ঢাকা      রবিবার ২৪, ফেব্রুয়ারী ২০১৯ - ১১, ফাল্গুন, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. ছাবিকুন নাহার

মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


গ্যাজেট বনাম কোয়ালিটি টাইম

তখন মেডিকেলে পড়ি। পড়াশোনার চাপে চিড়ে চ্যাপ্টা অবস্থা। ঠিক নাকের গোড়ায় ফার্স্ট প্রফ। অবস্থা এমন যে, পারলে ২৪ ঘন্টার মধ্যে ২৫ ঘন্টাই পড়ি! চাপাবাজি না রে ভাই, ৯৮ ভাগই সত্যি, সন্দেহ থাকলে মিলিয়ে দেখতে পারেন।

এই পড়ার আবার নানান যন্ত্রণা! কেউ হয় তো ম্যারাথন পড়া শেষে মাত্রই ঘুমাতে গেলো। আরেক জন হয়তো ঘুম থেকে ওঠে আয়োজন করে বসল পড়তে। কাজেই সবারই চেষ্টা থাকে তার জন্য যেন অন্যের কোন ক্ষতি না হয়।

তো সে জন্যই যখন পড়তে বসতাম যথা সাধ্য চেষ্টা করতাম টেবিল ল্যাম্পের আলো যেন টেবিলের বাইরে না যায়। আলো টেবিলের বাইরে যেতে না পারার দুঃখে হামলে পরত আমার চোখে। ফলাফল অবিরত চোখ থেকে পানি পড়ত, একেবারে যাকে বলে চোখ ভেসে যায় জলে। বই খুললেই মনে হতো উত্তাল সমুদ্রে কত গুলো কালো ডলফিন নাচানাচি করছে!

আইয়ের প্রফেসর নাসির স্যার খুব যত্ন নিয়ে আমার চোখ দেখলেন। মুখ ভর্তি হাসি নিয়ে বললেন, লেডি ডক্টর, একটা চশমা না হলে কি চলে?

মিথ্যা বলব না, আমার খুব খুশি লাগছিল। চশমা চোখে ভাব নিয়ে চলব। ডাবল ভাব নিয়ে মাঝে মধ্যে চশমার উপর দিয়ে তাকাব। আরো কত কী! এখানে একটা কথা না বলে পারছি না, আমার মায়ের ধারণা, তবৎ পৃথিবীর বড় বড় ডাক্তাররা চশমা পরেন। ভাবখানা এমন, যে যত বড় চশমিশ সে তত বড় ডাক্তার! মায়ের মনে এই ধারনা এসেছে সম্ভবত ওনার প্রিয় কোন চিকিৎস্যকের চশমা পরা থেকে। বাহ, আমিও এখন থেকে চশমা পরব। মা নিশ্চিত খুশি হবেন। 

মনের কথাটা বুঝতে পেরেছেন বলে মনে মনে স্যারকে খুব বড়সড় একটা ধন্যবাদ দিলাম।

সদর রোডে চশমা বানাতে দিয়েছি। অনেক ঘুরে ঘুরে ফ্রেম পছন্দ করলাম। চশমা দোকানির উসখুস কে পাত্তা দিলাম না। আরে বেটা জিনিস কিনব আমি, দেখে শুনে কিনব না? এত শখের জিনিস! সুন্দর না হলে চলে?

চশমার ডেলিভারির সময় তো আর ফুরায় না। সময়ের আগেই দোকানে গিয়ে হাজির। দোকানি মনে হয় এত্ত পাংচুয়াল কাস্টমার কমই দেখে থাকবে। মুখ দেখেই বুঝেছি। যাক আমার এসব ভাবলে চলবে কেন?

আমি সদর রোড থেকে ফিরতে ফিরতে কল্পনা করছি, নিউ লুকে আমাকে দেখে বন্ধুদের প্রতিক্রিয়া কেমন হবে? সবাই কী বলবে?

রুমে এসে আয়নার সামনে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিলাম। নাহ্, মন্দ লাগছে না। রুম মেটরা হৈ হৈ রৈ রৈ করে ওঠল। খুশি খুশি ভাব। পাশের রুমের বন্ধুরা একে একে অভিমত দিচ্ছে, কেমন লাগছে। মনে মনে হিসাব কসছি, আরো কতগুলি রুমে যেতে হবে। সবাই কে দেখাতে হবে না! না হলে হোস্টেল লাইফের মজা কোথায়?!

এমন সময় ঠ্ঠাসসস করে একটা আওয়াজ। আমি এবং আমরা আওয়াজের উৎস খুঁজতে ইতি উতি মারছি। নীনা আমার চশমা হাতে নিয়ে বল্ল, নাহার এই দেখ চশমার কাঁচ ফেটে গেছে! কাঁচটা নিশ্চয় ফিট করেনি। জোর করে লাগিয়েছিলো। ফলাফল...। হায় হায় করে উঠলাম। আমার চশমা, আমার চশমা ...

খোদা! বড় বাঁচা বেঁচে গেছি। একটু হলে চোখটাই যেত। সেই সান্ত্বনায় আমার চশমার দুঃখ সেখানেই জলাঞ্জলি দিলাম। এরপর খুব করে কিছু চাই না। কী দরকার! আপাতত চশমা ছাড়াই ডাক্তারি জীবন চলছে, চলবে।

এখন আসি জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়ে। আমার বড় পুত্র অহন। মানুষ সাধারণত পুত্র সন্তান কে বাবা বলে ডাকে। কিন্তু আমি অহন কে মা বলে ডাকি। এই সেদিন ও বিড়াল ছানার মতো তুলতুলে এইটুকু ছিলো। এখন স্কুলে যায়! সারাদিন স্কুলে থাকে। সন্ধ্যায় বাসায় ফেরে। চোখ মুখের দিকে তাকাতে পারি না। সোনা বাচ্চা আমার।

অহন কে নিয়ে আই স্পেশালিস্টের চেম্বারে বসে আছি। প্রফেসর টি ইসলাম শামীম, কাজিন, খুব মন খারাপ করে বললেন, গোসল আর ঘুমানো ছাড়া সব সময় চশমা পরেই থাকতে হবে। পাওয়ার মাইনাস টু টু! সিলিন্ড্রিক্যাল! নো এস্কিউজ। নো ল্যাপটপ। মোবাইল গেমস হারাম, টিভি শর্ত সাপেক্ষে।

বাবারে, এই পৃথিবীর বিধি নিষেধে পরেই গেলি। এত অল্প বয়সে! আমি এত্ত বড় চশমা প্রেমিক! তারপর ও আমার বুক চিড়ে খুব গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে এল।

পরিশেষে একটি কথা, এইসব গ্যাজেটে আজকাল বাচ্চাদের চোখ একেবারে গেলো বলে। এতটুকু এতটুকু বাচ্চা, মাথা ব্যথা, চোখ ব্যথা, চোখে পানি পড়া ইত্যাদি প্রবলেম নিয়ে ডাক্তারের কাছে আসছে। পরীক্ষা করে দেখা যায় মাইনাস দুই তিন চার। সবই এই টিভি স্ক্রিন, ল্যাপটপ, মোবাইলের কুফল। আমরা বাবা মায়েরা নিজেদেরকে ঝামেলা মুক্ত রাখতে অবলীলায় মোবাইল হাতে তুলে দিচ্ছি, সাময়িক ভাবে হয়তো একটু স্বস্তি পাচ্ছি কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদি কী ভয়ংকর বিপর্যয় যে অপেক্ষা করছে, সেটা বুঝছি না। এইসব আসলে খুব কী সুফল বয়ে আনছে? আমি বলব না, বরং চির ধরছে পারিবারিক বন্ডিংএ।

এমনও দেখা যায়, মা হয়তো এক রুমে জ্বরে কাতরাচ্ছে, আর বাচ্চা অন্যরুমে বসে স্ট্যাটাস দিচ্ছে, 'মাই মম ইজ সাফারিংস ফ্রম ফিভার, প্লিজ প্রে ফর হার।' আমরা আহ উহ করছি, কী লক্ষী বাচ্চা! মায়ের জন্য কী টান! ওইদিকে মা, মনেমনে ভাবছে, ইশ, বাচ্চাটা যদি কপালে একটু হাতটা রাখত, একটু পাশে বসে জিজ্ঞেস করতো, মা এখন তোমার কেমন লাগছে? মা...

যা হবার হয়েছে, এখন কী করলে ক্ষতি কাটিয়ে সুস্থ সুন্দর পারিবারিক বলয়ে ফেরা যাবে, কী করলে শারীরিক ও মানসিক ভাবে আমাদের সন্তান বেড়ে ওঠবে, আসুন সেদিকে নজর দেয়ার চেষ্টা করি। আমাদের সোনা বাচ্চাদের ভবিষ্যতের জন্য এখনই ভাবতে হবে, না হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হতে বাধ্য। চলুন তো সব রকমের গ্যাজেট পিছনে ফেলে বাচ্চাদের কোয়ালিটি সময় দেই, মানবিক এবং পরিপূর্ণ মানুষরুপে গড়ে তুলি।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

একটি ভুল, একটি গুজব আর বিনা অপরাধের শাস্তি

একটি ভুল, একটি গুজব আর বিনা অপরাধের শাস্তি

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের (শেবাচিম) একটি বিভাগে ডিপ্লোমা কোর্স আনার প্রক্রিয়া চলছিল। উৎসাহী…

সৌদি অপারেশন থিয়েটার বনাম আমাদের অপারেশন থিয়েটার

সৌদি অপারেশন থিয়েটার বনাম আমাদের অপারেশন থিয়েটার

সৌদি আরবে প্রথম অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার দিনটা আমার কাছে মনে রাখার মত…

মানুষের ভালবাসায় আমি ঋণী

মানুষের ভালবাসায় আমি ঋণী

আমি ময়মনসিংহ শহরে ৩ বছর ৪ মাস কাটাচ্ছি। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের…

রেইপ কেইস ও ধর্ষণ সার্টিফিকেট

রেইপ কেইস ও ধর্ষণ সার্টিফিকেট

কেবল মাত্র ভোরে হয়েছে। পাখির ডাক শুনা যাচ্ছে। আমাদের ইমার্জেন্সী ডাক্তার রুম…

নতুন চেম্বারে অশরীরী আত্মা

নতুন চেম্বারে অশরীরী আত্মা

নতুন একটা চেম্বার পেয়েছি আমি। দামী হাসপাতালের চালু চেম্বার। আজ থেকে একমাস…

আত্মহত্যার আত্মকাহিনী

আত্মহত্যার আত্মকাহিনী

যে রাতে আমি প্রথম আত্মহত্যার সিদ্বান্ত নিয়েছিলাম, সেদিন সন্ধ্যা থেকেই খুব বৃষ্টি…













জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর