ঢাকা      বুধবার ২৪, জুলাই ২০১৯ - ৯, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. ছাবিকুন নাহার

মেডিকেল অফিসার, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল


হাইমেন সমাচার অথবা সতীচ্ছেদ মিথ

উমম... কীভাবে যে শুরু করি! ব্যাপারটা এমন যে, এসব নিয়ে আমরা সাধারনত কথা বলতে চাই না। এ ব্যাপারে কথা না বলাই যেনো সভ্যতা ভব্যতা। অবশ্য মনেমনে হয়তো অনেকেই জানতে চাই। জানাটা ভীষণ দরকার।

যাইহোক বলছিলাম হাইমেন বা সতীচ্ছেদের কথা। কোথাও কোথাও একে বলে সতীপর্দা। নামটার মধ্যেই কেমন যেনো একটা বেঁধে রাখা বা নিয়ন্ত্রণ করার গল্প আছে। অন্তত আমার কাছে তাই মনে হয়। আমি অবশ্য বলি ঠকানোর গল্প।

নারীর ভ্যাজাইনাল ইনট্রয়টাস বা যোনীমুখে একটা স্বচ্ছ আবরন থাকে তাকেই এই জিনিস বলা হয়। আমার ইংরেজী প্রীতি নেই বললেই চলে। ঠেকায় না পরলে বাংলা ছাড়া নড়ি না। তবে একটা ব্যাপার স্বীকার করতেই হয়, অনেক নিষিদ্ধ গন্ধমাখা কথাও ওরা অবলীলায় বলে দেয়। একটুও অন্যরকম লাগে না শুনতে। হাইমেন অন্য আট দশটা কথার মতোই। কিন্তু সতীপর্দা!হায় হায়! এই মেয়ের মুখে কিছু আঁটকায় না।

সো এই লেখায় হাইমেন কথাটা হয়তো বেশি আসবে। শত হলেও আমি ও একই জল হাওয়ায় বসবাস করি।

 

যুগে যুগে নারীকে এই এক পর্দা বা হাইমেন দিয়ে এমন টাইট দেয়া হয়েছে যে, শুনলে আঁতকে ওঠবেন।

হাইমেনকে নারীর সতীত্বের সনদ ধরা হয়। যার আছে সে ভার্জিন বা সতী। যার নেই সে যে কি? মর্ত্যের দোজখের লাকড়ি। যাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ভার্জিনিটির মিথ ছড়ানো হয়। নাকি? আমার ভাষায় কুলায় না, আপনারা ধরে নিন আর নারী হলে মিলিয়ে।

এই মিথ কত নারীকে যে দুনিয়ার নরকে নিক্ষেপ করেছে, তা বলে শেষ করা যাবে না। সীতাকে আগুন পরীক্ষা দিতে হয়ছিল বলে শুনেছি। আর রামকে? ধুরর, ওদিকে যাচ্ছি কেন?

এখন আসুন জেনে নিই এই জিনিস আসলে কী?

প্রত্যেক নারীর যোনী পথের শুরুতে একটা খুবই পাতলা স্বচ্ছ পর্দা থাকে। যা হাইমেন নামে পরিচিত। বাংলায় কী বলে তা আপনারা জানেন। আরো জানেন যে ফার্স্ট মেটিংয়ে এই মনোরম আবরন ছিড়ে যায় এবং কিছুটা ব্লিডিং হয়।

ব্লিডিং হয়েছে? বেঁচে গেছো নারী। তুমি ভার্জিন। ব্লিডিং হয়নি? হবে ক্যামনে, তুমি তো অ...স...তী...

থামেন থামেন বিজ্ঞজন। একটু শুনেন। তারপর না হয় বলবেন। বিবেচনা আপনার।

এই হাইমেন অনেক ধরনের হয়। যেমন-

* লুনাটিক (পঞ্চমীর চাঁদের মতো,হলো না - কাস্তের মতো),

* অনেকগুলো ছিদ্রযুক্ত,

* লুজ,

* টাফ।

* কখনো কখনো এবসেন্ট। এমনি এমনি।

আবার কখনো কখনো পুরোটাই বন্ধ। বন্ধ মানে বন্ধ। নো এন্ট্রি, নো এক্সিট। নো মেন্সট্রুয়েশান, নো মেটিং।

যা বলছিলাম, এই হাইমেন এতই সংবেদনশীল যে এটা ছিঁড়ে যায়। তার এই ছিঁড়ে যাওয়াটাই নিয়তি। যেমন, কবির, এই পথ চলাতেই আনন্দ।

কী কারণে যায় তা পৃথিবীর সবাই জানে। না জানা কারণগুলো হলো-

* দৌড়ঝাঁপ

* গাছে চড়া

* বাইসাইকেল চালানো

* শিশুরা কৌতুহলপ্রবণ হয়ে নিজের প্রাইভেট পার্টসে ফিংগার, পেন্সিল, অন্যান্য ফরেন বডি ঢুকায়,ফলাফল...

পেন্সিল সবচেয়ে বেশি দায়ী পেন্সিলবাসী। যাবেন কই, মাফ নাই। পেন্সিল বেশি এভ্যাইলাবল শিশুদের কাছে।

বুঝা গেল ব্যাপারটা?

মজার ব্যাপার কি জানেন? এমনও আছে, কোন কোন নারীর পাঁচ সাতটা বাচ্চা, ভ্যাজাইনাল ডেলিভারি অথচ হাইমেন বহাল তবিয়াতে বসে আছে!

আবার এমনও আছে...বলে লাভ নেই। সে গল্প আপনারা জানেন।

শেষ করছি একটা গল্প দিয়ে-

উথাল পাতাল সুন্দরী এক রাজকন্যা। বিয়ে হলো এক রাজপুত্রের সাথে। তাদের বাসর।

রাজার অস্থির পায়চারী। হাতে তলোয়াড়।

মেয়ে তার মুখে চুনকালী মাখাবে না তো?

মেয়ের সতীত্ব আছে তো? রক্তমাখা রুমাল এখনো খিড়কী দিয়ে ছুঁড়ে মারছে না কেন?

সবাই অপেক্ষা করছে। এই লাল রক্ত তো আমার মান সম্মান, অহংকার, সব। সব বুঝি গেল। তবে কী....না আমি ভাবতে পারছি না।

আমার এই হাত দিয়ে আমার কন্যাকে খুন করব! আমি! বড় একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করলেন রাজা। আমি রাজা। সম্মান রক্ষার্থে আমি সব করতে পারি। হায় সম্মান! তুমি এত মামুলি! হাইমেনে থাকো! অস্ফুট স্বরে রাজা ঠিকই বললেন নিজেকে নিজে।

ওদিকে রাজপুত্র গ্যাচাং করে কনিষ্ঠ আঙুল কাটল। ভালো করে রক্ত মাখাল। ছুঁড়ে দিল রাজার মুখে। একসাথে সমস্ত বাদ্যযন্ত্র বেজে ওঠল। সম্মানের বাজনা নাকি অসম্মানের, আমরা সেদিকে যাব না।

আমরা বরং বাসরে ফিরে আসি। শুনি তাদের কথোপকথন-

-তুমি কেন এমনটা করলে? ইস, হাত কেটে গেছে কতটা!

-শোন মেয়ে বিয়ে মানে একতাল মাংস নিয়ে হামলে পড়া নয়। বিয়ে মানে আরো অনেক কিছু।

-না মানে আমি তো ভার্জিনই। ব্লিডিং হতে ও পারত...

রাজপুত্র কথা শেষ করতে দেয় না। বুকের মাঝে চেপে ধরে আর ফিসফিস করে বলে,

-বোকা মেয়ে, ভার্জিনিটি হাইমেনে থাকে না। এইসব সব বানানো। দখলে রাখবার, দমিয়ে রাখবার কৌশল। আমি তোমাকে দখল করতে চাইনে। ভালোবাসতে চাই। আর ভালোবাসায় সব শুদ্ধ।

পুনশ্চ: পেন্সিল শিল্প সাহিত্যের একটি অনন্য প্ল্যাটফর্ম। এই লেখাটা আমাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দিয়েছিলো পেন্সিল এবং পেন্সিলের বাইরে। রোগী_কথন লেখার অনুপ্রেরণা বলতে যদি কিছু থাকে, তবে তা এই। শুভ জন্মদিন পেন্সিল।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ডেঙ্গুর মূল ফোকাস এবার প্লাজমা লিকেজের দিকে!

ডেঙ্গুর মূল ফোকাস এবার প্লাজমা লিকেজের দিকে!

এবারের ডেঙ্গু খুব atypical presentation নিয়ে হাজির হইছে। আমার ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ এবং…

জন্ডিস প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সতর্কতা

জন্ডিস প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় সতর্কতা

জন্ডিস নিজে কোন রোগ নয়। এটি রোগের উপসর্গ। লিভারে প্রদাহ বা হেপাটাইটিস…

ডেঙ্গুজ্বর আতঙ্ক: কারণ ও করণীয়

ডেঙ্গুজ্বর আতঙ্ক: কারণ ও করণীয়

ইদানিং দেশের ভয়াবহ মৃত্যুর আতঙ্কের অপর নাম ডেঙ্গু জ্বর। এ জ্বরে মানুষ…

আমরা কি মাস হিস্টিরিয়ায় ভুগছি?

আমরা কি মাস হিস্টিরিয়ায় ভুগছি?

মনোবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের ভাষায় মাস হিস্টিরিয়া হলো একধরণের কালেক্টিভ অবসেসশনাল বিহেভিয়ার। একটা…

ব্লাইটেড ওভাম: নির্ণয় ও চিকিৎসা

ব্লাইটেড ওভাম: নির্ণয় ও চিকিৎসা

ব্লাইটেড ওভাম (blighted ovum/ anembryonic pregnancy/ empty sec) প্রেগনেন্সিতে একটি পরিচিত সমস্যা।…

ক্যান্সার আক্রান্তের যতসব কারণ

ক্যান্সার আক্রান্তের যতসব কারণ

ক্যান্সার হলে আর রক্ষা নেই এ কথা বহুল প্রচলিত। যদিও বর্তমানে অনেক…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর