ঢাকা      শনিবার ১৫, ডিসেম্বর ২০১৮ - ৩০, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৫ - হিজরী



নাজমুল ইসলাম নাইম

শিক্ষার্থী, যশোর মেডিকেল কলেজ


লাশ কাটা ঘর

ভ্যানের উপর পাটি দিয়ে মোড়ানো লাশটা, শেষ প্রান্তে পায়ের পাতা হালকা বের হয়ে আছে। লাল রং দেখে মেডিকেল স্টুডেন্ট হিসেবে রক্ত ভাবাটা খুব বেশি অস্বাভাবিক মনে করি না, কিন্তু পরক্ষণে ভালোভাবে খেয়াল করে দেখলাম আলতা! 

বয়স্ক একজন ভ্যানের সামনে বসা, নিজের কৌতূহল নিয়েই বয়স্ক লোকটাকে সালাম দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, চাচা আপনার মেয়ে?

চাচা: না বাজান, মোর ভাইর মাইয়া।(কান্না জড়িত কন্ঠে) বাপ মরা মাইয়্যা বাজান, গলায় ফাঁস দেছে। 

এরই মধ্যে লক্ষণ মামা (ডোম)এসে লাশ নামিয়ে মর্গের রুমে নিয়ে ধূপ জ্বালিয়ে দিলেন।

তখন সময় দুপুর ১২টা ৪০, স্যার না আসলে লাশ কাটা যাবে না, স্যার আসবে ২টায়। 

মাথায় হাত দিতেই লোকটা আমার দিক তাকালো। বললাম, চাচা কোন কারণ জানতে পেরেছেন?

চাচা: বাজান, গত ৬মাস আগে পিরিত কইরা বিয়া করছিলো মাইয়্যা। মাঝে মাঝে হোনতাম বাড়ি আইতো জামাই হাউরিরে কয় মা ত্রিশ হাজার ট্যাকা লাগবো, গঞ্জে দোকান দিব। মোরা গরীব মানু বাজান ট্যাকা পামু কই। মাইয়্যা এরপর বার বার বাড়ি অ্যাইতো, তয় মোরেও কইচেলে কিছু টেহার লইগ্যা। সোয়ামী কতায় কতায় মারে, আর রাখবো না ট্যাকা না দেলে। মুই কই মা রে মুই গতরে খাইট্যা যে ট্যাহা পাই হ্যাতে দুই বেলা খাইতেই পারি না। মইয়্যা সোয়ামীর বাড়ি না জাওনে জোর করি। একটা চোপাড়ও মারছি(কান্না)। মাইয়্যা হেই ২ মাস আগে জামাইর বাড়ি দিয়াইছেলাম। হেইয়ার পর, বাজান গতকাইল রাইতে হোনলাম মায় মোর গলায় ফাঁস দেছে তীব্র (কান্না)।

এরই মধ্যে স্যার এসে পড়লো, লাশের গলায় হ্যাংগিং এর দাগ নিশ্চিত করা হলো। চোখে পড়লো পারভীনের গায়ে কালো কালো দাগ, সেগুলো রিসেন্টলি কোন আঘাতের দাগ না, বেশ কিছু দিন আগের হবে। ময়না তদন্ত শেষের দিকে, রুম থেকে বিষণ্ন মনে বের হলাম।

লাশের গন্ধটা নাক থেকে যেমন সরছে না তেমনি চাচার কথা, লাশের নালিশ ভরা মুখটা কোনটাই মাথা থেকে যাচ্ছে না। দুপুরে খেতে পারলাম না। আত্মহত্যা করা মহা পাপ। কিন্তু নিজেকে প্রশ্ন করলাম পারভীনের মুক্তির পথ কী ছিল? পিতামৃত মেয়ের প্রেমিকই ছিল বিশ্বাসের শেষ আশ্রয়স্থল, কিন্তু যাকে বিশ্বাস করলো তার কাছে বিশ্বাসের মূল্য ত্রিশ হাজার টাকা? মেয়েটার মনে হয় কিছু বলার ছিল ঘৃনিত এই সমাজকে, কিন্তু সমাজ! ভালোবাসা! কে দাম দিবে তার?

লাশ কাটা ঘরের জানালা বিহীন চার দেয়ালে লেখা থাকে এরকম হাজারো পারভীনের গল্প। যারা সম্পদ কিংবা ভালোবাসার কাছে পরাজিত।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

প্রেসক্রিপশনের ব্যাপারে যত্নশীল হোন!

প্রেসক্রিপশনের ব্যাপারে যত্নশীল হোন!

রোগীর মুল সমস্যা, উপরের পেটে ব্যথা, বুকে জ্বালাপোড়া, পিঠে ব্যথা, দুর্বলতা। একটা…

আবেগীয় স্মৃতির গুদামঘর

আবেগীয় স্মৃতির গুদামঘর

ইন স্টিমের উপরে কাঠবাদামের আকারের অঞ্চলটির নাম "এমাগডেলা"। লিম্বিক সিষ্টেমের দুটি অংশ…

ক্লিনিক মালিকের আবদার টেস্ট বেশি দিতে হবে!

ক্লিনিক মালিকের আবদার টেস্ট বেশি দিতে হবে!

নোয়াখালী অঞ্চলে এক ক্লিনিকে কিছুদিন চাকুরী করেছিলাম। ডাক্তার সমাজে খন্ডকালীন এসব চাকুরীকে…

অধ্যাপক মনসুর খলিল স্যারকে শেষ দেখা!

অধ্যাপক মনসুর খলিল স্যারকে শেষ দেখা!

আজ থেকে তিন বছর আগে ২০১৫ সনের ডিসেম্বরের ৭ তারিখে আমি বদলী…

সুইসাইড ও পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার

সুইসাইড ও পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার

"স্যার আদাব, অপিসি পয়সনিং, পুলিশ কেইস..." মোবাইলে ইমার্জেন্সী চিকিৎসকের ফোন পেয়ে আউট…

'এইবার মিয়াসাব তাবিজের পাশাপাশি ওষুধ খাইতে বলছেন'

'এইবার মিয়াসাব তাবিজের পাশাপাশি ওষুধ খাইতে বলছেন'

আফিয়া বেগম উদ্ভ্রান্তের মত ৩২ বছর এর ছেলেকে নিয়ে আমার চেম্বারে আসলেন।…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর