ঢাকা      শনিবার ১৫, ডিসেম্বর ২০১৮ - ৩০, অগ্রাহায়ণ, ১৪২৫ - হিজরী



পুষ্টিবিদ উম্মে সালমা তামান্না

বিআইএইচএস জেনারেল হাসপাতাল, মিরপুর ও

ইবনে সিনা ডায়াগনস্টিক আ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার, বাড্ডা


সঠিক নিয়ম মেনে ডায়েট করুন

দরজা খুলেই রুমে তড়িঘড়ি করে ঢুকল মেয়েটা। সঙ্গে তার মধ্যবয়স্ক একজন পুরষ। আচরণে বুঝলাম যে তারা স্বামী-স্ত্রী। ঢুকেই চেয়ারে বসে কথা বলা শুরু করে দিল মেয়েটা। মেয়েটার অস্থিরতা ছিল চোখে পড়ার মত। দেখেই বুঝলাম যে এর পিছনে বাড়তি শ্রম দিতে হবে। আমি যে তার আচরণে হতচকিত সেটা বুঝতে না দিয়ে নাম জানতে চাইলাম। 

সে নাম না বলেই বলা শুর করল ম্যাম, আমি বেশ জটিলতার মধ্যে আছি। আপনার কাছে আমি আগে সব বিস্তারিত বলতে চাই। প্লিজ একটু শুনবেন কষ্ট করে। অনেক ডেসপারেট হয়ে আপনার কাছে এসেছি।

- জ্বী বলুন। অবশ্যই শুনব আপনার কথা। তবে তার আগে আপনার নাম আর বয়স বলুন। মেয়েটি তার নাম বলল। এরপর তার ওজন ও উচ্চতা দেখে নিলাম। মেয়েটির ওজন ছিল ৭০ কেজি। উচ্চতা এবং বয়স অনুযায়ী তার আদর্শ ওজন ৪৮ কেজি।
- ম্যাম, দেখেছেন আমার ওজন কত বেশি। এই ওজন কমানোর জন্য আমি অনেক কিছু করেছি। ভার্সিটিতে থাকাকালীন হলে আমি আর আমার ফ্রেন্ডরা মিলে ডায়েটের উপর অনেক পড়াশোনা করেছি।

থামিয়ে দিয়ে বললাম, আপনি কি ফুড আ্যান্ড নিউট্রিশনের স্টুডেন্ট?
- না ম্যাম, আমি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্রী। কিন্তু ওজন কমানোর জন্য আমরা অনেক পড়াশোনা করেছি ডায়েটের ব্যাপারে। গুগল সার্চ করেও অনেক কিছু জেনেছি (ভাষা হারিয়ে ফেললাম কথা শুনে)। আমার বেবি হওয়ার পর ওজন অনেক বেড়ে গিয়েছিল। আমি তখন থেকেই ডায়েট শুরু করেছিলাম। ব্যায়াম ও করতাম ১.৫ ঘন্টা করে। ওজন অনেক কমে গিয়েছিল। আমি তখন সেরকম খুশি ছিলাম। কিন্তু কিছুদিন পর ডায়েট করা বন্ধ করলে আমার ওজন আবার বাড়তে লাগল। এক পর্যায়ে ওজন আগের চেয়ে দ্বিগুন হয়ে গেল। আমি তখন ক্রাশ ডায়েট শুরু করি। আমার ওজন কমতে থাকে। কিন্তু শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়ায় আমি আর ক্রাশ ডায়েট কন্টিনিউ করতে পারিনি।

আপনাকে ক্রাশ ডায়েট চার্ট কে দিয়েছে?
- কেউ দেয়নি। আমি অনলাইনে দেখে শিখেছি। খাবারের ক্যালরি হিসাব করে নিজেই চার্ট বানিয়েছি। কিন্তু প্রেশার ফল করায় আমি আবার নরমাল খাবার খাওয়া শুরু করি। কিছুদিন পর আমি আবার ডায়েট, এক্সারসাইজ শুরু করে ৪ মাস কন্টিনিউ করলেও আমার ওজন আর আগের মত কমছিল না। তখন আমি ওমাদ ডায়েট করা শুরু করলাম। কিন্তু ওজন আর ২/৩ কেজির বেশি কমছে না। মাঝখানে একদিন মাথা ঘুরিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম।

- আপনার প্রেশার তো এখনও অনেক কম আছে, ৯০/৫০
- এখনতো আমি স্বাভাবিক খাবারই খাচ্ছি। গত সপ্তাহ থেকে আমা মেরুদন্ডের হাড়ে প্রচন্ড ব্যথা শুরু হয়েছে। আমি আপনার পাশের চেম্বারের ডা. সাইদুল ইসলামকে দেখিয়েছি। উনি আমাকে কিছু টেস্ট করতে দিয়েছে।
- হুম, আপনার টেস্টের রিপোর্টগুলো আমি দেখেছি। জানেন কি রিপোর্টে কী আছে? আপনি যে আপনার কত বড় ক্ষতি করেছেন সেটা কী বুঝতে পারছেন?
- জ্বী, (মাথা নিচু করে) আমার হিমোগ্লোবিন লেভেল কমে গেছে। বোন ডেনসিটিও কম। ক্যালসিয়ামের অভাব আছে ডাক্তার বলল। আমাকে ভিটামিন ডি এর ইঞ্জেকশন আর ক্যালসিয়াম এর ট্যাবলেট দিয়েছে। আমার হাজব্যান্ড বলল, এই মূহুর্ত্বে তোমার নিউট্রিশনিস্টের কাছে যাওয়া জরুরি। তাই আপনার কাছে আসা।

আপনি দেশের একটা স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। এখন নিজেই ব্যবসা করছেন। তারপরও এত বড় ভুল কী করে করলেন আপনি? ডায়েট জিনিসটা কোন ছেলে খেলা নয়। এটা ঠিক ম্যাথের মত, অনেক যত্ন সহকারে যার হিসাব মেলাতে হয়। ডায়েট করতে হয় আ্যান্টিবায়োটিকের ডোজের মত। আ্যন্টিবায়োটিকের ডোজ মিস হয়ে গেলে যেমন সেটা আর কাজ করে না, আবার শুরু থেকে নিতে হয়। ঠিকমত ডোজ কম্পলিট না করলে যেমন একটা সময় আ্যন্টিবায়োটিক রেসিস্টেন্স হয়ে যায় আমাদের শরীর, ডায়েটটাও ঠিক তেমন। না জেনে উলটা পালটা ডায়েট করার কারনে বিশেষ করে শুরুতেই অতিরিক্ত কম ক্যালরির ডায়েট করার কারণে আমাদের বডিকেও আমরা ডায়েট রেসিস্টেন্স করে ফেলি। ডায়েট করতে চাইলে অবশ্যই একজন পুষ্টিবিদের শরনাপন্ন হোন। তার কাছে আপনার শারিরীক জটিলতার কথা বিস্তারিত বলুন। তিনিই আপনাকে সঠিক পরামর্শ দিতে পারবেন।

ম্যাম আমি তো এমন একটা চার্ট ফলো করেছি যাতে অনেকেরই ওজন কমে গিয়েছে।
- কিন্তু ঐ ক্যালরির চার্ট যে আপনার জন্য সেটা কি কনফার্ম হয়েছেন? আমরা পুষ্টিবিদরা সবসময় বলি এক একজনের চার্ট এক একরকম। উচ্চতা, ওজন একই হলে যে চার্ট একরকম হবে তা নয়। বয়স, জেন্ডার, শারিরীক কী কী জটিলতা আছে তার উপর নির্ভর করে আমরা চার্ট দেই। আপনি কোন মেডিসিন নিচ্ছেন কিনা সেটাও মাথায় রাখতে হয়। কারণ ওজন কমানোর জন্য আমরা মাঝে মাঝে যেসব টনিক জ্যুস দেই কিছু গ্রুপের মেডিসিন গ্রহনকালীন এসব জ্যুস নেয়া যায় না। ডায়েট করার নিয়ম হল ক্যালরির পরিমান ক্রমাগতভাবে কমানো হবে। খাবারেও ভ্যারিয়েশন থাকবে। একই চার্ট দীর্ঘদিন ফলো করলে একটা পর্যায়ে যেয়ে আর ওজন কমতে চায় না। একজন পুষ্টিবিদ এমনভাবে ডায়েট চার্ট করেন যাতে আপনার ওজনও কমবে কিন্তু শরীরে কোন পুষ্টি ঘাটতি হবে না।

ম্যাম (অনুতপ্ত হয়ে) আমি বুঝতে পেরেছি যে ভুল করেছি। আমি এখন কী করব সেটা একটু বলেন।
- আপনি তো ক্রাশ ডায়েট, ওমাদ ডায়েট করে আপনার শরীরে পুষ্টির ঘাটতি তৈরি করে ফেলেছেন। এসব ডায়েটে শুরুতে কিছু ওজন কমলেও পরে ওজন বাড়তে  সময় লাগে না। ডায়েট করার আগে আপনার অবশ্যই জানা জরুরি ছিল কোন ডায়েটের কী উপযোগীতা, যেই ডায়েটটা করবেন সেটার কোন প্বার্শপ্রতিক্রিয়া আছে কিনা। আর সবচেয়ে জরুরি বিষয় হল কোন ডায়েটটা আপনার জন্য প্রযোজ্য। সবকিছু মেনে ডায়েট করলে আপনার শারিরীক অবস্থার এত অবনতি হত না।

আপনাকে আমার জন্য ভাল হবে এমন একটা ডায়েট চার্ট করে দিন।
- তা তো অবশ্যই। তবে পরবর্তীতে যে কোন শারিরীক সমস্যায় খাদ্য তালিকার জন্য অবশ্যই একজন ক্লিনিক্যাল ডায়েটিশিয়ান/নিউট্রিশনিষ্টের কাছে পরামর্শের জন্য আসবেন। কোন তিন মাস/ছয় মাস অনলাইনে কোর্স করা নামধারী ডায়েটিশিয়ানের কাছে থেকে আর চার্ট নিবেন না। আর গুগল থেকে তো অবশ্যই না।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ক্রিপটোমেনোরিয়া মাসিক যেথা লুকিয়ে রয়

ক্রিপটোমেনোরিয়া মাসিক যেথা লুকিয়ে রয়

রামিসা, চৌদ্দ বছরের টলটলে কিশোরী। ক্লাস নাইনে পড়ে। হাত পা বড় হয়ে…

স্ট্রোক প্রতিরোধে করণীয়

স্ট্রোক প্রতিরোধে করণীয়

আগে স্ট্রোকের রোগী মানেই মাথায় আসতো বুড়ো কোন রোগীর মুখ। ।কিন্তু এই…

টার্নার সিনড্রোম কী, উপসর্গ ও চিকিৎসা

টার্নার সিনড্রোম কী, উপসর্গ ও চিকিৎসা

ক্রোমোসোমের সমস্যার জন্য টার্নার সিনড্রোম হয়।  মানুষের শরীরের দেহকোষে ৪৬টি ক্রোমোজোম থাকে। …

আমি তো মরে গেছি, আমাকে গোরস্তানে রাখো

আমি তো মরে গেছি, আমাকে গোরস্তানে রাখো

আমেনা বেগম, বয়স ৪৬।  কিছু দিন পূর্বে জ্বরে ভুগেন।  ৪-৫ দিন জ্বর…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর