ডা. কাওসার উদ্দিন

ডা. কাওসার উদ্দিন

সহকারী সার্জন

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়।


১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ১১:৩৫ এএম

মা তার মেঘে ঢাকা তারা

মা তার মেঘে ঢাকা তারা

শুভ্র মেডিকেলে ফাইনাল ইয়ারে পড়ে তখন। হঠাৎ এক সকালে বাবা তাকে ফোন দিয়ে জানান মা নাকি কিছুটা অসুস্থ। শুভ্র সেদিনই ক্লাশ বাদ দিয়ে বাড়ির পথে রওনা দেয়। বাড়িতে গিয়ে দেখে মা বিছানায় শুয়ে আছেন, চোখ মুখে অসহ্য যন্ত্রণার ছাপ (vague abdominal discomfort), পেটের দুপাশে চিনচিনে ব্যথা (loin pain)। প্রস্রাবে ভীষণ জ্বালাপোড়া (UTI), প্রসাবের রঙটাও রক্তের মত টকটকে লাল (Hematuria)। মায়ের মাথাটা ভীষণ ধরা থাকে, রাতে ভাল ঘুম হয় না। শুভ্র তার ব্যাগে থাকা বিপি স্টেথো দিয়ে প্রেশার মেপে দেখে বেশি (HTN)!

শুভ্রর মাথাটা একটু ঝিমঝিম করে। কোন এক পরিচিত রোগের সাথে যেন সিম্পটমগুলো মিলে যাচ্ছে। তবে নিশ্চিত হতে পারছে না। মনে মনে প্রার্থনা করছে খারাপ কিছু যেন না হয়। পরদিনই মাকে নিয়ে যায় ডাক্তারের কাছে৷ তিনি সব শুনে প্রসাবের একটি টেস্ট (urine R/E) আর পেটের একটা আল্ট্রাসনো করতে দেন। রিপোর্ট হাতে এলে দেখা যায় প্রসাবে অসংখ্য RBC, RBC cast; আর আল্ট্রাসনোতে দুটো কিডনি জুড়ে অসংখ্য ছোট বড় cyst...

মেডিকেলের ছাত্র হিসেবে শুভ্রর যতটুকু যা জ্ঞান আর স্যরের কথোপকথন শুনে ও নিশ্চিত হয়ে যায় এটা পলিসিস্টিক Adult Polysystic Kidney Disease (PKD)! cyst গুলো একটা বা দুটো কিডনিতে থাকতে পারে, মায়ের দুটোতেই আছে! শুভ্রর মাথার ভেতরে কেমন ঘুরপাক দিয়ে ওঠে।

মায়ের বয়স খুব বেশি না, ৪৫ মাত্র। এ রোগটার শুরু ছোটবেলা থেকেই (infancy or childhood), cyst গুলো আস্তে আস্তে বড় হয় আর সিম্পটম প্রকাশ পায় ২০ বছরের পর থেকে যে কোন সময়। শুরুর দিকে যা থাকে তা শুধুই HTN, দিন যত যায় ততই অন্যান্য সিম্পটম প্রকাশ পায়। এটা Autosomal dominant in origin.(তবে Infantile PKD বলে আর একটা cystic renal disease আছে যেখানে শুরু থেকেই সিম্পটম থাকে, এবং সেটা Autosomal Recessive in origin) ডায়াগনোসিস আল্ট্রাসনোতে হয়, cyst খুব ছোট হলে MRI করে দেখা যায়।

Adult PKD এর কারণ genetic. gene mutation হয়ে এ রোগ হয়। দুটো gene এর জন্য দায়ী হতে পারে- PKD1 বা PKD2. PKD1 mutation হয়ে হলে যেটা হয় সেটা বেশি খারাপ!

শুভ্র নিজেকে প্রবোধ দেয়। নিশ্চই মায়ের খারাপ কিছু হবে না। আর এটা তো কোন ক্যান্সার না। কিন্তু শুভ্র তখনো জানে না এটা কখনো ক্যান্সার থেকেও মারাত্মক হতে পারে।

cyst গুলো কত তাড়াতাড়ি বড় হয় বা কত বেশি বড় হয় তার উপর নির্ভর করে এ রোগের তীব্রতা। প্রস্রাবের সাথে রক্ত গেলেও শুরুতে কোন ব্যথা থাকে না (painless hematuria)। কিন্তু যখন cyst গুলোর মধ্যে রক্তক্ষরণ হয় তখন প্রচণ্ড ব্যথা থাকে (painful hematuria)। অর্থাৎ এটি একই সাথে painless ও painful দু রকম hematuria নিয়ে প্রেজেন্ট করে।

শুভ্রর মায়ের creatinine তখন নরমাল। ডাক্তার তাদেরকে টেনশন করতে বারণ করেছেন। শুভ্র আশায় বুক বাঁধে, মা নিশ্চই তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে যাবেন। সে আবার ঢাকায় ফিরে আসে, ব্যস্ত হয়ে পড়ে পড়াশোনায়। সামনে ফাইনাল প্রফ, ডাক্তারি পাশ করার সর্বশেষ কঠিন এক্সাম। এর মাঝে ছুটিতে একদিন বাড়িতে গেলে মা আবার তাকে পেটে ব্যথার কথা বলে। ছুটি শেষে শুভ্র তাই মাকে নিয়ে হাজির হয় ঢাকায়। নেফ্রোলজিস্ট স্যারের সাথে কথা বললে, সবকিছু দেখে তিনি অল্প কিছু ওষুধ দেন আর ফলোআপে থাকতে বলেন। creatinine তখনো নর্মাল।

ইতোমধ্যে শুভ্র এমবিবিএস পাশ করে ইন্টার্নশিপ শুরু করে, আর তখনই হঠাৎ করে মা আবার অসুস্থ হয়ে যায়। ডিউটি ফেলে বাড়িতে গিয়ে দেখে মায়ের চোখ মুখ ফোলা, পেটটাও একটু ফোলা। নিজেই creatinine করেই দেখে অনেক বেশি। শুভ্র ভেবে পায় না কী করবে। তবে কী তার ভয়টাই সত্যি হতে যাচ্ছে! ওদিকে বাবারও বয়স হয়েছে, বাড়িতে একটা মাত্র ছোট বোন। বাড়ির একমাত্র ছেলে হিসেবে সব দায়িত্ব তারই। শুভ্র জানে স্যাররা এখন কী বলবে, তার মায়ের renal failure ডেভেলপ করেছে।

মায়ের এখন যা প্রয়োজন তা হল Hemodialysis. শুভ্র মাকে নিয়ে আবার ঢাকা যায়, ইউরোলোজি ডিপার্টমেন্টে এনে ডায়ালাইসিসের জন্য মায়ের হাতে ফিস্টুলা করিয়ে রাখে। আল্ট্রাসনোতে মায়ের সিস্টগুলো বেশ বড় তখন, আর পেটটাও ভীষণ ভারী। এই শরীর নিয়ে মাকে নিয়ে বারবার ঢাকায় যাতায়াত করা বেশ কষ্টকর। শুভ্র তাই নিজ শহরের ডায়ালাইসিস সেন্টারে যোগাযোগ করে। সেখানের স্যররা তখনই ডায়ালাইসিস শুরু করতে বললেন। সপ্তাহে তিন দিন চার ঘন্টা করে। প্রতি শনি সোম বুধবার মায়ের ডায়ালাইসিস চলতে থাকে। চলছে তো চলছে, এভাবে চলতে থাকে সীমাহীন কষ্টকর এই চিকিৎসা প্রক্রিয়া, শুভ্র তখনো জানেনা মায়ের এ কষ্টের শেষ কোথায়...

বিসিএস দেওয়ার পর শুভ্রর পোস্টিং হয় বাড়ির কাছেই সরকারি হাসপাতালে। ডিউটি ছাড়া পুরোটা সময় শুভ্র মায়ের কাছেই থাকে। বেতন যা পায় তা দিয়ে চিকিৎসার যতটুকু যা করা যায় তার সবই সে করে। কিন্তু দিনে দিনে cyst গুলো আরো বড় হতে থাকে, মায়ের পেটটা ভীষণভাবে ফুলে যায়। হঠাৎই একদিন মায়ের ভীষণ শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। cyst এর প্রেশার ইফেক্টে মায়ের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারে। আবার একটা আল্ট্রাসনো করা হয়৷ সেখানে দেখা যায় লিভারেও বেশ কিছু সিস্ট! ৩০% ক্ষেত্রে renal cyst সাথে hepatic cyst নিয়ে প্রেজেন্ট করে। তবে লিভার ফাংশন নর্মাল থাকে, লিভার বড় হয় শুধু। আর এটা মহিলাদের বেশি হয়।

Cyst গুলোর প্রেশার ইফেক্ট কমানো যায় কিনা সেটা চিন্তা করে cyst এর আল্ট্রাসনো গাইডেড fluid aspiration এর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। aspiration এর সময় দেখা যায় fluid এর সাথে blood আসছে, তাই aspiration আর কন্টিনিউ করা হয় না। মায়ের আগে থেকেই anaemia ছিল, এর সাথে যদি blood mixed fluid aspiration করা হয় তবে সিস্টের ফাঁকা জায়গায় আবারো নতুন করে ব্লিডিং হবে, এতে anemia আরো বাড়বে। cyst গুলো ড্রেইন না করায় মায়ের কষ্টটাও কমানো গেলো না।

erythropoietin injection প্রায়শই পুশ করা হয় anaemia কমানোর জন্য। সবকিছুর পরেও মা খুব একটা ভাল ছিল না। আর কি করা যায় সেগুলো নিয়ে শুভ্র অনেক ভাবলো। কিন্তু একটা চিন্তা কেন জানি শুভ্রর গভীরভাবে করা হয়নি, স্যাররাও কখনো বলেনি এ ব্যাপারে, আর সেটা হল kidney transplant!

মায়ের বেশ কষ্ট হতো, কিন্তু মুখ ফুটে তেমন কিছুই বলতো না। এদিকে শুভ্রর ট্রান্সফার হয়ে যায়। বাড়ি থেকে দূরে। সেখানে বেশ কাজের ব্যস্ততা, তবুও যখনই ছুটি পায়, ক্ষণিকের জন্য ছুটে আসে মাকে দেখতে।

মায়ের গতানুগতিক চিকিৎসার ভরসায় শুভ্র ঘুণাক্ষরে ভাবতে পারেনি মায়ের সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, নতুন কিছু ভাবতে হবে, করতে হবে নতুন কিছু। সবকিছু ছাপিয়ে কিভাবে যেন কিছুটা দিন পার হয়ে যায়। মায়ের কিডনি ততদিনে পুরোটাই ননফাংশনাল, ডায়ালাইসিস চলছে নিয়মিত। কিডনি দুটো তখন বেশ বড়। তাই এক পর্যায়ে চিন্তা করলো, ডায়ালাইসিস যেহেতু চলছেই সেহেতু এই ভারী কষ্টদায়ক কিডনি রেখে কী হবে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় nephrectomy করার, এতে হয়তো মায়ের কষ্ট কিছুটা কমবে। কিন্তু নেফ্রোলোজিস্ট যাদেরকে দেখালো তারা কেউ এ ব্যাপারে তেমন পজিটিভ কিছু বললেন না, আশংকা করলেন nephrectomy করতে যেয়ে যদি OT টেবিলে কিছু হয়, তার থেকে এখন যেমন চলছে তেমনই চলুক। চলতে থাকলো এভাবে আরো কিছুদিন...

শুভ্র সেদিন ডিউটিতে। হঠাৎ বাবার ফোন, রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে, তোর মা খুব অসুস্থ, তাড়াতাড়ি বাড়িতে আয়। শুভ্র তাড়াতাড়ি মাকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। মা তখন আইসিউতে ভর্তি, শ্বাস প্রশ্বাসে কষ্ট হচ্ছে, পালমোনারি ইডিমা ডেভেলপ করেছে। এদিকে ইমারজেন্সি ডায়ালাইসিস করা দরকার, কিন্তু আইসিইউতে কোন পোর্টেবল ডায়ালাইসিস মেশিন নেই। সবকিছু চিন্তা করে অন্য কোন উপায় না দেখে হয়ে মাকে আইসিইউ থেকে বের করে ডায়ালাইসিসের জন্য মাকে বাইরে নিয়ে আসে, শেষ হলে আবার আইসিইউতে ফিরয়ে নিয়ে আসে। মা তখন অজ্ঞান...

মা আইসিইউতে, শুভ্র পাশেই ডক্টরস রুমে, একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলো। হঠাৎই আইসিইউ থেকে কল আসে। শুভ্র ছুটে যায় মায়ের বেডের কাছে। সবকিছু চুপচাপ, নিথর নীরব তার মায়ের চাহনি। নেই, শুভ্রর মা আর বেঁচে নেই। মা, তার ভালবাসার মা, সবকিছু ছেড়ে চলে গেছেন দূরে, অনেক দূরে সেই না ফেরার দেশে। মায়ের নিথর দেহটা কোলে নিয়ে শুভ্র বাড়িতে আসে। মনে মনে অনুতাপ করে আর বলে, ক্ষমা করে দিও মা, আমি তোমার জন্য সবটা করতে পারিনি, আমি তোমাকে কিডনি দিতে পারিনি, আমায় ক্ষমা করে দিও...

শুভ্রকে সবাই সান্ত্বনা দেয়, কিন্তু শুভ্র কিছুতেই শান্তি খুঁজে পায় না। লোকে বলে সময়ের সাথে সব নাকি একদিন ভুলে যাবে। সেসব শুনে শুভ্র বলে, মায়ের স্মৃতি কি ভোলা যায়, মা যে আমার ভালবাসার মা...

লেখাটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে। সবাই শুভ্রর মায়ের জন্য দোয়া করি।

 

 

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না