো কয়েকজনের সাথে ব্যস্ত ছিলাম। সব বাদ দিয়ে দ্রুত ওটিতে গিয়ে ওটি রেডি করলাম। রোগী কে একটু আগেই অপারেশন এর কথা বলে এসেছি। ওটি বয় কে পাঠালাম রোগী আনতে। সে এসে বলল, তারা রোগী দিচ্ছে না, তারা আর অপারেশন করাবে না।

বেশ বিরক্ত হলাম। নিজেই চলে গেলাম রোগীর কাছে। রোগীর শুধু বড় ভাই আছেন। আর কেউ নাই।  জিজ্ঞেস করলাম, কেন অপারেশন করাতে চান না? তিনি বললেন, তার কাছে কোন টাকা নাই। যা এনেছিলেন, এ ৪/৫ দিনে সব শেষ। আমি বললাম, আমাদের এখানে তো অপারেশন করতে কোন টাকা লাগে না, শুধু ওষুধপত্র কিনতে কিছু টাকা লাগে।  উনি বললেন, সেই টাকাও তার কাছে নেই। এই অবস্থায় আমি দুইটা কাজ করতে পারি।

১. ফাইলে লিখে রাখা যে রোগীর লোক অপারেশন করাতে রাজি নয়, ইহাতে রোগীর মৃত্যু হলে হাসপাতাল কতৃপক্ষ অথবা ডাক্তার দায়ী নয়- এই টাইপের নিজের পিঠ বাঁচানো কাজ।
২. জোড় করে অপারেশন করা।

যেহেতু আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম যে, আমি যদি বৃহস্পতিবার বিকালে এই অপারেশন টা "না করে দিয়ে" চলে যাই, শনিবার সকালে এসে আর এই রোগীকে আর জীবিত পাবো না। তাই দ্বিতীয় অপশন টাই বেছে নিলাম।
বললাম আপনি যেভাবে পারেন, এই দুই-একটা জিনিস আনার ব্যবস্থা করেন, সর্বোচ্চ ১৫০০ টাকা লাগবে। বিকাশে টাকা আনার চেষ্টা করেন। আবার রক্ত ও লাগবে দুই ব্যাগ। সেটার ও ব্যাবস্থা করতে হবে। আমরা অপারেশন শুরু করতেছি।

সেদিন ওটিতে গিয়ে বুঝলাম, দুনিয়াটা কত কঠিন আর খারাপা জায়গা। অন্যান্য সময় ওটি বয়রাই ২ /১ টা জিনিস স্বেচ্ছায় দিয়ে বলে, স্যার এটা আনানোর দরকার নাই, আমার কাছে আছে, আমি দিয়ে দিচ্ছি। ( পরে সে রোগীর লোকের কাছ থেকে তার মুল্য নিয়ে নেয়, কম বা বেশি)। কিন্তু এই রোগীর বেলায় দেখি তাদের কাছে কিচ্ছু নেই। যা চাই, তাই নেই। বুঝলাম, এ রোগীর লোকের যেহেতু টাকা নাই, তাই ওরা ঠিক ভরসা পাচ্ছে না।

আমার কাছে কিছু জিনিস ছিল, সেগুলো এবং বিকল্প উপায়ে বাকি জিনিস পত্র যোগাড় করে অপারেশন শুরু করলাম, রক্ত ছাড়াই। এমনই কপাল খারাপ, হাড় উঠানোর একটা পর্যায়ে এমন ব্লিডিং শুরু হল, যে কয়েক সেকেন্ডেই ফিল্ড ভরে যাচ্ছিল।

জীবনে অনেক অপারেশন করার অভিজ্ঞতা থাকা স্বত্বেও মনে হচ্ছিল আমার পা কাঁপছে। কারণ, হাতে রক্ত নাই। ব্লিডিং বেশি হলে তাতেই রোগী টেবিলেই মারা যাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আল্লাহ সাহায্য করলেন। ব্লিডিং পয়েন্ট টা বের করতে পারলাম এবং বন্ধ করে অপারেশন শেষ করলাম।

হাড়ের টুকরা গুলো রোগীর লোকের কাছে দিয়ে দুই ব্যাগ রক্ত দেয়ার কথা বলে বের হলাম। ইতোমধ্যে তার ভাই কিছু টাকার ব্যাবস্থা করে ফেলেছেন।

সপ্তাহান্তে ঢাকার বাইরে একটু আধটু যেতেই হয়। সময় না থাকায় এক কাপড়েই গিয়ে লঞ্চে উঠলাম।

আল্লাহর অশেষ রহমত। রাতেই রক্তও দেয়া হয়ে গেল এক ব্যাগ। সম্পূর্ণ অজ্ঞান এবং নিশ্চিত মৃত্যু পথযাত্রী আবুল কালাম সাহেব শুক্রবার বিকালে ভাত খেতে চাইলেন। শনিবার আমার সাথে বেশ স্বাভাবিক ভাবেই কথা বললেন।
আলহামদুলিল্লাহ। পাঁচ দিন পর তাকে সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় ছুটি দিয়ে দিলাম। গত জুন মাসে তিনি এলেন হাড় লাগানোর জন্য। সেটাও হয়ে গেছে৷ আলহামদুলিল্লাহ। 

এতদিনে তার ছেলের সাথে ভুল বোঝাবুঝিরও অবসান হয়েছে। সেই ছেলেকে নিয়েই এসেছিলেন আমার সাথে দেখা করতে। বললেন, স্যার, আপনি আমার সেই ছেলেকে দেখতে চেয়েছিলেন, তাই নিয়ে আসলাম। সাথে বেশ কিছু খাবার ,তাদের নিজ বাড়ির।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না