ঢাকা      শনিবার ১৫, ডিসেম্বর ২০১৮ - ৩০, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. ফাহিম উদ্দিন

ইন্টার্ন চিকিৎসক

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।


হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার ভয়াবহতা!

সার্জারিতে ইন্টার্নশিপ প্রায় শেষ দিকে। এক ব্যাচমেট রিকুয়েস্ট করলো মেডিসিনে তার একটি নন-এডমিশন নাইট করে দিতে। তো ডিউটি ডক্টরস রুমে বসি আছি। রাত সাড়ে ১২টা।

হঠাৎ এক লোক একটা রিপোর্ট নিয়ে আসলো। (FNAC of Cervical Lymphnode... Result: Necrotizing inflammation, Suggestive of Tuberculosis)

এরপর ওনার কাছ থেকে পেশেন্টের হিস্ট্রি নিলাম। খুব ইন্টারেস্টিং লাগলো, তাই শেয়ার করছি।

পেশেন্টের(Age 40yrs, Diabetic & Normotensive) দীর্ঘদিন ধরে জ্বর আর কাশি ছিল। উনি কোনো ডাক্তার না দেখিয়ে হোমিওপ্যাথিক ওষুধ সেবন করেছিলেন। এতে ওনার জ্বর, কাশি সব সেরে যায় (কারণ, যতদূর জানি কিছু হোমিওপ্যাথিক ওষুধে স্টেরয়েড ব্যবহার করা হয়)। এর কিছুদিন পর ওনার Cervical Region এর দুটো enlarged Lymphnode ফেটে যায় (সম্ভবত Abscess হয়ে ফেটে/sinus formed হয়ে pus ড্রেইন হয়ে গেছে, সেখানে এখন Scar mark আছে.. N.B: this abscess is called "collar-stud abscess" )।

.

এরপর উনি আবার সেই হোমিওপ্যাথিক ডাক্তারের কাছে যান। হোমিওপ্যাথিক ডাক্তার তাকে জানান যে, উনি উপরের চিকিৎসা করে দিয়েছেন কিন্তু ভেতরের কী অবস্থা তা তো উনি জানেন না। তাই দুটো টেস্ট করতে বললেন। কিন্তু পেশেন্ট পার্টি ভাবলো এখানে টেস্ট করে টাকা খরচ না করে আরো কিছুদিন ওষুধ খেয়ে যাক, তারপর একেবারে শহরে গিয়ে টেস্ট করাবে।

তাই আরো কিছুদিন হোমিওপ্যাথিক ওষুধ খেয়ে গেল।

কিছুদিন পর পেশেন্টের আবার জ্বর আসলো এবং এবার তারা নিকটবর্তী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলো।সেখানে স্বাভাবিকভাবেই এত রোগীর ভিড়ে একজন রোগীকে ভালোমত এক্সামিনসন করা বা, হিস্ট্রি নেয়া সম্ভব নয়। যাইহোক, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আউটডোর থেকে দেখিয়ে আরো কিছুদিন ওষুধ খায় পেশেন্ট।

এরপর একদিন হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়।

প্রাথমিকভাবে ডায়াগনোসিস হয়: Cerebro Vascular Disease(Stroke). সেখানে থাকাকালীন কিছু টেস্ট করা হয়েছিল: Hematology report(ESR: 48... WBC: 11,800 ... Neutrophil 75%) ... Widal test: Negative... Chest X ray P/A view: Basal Pneumonitis in Rt Lung)

এখানে পেশেন্ট এন্টিবায়োটিকসহ অন্যান্য ওষুধের স্টেরয়েড ইনজেকশন পেয়েছিলেন (Inj. Dexa)। এরপর উনারা পেশেন্টকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হসপিটালে পাঠিয়ে দেন। এখানে যখন পেশেন্টকে রিসিভ করা হয় তখন পেশেন্টের C/C ছিল:

1)Disoriented for 3 days

2)Restlessness for 3 days

3)H/O Fever for 10 days

**BP was non recordable

(according to the documents of discharge paper)

পরবর্তীতে এখানে সিটি স্ক্যান করা হয়, সিটি স্ক্যান রিপোর্ট আসে: Suggestive of small infarct in the Rt parietal region.

#Hematology report:

WBC: 13,400

Neutrophil: 80%

PBF: Neutrophilic Leucocytosis

#Chest X ray: Homogeneous opacity are seen in both Lungs, suggestive of Non Specific Pulmonary Infection... Plz exclude PTB by Sputum test.

এক্স-রে ফাইন্ডিং দেখে পেশেন্টের এটেন্ড্যান্টকে জিজ্ঞেস করলাম, তখন টিবির কফ পরীক্ষা করতে দেয়া হয়েছিল কিনা? তখন তিনি জানালেন, কফ পরীক্ষা করতে নেয়া হয়েছিল কিন্তু পেশেন্ট এতটাই দুর্বল ছিল যে কফ টেনে বের করতে পারছিলেন না।(তাছাড়া এতদিন ধরে স্টেরয়েড গ্রহণে হয়ত cough suppression হয়ে গিয়েছিল)। পরবর্তীতে টিবির জন্য অন্য কোনো টেস্ট করতে বলা হয়েছে কিনা তা পেশেন্টের এটেড্যান্ট বলতে পারছেন না (উনার ভাষ্য মতে কফ আসছিলো না বলে টিবির কোনো টেস্ট করা হয়নি)।

যাইহোক কয়েকদিন চিকিৎসা পাওয়ার পর সম্ভবত পেশেন্টের কন্ডিশন কিছুটা বেটার হয়। পেশেন্টকে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ডিসচার্জ পেপারে দেখলাম Antiviral drug, হয়তোবা ischaemic Stroke এর পাশাপাশি

Viral meningitis/encephalitis সাসপেক্ট করা হয়েছিল!

(তাছাড়া আমরা জানি, হসপিটালগুলোতে গরিব রোগীদের কথা চিন্তা করে অনেক টেস্টই করতে দেয়া হয় না,, কেননা করতে দিলেও তারা করতে পারবে না)

যাইহোক বাড়ি যাওয়ার কয়েকদিনের মাথায় পেশেন্টের আবার জ্বর উঠে। আবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়। সেখানে প্রাথমিক ট্রিটমেন্ট দিয়ে আবার খুলনা মেডিকেল কলেজ হসপিটালে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এবার খুলনা মেডিকেল কলেজ হসপিটালে ভর্তি হওয়ার আগে পেশেন্ট পার্টি প্রাইভেট চেম্বারে একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তারকে দেখান।

প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী, তখন C/C ছিল-

1)H/O Fever

2)Unconsciousness

3)Right sided Weakness

এবং প্রাথমিকভাবে ডায়াগনোসিস করা হয়: Encephalitis with Ischaemic Stroke (CT Scan of Brain আগেই করা ছিল)

তখন পেশেন্টকে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দিয়ে, হসপিটালে এডমিশনের জন্য এভভাইস করা হয়। পেশেন্ট পার্টি এবার খুলনা মেডিকেল কলেজ হসপিটালের আরেকটি ইউনিটে এসে ভর্তি হন।

পেশেন্টের এটেন্ড্যান্টের কথা অনুযায়ী, এই ইউনিটের একজন ডাক্তার পেশেন্টের ব্যাপারে সবকিছু শুনে আগের সব রিপোর্ট সময় নিয়ে দেখেন এবং পেশেন্টের ফিজিক্যাল এক্সানিমেসন করতে গিয়ে দেখেন যে ঘাড়ের বাম পাশে কয়েকটা গোটার মত জিনিস (enlarged cervical lymphnode), পরবর্তীতে ওগুলো থেকে সুঁই দিয়ে পরীক্ষার (FNAC) জন্য পাঠানো হয় এবং সেই রিপোর্ট উনি আমার কাছে নিয়ে এসেছেন।

এখন আমার কাছে যেটা মনে হচ্ছে, পেশেন্ট দীর্ঘদিন হোমিওপ্যাথিক ওষুধ সেবন করায় টিবির টিপিক্যাল সাইন-সিম্পটমগুলো হয়ত সেভাবে প্রকাশ পায়নি।

পেশেন্টের cervical lymphnode গুলো আমিও হাত দিয়ে দেখলাম (মার্বেলের মত সাইজ, consistency is firm to hard, may be due to calcification)। আগে থেকেই ফাইন্ডিংস নোট করা দেখলাম Bilateral Planter Extensor। তাছাড়া আমার কাছে মনে হল কিছুটা Neck Rigidity ও আছে।

এবার ভর্তি হওয়ার দিন থেকেই পেশেন্ট Unconscious, সাথে ভর্তির সময় খিঁচুনিও ছিল। ইতিমধ্যে দেখলাম, প্রাথমিক ডায়াগনোসিস করা হয়েছে, Tubercular Meningitis with Ischaemic Stroke.

কেইসটা সম্পর্কে জানার পর থেকেই মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল। এই পেশেন্টের স্ট্রোক হওয়ার পেছনে প্রধান কারণ কী হতে পারে?

পরবর্তীতে একটু পড়াশোনা করে জানতে পারলাম, Tubercular Meningitis এর একটা কমপ্লিকেশন হল Ischaemic Stroke. তাছাড়া আরেকজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার যে প্রাথমিকভাবে দেখেই এটাকে Encephalitis হিসেবে ডায়াগনোসিস করেছেন তারও কারণ আছে।

কারণ হল Tubercular Meningitis হল Tuberculosis এর একটা Severe Form, তাই এখানে Meninges এর পাশাপাশি Adjacent Brain Parenchyma ও ইনভল্ভড হয় অনেক সময়।

আমি অবশ্যই ধন্যবাদ জানাই ওই ডাক্তারকে যিনি আগ্রহ সহকারে পেশেন্টের হিস্ট্রি নিয়েছেন এবং ফিজিক্যাল এক্সামিনেসন করতে গিয়ে প্রথম Cervical Lymphadenopathy এর বিষয়টা ডিসকভার করেছেন। পেশেন্টের এটেন্ড্যান্টের কথা শুনে মনে হচ্ছে ওই ডাক্তার সম্ভবত ইনডোর মেডিকেল অফিসার ডা. মিলি আপু। যদিও আপুর সাথে কখনো পরিচয় হয়নি। তবে বিষয়টা জেনে ভালো লাগলো।আপুর জন্য অনেক দোয়া এবং শুভকামনা।

অবশ্য রোগী এবং রোগীর পরিবারের জন্য খুব খারাপ লাগছে।

হোমিওপ্যাথিক ওষুধের পেছনে অযথা টাকা আর সময় নষ্ট করে এখন জীবন মরণাপন্ন, পাশাপাশি পেশেন্টের ওপর নির্ভরশীল তার পরিবারও আজ বিধ্বস্ত হয়ে পড়লো!

পুনশ্চ: কারো দোষ ধরার জন্য এই লেখাটি নয়। সরকারি হসপিটালে এত রোগীর চাপে অনেক সময়ই সময় নিয়ে পেশেন্টের হিস্ট্রি নেয়া,কথা শোনা,এক্সামিনেসন করা সম্ভব হয় না।

ইংরেজিতে একটা কথা আছে,, Knowledge increases by Sharing, not by Saving! এই সিরিজের সবগুলো লিখাই একাডেমিক আলোচনার জন্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

প্রেসক্রিপশনের ব্যাপারে যত্নশীল হোন!

প্রেসক্রিপশনের ব্যাপারে যত্নশীল হোন!

রোগীর মুল সমস্যা, উপরের পেটে ব্যথা, বুকে জ্বালাপোড়া, পিঠে ব্যথা, দুর্বলতা। একটা…

আবেগীয় স্মৃতির গুদামঘর

আবেগীয় স্মৃতির গুদামঘর

ইন স্টিমের উপরে কাঠবাদামের আকারের অঞ্চলটির নাম "এমাগডেলা"। লিম্বিক সিষ্টেমের দুটি অংশ…

ক্লিনিক মালিকের আবদার টেস্ট বেশি দিতে হবে!

ক্লিনিক মালিকের আবদার টেস্ট বেশি দিতে হবে!

নোয়াখালী অঞ্চলে এক ক্লিনিকে কিছুদিন চাকুরী করেছিলাম। ডাক্তার সমাজে খন্ডকালীন এসব চাকুরীকে…

অধ্যাপক মনসুর খলিল স্যারকে শেষ দেখা!

অধ্যাপক মনসুর খলিল স্যারকে শেষ দেখা!

আজ থেকে তিন বছর আগে ২০১৫ সনের ডিসেম্বরের ৭ তারিখে আমি বদলী…

সুইসাইড ও পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার

সুইসাইড ও পার্সোনালিটি ডিজঅর্ডার

"স্যার আদাব, অপিসি পয়সনিং, পুলিশ কেইস..." মোবাইলে ইমার্জেন্সী চিকিৎসকের ফোন পেয়ে আউট…

'এইবার মিয়াসাব তাবিজের পাশাপাশি ওষুধ খাইতে বলছেন'

'এইবার মিয়াসাব তাবিজের পাশাপাশি ওষুধ খাইতে বলছেন'

আফিয়া বেগম উদ্ভ্রান্তের মত ৩২ বছর এর ছেলেকে নিয়ে আমার চেম্বারে আসলেন।…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর